এক মলাটে একনজরে ভাষা আন্দোলন, মাতৃাভাষা আন্দোলন, শহিদ মিনার, ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা

পূর্ববাংলা পত্রিকার একুশে সংকলন ও দুটি বিখ্যাত কবিতা
১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ার শহিদ দিবস পালন উপলক্ষে প্রকাশিত ‘পূর্ব বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনে’ আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর নামহীন ‘কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা’ কবিতাটি এবং বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ‘বাতাসের সোহাগে রাত এল বুনো’ কবিতাটি ‘স্মৃতি’ নামে প্রকাশিত হয়।

স্বাধীনতা আন্দোলন ও ভাষা দিবসের আলেখ্যে লেখা যুগপৎ ব্যতিক্রমী উপন্যাস
স্বাধীনতা আন্দোলন ও ভাষা দিবসের আলেখ্যে লেখা যুগপৎ ব্যতিক্রমী আদলের উপন্যাস আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’। ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা দিবসের উপর এ যাবত যত উপন্যাস লেখা হয়েছে তৎমধ্যে উপমা ও গভীরতা বিবেচনায় এটি শ্রেষ্ঠতম উপন্যাস।

জাতিসংঘে প্রথম বাংলা ভাষণ
১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯-তম অধিবেশনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন।

একুশের প্রথম আলোকচিত্র প্রদর্শন
১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে শিল্পকলা একাডেমিতে আলোকচিত্র শিল্পী মনোয়ার আহমদ এর একক আলোকচিত্র প্রদর্শন হয়। ভাষা সৈনিক ও রাজনীতিবিদ মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ আলোকচিত্র প্রদর্শন উদ্বোধন করেন।

রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রথম স্বীকৃতি
১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাকে উর্দু ভাষার সাথে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

তমদ্দুন মজলিশ
ভাষা সৈনিক নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাশেম (পরবর্তীকালে প্রিন্সিপাল) এর নেতৃত্বে কতিপয় ছাত্র ও অধ্যাপকের সম্মিলিত প্রয়াসে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিশ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়।

বাংলা ভাষা প্রচলন বিল
১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি বাংলা ভাষা প্রচলন বিল পাশ হয়।

বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সংবিধান
১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান বাংলা ভাষায় রচিত। এটিই বাংলা ভাষায় রচিত কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম সংবিধান।

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের প্রথম আহবায়ক
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের প্রথম আহবায়ক ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির প্রথম আহবায়ক ছিলেন আবদুল মতিন এবং সবর্দলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের প্রথম সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি নওয়াবপুর রোডে আওয়ামীগ অফিসে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন জনাব আবুল হাসেম।

বাংলা একাডেমী আইন ও বর্ধমান হাউজ
১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ এপ্রিল প্রাদেশিক আইন সভায় ‘বাংলা একাডেমী এ্যাক্ট ১৯৫৭’ পাস এবং ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ আগস্ট ‘বর্ধমান হাউজ’ তথা বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয়।

সরকারিভাবে প্রথম একুশে ফ্রেব্রুয়ারি পালন
আবু হোসেনের সরকার এর আমলে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয়। এরপর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন জাতীয় মর্যাদা লাভ করে। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ হতে ভারতের বাংলাভাষী ত্রিপুরা রাজ্য একুশে ফেব্রুয়ারিকে বাংলা ভাষা দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেয়। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গেও বেসরকারিভাবে একুশে ফ্রেব্রুয়ারি উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

অমর একুশে ভাস্কর্য
জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ার সামনে স্থাপিত ‘অমর একুশে’ ভাস্কর্যটির স্থপতি শিল্পী জাহানারা পারভীন। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক কাজী সালেহ আহমদ ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করেন।

বাংলাদেশের বাইরে ভিন্ন রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন
১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ হতে ভারতের বাংলাভাষী রাজ্য ত্রিপুরা সরকারিভাবে তাদের রাজ্যে একুশে ফেব্রুয়ারিকে বাংলা ভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরের বছর পশ্চিম বাংলায় বেসরকারিভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

একুশের ফেব্রুয়ারির ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ মর্যাদা লাভ
১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আর্ন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ এর মর্যাদা স্বীকৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের কারণে বদলীকৃত প্রথম জেলাপ্রশাসক
ঢাকার তৎকালীন জেলাপ্রশাসক জনাব হুসেন হায়দার ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা হতে পরবর্তী একমাসের জন্য ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করার বিষয়ে অসম্মতি জ্ঞাপন করলে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে সিলেটে বদলি করা হয় এবং জনাব কোরেশিকে জেলাপ্রশাসক, ঢাকা হিসেবে বদলি করা হয়।

ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে প্রচারিত প্রথম গোপন দলিল
ভাষা আন্দোলনকে সফল করে তোলার জন্য শুধু পার্টির সদস্যদের মধ্যে প্রচারের লক্ষ্যে পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ববাংলা কমিটির স¤পাদকমণ্ডলী ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি একটি দলিল প্রচার করেন। গোপনীয়ভাবে প্রচারিত এ দলিলটি ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে প্রকাশিত প্রথম গোপন দলিল হিসেবে খ্যাত।

একুশে পদক
১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ হতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাষা শহিদ স্মরণে একুশে পদক প্রদানের রীতি চালু হয়।

আসামের বাংলা ভাষা আন্দোলন
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে বাংলায় কথা বলার কারণে অসমিয়রা আসামের বাঙ্গালিদের উপর আক্রমণ করে বসে। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে আসামের গোয়াল পাড়া জেলায় ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলন শুরু হয়। অত্যাচার নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে প্রায় দু লক্ষাধিক বাঙ্গালি উত্তরবঙ্গ ও অন্যান্য স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। অসমিয়া ভাষাকে মাতৃভাষারূপে গ্রহণ করার শর্তে তাদেরকে আসামে পুনর্বাসন করা হয়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ২১ ও ২২ এপ্রিল আসামের প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভায় অসমিয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের দাবি উঠে। সংখ্যাঘরিষ্ঠতার কারণে এ প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং কার্যকর করার জন্য মন্ত্রিসভাকে নির্দেশ দেয়া হয়। এ সিদ্ধান্তে বাঙ্গালিরা ক্ষুব্ধ হয়। প্রদেশ জুড়ে সৃষ্টি হয় প্রবল উত্তেজনা। অসমিরা আবার ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলন শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ২ ও ৩ মে আকর্ষণীয় উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ‘নিখিল আসাম বাঙ্গালা ভাষা সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। এর পরদিন অসমিয়ারা বাঙ্গালিদের উপর হায়েনার মতো ঝাপিয়ে পড়ে। সরকারি হিসাব মতে চল্লিশের অধিক লোক নিহত হয়। জ্বালিয়ে দেয়া হয় ১০ সহস্রাধিক বাড়ি। ৫০ হাজার লোককে বসতবাটী হতে উচ্ছেদ করা হয়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই আসামের রাজ্যভাষাকে কেন্দ্র করে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা বিধান পরিষদে আসামের রাজ্যভাষাকে অসমিয়া করার পক্ষ বক্তব্য দেন এবং ১৪ অক্টোবর তীব্র বিতর্কের পর কেবল কাছাড়ের জন্য বাংলা ভাষার ব্যবহার স্বীকার করে নিয়ে মহকুমা পরিষদের উপর বাংলা ভাষার ভাগ্য ছেড়ে দেয়া হয়। প্রতিবাদ করার পরও ই¯িপত ফল পাওয়া যায় নি। ২৪ অক্টোবর গৃহীত হয় আসাম সরকারি রাজ্যভাষা বিল। বাংলা ভাষার দাবিতে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। বাংলা ভাষার প্রাদেশিক মর্যাদা আদায়ের লক্ষ্যে ১৯ মে হতে সমগ্র কাছাড়ে ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে রাাজ্য সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেন। আন্দোলনকারীরা বাংলা ভাষার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করায় জনসাধারণের উপর কোনোরূপ সতর্কীকরণ ছাড়া পুলিশ গুলি ছুড়লে সর্বমোট ১১ জন ভাষাসৈনিক শহিদ হন।

ক্রমশ-

error: Content is protected !!