এতদ্দ্বারা সর্বসাধারণের অবগতির জন্য জানানো যাইতেছে যে- বাক্যটি শুদ্ধ কি না

ড. মোহাম্মদ আমীন

 
ব্যাকরণ, অর্থ, উদ্দেশ্য এবং উপস্থাপন যে দিক দিয়ে বিবেচনা করা হোক না কেন বাক্যটি সম্পূর্ণ শুদ্ধ  এবং সুন্দর ও চৌকশ। এরকম জোরালো বাক্য বাংলায় খুব কম আছে। চাকুরির প্রথম দিকে এ বাক্য দিয়ে যখন প্রজ্ঞাপন লিখতে শুরু করি তখন মনে হতো— অশুদ্ধ।  কারণ তখন বিবেচনা না করে গড্ডলিকা প্রবাহে শেখা বুলি আওড়ে যেতাম হায় হায়! এটি অশুদ্ধ। অথচ শুদ্ধ। এখনো একই কারণে অনেকে বাক্যটি অশুদ্ধ মনে করে।
 
যিনি আমার বাংলা শেখানোর গুরু, যিনি আমার কাছে সমকালীন বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলাবিদ, যিনি পররারষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সর্বপ্রথম বাংলায় পত্র যোগাযোগ চালু করেছেন তিনিই আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। বলেছেন  এটি শুদ্ধ এবং খুবই শক্তিশালী একটি বাক্য। তিনি প্রায়শ বলতেন— সবাই যা অশুদ্ধ বলে তা অশুদ্ধ মনে করার; সবাই যা শুদ্ধ মনে করে তা শুদ্ধ ভাবার আগে কারণ বিশ্লেষণ করবে। অভিজ্ঞান-
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
শ্রেষ্ঠত্ব ভোটের গণনার মতো মাথার সংখ্যা দ্বারা নির্ধারিত হয় না; মগজের কর্মক্ষমতা দ্বারা  নির্ধারিত হয়।
এবার দেখি বাক্যটি অশুদ্ধ হবে না কেন
সংস্কৃত ‘অবগত (অব+√গম্‌+তি)’ অর্থ— (বিশেষণে) জ্ঞাত, অবহিত, বিদিত। অবগত থেকে অবগতি। যেমন: সর্বসাধারণকে অবগত করা যাইতেছে যে- – -।
সংস্কৃত ‘অবগতি (অব+√গম্‌+তি)’ অর্থ (বিশেষ্যে) অবহিত, জ্ঞান, বোধ; গুরুত্ব প্রদান, দৃষ্টি আকর্ষণ, নিশ্চয়াত্মক জ্ঞান; (বাংলায়) জানার জন্য মনোনিবেশ। বাংলা বাক্য হিসেবে অবগতি শব্দটি সাধারণত (বিশেষ্যে) ‘জানার জন্য মনোনিবেশ’, গুরুত্ব প্রদানের জন্য অবগত করানো, বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণের জন্য গুরুত্বারোপ করার বিষয়টি অবহিত করানো প্রভৃতি অর্থে সমধিক ব্যবহৃত হয়। সর্বসাধারণের অবগতির জন্য অবগত করা যাইতেছে যে – – -।
বাংলা জানানো অর্থ (ক্রিয়াবিশেষ্যে)— অবহিত করা, জ্ঞাত করা (সবাইকে জানানো), সতর্ক করা; নিবেদন করা (শ্রদ্ধা জানানো)।
জানানো ক্রিয়াবিশেষ্য, কিন্তু অবগতি বিশেষ্য। উত্তর দেওয়ার আগে এ বিষয়টি অবহেলা করবেন না। এটাই আসল বিষয়। দর্শনের জন্য দর্শনি দিতে হয়। অবগতির জন্য অবগত হতে হয়।
এখন বলুন তো, শিরোনামোক্ত বাক্যটি কি আপনার কাছে বাহুল্যজর্জরিত মনে হয়? একটি শব্দের একাধিক অর্থ থাকে। বাক্যে তা উদ্দেশ্য অনুসারে দ্যোতিত হয়।
বল খোকা বল, শুধু বল দিয়ে কি বল খেলা যায়?
 

শনাক্ত না কি সনাক্ত: শুবাচ সাম্প্রতিক বানান

শনাক্ত ইদানীং বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। যুদ্ধকালীন সহিংস নেতার মতো করোনাভাইরাস প্রায় অপরিচিত শনাক্ত শব্দটির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে তুলে দিয়েছে।
অনেকে প্রশ্ন করেন শনাক্ত না কি সনাক্ত। শব্দটির প্রমিত বানান শনাক্ত। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে (২০১৭ খ্রি.), বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত ফারসি শনাক্ত শব্দের অর্থ পরিচিতি নিশ্চিতকরণ।
নিমোনিকসূত্র: বানান কীভাবে মনে রাখবেন? বিদেশি শব্দে মূর্ধন্য-ষ হয় না। তাই শনাক্ত বানানে মূর্ধন্য-ষ হবে না। বাকি থাকে স আর শ। তাহলে দন্ত্য-স নয় কেন? বর্ণমালায় সবার আগে তালব্য-শ। রোগী চিকিৎসার জন্য গেলে আগে শনাক্ত করা হয়। তারপর শুরু হয় সেবা। এজন্য শনাক্ত বানানে তালব্য-শ।
অতএব, লিখুন ‘শনাক্ত’; লিখবেন না ‘সনাক্ত’।
 
হাজত
হাজত শব্দের বর্তমান আভিধানিক অর্থ বিচারের পূর্বে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আসামিকে আদালতে হাজির করার জন্য পুলিশের জিম্মায় রাখার স্থান। ‘হাজত’ আরবি শব্দ। এর আদি ও মূল অর্থ ছিল— প্রয়োজন, চাহিদা, প্রাপ্যতা প্রভৃতি। বাংলায় আসার পর শব্দটি তার মূল অর্থ হারিয়ে কেবল আদালতের প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যে আসামিদের রাখার স্থানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বাংলায় ‘হাজত’ শব্দটি এখন আরবির মতো আর সাধারণ অর্থে ব্যবহার করা হয় না। এটি এখন আইনগত শব্দ। ‘হাজত’ শব্দটিকে সাধারণ মানুষ এখন আর চাহিদা মনে করে না। এটি একটি ভয়ঙ্কর স্থান।
 
আঁতেল
আঁতেল হল আধুনিক বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত একটি ফরাসি-ভাষা-আগত বিশেষ্য ও বিশেষণবাচক শব্দ, যা “বুদ্ধিজীবী” বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ (Intellectual) শব্দের অপভ্রংশ।[১][২] আভিধানিক অর্থে, আঁতেল হল (ব্যঙ্গে) পণ্ডিত, বিদ্বান, বুদ্ধিজীবীর ধরনধারণবিশিষ্ট (ব্যক্তি), যা ফরাসি তেঁলেক্তুয়াল (intellectual) এর অপভ্রংশ, কিংবা ইং. intellectual এর ফরাসিভঙ্গিম উচ্চারণ থেকে আগত।[৩] পুথিগত বিদ্যায় পারদর্শী তবে বাস্তববুদ্ধি ও কাণ্ডজ্ঞানের অভাব এমন ব্যক্তিকে আঁতেল বলা হয়। যে জ্ঞানীর ভান করে তাকেও আঁতেল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।[১] ভাষাতত্ত্ববিদ পবিত্র সরকারের মতে, “চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী বাঙালির আত্মপ্রকাশ ঘটে, যারা নিয়মিত কফি হাউসে বসতেন, পাঞ্জাবি পরতেন ও নিজেদের সেরা মনে করতেন; এসব বুদ্ধিজীবীকে দেখে অন্যান্যদের বিদ্রুপ এবং প্রতিক্রিয়াতেই ‘আঁতেল’ শব্দটির প্রয়োগ শুরু।
 
বাংলা ভাষায় আঁতেল শব্দটি ইংরেজি (মূলে ফরাসী) ইন্টেলেকচুয়াল (বুদ্ধিজীবী) শব্দ থেকে এসেছে মনে করা হয়। সাধারনত: সেই ব্যক্তিকে ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ বলা হয় যে কি না কোনো বিষয়ে একই সাথে ‘জ্ঞানী ও পারদর্শী’| তবে কথ্য ভাষায় আঁতেল শব্দটি নেতিবাচক বা নিন্দার্থে ব্যবহৃত হয়।
 
কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ
পৌষ মাসের সাথে প্রাচীন ভারত থেকে বর্তমান পর্যন্ত অত্যন্ত আনন্দের সম্পর্ক রয়েছে।এই মাসটি পূর্বে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিকট প্রিয় হলেও বর্তমানে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের নিকটই প্রিয়।এই সময় সূর্যের উত্তরায়ণ ঘটে।অগ্রহায়নের তোলা ধান থেকে নতুন চাল বের হয়,নতুন গুড় বের হয়।প্রাথমিক শীতের আমেজে পিঠাপুলির ধুমধাম থাকে সারা মাস।সারা বছরে এইমাসেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ হতো।তাই এই প্রবাদটি প্রচলিত হয়েগিয়েছে কারো পৌষমাস আর কারো সর্বনাশ। পৌষ মাসে নতুন ধান ওঠে। তাই কৃষকদের কাছে এটা খুব ভালো সময়। এই সময় এইজন্য পিঠে পুলি খাওয়া হয়। কিন্তু যাদের হাতে পয়সা থাকে না, এই পৌষ মাসেই তারা ঠাণ্ডায় মরে যায়, তাদের কাছে পৌষ মাস সর্বনাশের মাস । পৌষ মাসে কেউ পিঠা-পুলি খেয়ে আনন্দ উপভোগ করে, আবার কেউ শীতে দারুন কষ্ট পায়। কারো জন্য যে সময়টা আনন্দের, ঠিক একই সময়টা অন্য কারো জন্যে দুঃখের। অর্থাৎ কারো সুসময়, কারো দুঃসময়।
 
মূলত হিন্দুদের একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ওপর ভিত্তি করে প্রবাদটা তৈরী। মকর-সংক্রান্তি, গঙ্গাসাগরে পুণ্যস্নান এসব কথা হয়তো শুনে থাকবেন।
সবচেয়ে ভালো হয়। যদি ঈশ্বর গুপ্ত’র লেখা “পৌষপার্ব্বণ” কবিতাটা একবার পড়ে দেখেন। ওখানে অসাধারণভাবে বর্ণনা দেওয়া আছে।
এছাড়াও পৌষের প্রচন্ড শীতে যাদের সামর্থ্য আছে তারা আরামে কাটিয়ে দিতে পারে। যাদের সামর্থ্য নেই তারা প্রচন্ড শীতে বাইরে বের হয় কর্ম করতে, কাপড় চোপড়ের অভাবে কষ্ট করে দিনাতিপাত করতে হয়।
আরেকটি বিষয় আছে। দারুন শীতে যাদের বউ আছে তারা কত সুখে রাত কাটায়! যাদের নাই তারা কত কষ্টে রাত কাটায়!! গ্ৰাম্য প্রবাদ।
 
 
 
 
কৃষ্ণের জীব একটি বাংলা বাংলা বাগ্‌ধারা। এর প্রায়োগিক ও আভিধানিক অর্থ দুর্বল ও অসহায় ব্যক্তি। 
 
এই  পোস্টের লিংক:  https://draminbd.com/এতদ্দ্বারা-সর্বসাধারণের/
 
error: Content is protected !!