এক মলাটে একনজরে ভাষা আন্দোলন, মাতৃাভাষা আন্দোলন, শহিদ মিনার, ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা

মুসলিম পার্লামেন্টারি দল হতে পদত্যাগ
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকার স¤পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন ছাত্র-জনতার উপর গুলীবর্ষণ ও নির্যাতনের প্রতিবাদে মুসলিম লিগ পার্লামেন্টারি দল হতে পদত্যাগ করে ভাষা আন্দোলনের প্রতি একাÍতা ঘোষণা করেন।

প্রথম কারফিউ বা সান্ধ্য-আইন জারি
গুলিবর্ষণের পর পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন সরকারকে অচল করে দেয়। এ পরিস্থিতিতে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধরার পাশাপাশি রাত ১০টা হতে ভোর ৫টা পর্যন্ত সান্ধ্য-আইন জারি করা হয়।

সরকারকে চরমপত্র প্রদান ও প্রথম শহিদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে, যেস্থানে আবুল বরকত পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেখানে ছাত্ররা রাতারাতি ১০-ফুটের অধিক উচ্চতার একটি ‘শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করেন। সেদিন বিকেলের দিকে সশস্ত্র পুলিশ এসে স্তম্ভটি গুড়িয়ে দেয়। ‘শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ’ ভেঙ্গে দেয়ায় ছাত্র-জনতা আরও সংগ্রামী, ক্ষুব্ধ, উত্তাল ও বেপরোয়া হয়ে উঠে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এক সভায় মিলিত হয়ে সরকারকে ৭৫ ঘন্টার আলটিমেটাম (চরমপত্র) দেয় এবং ৫ মার্চ পূর্ব-পাকিস্তানে ‘শহিদ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

ভাষা আন্দোলনের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম বারের মতো বন্ধ ঘোষণা
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। ছাত্র-ছাত্রীদের জোর করে হল হতে বের করে দেওয়া হয়। প্রধান ৯ জন নেতার উপর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি এবং সংবাদপত্রের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ভাষা আন্দোলনের ৯ জন মূল নেতার মধ্যে ৮ জনকে এক বাড়ি হতে গ্রেফতার করা হয়।

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি এবং একুশে ফেব্রুয়ারি
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠিত হয় এবং ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি ভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করা হয় কিন্তু ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম কমিটি’ মিছিল বের করলে পুলিশ মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে সালাম, রফিক, জব্বার এবং বরকতসহ জানা-অজানা অনেক লোক শহিদ হন।

আরবি হরফে বাংলা শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে গঠিত কমিটি
পূর্ব-পাকিস্তানের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা পূনর্গঠনের লক্ষ্যে মাওলানা আকরাম খাঁ-কে প্রধান করে ২৩ সদস্যের ‘পূর্ব বাংলা শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার কমিটি’ গঠন করা হয়। ক্ষমতাসীন সরকারের চাপ এবং সংস্কারের পক্ষে মাওলানা আকরাম খাঁ-র নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গী সত্ত্বেও সংস্কার কমিটি আরবি হরফে বাংলা ভাষা শিক্ষা ও প্রচলনের বিষয়টি অনুমোদনের বিপক্ষে মতামত প্রদান করেন। ফলে ইজ্জত বাঁচানোর লক্ষ্যে সরকার কমিশনের প্রতিবেদন গায়েব করে দেয়।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ
অধিকাংশ বর্ণনাকারীর মতে সালাহ উদ্দিন ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ। কিন্তু পত্রপত্রিকা, সরকারি বিবরণ, ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন গবেষণামূলক নিবন্ধ ও গ্রন্থাদি পর্যালোচনায়, সালাহ উদ্দিন নামের কেউ ২১ ফেব্রুয়ারি আদৌ শহিদ হন নি দেখা যায়। শহিদ রফিক উদ্দিনকে ভুলবশত সালাহ উদ্দিন অভিহিত করা হয়েছে। সে হিসেবে রফিক উদ্দিন ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ। মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের আই কম ২য় বর্ষের ছাত্র, সিঙ্গাইর পারিল গ্রাম নিবাসী ও বাদামতলীর কমার্শিয়াল প্রেসের মালিক মোহাম্মদ আবদুল লতিফের জ্যৈষ্ঠ পুত্র রফিক উদ্দিন ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৪ নম্বর ব্যারাকের সামনে মাথায় গুলি লেগে ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করেন। সরকারি ঘোষণায় জানান হয়, “প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট জনাব ওবায়দুল-ার উপস্থিতিতে হাফেজ আবদুল গফুর শহিদ রফিক উদ্দিনের জানাযা পড়েন এবং আজিমপুর গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।” আজিমপুর গোরস্থানে এখন শহিদ রফিকের খবরের কোনো চিহ্ন নেই, খুজে পাওয়ারও কোনো অবকাশ আর নেই।

ভাষা শহিদ সলিল সিংহ, সুদেষ্ণা সিংহ ও মণিপুরি ভাষা আন্দোলন
১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার স্বীকৃতির লক্ষ্যে আন্দোলনকালে পুলিশের লাঠিচার্জে গুরুতরভাবে আহত ভাষা সৈনিক সলিল সিংহ মৃত্যুবরণ করেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায় আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক সুদেষ্ণা সিংহ। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মার্চ ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জে গুংগাবাড়ি রেললাইনে ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি স্টুডেন্ট এসোশিয়েশন’ ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আহুত ৫০১ ঘন্টার রেল বন্ধ কমসুচি পালনকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এদিন প্রমোদিনী সিংহ, রত্না সিংহ, আরতি সিংহ, কমলাকান্ত সিংহসহ ১২ জনের অধিক ভাষাসৈনিক পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ এপ্রিল গৌহাটি হাইকোর্ট বিষ্ণুপ্রিয়া নামের পূর্বে বা পরে মণিপুরি ব্যবহার করা যাবে মর্মে রায় দেন। এর ফলে ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৯ এপ্রিল হতে আসাম সরকার একটি নোটিফিকেশন জারি করে। ২০০১ খ্রিস্টাব্দের ১২ ফেব্রুয়ারি আসাম রাজ্যে প্রাইমারি স্তরে সরকারিভাবে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা চালু করা হয়। সুদেষ্ণার আত্মত্যাগের স্মৃতি ও সম্মানার্থে প্রতি বছর ১৬ মার্চ ‘শহিদ সুদেষ্ণা দিবস’ পালিত হয়। মণিপুরি ভাষাভাষীদের কাছে দিবসটি ‘মণিপুরি ভাষা শহিদ দিবস’ হিসেবেও পরিচিত।

রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি
১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করে। সংবিধানের মূল ভাষা ছিল ইংরেজি। সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত ২১৪ অনুচ্ছেদটির বাংলা অনুবাদ হলঃ-
২১৪(১)- পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু ও বাংলা, তবে শর্ত থাকে যে, সংবিধান দিবসের অব্যবহিত পূর্র্ব পর্যন্ত পাকিস্তাানের যে সব সরকারি উদ্দেশ্য পরিপালনের জন্য ইংরেজি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, সে সকল উদ্দেশ্যে উক্ত ভাষা সংবিধান দিবস হতে আরম্ভ করে পরবর্তী বিশ বছর মেয়াদের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকবে এবং উক্ত বিশ বছর মেয়াদ অতিক্রম হওয়ার পর সংসদ আইন দ্বারা যেরূপ উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবেন, সেরূপ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের বিধান করা যাবে। (২) সংবিধান দিবস হতে আরম্ভ করে দশ বছর মেয়াদ অতিবাহিত হলে ইংরেজি ভাষা পরিবর্তনকল্পে সুপারিশ করার নিমিত্ত রাষ্ট্রপতি একটি কমিশন গঠন করবেন। (৩) এ অনুচেছদে এমন কিছু নেই, যা উক্ত বিশ বছর মেয়াদ অতিক্রান্ত্র হওয়ার পূর্বে কোনো প্রাদেশিক সরকারকে সে প্রদেশে যে কোনো একটি রাষ্ট্রভাষার দ্বারা ইংরেজি ভাষাকে পরিবর্তিত করা হতে বিরত রাখতে পারবে।

রাষ্ট্রভাষা হতে জাতীয় ভাষা
১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খান ‘দ্যা কনস্টিটিউশন অব দ্যা রিপাবলিক অব পাকিস্তান’ প্রবর্তন করেন। এ সংবিধানে বাংলা ভাষার মর্যাদা রাষ্ট্রীয় ভাষা হতে পরিবর্তিত করে জাতীয় ভাষায় আনা হয়। উক্ত সংবিধানের ২১৫ অনুচ্ছেদের বাংলা অনুবাদ নিম্নরূপ-
২১৫(১)- পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা বাংলা ও উর্দু; কিন্তু সংবিধানের এ অনুচ্ছেদকে অন্য কোনো ভাষা ব্যবহারের প্রতিবন্ধকরূপে ব্যবহার করা যাবে না, বিশেষত ইংরেজি ভাষা পরিবর্তনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এ ভাষা (ইংরেজি) সরকারি ও অন্যান্য উদ্দেশ্যসমূহ প্রতিপালনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারবে। (২) সরকারি উদ্দেশ্য প্রতিপালনের জন্য ইংরেজি ভাষা পরিবর্তনের প্রশ্নটি পরীক্ষা ও তার প্রতিবেদন উপস্থাপনকল্পে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রপতি একটি কমিশন গঠন করবেন। উল্লেখ্য ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে কমিটি গঠনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে কমিটি পরবর্তীকালে অর্থহীন হয়ে যায়।

বাংলা ভাষার বর্তমান সংবিধানিক মর্যাদা
১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৪ নভেম্বর গণপরিষদ গৃহীত ও মূল ভাষা হিসেবে বাংলায় রচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এর সংবিধানের ৩নং অনুচ্ছেদে বাংলা ভাষাকে একক ও শর্তহীনভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়ে বলা হয় “প্রজাতন্তের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা”।

ক্রমশ-

error: Content is protected !!