এবি ছিদ্দিক-এর শুবাচ পোস্ট সমগ্র যযাতি সমগ্র শুদ্ধ বানান চর্চা শুবাচ ব্যাকরণ বিবিধি

 
 
ক্রিয়াপদের শেষে ও-কার: প্রমিত-অপ্রমিত কিংবা সংগত-অসংগত ৫৪
 
‘হলো’, ‘হতো’, ‘জানো’, ‘করো’ প্রভৃতি শব্দের (ক্রিয়াপদের) অন্ত্যে ‘ও-কার’ যুক্ত করা কিংবা না-করা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। একদল বলেন, “অকারণে ক্রিয়াপদের শেষে ‘ও-কার’ যুক্ত করে মেদ বাড়ানোর কোনো দরকার নেই।” আরেক দল বলেন, “ ‘হলো’, ‘হতো’, ‘জানো’ প্রভৃতি ক্রিয়াপদের বানান ‘ও-কার ছাড়া লেখাটা ভুল-অশুদ্ধ।” যাঁরা এই রায়গুলো দিচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই বাঘা-বাঘা বৈয়াকরণ। তাই, আমি নির্দিষ্ট একটি দলের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করবার স্পর্ধা না-দেখিয়ে কেবল একটি মৌলিক বিষয়ে আলোকপাত করে আমার এই লেখার ইতি টেনে দেব।
‘অশুদ্ধ’ আর ‘ভুল’ শব্দদ্বয়ের প্রয়োগ ভাষার মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে মোটেও সমীচীন নয়। ভাষার চর্চায় এমন পরিস্থিতি খুব কমই আসে, যেক্ষেত্রে এই শব্দ দুটি (অশুদ্ধ বা ভুল) নির্দ্বিধায় ব্যবহার করা যায়। কেননা, আমরা যে মাধ্যমের সাহায্যে আমাদের মনের ভাব সহজেই অন্যের কাছে ব্যক্ত করতে পারি, তাই (তা-ই) ভাষা৷ কেউ এই ভাষার প্রয়োগ অভিনব উপায়ে করতে পারেন, আবার কেউ কেবল মোদ্দা কথাটি ব্যক্ত করতেই খেই হারিয়ে ফেলেন, কেউ-বা বলতে-লিখতে গিয়ে শব্দদের আউলে ফেলেন। ফলে সৃষ্টি হয় নানান বিশৃঙ্খলার। এই বিশৃঙ্খলা এড়াতেই ব্যাকরণের সৃষ্টি। বৈয়াকরণগণ নানাবিধ নিয়মনীতি তৈরি করে ভাষার মধ্যে স্থিতি আনেন, ভাষার সর্বজনীন রূপ প্রতিষ্ঠিত করেন, যাকে আমরা ‘প্রমিত’ রূপ বলছি। ভাষার ক্ষেত্রে ‘প্রমিত’ মানে মানসম্পন্ন, উৎকৃষ্ট, নির্বাচিত, বাছাইকৃত প্রভৃতি। কেউ প্রমিত ভাষায় কথা বলা বা লেখার মানে হচ্ছে, ভাষার উৎকৃষ্ট-নির্বাচিত রূপটি ব্যবহার করা। এমনটি যাঁরা করেন, লোকে তাঁদের প্রশংসা করে। আবার, কেউ ভাষার প্রমিত রূপ ব্যবহার না-করলে, ব্যাকরণের বিধিনিষেধ তোয়াক্কা না-করে কথা বললে বা লিখলে মানুষে তাঁদের আঞ্চলিকতার তকমা লাগিয়ে দেয়। এরূপ ব্যক্তিবর্গের খামখেয়ালি দেখে ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন প্রাজ্ঞিক-বোদ্ধা শ্রোতা বা পাঠক বলেন, “ ‘করতেছি’, ‘খাইসি’, ‘আইসে’ প্রভৃতিরূপে বলাটা সংগত নয়। ‘পরিক্ষা’, ‘ছাত্রি’, ‘বলসে’ প্রভৃতিরূপে লেখাটা সমীচীন নয়। এসব অপ্রমিত-অসংগত।” ঋদ্ধ ব্যক্তি কখনো বলেন না, “ ‘করতেছি’, ‘খাইসি’, ‘আইসে’ প্রভৃতিরূপে বলাটা অশুদ্ধ। ‘পরিক্ষা’, ‘ছাত্রি’, ‘বলসে’ প্রভৃতিরূপে লেখাটা ভুল। এসব ক্ষমার অযোগ্য।” কারণ, ওভাবে বলা কিংবা লেখা হলেও পাঠক বা শ্রোতৃগণ মূল বক্তব্য বুঝে নিতে পারেন।
“রাস্তায় স্যারের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ছাফিয়া সালাম জানিয়ে কুশল বিনিময় করল, কিন্তু সাফা সালাম না-জানিয়েই হালহকিকত জানাল-জানল।”— ‘প্রমিত-অপ্রমিত’ বা ‘সংগত-অসংগত’-এর ব্যাপারটিও অনেকটা একইরকম। স্যারের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হলে সালাম বা নমস্কার জানিয়ে কথা শুরু করাটা সমাজের তৈরিকৃত রীতি, তাই ছাফিয়ার আচরণ প্রমিত, সংগত৷ অপরদিকে, সালাম বা নমস্কার না-জানিয়ে শুরু করাটা আমাদের সমাজের রীতিবিরোধী, তাই সাফার আচরণ অপ্রমিত, অসংগত; কিন্তু অশুদ্ধ কখনো নয়। মোদ্দা কথায় যা বলতে চাইছি— ভাষার ক্ষেত্রে ‘শুদ্ধ-অশুদ্ধ’ রীতিতে নয়, ‘প্রমিত-অপ্রমিত’ কিংবা ‘সংগত-অসংগত’ রীতিতে বক্তা বা লেখকের বক্তব্য মূল্যায়ন করতে হয়। এবার শুরুর প্রসঙ্গে ফিরে যাচ্ছি—
বাংলা ভাষায় ক্রিয়াপদের রূপ সাধু রীতির ওপর নির্ভরশীল। চলিত রীতিতে কাল ও পুরুষভেদে (মহিলাভেদে হলেও সমস্যা নেই!) কোনো ধাতুর বিভিন্ন রূপ কীরকম হবে, তা একই কাল ও পুরুষভেদে নির্ণিত সাধু রূপের ওপরই নির্ভরশীল। অর্থাৎ, বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ক্রিয়াপদের সাধু রূপ থেকেই চলিত রূপের সৃষ্টি। আর, কোনো ক্রিয়াপদের সাধু রূপ থেকে চলিত রূপ লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হচ্ছে— চলিত রীতিতে ক্রিয়াপদের শেষে তখনই ‘ও’ বা ‘ও-কার’ হবে, যদি ওই ক্রিয়াপদের সাধু রূপের অন্ত্যেও ‘ও’ বা ‘ও-কার’ থাকে। সাধু রূপের অন্ত্যে ‘ও’ বা ‘ও-কার’ না-থাকলে চলিত রূপেও থাকবে না। কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি:
সাধু — চলিত
থাকিও (থাকিয়ো) > থেকো;
করিও (করিয়ো) > করো/কোরো;
মারিও > মেরো;
উঠিও (উঠিয়ো) > উঠো;
লিখিও (লিখিয়ো) > লিখো;
শুইও (শুইয়ো) > শুয়ো;
বুঝানো > বোঝানো;
শিখানো > শেখানো;
উঠানো > ওঠানো;
পড়িব > পড়ব;
যাইব > যাব;
গাহিল > গাইল;
দেখিল > দেখল;
শুনিত > শুনত;
থাকিত > থাকত;
মরিল > মরল।
একইভাবে,
হইল > হল;
হইত > হত;
তুমি তাহাকে জান > তুমি তাকে জান;
তোমরা তাহার কাজ কর > তোমরা তার কাজ কর।
অর্থাৎ, ব্যাকরণের নিয়মে ‘হলো’, ‘হতো’, ‘জানো’, ‘করো’ প্রভৃতি রূপ অন্ত্যে ও-কার ছাড়া ‘হল’, ‘হত’, ‘জান’, ‘কর’ প্রভৃতিরূপে লেখাটাই সংগত। কিন্তু অস্বস্তির ব্যাপার হচ্ছে, আলোচ্য রূপগুলোর বানান অন্ত্যে ‘ও-কার’ ছাড়া লিখলে উচ্চারণে বিভ্রান্তি ছাড়াতে পারে। আর, কোনো কারণে পাঠক যদি ওই শব্দগুলোর উচ্চারণের সময় অন্ত্যধ্বনি হলন্তরূপে পড়েন, তাহলে অর্থ একেবারেই বদলে যাবে। তখন বাংলার ‘হল’ হয়ে যাবে ইংরেজির ‘hall’, ‘কর’ হয়ে যাবে ‘tax’, ‘জান’ হয়ে যাবে ‘darling’ বা ‘life’। পাঠকের বিভ্রান্তিতে ‘হত’ হয়ে যেতে পারে আহত। তাই, শব্দের অন্ত্যে /ও/ উচ্চারণের কারণে সৃষ্ট এই বিভ্রান্তি এড়াতে বাংলা একাডেমি একটি পথ বাতলে দিয়েছে এবং সেটি হচ্ছে— যেসকল শব্দের ক্ষেত্রে ‘অন্ত্য-অ’-এর সংবৃত আর হলন্ত উচ্চারণের কারণে অর্থ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা থাকে, সেসকল শব্দের বানান অন্ত্যে ‘ও-কার’ দিয়ে লেখা যেতে পারে।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলেও সত্যি যে, বাংলা একাডেমির সর্বশেষ ( ? ) সংস্করণ ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ কিছু শব্দের বানানে এই ‘পারে’ মন্তব্যটি চূড়ান্তরূপে গ্রহণ করে ফেলেছে এবং ক্রিয়াপদ হিসেবে কেবল ‘হলো’, ‘হতো’, ‘শুলো’, ‘জানো’ প্রভৃতি রূপ প্রমিত হিসেবে উল্লেখ করেছে। যেহেতু বর্তমানে বাংলা একাডেমিই আমাদের কর্তারূপে প্রমিত রূপ নির্ধারণের দায়িত্বে নিয়োজিত, সেহেতু তাদের রায় মেনে এখন থেকে ‘হলো’, ‘হতো’, ‘জানো’, ‘করো’ প্রভৃতিরূপে লেখাটাই প্রমিত-সংগত। তবে কেউই ‘হল’, ‘হত’, ‘জান’, ‘কর’ প্রভৃতি বানান এভাবে লিখছেন মানে এই নয় যে, তিনি ভুল লিখছেন। কোনো বাংলাদেশি আলোচ্য বানানগুলো অন্ত্যে ‘ও-কার’ ছাড়া লিখলে কেবল এটুকু বলা যাবে— তিনি উৎকৃষ্ট রূপটি বা রূপসমূহ ব্যবহার করছেন না।
< এবি ছিদ্দিক
[ জ্ঞাতব্য: ১. ‘হতো’ আর ‘হত’— উভয় শব্দের উচ্চারণেই ‘অন্ত্য-অ’ সংবৃতরূপে (/ও/) উচ্চারিত হয়। তবে ‘হতো’-এর উচ্চারণে ‘আদ্য-অ’-এর উচ্চারণও সংবৃত। অর্থাৎ,
হত = /হতো/;
হতো = /হোতো/। ] (২৩শে এপ্রিল, ২০২০)
ক্রমশ
বিশেষণ নির্ণয়ের কৌশল

Language
error: Content is protected !!