এবি ছিদ্দিক-এর শুবাচ পোস্ট সমগ্র যযাতি সমগ্র শুদ্ধ বানান চর্চা শুবাচ ব্যাকরণ বিবিধি

বায়ান্ন: প্রমিত, না কি আঞ্চলিক? ৯১
 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুসারে, বায়ান্ন হচ্ছে বাহান্নর আঞ্চলিক রূপ। তাহলে কি প্রমিত রীতিতে শব্দটির ব্যবহার অসংগত? আগে এ-সংক্রান্ত কিছু মৌলিক দিক স্পষ্ট করা উচিত। আপনার রায় না-হয় দিক কটির আলোচনা শেষে দেবেন। তবে কথা না-বাড়িয়ে দিকগুলোয় আলোচনায় চলে যাচ্ছি.
প্রথমত, কোনো ভাষার আঞ্চলিক শব্দ যখন ওই ভাষার মান্য অভিধানে স্থান পায়, তখন মান্য (প্রমিত) রীতিতে লেখা বা বলার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক শব্দটি বা শব্দগুলো ব্যবহারে কোনো বাধা থাকে না। মান্য অভিধানে কোনো শব্দের উৎসের পাশে ‘আঞ্চলিক’ উল্লেখ থাকার মানে এই নয় যে, শব্দটি কেবল আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহার করা যাবে; প্রকৃত মানে হচ্ছে, ওই শব্দটির উৎস হচ্ছে আঞ্চলিক ভাষা। যেমন: ‘ছোটদি’ শব্দের উৎসের পাশে ‘আঞ্চলিক’ লেখা রয়েছে। এর মানে হচ্ছে ‘ছোটদি’ শব্দটি আঞ্চলিক ভাষা থেকে প্রমিত ভাষায় জায়গা করে নিয়েছে। ব্যাপারটি অনেকটা ‘পাশ’ শব্দের উৎস ‘ইংরেজি’ (ইংরেজি ভাষা), ‘দুরবিন’ শব্দের উৎস ‘ফারসি’, ‘ঠান্ডা’ শব্দের উৎস ‘হিন্দি’ প্রভৃতির মতো। মান্য রীতিতে পাশ, দুরবিন, ঠান্ডা প্রভৃতি শব্দ ব্যবহারে যেমন কোনো ভুল নেই, তেমনি মান্য অভিধানে গৃহীত ছোটদি, ছ্যামড়া, মেকুর, নেবু, বায়ান্ন, মেন্দি, কটাল প্রভৃতি শব্দের ব্যবহারেও কোনো অসংগতি নেই।
দ্বিতীয়ত, উৎস অনুসারে ‘বায়ান্ন’ শব্দটি প্রকৃতপক্ষে আঞ্চলিক শব্দ নয়, বস্তুত এটি একটি তদ্ভব শব্দ। কেননা, ‘বাহান্ন’ আর বায়ান্ন— উভয় শব্দের মূল উৎস হচ্ছে সংস্কৃত ‘দ্বাপঞ্চাশৎ’ (বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুসারে ‘দ্বিপঞ্চাশৎ’)। শুদ্ধ সংস্কৃতের ‘দ্বাপঞ্চাশৎ’ সাধারণের প্রাকৃত ভাষায় ‘বাবন্নাহ’-তে বদলে যায়। মধ্য বাংলায় লোকমুখে এই ‘বাবন্নাহ’-এর ‘ব’ লোপ পেয়ে ‘য়’-শ্রুতির ফলে, এবং অন্ত্যের ‘হ’ লোপ পেয়ে ‘বাবন্নাহ’ হয়ে যায় বায়ান্ন। আধুনিক বাংলায় ‘য়্’ লোপ পেয়ে ‘হ্’ শ্রুতির মাধ্যমে ‘বায়ান্ন’ থেকে ‘বাহান্ন’-এর সৃষ্টি। এটি অনেকটা ‘বিবাহ’ থেকে ‘বিয়ে’ সৃষ্টির বিপরীত প্রক্রিয়া। বিবাহ থেকে আধুনিক বিয়ের সৃষ্টি বলে আধুনিক বাংলায় বিবাহ শব্দটির ব্যবহার যেমন অসংগত বলার কোনো সুযোগ নেই, তেমনি বায়ান্ন থেকে বাহান্নর সৃষ্টি বলে বায়ান্নকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়ার কোনো কার্যকারণ নেই।
তৃতীয়ত, বাঙালির (বাংলাদেশি বাঙালির) গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সঙ্গে ‘বাহান্ন’ শব্দটি ঠিক যায় না। বাঙালি যখনই ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের কথা বলে, তখনই তার মস্তিষ্কে-মুখে ‘বায়ান্ন’ শব্দটি চলে আসে, বাহান্ন নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের “বায়ান্নর দিনগুলি”-র কথা বলা হোক কিংবা ভাষা আন্দোলনের কথা; বাঙালির মুখে ওইসব ঘটনার সাল সর্বদা /উন্‌নিশ্‌শো বায়ান্‌নো/ রূপেই উচ্চারিত হয়, /উন্‌নিশ্‌শো বাহান্‌নো/ রূপে নয়। শব্দের বিবর্তনের এসব ইতিহাস পর্যালোচনা করে এবং নিজেদের ইতিহাসে চোখ বুলিয়ে আপনার কি মনে হয় যে, কোনো বাংলাদেশি বাঙালি তাঁর কথায় ‘বায়ান্ন’ শব্দটি ব্যবহার করা মানে তিনি প্রমিত ভাষাকে আঞ্চলিকতার দোষে দুষ্ট করেন? (২৩শে জানুয়ারি, ২০২১)

ক্রমশ

সাবধানতার সঙ্গে: একটি পদবন্ধের যথার্থতা 

Language
error: Content is protected !!