এক মলাটে স্যমন্তক

১৯

আফজল চৌধুরীর ড্রয়িং রুমের সোফায় সাদা পাঞ্জাবি আর চেক লুঙ্গি পরিহিত ধবধবে এক নজরকাড়া ইন্দ্রলুপ্ত বর্ষীয়ান। তাঁকে ঘিরে দুজন মাঝবয়সী লোক; এর একজন স্থানীয় কমিশনার। কর্মসূত্রে তিনি আমার পূর্ব পরিচিত। বর্ষীয়ান লোকটিকে চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু মনে করতে পারছিলাম না। বয়স্ক হলেও বেশ সুঠাম। চোখেমুখে বুদ্ধির দুরন্ত উচ্ছ্বাস, কথায় বিজ্ঞতার ছাপ। আমাদের দেখে সবাই গল্প থামিয়ে তাকালেন। কমিশনার সালাম দিলেন দাঁড়িয়ে। আফজল চৌধুরী সুদর্শন বর্ষীয়ানকে দেখিয়ে বললেন, নাতি, ইনি আবদুল হক চৌধুরী, আর বদ্দা। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, আঁরার রউজানর (রাউজান উপজেলা) গৌরব; নাম উইন্নুন-না?
আমি সালাম দিয়ে সোৎসাহে বললাম, চট্টলবিদ আবদুল হক চৌধুরী?
জি, রতনে রতন চিনে; গর্বের গলায় বললেন আফজল চৌধুরী।
আমি আবদুল হক চৌধুরীর দিকে ডান হাত এগিয়ে দিলাম। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন হাত এগিয়ে দিতে। বললাম, আপনার মতো নমস্য লোকের সঙ্গে হাত মেলাতে পেরে খুব খুশি লাগছে।
আবদুল হক চৌধুরী বললেন, আপনাকে কোথায় জানি দেখেছি? উহ্, মনে পড়েছে— চিটাগাং, কাজির দেউড়ি, ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর বাসাত, মনত পইজ্জে না অনত্তে?
অবাক হয়ে গেলাম তাঁর স্মরণশক্তির প্রখরতায়। বললাম, মনে পড়েছে।অনেক বছর আগের কথা। আপনি কেমন আছেন?
: সেই ১৯২২ থেকে দুনিয়াতে। এখন ১৯৯২। এক জায়গায় আর কতদিন ভালো লাগে। এবার যাবার পালা। এখন সময় কাটে হাসপাতাল আর বিছানায়। হাসির জায়গায় কাশি।কলম ধরলে হাত কাঁপে। চোখ, কান, স্মৃতি— সবাই অবাধ্য হতে শুরু করেছে। এখন আমার কোনো অঙ্গই আমার মনের কথা শোনে না। স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। এমন স্বাধীনতা লক্ষণ হিসেবে খুব খারাপ।
আফজল চৌধুরী বললেন, আমি মুক্তিযোদ্ধা, আমার বয়স বুড়োদের চেয়ে সবসময় এগারো বছর কম থাকে। আপনাদের ষাট আমার আটচল্লিশ।
আবুদল হক চৌধুরীকে বললাম, আপনার ছেলে আহমেদ আমিন চৌধুরী আমার পরিচিত।
হেসে বললেন, আমিনরও আঁর ডইল্যা লেখালেখির অভ্যাস আছে। লেখালেখির অভ্যাস ভালা নয়। বউ-পোয়ারে সময় দেউন ন-যায়। তারা দূরে সরি যায়। প্রকাশক টাকা দেয় না। অভাবে থাকতে হয়। অভাবী মানুষকে কেউ দুই পয়সার দামও দেয় না। অবশ্য আঁর আমিন পুলিশ অফিসার, চঅরি একখান আছে। সংসার চালানোর জন্য প্রকাশকের দিকে চেয়ে থাকতে হয় না। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত লেখকদের কেউ দাম দেয় না। বেচারা জীবনানন্দ, শিবরাম চক্রবর্তী, মধুসূদন, নজরুল— সামান্য অর্থের জন্য কত কষ্ট, কত অপমান— আর এখন?
রাকু বলল, গত বছর চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গখের একটা ছবি সত্তর কোটি টাকা নিলামে ওঠেছিল। অথচ তাঁকে ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না-পেরে ৩৭ বছর বয়সে আত্মহত্যা করতে হয়েছে।
আফজল সাহেবের মুখে রচনাদের পরিচয় এবং আমার ভূমিকা জানতে পেরে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন আবদুল হক চৌধুরী। বিশুদ্ধ বাংলায় উল্লসিত গলায় বললেন, এমন মহৎ কাজের নজির খুব বিরল, সাহস লাগে প্রচুর। আফজল, তোমরা খুব ভালো একজন মানুষ পেলে। কদর করতে ভুলো না।
: জি, বদ্দা?
: সবসময় উনার পাশে থাকার চেষ্টা করবে। এমন বিরল সুযোগ আর নাও পেতে পার। অনেকের এমন ভালো কাজ করার সাহস নেই, আবার অনেকের থাকে না সামর্থ্য কিংবা ইচ্ছা। যাদের আছে তাদের অন্তত উৎসাহটা দিতে পারি, কী বলো?
কমিশনার বললেন, আমরাও স্যারকে দেখে রাখব। ভালো যেখানেই হোক, আমরা আছি। যতবার মন্ত্রণালয়ে গেছি ততবার তিনি ভাইয়ের মতো ভালোবেসে সহযোগিতা করেছেন।
কথা শেষ হওয়ার আগে বস্তি হতে হট্টগোলের শব্দ ভেসে এল। কমিশনার বললেন, আমার এলাকায় কয়েকটা বস্তি আছে। সবসময় গন্ডগোল লেগে থাকে। বস্তিবাসীর অনেকে অপরাধে জড়িত। প্রতিটি বস্তি এক একটা মাদক ব্যবসার ঘাঁটি।
আবদুল হক চৌধুরী বললেন, তারা অপরাধী, কিন্তু কার জন্য অপরাধ করে? তাদের দিয়ে কে অপরাধ করায়? এগুলো কখনো ভেবেছ? এত অভাবে তারা অপরাধ আর গন্ডগোল না করে কী আর করবে? তাদের অপরাধের জন্য আমরাই দায়ী। মনে রাখবে, অভাবী মানুষকে ধনীরাই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে অপরাধী করে তোলে।
রচনা বলল, বস্তিবাসীদের সবাই এড়িয়ে চলেন, ঘৃণা করেন।তাদের মানুষই গণ্য করা হয় না।
আবদুল হক চৌধুরী বললেন, মানুষ ধনী-গরিব, উঁচু-নীচু, দেশ-জাতি, ধর্ম-বর্ণ প্রভৃতির নামে যত বিভাজন দেওয়াল তৈরি করেছে তার এক হাজার ভাগের এক ভাগও মিলন সেতু তৈরি করতে পারেনি। পারলে পৃথিবীর কোনো মানুষকে অন্তত মৌলিক চাহিদার জন্য হাহাকার করতে হতো না। এটি সভ্যতার ব্যর্থতা, মানব জাতির কলঙ্ক।
আমি বললাম, সীমান্তের পর সীমান্ত হয়েছে, সীমান্ত জুড়ে অস্ত্রধারীদের প্রহরা বেড়েছে, কিন্তু সীমন্তে মমতার অঙ্গুষ্টি ক্রমশ নেকড়ে-নখের দিকে ধাবিত; সীমন্ত সিঁদুরের নিটোল ঝরনায় রক্তের ধারা।সীমন্তিনীরা বেওয়া হওয়ার হতাশায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে।।
আফজল সাহেব অস্থির গলায় বললেন, ওবা নাতি, ওবা বদ্দা— হানা ঠান্ডা অই যারগুই। তাড়াতাড়ি আইয়ুন।
ডাইনিং রুমে বিরাট টেবিলে নানা রকম খাবার। একসঙ্গে এতগুলো খাবার দেখে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে আল্পনা-কল্পনা ও টুটুল; রচনার চোখেও বিস্ময়। একসঙ্গে এত খাবার তারা এর আগে কোনোদিন খাওয়ার জন্য দেখেনি। এমন সাদর আপ্যায়নও পায়নি।
টুটুল বলল, আল্লাহ্ কত খাবার! আমি সবগুলা খামু। কাউকে দিমু না।
আফজল চৌধুরী বললেন, দাদু, সব তোমার জন্য করা হয়েছে।
আবদুল হক চৌধুরী টুটুলকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, আমিই খাইয়ে দেব তোমাকে। এসো দাদু, কাছে এসো।
আফজল চৌধুরী রচনার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোয়ার হন ধর্ম নাতিন?
রচনা উত্তর দেওয়ার আগে আবদুল হক চৌধুরী বলে ওঠেন, আফজল, এমন প্রশ্ন গোঁড়ামির লক্ষণ। মনুষ্যত্বই মানুষের ধর্ম। কাউকে এমন প্রশ্ন কখনো করবা না। অন্যের ধর্ম দিয়ে তুমি কী করবে? কেউ যদি তোমার ধর্মের না হয় সেজন্য কি তোমার বাড়াভাতে ছাই পড়বে? তোমার মতো তোমার আশেপাশের সবাই মুসলিম, তারপরও তোমার-আমার চোখের সামনে রাস্তায় হাজার মুসলিম না খেয়ে মরছে। তুমি আমি কি তাদের খাওয়াচ্ছি? কোনো মুসলিম প্রধান দেশে থেকে তুমি কি মুসলিম হিসেবে অতিরিক্ত কোনো সুবিধা পেয়েছ? দেশ তো কম ঘুর-নি।
: পাইনি। বরং সৌদিরা আমাদের মিসকিন বলে উপহাস করে।
আমি বললাম, ধর্মীয় গোঁড়ামি সবসময় ক্ষতিকর।
আবদুল হক চৌধুরী বললেন, যেকোনো গোঁড়ামি অসহ্য। গোঁড়ামির গোড়া, গোড়া থেকে উৎপাটন না-করে মাঝখান থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করার পরিণতি ভয়ংকর হয়। এমন করাটাও এক ধরনের গোঁড়ামি। আমরা কিন্তু তাই করছি। এজন্য এত অসহনীয় পরিস্থিতি। মানুষকে শিক্ষিত করতে পারলে গোঁড়ামি চলে যাবে। আগুন দিয়ে আগুন নেভানো যায় না। মনে রাইখবা, অশিক্ষাই সব গোঁড়ামির উৎস।
কথায় কথায় খুব আনন্দের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো। টুটুল, সারা ঘর
টুটুল, আফজল চৌধুরীর নাতির খেলনা নিয়ে মনের আনন্দে খেলছে আর ঘুরে ঘুরে সারা ঘরের জিনিসপত্র দেখছে। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ পরপর রাকুর কানে কানে কী যেন বলছে। খেলতে খেলতে একটা কাচের পুতুল ভেঙে ফেলে হঠাৎ।
রাকু উঠে জোর করে নিয়ে আসতে চাইল টুটুলকে। টুটুল আসবে না, খেলবেই। তার উচ্ছল-উচ্ছ্বাসে পুরো ঘর হাসির মতো কাঁপছে ভুমিকম্পের আলোড়নে।
আফজল চৌধুরীর পুত্রবধূ বললেন, খেলুক, ইচ্ছেমতো ভাঙুক। টুটুলের হাসির চেয়ে খেলনা বড়ো না। আমার ছেলে কোনোদিন এসব খেলনা দেখে এত মধুর হাসি হাসেনি। এত প্রবল উচ্ছ্বাসে ঘরটাও কাঁপিয়ে তুলেনি। টুটুলও স্বাভাবিক হয়ে যাবে দুদিন পর— এমন আবেগ স্বপ্নের ঘোর বেশিদিন থাকে না; থাকতে থাকতে সবাইকে বসন্তের মায়াবী কল্পনায় ইচ্ছেমতো তাদের ইচ্ছাগুলো শৃঙ্খলহীন উচ্ছৃঙ্খলতায় মেলে ধরতে পারার সুযোগ দেওয়া উচিত। নইলে মন মরে যায়, অবদমন খুব খারাপ জিনিস।আমাদের দেশে শিশুরা পদ পদে অবদমিত হচ্ছে। অবদমিত মনের বিস্তার পদপিষ্ট কচি চারার মতো বন্ধ্য হয়।
তাঁর উদার কথা আমার বুকে জমাট মায়ার শিহরন তুলে দিল। ভদ্রমহিলার প্রকাশে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। এমন মন বিরল।আফজল চৌধুরীকে বললাম, দাদু, আপনার পুত্রবধূ অনেক বড়ো মনের মানুষ।
: আমার ছেলে আরও বড়ো মনের। সে আমেরিকা থাকে। পরিচয় হলে বুঝবেন। ঠিক আপনার মতো।
কমিশনার বললেন, এবার গান হবে।
প্রথমে কে গাইবে? জানতে চাইলেন আবদুল হক চৌধুরী।
কেউ কিছু বলার আগে পিচ্চি পঞ্চোর্ধী কল্পনা বলে ওঠল, আমি।
সাহস দেখে অবাক হয়ে গেল সবাই। ফ্ল্যাটে ওঠে তারা যত হতবাক হয়েছে আমরা তার চেয়ে বেশি হতবাক হয়ে গেলাম।
শুরু করো, আবদুল হক চৌধুরী কল্পনাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন।
বাংলাদেশটা আমার ঘর, সকলের আত্মীয় সবে নহি কেহ পর,
সকলে একান্নভুক্ত, সকলে একান্নভুক্ত আবালবৃদ্ধা নারী-নর।
সকলের আত্মীয় সবে নহি কেহ পর।
আমরা হিন্দু মোছলমান, বৌদ্ধ আর খ্রিষ্টান,
এক ঘরের বাসিন্দা সবি এক ঘরের সন্তান,
এক-মায়ের দুধ করিয়া পান,
এক-মায়ের দুধ করিয়া পান বাঁচিয়া রই জীবনভর।
সকলের আত্মীয় সবে নহি কেহ পর।”
আবদুল হক চৌধুরী বললেন, গানটা কার লেখা?
:বাদশা ফকিরের।

Total Page Visits: 5894 - Today Page Visits: 10

16 thoughts on “এক মলাটে স্যমন্তক”

  1. I was very happy to seek out this web-site.I wished to thanks to your time for this wonderful learn!! I positively enjoying every little little bit of it and I have you bookmarked to take a look at new stuff you weblog post.

  2. My wife and i got very glad that Raymond managed to conclude his research through the precious recommendations he acquired from your very own web site. It is now and again perplexing just to find yourself making a gift of things which usually other people may have been making money from. We do understand we have the blog owner to give thanks to for this. The entire explanations you made, the straightforward site menu, the friendships you will make it easier to engender – it’s got most overwhelming, and it is letting our son in addition to our family believe that that concept is fun, and that is incredibly essential. Thanks for everything!

  3. Wow! This could be one particular of the most beneficial blogs We have ever arrive across on this subject. Basically Excellent. I am also an expert in this topic therefore I can understand your hard work.

  4. My husband and i were really joyful that Chris could complete his homework out of the precious recommendations he gained out of the web site. It is now and again perplexing just to happen to be offering ideas that many the others have been trying to sell. And we all figure out we’ve got the writer to give thanks to for that. The type of explanations you made, the easy site navigation, the friendships you can make it possible to promote – it’s mostly terrific, and it is leading our son in addition to our family reckon that that subject matter is enjoyable, and that is rather indispensable. Thank you for all!

  5. Throughout this great scheme of things you’ll receive a B- with regard to hard work. Where you actually lost everybody ended up being on the details. You know, they say, the devil is in the details… And it couldn’t be more accurate in this article. Having said that, allow me inform you what exactly did work. The writing is extremely engaging which is probably the reason why I am making the effort in order to comment. I do not make it a regular habit of doing that. Second, whilst I can see a leaps in reasoning you come up with, I am definitely not convinced of just how you appear to connect your details which inturn help to make the final result. For the moment I will, no doubt subscribe to your position but hope in the future you link the facts better.

  6. I’ve recently started a blog, the info you provide on this website has helped me greatly. Thanks for all of your time & work. “The achievements of an organization are the results of the combined effort of each individual.” by Vince Lombardi.

  7. What’s Taking place i’m new to this, I stumbled upon this I have discovered It absolutely useful and it has helped me out loads. I hope to give a contribution & aid other users like its helped me. Good job.

  8. Today, I went to the beach with my kids. I found a sea shell and gave it to my 4 year old daughter and said “You can hear the ocean if you put this to your ear.” She put the shell to her ear and screamed. There was a hermit crab inside and it pinched her ear. She never wants to go back! LoL I know this is entirely off topic but I had to tell someone!

  9. I like what you guys are up too. Such smart work and reporting! Keep up the superb works guys I have incorporated you guys to my blogroll. I think it will improve the value of my site 🙂

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!