এবি ছিদ্দিক-এর শুবাচ পোস্ট সমগ্র যযাতি সমগ্র শুদ্ধ বানান চর্চা শুবাচ ব্যাকরণ বিবিধি

 
সম্পর্কের যত নাম: মান্য রূপ ৮০
 
একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা যখন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখন তাদের ‘স্বামী-স্ত্রী’, ‘পতি-পত্নী’, ‘জামাই-বউ’ প্রভৃতি বলা হয়। স্বামী-স্ত্রীর ঘরে যেসকল বাচ্চার জন্ম হয়, তারা হচ্ছে ওই দম্পতির সন্তান। পুংলিঙ্গের সন্তানকে ছেলে, পুত্র, তনয় প্রভৃতি এবং স্ত্রীলিঙ্গের সন্তানকে মেয়ে, কন্যা, দুহিতা, তনয়া প্রভৃতি শব্দে সম্বোধন করা হয়। সন্তান নিজের জনককে পিতা, বাবা, আব্বা, আব্বু প্রভৃতি এবং জননীকে মাতা, মা, আম্মা, আম্মু প্রভৃতি নামে ডাকে। একই দম্পতির সন্তানেরা বয়সে নিজের চেয়ে বড়ো জনকে ছেলে হলে ভাই, দাদা, ভায়া, ভ্রাতা প্রভৃতি এবং মেয়ে হলে আপা (আপু) কিংবা দিদি বলে ডাকে। বড়ো ভাইয়ের স্ত্রীকে ভাবি, বউদি, বউঠাকুরানি প্রভৃতি এবং বড়ো বোনের স্বামীকে দুলাভাই, জামাইবাবু প্রভৃতি সংজ্ঞায় ডাকা হয়। অপরদিকে, বয়সে নিজের চেয়ে ছোটো জনকে ছেলে হলে ‘ভাই’ এবং মেয়ে হলে ‘বোন’ ডাকার রেওয়াজ রয়েছে। ছোটো ভাইয়ের পত্নী হচ্ছে ‘বউমা’। ভাইয়ের ছেলেমেয়েকে ‘ভাইপো-ভাইঝি’ এবং বোনের ছেলেমেয়েকে ‘বোনপো-বোনঝি’ সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা হয়। সন্তানেরা পিতার বড়ো ভাই বা দাদাকে ‘জ্যাঠা’ এবং ছোটো ভাইকে চাচা, ‘কাকা’ প্রভৃতি বলে ডাকে। জ্যাঠার পত্নী হচ্ছে জেঠি, জেঠিমা, জ্যাঠাইমা প্রভৃতি এবং চাচা বা কাকার স্ত্রী হচ্ছে ‘চাচি’ বা ‘কাকি’। জ্যাঠার আর চাচার সন্তানকে যথাক্রমে জেঠতুতো ভাইবোন এবং চাচাতো ভাইবোন ডাকা হয়। পিতার বোনকে ধর্মভেদে ফুফু (ফুপু), পিসি প্রভৃতি ডাকতে শোনা যায়। ফুফু বা পিসির স্বামী হচ্ছে ‘ফুফা’ (ফুপা) বা পিসে (পিসেমশাই)। ফুফু বা পিসির সন্তানদের ফুফাতো ভাইবোন কিংবা পিসতুতো ভাইবোন ডাকতে হয়।
স্ত্রী তার স্বামীর বড়ো ভাইকে ‘ভাশুর’ বা ‘বড়োঠাকুর’ এবং ছোটো ভাইকে ‘দেবর’ সংজ্ঞায় সম্বোধন করে; ভাশুর ও দেবরের পত্নীকে সম্বোধন করে ‘জা’ নামে। দেবরকে স্নেহ করে ‘ঠাকুরপো’ ডাকাটাও বেশ জনপ্রিয়। ভাইয়ের জায়গায় বোন হলে স্বামীর বড়ো বোনকে ‘ননাস’ এবং ছোটো বোনকে ‘ননদ’ নামে ডাকার রীতি প্রচলিত রয়েছে। ননদকে ‘নন্দা’-ও ডাকা হয়। ননদের এই ‘নন্দা’ সম্বোধন থেকেই ননদের স্বামীকে ‘নন্দাই’ বলার প্রচলন। পতির দ্বিতীয় কোনো পত্নী থাকলে তাকে ‘সতিন’ বলা হয়। মায়ের সতিন হচ্ছে সন্তানের ‘সৎ মা’। স্বামীর মাতা-পিতা হচ্ছে স্ত্রীর ‘শ্বশুর-শাশুড়ি’। শ্বশুর-শাশুড়ি তাদের সন্তানের পত্নীকে ‘বউ’, ‘বউমা’, ‘পুত্রবধূ’ প্রভৃতি সম্বোধনে ডাকে। পিতার মাতাপিতা বা মায়ের শ্বশুর-শাশুড়ি হচ্ছে সন্তানের ‘দাদা-দাদি’ বা ‘পিতামহ-পিতামহী’। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সম্বোধনে দাদাকে ‘দাদু’ এবং দাদিকে ‘ঠাকুরমা’ বলে ডাকতেই বেশি শোনা যায়। দাদা-দাদিরা তাদের ছেলের পুত্রকে ‘নাতি’, ‘পৌত্র’ প্রভৃতি নামে এবং পুত্রের মেয়েকে ‘নাতনি’, ‘পৌত্রী’ প্রভৃতি সম্বোধনে ডেকে থাকে। নাতির পত্নী হচ্ছে ‘নাতবউ’ এবং নাতনির পতি হচ্ছে ‘নাতজামাই’। নাতির ঘরে কোনো ছেলে বা মেয়ে জন্ম নিলে তাদের যথাক্রমে ‘প্রপৌত্র’ আর ‘প্রপৌত্রী’ বলা হয়। প্রপৌত্র-প্রপৌত্রীরা নিজেদের পিতার দাদা-দাদিকে যথাক্রমে ‘প্রপিতামহ’ ও ‘প্রপিতামহী’ ডাকে।
স্ত্রীর পিতামাতা হচ্ছে স্বামীর ‘শ্বশুর-শাশুড়ি’। শ্বশুর-শাশুড়িরা তাদের কন্যার পতিকে ‘জামাই’, ‘জামাতা’ প্রভৃতি রিশতায় পরিচয় দেয়। বরের মা-বাবা এবং কনের মা-বাবা পরস্পরকে বেয়াই-বেয়ান বলে ডাকে। পতি নিজের পত্নীর ছোটো ভাই ও বোনকে যথাক্রমে শালা বা শ্যালক এবং শালি বা শ্যালিকা আজ্ঞায় ডাকে। স্ত্রীর বড়ো ভাইকে ‘সম্বন্ধী’ বলা হয়। স্ত্রীর বড়ো বোনকে ‘জেঠাস’ ডাকার প্রচলনই সবচেয়ে বেশি এবং সম্বোধনটি অনেকটাই মান্য; যদিও শব্দটি অভিধানভুক্ত নয়। কাজী নজরুল ইসলাম আত্মীয়তার এই সম্বোধনের নাম দিয়েছিলেন ‘জেড়শাস’। শালার বউ হচ্ছে ‘শালাজ’ বা ‘শালাবউ’ এবং শালি ও জেঠাসের স্বামী হচ্ছে ‘ভায়রা’; সম্বন্ধীর পত্নী হচ্ছে ‘বউদি’ বা ‘ভাবি’। স্বামী, তার স্ত্রীর চাচা ও জ্যাঠাকে ‘চাচা-জ্যাঠশ্বশুর’ এবং চাচি ও জেঠিকে ‘চাচি-জ্যাঠশাশুড়ি’ বলে পরিচয় দেয়।
মায়ের ভাইবোনকে সন্তানেরা ‘মামা’ আর ‘খালা’ বলে ডাকে। খালাকে ‘মাসি’ সম্বোধনে ডাকাটাও বেশ জনপ্রিয়। মামার পত্নী হচ্ছে ‘মামি’, খালার পতি হচ্ছে ‘খালু’। খালা যখন মাসি, তখন খালু হয়ে যায় ‘মেসো’। মামার ছেলেমেয়েদের মামাতো ভাইবোন এবং খালা বা মাসির সন্তানদের খালাতো বা মাসতুতো ভাইবোন সম্পর্কে পরিচয় দেওয়া হয়। মায়ের পিতা হচ্ছে ‘নানা’, ‘দাদু’, ‘মাতামহ’ প্রভৃতি এবং মায়ের মাতা হচ্ছে ‘নানি’, ‘দিদা’ ‘মাতামহী’ প্রভৃতি। পিতা-মাতা তার মেয়ের ছেলেমেয়েকে দৌহিত্র ও দৌহিত্রী সম্পর্কে পরিচয় দেয়। দৌহিত্রের ছেলেমেয়ে হচ্ছে প্রদৌহিত্র ও প্রদৌহিত্রী। সন্তানেরা তাদের মায়ের দাদা-দাদিকে প্রমাতামহ-প্রমাতামহী বলে জানে।
< এবি ছিদ্দিক
সম্বোধন নিরূপণে শ্রম স্বীকার করে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন— মান্যবর কৃষ্ণা শীল, বন্ধুবর শুভ্র নাথ, এবং বন্ধুবর লামিয়া সুলতানা তাযকিয়া। (১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২০)
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি: ১. বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান।
২. বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান।
৩. বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস।
 
 
ক্রমশ
মোরগের বাজার থেকে কক্সবাজার: ভাষাবিজ্ঞানীদের স্বেচ্ছাচারিতার নমুনা
 

Language
error: Content is protected !!