এক মলাটে একনজরে ভাষা আন্দোলন, মাতৃাভাষা আন্দোলন, শহিদ মিনার, ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা

ড. মোহাম্মদ আমীন

এক মলাটে একনজরে ভাষা আন্দোলন, মাতৃাভাষা আন্দোলন, শহিদ মিনার, ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা

এক মলাটে একনজরে ভাষা আন্দোলন ও শহিদ মিনার

ভাষা আন্দোলন : সূচনা হতে পরিণতি

জনগণের মুখের ভাষায় রচিত প্রথম পুস্তক
খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার বছর পূর্বে গৌতম বুদ্ধ জনগণের মুখের ভাষায় প্রথম পুস্তক ‘ত্রিপিটক’ রচনা করেন। গৌতম বুদ্ধ মাতৃভাষায় ‘ত্রিপিটক’ গ্রন্থটি রচনা করে পৃথিবীতে প্রথম মাতৃভাষায় কদর প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাংলা ভাষার জননী পালিকে অকাল মৃত্যুর হাত হতে রক্ষা করে বাংলা ভাষা সৃষ্টির পথ সুগম ও নিশ্চিত করেন।


বাংলা ভাষার প্রথম রাজভিষেক
বঙ্গদেশে তুর্কি শাসন শুরু হওয়ার পর অবহেলিত বাংলা ভাষা প্রথম রাজ দরবারে ঠাই পাওয়ার সুযোগ পায়। মুসলমান তুর্কি শাসকেরা অবহেলিত বাংলা ভাষাকে পথ হতে কুড়িয়ে এনে সাধারণ লোকের ভাষা হিসেবে সসম্মানে রাজ দরবারে ঠাই দেন। তুর্কিদের হাতে পথের ভাষা বাংলা পথের সঙ্গে সঙ্গে রাজ দরবারেও সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পথ ও প্রসাদ দুটোই বাংলা ভাষার আয়ত্তে চলে আসে।


মাতৃভাষা চর্চার প্রথম বেসরকারি প্রচেষ্টা
প্রাচীনকালে বৌদ্ধ বিহারে এবং মধ্যযুগে মোগল আমলে পাঠশালায় বাংলাভাষা চর্চার জন্য বেসরকারিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালিত হত। ১৮০৩ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ গবেষক মিস্টার ওয়ার্ড লিখেছেন, বাংলার প্রায় সকল গ্রামে লেখা-পড়া এবং গণিতবিদ্যা শেখানোর পাঠশালা ছিল। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম কেরি বাংলা শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের রীতিমত আন্দোলনের চেয়েও নিবিড় কার্যক্রম শুরু করেন। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মাত্র সতের বছরে উইলিয়াম কেরি ও তাঁর বন্ধুদের প্রচেষ্টায় শ্রীরামপুর মিশনের চারপাশে ৪৫ টি পাঠশালা গড়ে উঠে। অনুমান দুই হাজার শিক্ষার্থী পাঠশালাগুলোতে বিদ্যা শিক্ষা করত। একই সাথে পাদরি রবার্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্ব-উদ্ভাবিত প্রাথমিক শিক্ষা চালু করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে এ ধরণের পাঠশালার সংখ্যা ৩৬ ছড়িয়ে যায়। যাতে প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছিল। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি হতে বাংলা পাঠশালার কাজ শুরু হয়।


পাকিস্তানে বাংলা ভাষাভাষী জনসংখ্যা
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের প্রারম্ভে পাকিস্তানের মোট ছয় কোটি নব্বই লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে চার কোটি চলি¬শ লক্ষ ছিল বাংলা ভাষাভাষী। পাকিস্তানে পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বালুচি, উর্দু, পশতু, ব্রাহুই, কাশ্মীরি ভাষাভাষীদের মোট সংখ্যার চেয়ে বাংলা ভাষাভাষী জনগণের সংখ্যা বেশি ছিল। তবু পাকিস্তানিরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা না করার গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল।


বাংলা ভাষা চর্চার প্রথম সরকারি স্বীকৃতি
১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে বাংলা ভাষায় অধ্যয়ন সরকারিভাবে স্বীকৃত ছিল না। ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর বঙ্গ-বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন প্রথমবারের মতো বৃটিশ সরকার স্বীকৃতি দেয়। লর্ড হার্ডিঞ্জ সমগ্র বাংলা তথা বঙ্গদেশ, বিহার ও উড়িষ্যায় ১০১ টি আদর্শ বাংলা পাঠশালা স্থাপনের ব্যবস্থা নেন। এ লক্ষ্যে ১০১ জন শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। আশ্চর্য হলেও সত্য যে, ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ৩ কোটি ৭০ লক্ষ লোকের শিক্ষার জন্য সরকারি বরাদ্দ ছিল মাত্র আট হাজার টাকা। যা তৎকালে একজন কালেক্টরের বার্ষিক বেতনের এক তৃতীয়াংশ। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বাংলা শিক্ষা পরিকল্পনা’ অনুযায়ী বাংলার ছোট লাট হ্যালিডে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ভূদেব মুখোপাধ্যায় সরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর প্রয়াস নেন। তিনি ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি মিস্টার ইডেনকে একটি পত্রের মাধ্যমে বাংলায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু ও উন্নয়নের আবেদন জানান।


প্রথম শিক্ষা কমিশন
১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি বৃটিশ সরকার প্রাথমিক শিক্ষার বিকাশ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে হান্টার কমিশন গঠন করেন। এ কমিশনের প্রধান কাজ ছিল ভারতবর্ষে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ও প্রসারের জন্য একটি সুপারিশমালা তৈরী। হান্টার কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৮৮৩-১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের আইন সভায় ‘জনহিতকর আইন’ এর অনুবলে সরকারি আওতা হতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবমুক্ত করে স্থানীয় সংস্থার হাতে তুলে দেয়া হয়। একই সাথে রিপোর্টের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার ‘শিক্ষা বোর্ড’ গঠন করে প্রাথমিক শিক্ষার যাবতীয় কার্যক্রম ও সর্বময় কর্তৃত্ব শিক্ষাবোর্ডের উপর ন্যস্ত করে।


বৃটিশ আমলে বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা
১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস ‘কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা’ এবং ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে জোনাথন ডানকান কাশিতে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটির কোনোটিতে ভারতীয়দের কোনো মাতৃভাষায় শিক্ষা চর্চার সুযোগ ছিল না। ধর্মীয় সহানুভূতি আদায়ের আড়ালে দেশের জনগণকে আধুনিক ভাষা ও শিক্ষা হতে বঞ্চিত রেখে কতিপয় অভিজাত শ্রেণী সৃষ্টি করে ভারতকে নিরাপদে শোষণ করে যাওয়ায় ছিল বৃটিশদের লক্ষ্য। উন্নত ও বিজ্ঞানসম্মত দেশীয় ভাষা থাকা স্বত্ত্বেও সংস্কৃত কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে বৃটিশরা বাংলা ভাষার সু¯পষ্ট অবেহলা প্রদর্শন করে। এটি হচেছ বাংলা ভাষাকে অবহেলা করার তৃতীয় প্রয়াস।


লাহোর প্রস্তাব ও বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দাবি
১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ মার্চ ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগে’র অধিবেশনে লাহোর প্রস্তাব (পাকিস্তান প্রস্তাব) গৃহীত হবার পরপরই ঢাকা এবং কলিকাতার বুদ্ধিজীবী, লেখক ও চিন্তাবিদরা বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকার স¤পাদক মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, মুজিবর রহমান খাঁ, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ পাকিস্তান অংশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার পক্ষে জোর দাবি তুলেন। বাংলা ভাষার ইতিহাসে এটাকে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দাবির প্রথম প্রয়াস হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ক্রমশ-

error: Content is protected !!