উল্লেখিত শব্দটি শুদ্ধ কি না: উল্লিখিত বনাম উল্লেখিত

ড. মোহাম্মদ আমীন
 
 
সংযোগ: https://draminbd.com/উল্লেখিত-শব্দটি-শুদ্ধ-কি/
 
শুবাচির প্রশ্ন: ‘উল্লেখিত’ শব্দটি ভুল না কি শুদ্ধ জানতে চাই। এটি কি আমি উল্লেখিত অর্থে ব্যবহার করলে অশুদ্ধ হবে?
উল্লিখিত সংস্কৃত শব্দ। যা বাংলায় তৎসম নামে পরিচিত। সংস্কৃত উল্লিখিত(উদ্‌+√লিখ্+ত) অর্থ— (বিশেষণে) ওপরে বা পূর্বে লিখিত, পূর্বে উক্ত। সুতরাং, সংস্কৃত হিসেবে উল্লেখিত শব্দটি সংস্কৃত ব্যাকরণমতে শুদ্ধ নয়।
তবে, তবে, বাংলায় এরূপ অনেক শব্দ প্রমিত এবং খাঁটি বাংলা শব্দ হিসেবে অভিধানে ঠাঁই পেয়েছে।  উল্লিখিত শব্দে বর্ণিত অর্থে বাংলায় ‘উল্লেখিত’ শব্দের বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। এখন দেখা যাক, শব্দটি অন্য উৎস বিচারে কতটুকু সিদ্ধ।
 
যেসব শব্দের মূল সংস্কৃত এবং পরে আংশিক পরিবর্তন হয়ে বাংলায় ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলো তদ্ভব। তদ্ভব শব্দের অপর নাম খাঁটি বাংলা শব্দ। বাংলায় এরূপ শব্দের পরিমাণ মোট শব্দের প্রায় ৬০ ভাগ। তৎসমের মতো তদ্ভব শব্দের কোনো ব্যাকরণিক ব্যুৎপত্তি নেই। শব্দটির মূল সংস্কৃতে আছে এবং বাংলায় বহুল ব্যবহৃত — এটি খাঁটি বাংলা শব্দ হওয়ার শর্ত বহুলাংশে পূরণ করে। এভাবে সংস্কৃত শব্দের পরিবর্তনের মাধ্যমে তদ্ভব বা খাঁটি বাংলা শব্দের জন্ম।
অর্থাৎ সংস্কৃত মূল আর প্রচলন দিয়ে বাংলার ৬০ ভাগ শব্দের (তদ্ভব) শুদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়েছে। অভিধানভুক্ত করা হয়েছে। এ হিসেবে “সংস্কৃত ‘উল্লিখিত’ হতে উদ্ভূত ‘উল্লেখিত’ খাঁটি বাংলা শব্দ হিসেবে  শুদ্ধ।
 
তবে ‘উল্লেখিত’ শব্দটি অভিধানে ঠাঁই পায়নি। কেবল এ একটা কারণে কোনো শব্দকে অশুদ্ধ বলা যায় না। আবার কোনো শব্দ অভিধানে ঠাঁই পেয়েছে কেবল এ একটি কারণ দিয়ে শুদ্ধতাও নির্ধারণ করা যায় না বাংলার প্রায় তিন লাখ শব্দের মধ্যে অভিধানভুক্ত হয়েছে কেবল এক লাখ বিশ হাজারের মতো শব্দ।
উপর্যুক্ত বিবেচনায় ‘উল্লেখিত’ শব্দটি খাঁটি বাংলা শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এটি যদি ভুল হয় তাহলে বাংলার ৬০ ভাগ শব্দই ভুল। কারণ বাংলার  মোট শব্দভান্ডারের ৬০ ভাগ শব্দই এভাবে  উদ্ভূত।
 
অভিধান ও বাংলা বানান
অনেকে মনে করেন, অভিধানে কোনো একটি শব্দের যে কয়টি বিকল্প বানান দেখা যায় সবগুলো শুদ্ধ। এ ধারণা ঠিক নয়। যেসব শব্দ অতীতে ব্যবহৃত হতো, কিন্তু এখন হচ্ছে না; বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে শুদ্ধ নয় এবং শুদ্ধ ও প্রমিত — সব ধরনের শব্দ অভিধানে থাকতে পারে। অভিধান ব্যাকরণ নয়, প্রমিত রীতিও নয়— এটি শব্দ ভাণ্ডার। তাই ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ হোক বা অশুদ্ধ হোক সব ধরণের শব্দ অভিধানে রাখা হয়।
 
যাঁরা অভিধান রচনা করেন তাঁরা বৈয়াকরণ হিসাবে অভিধান রচনা করেন না, আভিধানিক হিসাবে অভিধান রচনা করেন। পাঠক অভিধান দেখেন শব্দের অর্থ বা অর্থানুসারে বানান এবং প্রমিত বানান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য, ব্যাকরণরীতি জ্ঞাত হওয়ার জন্য নয়। যে সকল শব্দ প্রচলিত ছিল বা আছে সবগুলো অভিধানে না-দিলে বিভিন্ন বানানে লেখা শব্দের অর্থ-উদ্ধারে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য কোনো শব্দের যতগুলো বানান প্রচলিত ছিল বা আছে তা শুদ্ধাশুদ্ধ বিবেচনা না করে অভিধানে উল্লেখ করা হয়। অতএব, কেবল অভিধানভুক্তির কারণে কোনো শব্দ শুদ্ধ বা প্রমিত হয়ে যায় না। কোনো শব্দকে প্রকৃত অর্থে শুদ্ধ হতে হলে তা ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ হতে হয়। বিকল্প বিষয়টি দুর্ঘটনার জন্য রাখা হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় কেউ বিকল্প পন্থা গ্রহণ করে না। অভিধানে বিকল্প বানান হিসেবে রাখা শব্দের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। তাই বিকল্প বানান স্বাভাবিক বানান নয়।
 

এবার দেখা যাক, অভিধান কী? অভিধানকে দোকানের সঙ্গে তুলনা করা যায়। পার্থক্য হচ্ছে, দোকান পণ্যভাণ্ডার এবং অভিধান শব্দভাণ্ডার। ক্রেতাসাধারণের চাহিদা অনুযায়ী দোকানকে পণ্যসজ্জিত করা দোকানির কাজ। পণ্যের ভালোমন্দ, ক্রেতাসাধারণের লাভক্ষতি বা প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ নির্ধারণ দোকানির কাজ নয়। সময়-স্থান ও প্রচলন বা চাহিদা অনুযায়ী দোকানি যেমন পণ্য সজ্জিত করেন, তেমনি আভিধানিক সজ্জিত করেন অভিধান। এজন্য একশ বছরের আগের অভিধানের শব্দভুক্তি আর পরের অভিধানের শব্দভুক্তিতে পার্থক্য দেখা যায়। একটি দোকানে চাহিদার সব পণ্য থাকার চেয়ে না-থাকাটাই অধিক স্বাভাবিক। তাই কোনো দোকানে কাঙ্ক্ষিত পণ্যটি না-ও পাওয়া যেতে পারে। এর মানে এই নয় যে, পণ্যটি কোথাও নেই কিংবা অস্তিত্বহীন। তেমনি, কোনো নির্দিষ্ট অভিধানে বা প্রচলিত সবকটি অভিধানেও যদি কোনো শব্দ পাওয়া না-যায়, তবু কারও এমনটি বলা সমীচীন হবে না যে, ওই শব্দটি নেই। বাংলা ভাষায় কমবেশি চার লাখের মতো শব্দ আছে। তবে এ পর্যন্ত অভিধানভুক্ত শব্দের সংখ্যা দেড় লাখের কম। তাই কোনো শব্দ কোনো অভিধানে না পেলে তা নেই কিংবা অস্তিত্বহীন বলা উচিত নয়।

পণ্যের ভালোমন্দ বিবেচনার চেয়ে ক্রেতার চাহিদা মেটানো এবং পণ্যবিক্রি করা দোকানির মুখ্য বিষয়। ক্রেতার লাভক্ষতি কিংবা স্বাস্থ্যের উন্নতি-অবনতির দিকে নজর দেওয়া দোকানির কাজ নয়। এ কাজের জন্য নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে, নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। ভাষার জন্য এই আইনটির নাম ব্যাকরণ। দোকানে থাকা সবপণ্য যেমন ভালো হতে পারে – এমনটি নিশ্চিত করে বলা যায় না, তেমনি অভিধানে থাকা সকল শব্দ শুদ্ধ- এটিও নিশ্চিত করে বলা যায় না। সিগারেট, মদ্য, ভেজাল পণ্য কিংবা পচা খাদ্যবস্তু স্বাস্থ্যহানিকর। তবু তা দোকানে রাখা হয়, বিক্রি করা হয়। দোকানি যদি ক্রেতার স্বাস্থ্য বিবেচনায় রত হয়, তাহলে ব্যবসায় লাটে উঠবে। অভিধানও ঠিক দোকানের মতো। অভিধানকে শব্দের গুদামও বলা যেতে পারে। গুদামে রাখা সব পণ্য মানসম্মত ও ভালো কিংবা স্বাস্থ্যকর তা বলা যাবে না। গুদামে ভালো-মন্দ, আংশিক ভালো, আংশিক মন্দ- সব রকমের পণ্য রাখা হয়। তাই গুদামে রাখা সব পণ্য মানসম্মত- এমনটি ভাবা যেমন সমীচীন নয়। তেমনি সমীচীন নয় অভিধানে উপস্থাপিত সব শব্দ শুদ্ধ ভাবা। বাকি অংশ দেখুন

নিচে কিছু প্রয়োজনীয় সংযোগ
 
 
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
 
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
 
 
 
 
 
আমি শুবাচ থেকে বলছি
 
 
 
 
 
 
— — — — — — — — — — — — — — — — —
প্রতিদিন খসড়া
 
 
error: Content is protected !!