এক মলাটে একনজরে ভাষা আন্দোলন, মাতৃাভাষা আন্দোলন, শহিদ মিনার, ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা

আরবি হরফে বাংলা চালুর অপপ্রয়াস

১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে নিখিল পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান ইসলামি আদর্শ প্রতিষ্ঠার অজুহাতে বাংলা লিখন প্রণালীকে পরিবর্তন করে আরবি হরফে বাংলা প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন। এ লক্ষ্যে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত ‘কেন্দ্রীয় পাকিস্তান শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ড’ এর সভায় পাকিস্তানে প্রচলিত সকল ভাষার লিখন প্রণালী আরবি হরফে পরিবর্তন করার সুপারিশ করা হয়। উল্লে¬খ্য বাংলা ছাড়া পাকিস্তানে প্রচলিত বাকি ভাষাগুলোর লিখন প্রণালী ছিল আরবি হরফে। স্বভাবতই প্রস্তাবটির একমাত্র লক্ষ্য ছিল বাংলাকে পরিবর্তন করা। সুপারিশ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে পাকিস্তান সরকার ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল পূর্ব-পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলার ২০টি কেন্দ্রে আরবি হরফে বাংলা ভাষার মাধ্যমে প্রাপ্ত-বয়স্কদের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়ার কাজ শুরু করেন।


পতাকা দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি ঘোষণা

১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রতিবাদ-জ্ঞাপনের কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্ত কবে নেয়া হয়েছিল সে ব্যাপারে ৩১ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি এবং ৬ ফেব্রুয়ারি- তিনটি তারিখ পাওয়া যায়। অধিকাংশ গবেষক ও বর্ণনাকারীর অভিমত এবং পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি গৃহীত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল জনসমাবেশটি হতে বাংলা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশে সাধারণ ধর্মঘট তথা হরতাল পালন ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠানের ডাক দেয়া হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের খরচ সংগ্রহের জন্য ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ১১, ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে পতাকা দিবস পালনের কর্মসূচি ঘোষিত হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৪ ফেব্রুয়ারি হতে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৭ (সতের) দিন ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের প্রস্তুতি চলে।

২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি ঘোষণার কারণ
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন আহবান করা হয়েছিল। বাজেট অধিবেশনের দিন কর্মসূচি ঘোষণা ও পালনের মাধ্যমে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে আইন পরিষদকে বাধ্য ও প্রভাবিত করে পূর্ব-পাকিস্তানের পক্ষ হতে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করার কিংবা অনুরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি প্রদান করা হয়েছিল।

সরকার প্রধানের বিরুদ্ধে স¤পাদকীয় ও পত্রিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ১২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান ‘অবজারভার’ পত্রিকায় প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে ‘ছদ্ম ফ্যাসিজম’ শিরোণামে একটি স¤পাদকীয় প্রকাশ করা হয়। তাসাদ্দুক হোসেন লিখিত এ প্রতিবেদনটি ছিল খাজা নাজিমুদ্দিনের ভাষা সংক্রান্ত্য মন্তব্যের বিরুদ্ধে পত্রিকায় প্রকাশিত সবচেয়ে কড়া প্রতিবেদন। রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন সমর্থনসহ আপত্তিকর স¤পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশের অভিযোগে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান ‘অবজারভার’ পত্রিকার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। একই কারণ দেখিয়ে পত্রিকার স¤পাদক আবদুস সালাম ও প্রকাশক হামিদুল হক চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী না হওয়া পর্যন্ত ‘পাকিস্তান অবজারভার’ বন্ধ ছিল।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম টেলিগ্রাম সংখ্যা
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার উপর পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে সর্বস্তরের জনগণের অংশ গ্রহণের ব্যাপকতাকে সাধারণ্যে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকা একটি টেলিগ্রাম সংখ্যা বের করে। এটি ভাষা আন্দোলন উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম টেলিগ্রাম সংখ্যা।

গণপরিষদের অধিবেশন বর্জনকারী প্রথম ব্যক্তি
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি আইন পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন চলছিল। ছাত্র-জনতার উপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ পরিষদগৃহ পরিত্যাগ করেন। আরও ৩ জন পরিষদ সদস্য তাঁকে অনসুরণ করে পরিষদ গৃহ হতে বেরিয়ে এসে ভাষা আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেন।

দেশের প্রথম শহিদ মিনার
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী জেলায় রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেল প্রাঙ্গণে রাতের বেলা দেশের প্রথম শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে পুলিশ শহিদ মিনারটি গুড়িয়ে দেয়।

পত্রিকা অফিসে আগুন
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি ক্ষুব্ধ জনতা ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকার ছাপাখানা জুবিলি প্রেসে আগুন লাগিয়ে দেয়। মর্নিং নিউজ পত্রিকায় ‘উযড়ঃরবং জড়ধসরহম ঝঃৎববঃং’ শিরোনামের লেখায় ‘ভারতীয় দালাল আর হিন্দুরা পাকিস্তানকে ধ্বংস করার জন্য এ আন্দোলন চালাচ্ছে’ মন্তব্য করায় জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে পত্রিকা অফিসে আগুন লাগায়।

বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রথম সুপারিশ
ভাষা আন্দোলনের উত্তাল জনরোষে সারাদেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে। সরকার ও প্রশাসন কার্যত নিষ্ক্রিয় ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিপর্যস্ত মুসলিম লিগ সরকার অনোন্যপায় হয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার সুপারিশ সম্বলিত প্রস্তাব পাশ করে।

ক্রমশ-

error: Content is protected !!