এবি ছিদ্দিক-এর শুবাচ পোস্ট সমগ্র যযাতি সমগ্র শুদ্ধ বানান চর্চা শুবাচ ব্যাকরণ বিবিধি

অবিদ্যা ২৪
 
‘অবিদ্যা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘অজ্ঞান’, ‘মায়া’, ‘প্রকৃতি’ ইত্যাদি। ইসলাম ধর্মে অবিদ্যা বলতে সকল ক্ষতিকারক জ্ঞান, ধারণা ও বাসনাকে বোঝালেও সনাতন ধর্মে অবিদ্যাকে পাঁচটি নামে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়।
 
সনাতন ধর্মের যুগাবতার শ্রী কৃষ্ণের বাণী অনুযায়ী, জ্ঞান বলতে মানশূন্যতা, দম্ভহীনতা, অহিংসা, সহিষ্ণুতা, সরলতা, গুরুর সেবা, আত্মসংযমী হওয়া, ইন্দ্রীয় বিষয়ককে প্রাধান্য না-দেওয়া; জন্ম-মৃত্যু, অসুখ-বিসুখ, বার্ধক্য ইত্যাদিকে নেতিবাচক হিসেবে গ্রহণ না-করা; স্ত্রী, সন্তান ও গৃহের প্রতি আসক্তি দমিয়ে রেখে ঈশ্বরের প্রতি মনোনিবেশ করা; অহংকার থেকে বিরত থাকা, অবাঞ্ছিত বস্তু লাভের বাসনায় মত্ত না-হওয়া ইত্যাদি বোঝায়। অপরদিকে, যে বিদ্যা মানুষকে আধ্যাত্মিক ও ঐশ্বরিক জ্ঞান দান করে না, তা-ই হচ্ছে অবিদ্যা। শান্তি, কল্যাণ, মুক্তি ও সম্প্রীতির মূল অন্তরায় হচ্ছে এই অবিদ্যা।
 
‘অবিদ্যা’ শব্দের বিভিন্ন অর্থের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘মায়া’। ‘মায়া’ হচ্ছে মূলত ঈশ্বরের ছায়া। কোনো মানুষের ছায়াকে যেমন তার শরীর থেকে পৃথক করা যায় না, তেমনি মায়াকেও ঈশ্বর থেকে আলাদা করা না। ছায়া হচ্ছে মানুষের প্রতিবিম্ব, যা তার সঙ্গে সঙ্গেই থাকে এবং দেখতে নির্দিষ্ট মানুষটির উলটো দেখায়। তাই, কোনো মানুষের ছায়া দেখে ঐ মানুষটিকে যথাযথভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ছায়ার মতো মায়াও একপ্রকার প্রতিবিম্ব। এই মায়া মানুষের জীবনধারায় আয়নার ময়লার মতো কাজ করে। ময়লা থাকলে যেমন আয়নাতে নিজের রূপ যথাযথভাবে দেখা যায় না, তেমনি মায়ায় আচ্ছন্ন ব্যক্তিও ঈশ্বরের প্রকৃত রূপ দেখতে পায় না। সনাতন ধর্ম মতে এই মায়া বা অবিদ্যা পাঁচ প্রকার। যথা:  তম, মোহ, মহামোহ, তামিস্র ও অন্ধতামিস্র। নিচে এই পাঁচ প্রকার অবিদ্যা অতি সংক্ষেপে উল্লেখ করছি:
 
১. তম: ‘তম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘অহংকার’, ‘পাপ’, ‘অন্ধকার’ ইত্যাদি। ‘সত্ত্ব’, ‘রজঃ’ ও ‘তমঃ’; এ তিনটি প্রকৃতিজাত গুণের মধ্যে ‘তম’ সবচেয়ে নিকৃষ্ট। তম হচ্ছে নিজের অল্পজ্ঞান নিয়ে অহংকার করা, অন্ধ-কুসংস্কারে ডুবে থাকা। এছাড়া ‘তম’ গুণসম্পন্ন ব্যক্তি ভ্রান্তি, বিমূঢ়তা, আলস্য ও নিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকে। তাই, তারা কখনোই ঈশ্বরকে জানতে পারে না। আর যারা ঈশ্বরকে জানতে পারে না, নিজের আত্মাকে ঈশ্বরের সমীপে সমর্পণ করতে পারে না; তাদের দ্বারা সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধিত হওয়ার উদাহরণ অতি বিরল।
 
২. মোহ: ‘মোহ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘বিবেচনাহীন আকর্ষণ’, ‘মুগ্ধতা’, ‘ভ্রান্তি’, ‘মায়া’, ‘অজ্ঞান’ ইত্যাদি। অবিদ্যার আলোচনায় প্রকৃতির যে-কোনো জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বা আসক্তির নামই হচ্ছে ‘মোহ’। যেমন: অনন্ত সুখ লাভের প্রতি আসক্তি। এই মোহের কারণে মানুষ তার আসল করণীয় থেকে দূরে সরে গিয়ে এবং ঈশ্বরকে ভুলে গিয়ে পার্থিব বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। ফলে মোহে আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যের মঙ্গলে নিজেকে সচেষ্ট রাখার অবকাশ পায় না।
 
৩. মহামোহ: কোনো সাংসারিক বিষয় বা জিনিসের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণই হচ্ছে ‘মহামোহ’। যেমন: নির্দিষ্ট কারও প্রেম লাভের বাসনা। এক্ষেত্রে ব্যক্তির প্রত্যাশিত জিনিসটি না-পাওয়া পর্যন্ত আসক্তি দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই অবিদ্যা মানুষকে একেবারেই আধ্যাত্বিক জ্ঞ্যানশূন্য করে দেয়। ফলে মানুষ ঈশ্বরকে ভুলে গিয়ে সাংসারিক ভাবনায় ডুবে যায়। আর যে ব্যক্তি কেবল সাংসারিক ভাবনায় মগ্ন থাকে, তার দ্বারা সাধারণ মানুষের কল্যাণ তো দূর, নিজ পরিবারের কল্যাণ সাধনও পূর্ণতা পায় না।
 
৪. তামিস্র: ‘তামিস্র’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘কৃষ্ণপক্ষ’, ‘ভোগ ইচ্ছার ব্যাঘাতজনিত ক্রোধ’, ‘নিশাচর’, ইত্যাদি। তবে অবিদ্যার ক্ষেত্রে, যে বিষয়ের কারণে ক্রোধ জন্মায়, তাকে তামিস্র বলে। সাধারণত অপরের ধন, স্ত্রী ও পুত্র হরণ করতে না-পারার কারণে বা নিজেরও অনুরূপ না-থাকার কারণে যে ক্রোধের সৃষ্টি হয়, সেটিই হচ্ছে ‘তামিস্র’। ‘তামিস্র’-এর কারণে মানুষ তার সুবোধ হারিয়ে ফেলে অন্যের প্রতি হিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। আবার, সনাতন ধর্ম মতে, ‘তামিস্র’ একটি নরকের নামও। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে যে, যে ব্যক্তি অপরের ধন, স্ত্রী ও পুত্র অপহরণ করে, অত্যন্ত ভয়ঙ্কর যমদূতেরা তাকে কালপাশে বেঁধে বলপূর্বক তামিস্র নরকে নিক্ষেপ করে। এই তামিস্র নরক অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সেখানে যমদূতের মাধ্যমে পাপীকে নিদারুণভাবে প্রহার করা হয়, উপোষে রাখা হয়, এমনকি সামান্য জল পর্যন্ত পান করতে দেওয়া হয় না।
 
৫. অন্ধতামিস্র: ‘অন্ধতামিস্র’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘ঘোর অন্ধকার’। এটি প্রায়ই ‘তামিস্র’-এর অনুরূপ। কোনো পতি(স্বামী)-কে বঞ্চনা করে তার স্ত্রী-পুত্র ভোগ করাই হচ্ছে ‘অন্ধতামিস্র’। ‘অন্ধতামিস্র’-তে আচ্ছন্ন ব্যক্তি এতই পরশ্রীকাতর হয় যে, ঈশ্বরের শাস্তির কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে সুখে বসবাসরত কোনো স্বামীর কাছে স্ত্রী ও পুত্রের(ঐ স্বামীর) নামে কুৎসা রটিয়ে পরিবারের মধ্যে ভাঙন ধরিয়ে দিয়ে ঐ স্ত্রী-পুত্রকে নিজের অধীনস্থ করে নিয়ে তাদের ভোগ করতে দুই বার ভাবে না। আবার, সনাতন ধর্মের শাস্ত্রানুসারে, ‘অন্ধতামিস্র’ একটি নরকের নামও, যা অত্যন্ত অন্ধকারে ঢাকা। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে যে, যে ব্যক্তি পতিকে বঞ্চনা করে তার স্ত্রী-পুত্র ভোগ করে, সে ব্যক্তি অন্ধতামিস্র নরকে পতিত হয়। পাপীকে ঐ নরকে নিক্ষেপ করার পূর্বে যমদূতেরা নানান প্রকার যন্ত্রণা জর্জরিত করে তোলে। এই যন্ত্রণার মাত্রা এতই বেশি হয় যে, এর ফলে পাপীর বুদ্ধি এবং দৃষ্টিশক্তি; দুটিই নষ্ট হয়ে যায়। (২৫শে জুলাই, ২০১৯)
 
সহায়তায়: শ্রীযুক্তা সায়েরী ঘটক
সহায়ক গ্রন্থ ও উৎস: ১. বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান;
 
২. বাঙ্গালা ভাষার অভিধান(শ্রীজ্ঞানেন্দ্র মোহন দাস);
৩. h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা।
ক্রমশ
প্রত্যয় বনাম বিভক্তি
 

Language
error: Content is protected !!