একনজরে বেগম রোকেয়া: সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ষষ্ঠ বাঙালি

ড. মোহাম্মদ আমীন

মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত,  প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (বেগম রোকেয়া নামে সমধিক পরিচিত)  ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার অর্ন্তগত পায়রাবন্দ গ্রামে  জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৩২  খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর কলকাতায় মারা যান। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলার  সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি  নির্ধারণ জরিপে তিনি ষষ্ঠ  হয়েছিলেন।  তাঁর প্রথম লেখা পিপাসা এবং এর মাধ্যমে সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ।  পিপাসা ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘নভপ্রভা’ পত্রিকায়  প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে  ইংরেজি রচনা “সুলতানাজ ড্রিম” মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় ছাপা হয়। তাঁর লেখক ছদ্মনাম মিসেস আর.এস হোসেন । বেগম রোকেয়ার পিতা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের  এবং মা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। 

 রোকেয়ার  পিতা জমিদার আবু আলী হায়দার সাবের আরবি, উর্দু, ফারসি, বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তবে  নারীশিক্ষার ব্যাপারে ছিলেন প্রচণ্ড রক্ষণশীল। রোকেয়ার জ্যেষ্ঠ দুভাই  মোহাম্মদ ইব্রাহীম আবুল আসাদ সাবের ও খলিলুর রহমান আবু যায়গাম সাবের ছিলেন শিক্ষিত, বিদ্যানুরাগী ও উদার মনোভাবের অধিকারী। বেগম রোকেয়ার শিক্ষালাভ, সাহিত্যচর্চা এবং সামগ্রিক মূল্যবোধ গঠনে এই দুভাইয়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় পর্দপ্রথা এত কঠোর ও জঘন্য ছিল য়ে,  মেয়েদের  প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ ছিল না। পাঁচ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে কলকাতায় বসবাস করার সময়   বেগম রোকেয়া একজন  ইংরেজ শিক্ষয়িত্রীর নিকট  কিছুদিন লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।  এরপর বড়ো দু-ভাইয়ের  সহায়তায় তিনি বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি এবং আরবি ভাষা শিখেন।

৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের  বিহারের ভাগলপুর নিবাসী উর্দুভাষী সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের সঙ্গে বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয়। তিনি ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। উদার ও মুক্তমনের অধিকারী স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় রোকেয়া দেশি-বিদেশি লেখকদের রচনার সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ পান এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁর সাহিত্যচর্চার সূত্রপাতও ঘটে স্বামীর অনুপ্রেরণায়। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা মে সাখাওয়াৎ হোসেন মারা যান। ইতোপূর্বে তাঁদের দুটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে। তবে উভয়ে অকালে মারা যায়। 

স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গ রোকেয়া নারীশিক্ষা বিস্তার ও সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দের ১লা অক্টোবর স্বামীর প্রদত্ত অর্থে পাঁচটি ছাত্রী নিয়ে ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল স্থাপন করেন। পারিবারিক কারণে তাঁকে  ভাগলপুর ছেড়ে কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করতে হয়। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই মার্চ কলকাতার ১৩ নং ওয়ালিউল্লাহ লেনের একটি বাড়িতে মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে তিনি নবপর্যায়ে ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ছাত্রীসংখ্যা একশত পেরিয়ে যায়। ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বাংলার নারী শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন।

নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী, নবপ্রভা, মহিলা, ভারতমহিলা, আল-এসলাম, নওরোজ, মাহে নও, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, The Mussalman, Indian Ladies Magazine  প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন।  তাঁর প্রথম লেখা ‘পিপাসা’ (মহরম) প্রকাশিত হয় ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে, চৈত্র ও বৈশাখ ১৩০৮-১৩০৯ (যুগ্মসংখ্যা) নবপ্রভা পত্রিকায়।  অনেকে মনে করেন, তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে নবনূর পত্রিকায়।  তবে এ তথ্যের কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি নেই। তিনি সমকালীন সাময়িক পত্রিকায় মিসেস আর.এস হোসেন নামে তাঁর রচনা প্রকাশিত হতো। 

ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও শে­ষাত্মক রচনায় বেগম রোকেয়া নিজকীয়তায় ছিলেন অতুলনীয়। সৃজনশীল মনোভাব, যুক্তি ও শব্দচয়নে তাঁর দক্ষতা ছিল মুগ্ধকর। কৌতুকপ্রিয়তা ছিল তাঁর রচনার সহজাত বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞান সম্পর্কেও  তিনি ছিলেন অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী। সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন রোকেয়াকে নির্ভয়ে স্বাধীন মতামত প্রকাশে উৎসাহিত করেছিলেন।  সওগাতের সঙ্গে বেগম রোকেয়ার সম্পৃক্ততা ছিল নিবিড়। এ পত্রিকার প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যার (অগ্রহায়ণ ১৩২৫) প্রথম পৃষ্ঠায় রোকেয়ার ‘সওগাত’ কবিতাটি ছাপা হয়। এছাড়া তাঁর বহু প্রবন্ধ ও কবিতা সওগাতে প্রকাশিত হয়।

মতিচূর (প্রবন্ধ, ২ খন্ড: ১ম খন্ড ১৯০৪, ২য় খন্ড ১৯২২),  Sultana’s Dream  (নকশাধর্মী রচনা, ১৯০৮), পদ্মরাগ (উপন্যাস, ১৯২৪), অবরোধবাসিনী (নকশাধর্মী গদ্যগ্রন্থ, ১৯৩১) প্রভৃতি  বেগম রোকেয়ার উল্লেখযোগ্য রচনা। এছাড়া আছে অসংখ্য প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা, ব্যঙ্গাত্মক রচনা ও অনুবাদ। Sultana’s Dream গ্রন্থটি রোকেয়া নিজেই বাংলায় অনুবাদ করেন সুলতানার স্বপ্ন  নামে। এটি একটি প্রতীকী রচনা এবং এতে বর্ণিত Lady Land  বা নারীস্থান মূলত রোকেয়ারই স্বপ্নকল্পনার প্রতীক। মতিচূর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, সুলতানার স্বপ্ন প্রভৃতি গ্রন্থে রোকেয়ার ঐকান্তিক স্বপ্নই এক অভিনব রূপ পেয়েছে। মতিচূর ২য় খন্ডে আছে ‘সৌরজগৎ’, ‘ডেলিসিয়া হত্যা’ (মেরী করেলী রচিত Murder of Delicia, ১৮৯৬ উপন্যাসের গল্পাংশের অনুবাদ), ‘জ্ঞান-ফল’, ‘নারী-সৃষ্টি’, ‘নার্স নেলী’, ‘মুক্তি-ফল’ প্রভৃতি গল্প ও রূপকথা। বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা তাঁর অসংখ্য চিঠিপত্র রয়েছে।  

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া কলকাতায় মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি ‘নারীর অধিকার’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখছিলেন। তাঁকে উত্তর কলকাতার সোদপুরে কবরস্থ করা হয়। খবরটি দীর্ঘকাল অজ্ঞাত ছিল।  পরবর্তীকালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক অমলেন্দু দে এটি আবিষ্কার করেন ।

 ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই অক্টোবর প্রতিষ্ঠা করা হয় রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়।  ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়  বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।  এটি রংপুর বিভাগের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।  বেগম রোকেয়ার নামে  ১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নাম রাখা হয় বেগম   রোকেয়া হল। পূর্বে  এর নাম ছিল উইমেন্স হল । প্রসঙ্গত, ব্রিটিশ আমলে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠাকালে হলটির নাম ছিল চামেলি হাউজ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রোকেয়া হল নামের দুটি ছাত্রীনিবাস রয়েছে।  ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে বেগম রোকেয়ার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে  বাংলাদেশ ডাক বিভাগ দুটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। প্রতিবছর ৯ই ডিসেম্বর তাঁর জন্মদিনে বেগম রোকেয়া দিবস পালন করা হয় এবং নারী উন্নয়নে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ বিশিষ্ট নারীদের বেগম রোকেয়া পদক প্রদান করা হয়। বেগম রোকেয়ার  ১৩৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গুগল তাদের হোমপেজে বেগম রোকেয়ার গুগল ডুডল প্রদর্শন করে।  গুগল ডুডলটিতে দেখা যায় সাদা পোশাকে চশমা পরা বেগম রোকেয়া বই হাতে হেঁটে যাচ্ছেন।

বেগম রোকেয়ার কয়েকটি বাণী

কোনো ভগ্নী মস্তক উত্তোলন করিয়াছেন, অমনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন-রূপ অস্ত্রাঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে।

আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্যে পুরুষগণ এই ধর্মগ্রন্থগুলি ইশ্বরের আদেশ বলিয়া প্রচার করিয়াছেন।

এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষরচিত বিধিব্যবস্থা ভিন্ন কিছুই নহে। মুনিদের বিধানে যে কথা শুনিতে পান, কোনো স্ত্রী-মুনির বিধানে হয়ত তাঁহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতেন।

ধর্ম আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে; ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমণীর উপর প্রভুত্ব করিতেছেন। — বেগম রোকেয়া, ১৯০৪

একনজরে বেগম রোকেয়া: সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ষষ্ঠ বাঙালি 

লিংক: https://draminbd.com/একনজরে-বেগম-রোকেয়া-সর্বক/

— — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — —
বাকি অংশ এবং অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দেখার জন্য নিচের লিংক
 
লিংক: https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-3/
 
 
 
শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 
 
সূত্র:
১, ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
২. বাংলা ভাষার মজা, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
৩. কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
error: Content is protected !!