এক মলাটে একনজরে ভাষা আন্দোলন, মাতৃাভাষা আন্দোলন, শহিদ মিনার, ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা

ভাষা আন্দোলনের প্রথম আনুষ্ঠানিক সংঘটন
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ঢাকায় ‘গণ আজাদী লীগ’ বা ‘পিপল্স ফ্রিডম লীগ’ নামক একটি সংঘটন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটে। সংঘটনটির আহবায়ক ছিলেন কমরুদ্দিন আহমদ। মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, তাজ উদ্দিন আহমদ প্রমূখ বামপন্থী প্রগতিবাদী নেতারা ‘গণ আজাদী লীগে’র সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘গণ আজাদী লীগে’র নাম পরিবর্তন করে ‘সিভিল লির্বার্টিস লীগ’ রাখা হয়। কমরুদ্দিন আহমদের মতে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের শেষদিকে তাঁর বাসায় অনুষ্ঠিত একটি সভায় ‘গণ আজাদী লীগ’ বা ‘পিপল্স ফ্রিডম লীগ’ গঠিত হয়। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ‘গণ আজাদী লীগে’র প্রথম ম্যানিফেস্টো প্রকাশ হয়। ‘গণ আজাদী লীগে’র ঘোষণায়, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা উল্লে¬খ করে মাতৃভাষার সাহায্যে শিক্ষাদান এবং বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার দাবি ও দাবি পূরণের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। ‘গণ আজাদী লীগ’ই প্রথম সংঘটন যা বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবী প্রথম বারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করে।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু সমর্থনকারী কয়েকজন বাঙালি
কবি গোলাম মোস্তফা এবং সাংবাদিক মুজিবর রহমান খাঁ, মোহাম্মাদ ওয়াজেদ আলী, নাদীয়ার সা’দ আহমদ, সেখ আবদুল হাকিম, কলকাতার মহবুব খান প্রমুখ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার সমর্থনকারী ব্যক্তিদের কয়েকজন।

বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭ নভেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে ভাষা বিষয়ক প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানে বাংলা ভাষা বিষয়ক বিতর্ক এবং আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ করা হয়। এ সুপারিশকে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত বলে গণ্য করা হয়।

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষাকল্পে অনুষ্ঠিত প্রথম বিক্ষোভ
করাচির শিক্ষা সম্মেলনে বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদানের প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সংবাদ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-ছাত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রতিবাদ সভা করে। ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লিগ ওয়ার্কিং কমিটি’র শেষ বৈঠকে শিক্ষা সম্মেলনের সুপারিশের প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে প্রথম প্রতিবাদ সভা
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর দুপুর ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রথম প্রতিবাদ সভা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিশে’র স¤পাদক জনাব আবুল কাশেমের (অধ্যক্ষ আবুল কাশেম) সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-সংসদের তৎকালীন সহ-সভাপতি জনাব ফরিদ আহমদ প্রস্তাব পাঠ করেন।

বাংলা ভাষা আন্দোলন সমর্থনকারী প্রথম মন্ত্রী
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বরের প্রতিবাদ সমাবেশের পর বিক্ষোভ প্রদর্শনরত বিশাল ছাত্রসমাবেশে তৎকালীন কৃষি মন্ত্রী মহাম্মদ আফজল বক্তৃতা প্রদান করেন এবং ছাত্রদের ভাষা আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ও একাÍতা ঘোষণা করেন।

প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তমদ্দুন মজলিসের নুরুল হক ভুঁইয়াকে আহবায়ক করে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়।

প্রথম ছাত্র ধর্মঘট ও ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত
পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ উত্থাপিত বাংলাকে গণ পরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রস্তাবের বিপক্ষে মুসলিম লিগের সদস্যরা ভোট দেয়ার সংবাদ ঢাকায় পৌঁছামাত্র সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। মুসলিম লিগ সদস্যদের এহেন ঘৃণ্য আচরণের প্রতিবাদে ১৯৪৮ খৃস্টাব্দের ২৬ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে অভিনন্দন জানানো হয় এবং ঢাকায় বাংলা ভাষাকে গণপরিষদের ভাষা হিসেবে মর্যাদা প্রদানের দাবিতে প্রথমবারের মতো ছাত্র ধর্মগট পালিত হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সাহসী ভূমিকা তাঁকে বাংলা ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২ মার্চ বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পূর্বপাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ও রাজনীতিক কর্মীদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। কামরুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার নিমিত্ত জনাব শামসুল আলমকে আহবায়ক করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ নামক একটি সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়।

ভাষা আন্দোলনের প্রথম সাধারণ ধর্মঘট
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে সারা পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট পালনের ডাক দেওয়া হয়। এ হরতালকে বাংলা ভাষা আন্দোলনের লক্ষ্যে আহুত প্রথম সাধারণ ধর্মঘট বলা হয়।

প্রথম রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন
ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ স্মরণে প্রতিবছর ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হত। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা দাবির জন্য পালিত ছাত্র-ধর্মঘটে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের প্রাক্কালে সেক্রেটারিয়েট গেইটে পিকেটিং করতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, মোঃ তোয়াহা, ডাঃ এম এ আযমল, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন, খালেক নেওয়াজ খান প্রমূখ পুলিশের হাতে আটক হন। উলে¬খ্য ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চের নির্যাতনের প্রতিবাদে ১৪ মার্চ সমগ্র পূর্ব-পাকিস্তানে পুনরায় সাধারণ ধর্মঘট পালনের আহবান জানানো হয়। এ আহবানের পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ মার্চ সমগ্র পূর্ব-পাকিস্তানে বিক্ষোভ ও ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে লেখার কারণে প্রথম নিষিদ্ধকৃত পত্রিকা
ভাষা আন্দোলন সমর্থন এবং ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সংবাদ-ফিচার ইত্যাদি প্রকশ করায় ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মার্চ কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘স্বাধীনতা’ এবং কলকাতা হতে আমদানি-করা সকল পত্রিকা সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা দিবস
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ প্রথম রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন হওয়ার পর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ দ্বিতীয় বারের মতো রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হয়।
ক্রমশ:

error: Content is protected !!