এক মলাটে একনজরে ভাষা আন্দোলন, মাতৃাভাষা আন্দোলন, শহিদ মিনার, ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা

বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রচিত প্রথম প্রবন্ধ
আবদুল হক রচিত ‘বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে রচিত প্রথম প্রবন্ধ। প্রবন্ধটি দুই কিস্তিতে যথাক্রমে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ ও ২৯ জুন দৈনিক ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আবদুল হক রচিত এবং ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ নামক প্রবন্ধটি বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সপক্ষে প্রকাশিত দ্বিতীয় প্রবন্ধ। আবদুল হক রচিত এবং ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাই প্রকাশিত ‘উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে” প্রবন্ধটি বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সপক্ষে লেখা তৃতীয় প্রবন্ধ। দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকায় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুলাই প্রকাশিত ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বিরচিত ‘পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ নামক প্রবন্ধটি বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সপক্ষে রচিত চতুর্থ প্রবন্ধ।

মহিলার ছদ্মনামে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রচিত প্রথম প্রবন্ধ
বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সপক্ষে রচিত চতুর্থ প্রবন্ধ আবদুল হক বিরচিত ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। মিসেস এম এ হক ছদ্মনামে সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকার ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ আগস্ট সংখ্যায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি মহিলাদের এতই অনুপ্রাণিত করে যে, অনেক মহিলা এবিষয়ে লিখতে শুরু করেন।

ভাষা আন্দোলনের উপর লিখিত প্রথম গ্রন্থ
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিসের সাধারণ স¤পাদক আবুল কাশেম স¤পাদিত ও মজলিস প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা- বাংলা না উর্দু’ নামক গ্রন্থটি ভাষা সমস্যার উপর রচিত প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ। গ্রন্থটিতে কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ এবং আবুল কাশেমের লেখা তিনটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়। বইটি প্রকাশ হলে কেনার মতো ৫ জন লোকও পাওয়া যায় নি। গ্রন্থটির পৃষ্ঠা সংখ্যা কম ছিল বলে অনেক এটিকে পুস্তিকা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এটি ছিল অসাধারণ সাহসী একটি উদ্যোগ। পুস্তকটিতে আবুল কাশেম আরও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের অফিস আদালতের ভাষা বাংলা হবে। উর্দু ও ইংরেজি হবে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাষা। উল্লেখ্য ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর আবুল কাশেমের নেতৃত্বে ঢাকায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’ গঠিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের প্রথম ইতিহাস
১৯৫২ খ্রিস্টব্দের জুন মাসে ৩১/১, আজিমপুর রোড এর ঠিকানায় পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিসের পক্ষ হতে প্রকাশিত ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থটি ভাষা আন্দোলনের প্রথম ইতিহাস গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের উপর প্রকাশিত দ্বিতীয় পুস্তিকা
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ১১ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবসে “রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন- কি ও কেন?” শিরোনামে যুবলীগ একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। পুস্তিকাটি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম জাগরণমূলক পুস্তিকা। ডঃ আনিসুজ্জামান পুস্তিকাটি রচনা করেন। এরপর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ হতে মোহাম্মদ তোয়াহা রচিত আরেকটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। ভাষা আন্দোলনের উপর প্রকাশিত তৃতীয় পুস্তিকার নাম “আমাদের ভাষার লড়াই”। সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক কাজী গোলাম মাহবুবের অনুরোধে বদরুদ্দিন উমর পুস্তিকাটি রচনা করেন। উল্লেখ্য খন্দকার মোশতাক আহমদের দায়িত্বে পুস্তিকাটি ছাপা হয়েছিল।

একুশের ফেব্রুয়ারি স্মরণে রচিত প্রথম কবিতা
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহবায়ক চট্টগ্রাম নিবাসী কবি মাহবুবুল আলম রচিত ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাটি বাংলা ভাষা আন্দোলনে সংঘটিত ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির নৃশংস ঘটনা স্মরণে রচিত প্রথম কবিতা।
ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতা আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখিত ‘স্মৃতির মিনার’ নামক কবিতাটি শহিদ মিনার ধ্বংসের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ স্বরূপ লেখা প্রথম এবং ভাষা আন্দোলনের উপর লেখা ২য় কবিতা। কবিতাটির প্রথম চারটি লাইন হচ্ছে-
‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু আমরা এখানো
চার কোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো! যে ভিৎ কখনো কোনো রাজন্য
পারেনি ভাঙতে…’।
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার প্রথম শহিদ ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ ভাঙ্গার দিন রচিত হয়েছিল। সে হিসেবে এটি ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত দ্বিতীয় কবিতা। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ লুতফুর রহমান জুলফিকারের লেখা সুদীর্ঘ ৬৩ পঙক্তির ‘রক্তের ডাক’ নামক কবিতাটি ভাষা আন্দোলনের উপর লেখা তৃতীয় কবিতা।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত প্রথম গান
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত প্রথম গান ‘বাঙলা ভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালি/ ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলি’। খুলনা নিবাসী কবি শামসুদ্দিন আহমদ রচিত এ গানটি বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন স্মরণে রচিত প্রথম গান। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের প্রথমার্ধে ২১ ফেব্রুয়ারির পূর্বে গাজীউল হক রচিত নিজামুল হক সুরারোপিত ‘ভুলব না ভুলব না, ভুলব না আর একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গানটি একুশে ফেব্রুয়ারির উপর রচিত দ্বিতীয় গান। আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি একুশ স্মরণে রচিত তৃতীয় গান।

একুশের শহিদদের নাম উচ্চারিত প্রথম কবিতা
হাসান হাফিজুর রহমানের ‘অমর একুশে’ কবিতা একুশের শহিদদের নাম উচচারিত প্রথম কবিতা। কবিতাটির প্রথম স্তবক ‘ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার কি বিষণ্ন থোকা থোকা নাম একসার জলন্ত নাম…’।

একুশের ভাষা আন্দোলনের ঘটনা নিয়ে রচিত প্রথম নাটক
বাংলা নাট্য শিল্পে ভাষা আন্দোলনের চেতনার প্রথম পথিৃকৎ মুনীর চৌধুরী। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে রচিত এবং ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘কবর’ ভাষা আন্দোলনের চেতনায় লেখা প্রথম নাটক। নাটকটি আরউইন শ’র ‘ব্যারি দ্যা ডেড’ এর ছায়া অবলম্বনে রচিত। উল্লেখ্য ‘কবর’ নাটকে কোনো নারী চরিত্র নেই। দিয়াশলাইয়ের কাঠির আলোতে এটি প্রথম কেন্দ্রীয় কারাগারে অভিনীত হয়।

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপন্যাস
আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’,শওকত ওসমানের ‘আর্তনাদ’, জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’, সেলিনা হোসেনের ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাস ‘নিরন্তর’ ইত্যাদি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপন্যাস।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি’
১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকা কলেজের ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে বর্তমান বঙ্গবন্ধু এভেনিউ এলাকায় (তখনকার ব্রিটিানিয়া সিনেমা হলে) প্রথম আমার সোনার বাংলা গানটি গাওয়া হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে আবদুল লতিফের সুরে আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো’ গানটি আতিকুল ইসলামের কন্ঠে প্রথম গাওয়া হয়। গানটি প্রথমে কবিতা হিসেবে লেখা হয়েছিল। যা গেণ্ডারিয়ার ধুপখোলা মাঠে যুবলীগের একটি অনুষ্ঠানে প্রথম আবৃতি করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে যুবলীগের তৎকালীন সাংস্কৃতিক স¤পাদক সৈয়দ আহমদ হোসেনের কাছ হতে রফিকুল ইসলাম কবিতাটি নিয়ে আবদুল লতিফকে সুর করতে দেন। আবদুল লতিফের সুরে গাফফরার চৌধুরীর কবিতাটি আতিকুল ইসলামের কন্ঠে আবার গাওয়া হয়। পরবর্তীকালে গানটিতে আলতাফ মাহমুদ নতুনভাবে সুর দেন। বর্তমানে গানটি আলতাফ মাহমুদের সুরে গাওয়া হয়।

একুশের প্রথম সংকলন
১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কলেজ ছাত্রাবাস কর্তৃক ১/৪ ডিমাই সাইজের ৪ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত প্রচারপত্রটি একুশের প্রথম সংকলন। সংকলনটিতে আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি ‘একুশের গান’ শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে হাসান হাফিজুর রহমান স¤পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনটি একটি পূর্ণাঙ্গ সংকলন। তাই এটিকে অনেকে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম সংকলন বলে থাকেন। ‘আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙানো গানটি‘ এ সংকলনে দ্বিতীয়বারের মতো মুদ্রিত হয়। হাসান হাফিজুর রহমান স¤পাদিত একুশে সংকলনটি প্রকাশ করেছিলেন ‘পুথিপত্র প্রকাশনী’র পক্ষে মোহাম্মদ সুলতান। পচ্ছদ শিল্পী আমিনুল ইসলাম, রেখাঙ্কনে শিল্পী মর্তুজা বশীর। সংকলনটি প্রকাশিত হবার ২১ দিন পর সরকার বাজেয়াপ্ত করে।

ক্রমশ-

error: Content is protected !!