এক মলাটে একনজরে ভাষা আন্দোলন, মাতৃাভাষা আন্দোলন, শহিদ মিনার, ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা

 

ভাষা আন্দোলন, রাষ্ট্রভাষা ও অমর একুশে

উপমহাদেশের প্রথম ভাষাসৈনিক
মহামতি গৌতম বুদ্ধ উপমহাদেশের প্রথম ভাষা সৈনিক। তিনি আর্য ভাষার বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করে জনগণের মুখের ভাষা পালিতে ‘ত্রিপিটক’ রচনা করেছিলেন। গৌতম বুদ্ধ পালি ভাষায় ত্রিপিটক রচনা না করলে পৃথিবীতে বাংলা বলে কোনো ভাষার অস্তিত্ব থাকত কিনা সন্দেহ। গৌতম বুদ্ধের ত্রিপিটক বাংলা ভাষার আদিরূপে রচিত প্রথম গ্রন্থ। ‘বেদ’ এর ভাষাকে সংস্কার করে সংস্কৃত ভাষা সৃষ্টি করা হয়। সংস্কৃত ছিল মুষ্টিমেয় ব্রাহ্মণ এবং গুটি কয়েক তথাকথিত উচুশ্রেণির লোকের ভাষা। বেদ বা সংস্কৃত ভাষা সাধারণ লোকদের শোনা কিংবা বলা নিষিদ্ধ ছিল। কেউ অসাবধানতা বশত শুনে ফেললে কানে গরম সীসা ঢেলে দেয়া হত। আর্যরা ছাড়া অন্য কেউ সংষ্কৃত ব্যবহার করতে পারত না। গৌতম বুদ্ধ বাংলা ভাষার আদিরূপ পালি ভাষায় প্রথম গ্রন্থ রচনা করে বাংলা ভাষার অকাল প্রাণনাশকারী হিন্দু ব্রাহ্মণদের হাত হতে বাংলাকে রক্ষা করেছিলেন। ব্রাহ্মণেরা বাংলা ভাষাকে এতই ঘৃণা করত যে, তারা বাংলা ভাষা চর্চাকারীদেরকে রৌরব নামক নরকের বাসিন্দা ঘোষণা দিয়ে সাধারণ মানুষের ভাষা বাংলাকে চিরতরে রূদ্ধ করে দেয়ার অপপ্রয়াসে মেতে উঠেছিল। জনগণের মুখের কথা পালি-প্রাকৃতের প্রচার ও চর্চা নিষিদ্ধ করে হিন্দু রাজারা বাংলা ভাষাকে শেষ করে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল। গৌতম বুদ্ধ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ পালি ভাষায় ত্রিপিটক রচনা করেন।

ভাষা কমিটি : বাংলা একাডেমী ও বাংলা উন্নয়ন বোর্ড
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৯ মার্চ মওলানা আকরম খাঁকে চেয়ারম্যান এবং ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্, অধ্যক্ষ ইব্রাহীম ও ডঃ মুহাম্মদ এনামুল হকসহ ১৪ জনকে সদস্য করে ভাষা কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলা অক্ষরমালা, ভাষা ও ব্যাকরণকে সহজীকরণের জন্য বিস্তারিত সুপারিশ প্রণয়ন করেন। কমিটির সুপারিশের আলোকে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমী এবং ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে বাংলা উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয়।

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং একুশে ফেব্রুয়ারি
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠিত এবং ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি ভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সরকার ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ শে ফ্রেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম কমিটি’ মিছিল বের করলে পুলিশ গুলি চালায়। সালাম, রফিক, জব্বার এবং বরকতসহ অনেকে শহিদ হন। পৃথিবীতে বাংলাই একমাত্র ভাষা যাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে মর্যাদা দেয়ার জন্য আন্দোলন ও রক্ত দিতে হয়েছে। জাতিসংঘ এর সম্মানে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ হতে ২১ ফ্রেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস’ ঘোষণা করে।

প্রথম শহিদ মিনার
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গনে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের প্রথম শহিদ মিনার নির্মাণ করা হয়। তবে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি পুলিশ তা ভেঙ্গে দেয়।

সরকারিভাবে প্রথম একুশে ফ্রেব্রুয়ারি পালন
যুক্তফ্রন্টের অংশবিশেষের ভাগাভাগিতে আবু হোসেনের সরকার ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করে। অত:পর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ হতে একুশে ফেব্রুয়ারি জাতীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ হতে ভারতের বাংলাভাষী ত্রিপুরা রাজ্য একুশে ফেব্রুয়ারিকে বাংলা ভাষা দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা প্রদান করে। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গেও বেসরকারিভাবে একুশে ফ্রেব্রুয়ারি উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

একুশের আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রথম অনানুষ্ঠানিক দাবি
১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে একুশের এক অনুষ্ঠানে ‘গফরগাঁও থিয়েটার’ নামক সংগঠন একুশে ফেব্রুয়ারি’র আন্তর্জাতিক মর্যাদার দাবি উত্থাপন করে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে একুশের সংকলনে ‘গফরগাঁও থিয়েটার’ তাদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। ‘অর্ঘ’ নামের সংকলনটিতে একুশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা দাবির সপক্ষে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ ছাড়াও প্রচ্ছদে ‘বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস চাই; ‘একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাই’ প্রভৃতি শ্লোগান মুদ্রিত করা হয়। উল্লেখ্য ভাষা-শহীদ জব্বারের জন্মস্থান গফরগাঁও।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা
১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৬ নভেম্বর একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ এর স্বীকৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়।

বাংলা ভাষার প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা
“যে যো বিধি সো বিনা বিধি/ যো সো কো সেই স্বাধী/ টীলিত মোর ঘর নাহি পড় বেষী/ হাড়ীতে ভাত নাহি তিনি আবেশী/ বেঙ্গ সংসার মোর বড় ঢিল জাস/ চুলি দুধুকি বেণ্ঠে মামায়” চর্যাপদের এ অংশটি বাংলা ভাষার প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা। এর অর্থ- যে বুদ্ধিমান বলে সেই বুদ্ধিহীন সাধু সেজেছে সততাবিহীন প্রতিবাদে কবি কণ্ঠে দিল তার আত্মপরিচয়। সে ব্রাহ্মণ নয়, সে অমিতাভ নয়, তার পরিচয় সে বাঙালি।’ এখানে কবি বড় গর্বের সঙ্গে নিজেকে বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

ভাষা আন্দোলনের প্রথম সু¯পষ্ঠ কবিতা
সতের শতকের কবি আবদুল হাকিমকে ভাষা আন্দোলনের প্রথম কবি বলা যায়। তাঁর লেখা বিখ্যাত কবিতা–“যে সব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি //দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুড়ায়/ নিজ দেশ ত্যাগি কেন বিদেশ ন যায়…//” কবিতাটি সু¯পষ্ঠভাবে মাতৃভাষা বাংলার উপর বাংলা ভাষা অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে লেখা প্রথম কবিতা। এ কবিতাটি মাতৃভাষা বিরোধী বা মাতৃভাষার প্রতি বৈরী প্রদর্শনকারীদের প্রতি একজন কবির সরাসরি বিদ্রোহের অনলবর্ষী প্রয়াস। তুর্কি শাসনামলে এদেশীয় উঁচু শ্রেণির লোকেরা শাসক শ্রেণির কাছাকাছি পৌঁছা কিংবা পদলাভের জন্য বাংলা ভাষাকে অবহেলা করে তুর্কি-ফারসি ভাষাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। তথাকথিত উঁচু শ্রেণির কিংবা উঁচু শ্রেণিতে পরিগণিত হওয়ার প্রত্যাশীরা বাংলা ভাষার বদলে বিদেশি ভাষাকে বেশি প্রাধান্য দিতে শুরু করে। আবদুল হাকিম কবিতাটির মাধ্যমে বাংলা ভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা প্রমাণে রচিত প্রথম প্রবন্ধ
১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত আবুল মনসুর আহমদের নিবন্ধটি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে প্রকাশিত প্রথম প্রবন্ধ হিসেবে স্বীকৃত।

ভাষা সমস্যার উপর মহিলা রচিত প্রথম প্রবন্ধ
‘আজাদ’ পত্রিকার ‘মহিলা মাহফিলে’ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ অক্টোবর প্রকাশিত আয়েষা বেগম বিরচিত ‘ভাষা সমস্যা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি বাংলা ভাষা সমস্যা স¤পর্কে কোনো মহিলা লিখিত প্রথম প্রবন্ধ। এরপূর্বে বাংলা ভাষা সমস্যা নিয়ে কোনো মহিলা প্রবন্ধ লিখেননি।

রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রথম প্রবন্ধ পর্যালোচনা
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এবং অন্যান্য প্রসঙ্গে লিখিত কয়েকটি প্রধান প্রবন্ধের প্রথম পর্যালোচনা প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে। ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় প্রবন্ধ পর্যালোচনাটি প্রকাশিত হয়।

ক্রমশ-

error: Content is protected !!