এবি ছিদ্দিক-এর শুবাচ পোস্ট সমগ্র যযাতি সমগ্র শুদ্ধ বানান চর্চা শুবাচ ব্যাকরণ বিবিধি

অবান্তর বনাম অপ্রাসঙ্গিক ৯৪
 
‘অব’ আর ‘অন্তর’ মিলে ‘অবান্তর’ শব্দটি গঠন করেছে। এখানে ‘অব’ মানে ‘গত’, এবং ‘অন্তর’ মানে ‘মধ্য’। তাহলে ‘অবান্তর’ শব্দের গঠনগত অর্থ দাঁড়ায়— যা কোনোকিছুর মধ্য থেকে গত হয়েছে। অর্থাৎ, যা মূল বিষয় অতিক্রম করে যায়, তাই (তা-ই) অবান্তর। ধরা যাক, কেউ একজন ‘দ্বেষ’ আর ‘বিদ্বেষ’ শব্দ দুটির আলোচনা করছেন। আলোচনার একপর্যায়ে তিনি নিজের আলোচনার বিষয় ছাড়িয়ে ‘ঈর্ষা’ আর ‘হিংসা’ পার্থক্য নিরূপণে লেগে গেলেন। ওই ব্যক্তি মূল বিষয় বা প্রসঙ্গ অতিক্রম করে এরূপ নতুন আরেকটি বিষয় বা প্রসঙ্গে চলে যাওয়াই হচ্ছে অবান্তর।
আবার, ‘প্রাসঙ্গিক’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘প্রসঙ্গ বা বিষয়সংক্রান্ত’। এই ‘প্রাসঙ্গিক’ শব্দটির শুরুতে নঞর্থক ‘অ’ যুক্ত হয়ে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ (ন+প্রাসঙ্গিক) শব্দটি গঠন করে। অর্থাৎ, নয় প্রাসঙ্গিক যা, বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন যা, তাই (তা-ই) হচ্ছে অপ্রাসঙ্গিক। আমরা কোনো প্রসঙ্গে বা বিষয়ে বলতে গিয়ে ওই প্রসঙ্গ বা বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নানান বিষয়ের অবতারণা করি। যেমন: বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে ঢাকা কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ টানি। কেননা, এগুলোও বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এগুলোর সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের যথেষ্ট সম্পর্ক রয়েছে বলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান নিয়ে আলোচনায় এসব প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে আনলে তা প্রসঙ্গের বাইরে চলে যায় না; অর্থাৎ, পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের আলোচনা প্রাসঙ্গিক। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান বোঝাতে অক্সফোর্ড কিংবা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে টেনে আনা অপ্রাসঙ্গিক। কারণ, বাংলাদেশ আর ওসব দেশের রীতিনীতি, ধ্যানধারণা, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামর্থ্য একেবারেই আলাদা। পলাশির যুদ্ধ নিয়ে লিখতে গিয়ে কুমিরের খাঁজকাটা লেজের বর্ণনা দেওয়ার গল্পটি অপ্রাসঙ্গিকতার সবচে সুন্দর উদাহরণগুলোর একটি।
কোনো বিষয়ের আলোচনায় অন্য আরেকটি বিষয়কে টেনে আনা অবান্তর হয়ে গেলেও অনেকসময় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না। যেমন: কোনো ব্যক্তি সম্প্রতি ‘গরু’ বানান ‘গোরু’ লেখার শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করছেন। তাহলে আলোচনার মূল প্রসঙ্গ বা বিষয় হচ্ছে ‘গোরু বানানের শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা’। ওই ব্যক্তি আলোচনার একপর্যায়ে ইদ, ইগল, মেডিক্যাল, ঝরনা, ধরন প্রভৃতি পরিবর্তিত বানানের শব্দ টেনে এনে সেগুলোর শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা নিয়েও যুক্তিতর্ক করলেন। তাঁর আলোচনায় এসব শব্দের প্রসঙ্গ টেনে আনা প্রাসঙ্গিক। কারণ, গোরুর মতো এসব শব্দের বানানের পরিবর্তন নিয়েও সম্প্রতি শোরগোল চলছে। কিন্তু তাঁর আলোচনায় এসব শব্দ টেনে আনা একেবারেই অবান্তর। কারণ, আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে ‘গোরু বানানের শুদ্ধতা কিংবা অশুদ্ধতা নিরূপণ করা’; অন্য কোন কোন শব্দের বানান পরিবর্তন করেছে, তা নয়।
এখানে একটি লক্ষ করবার মতো বিষয় হচ্ছে— অপ্রাসঙ্গিক মানেই অবান্তর, কিন্তু অবান্তর মানেই অপ্রাসঙ্গিক নয়। আলোচনা মূল বিষয়ের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক বিষয়ও অতিক্রম করে গেলে, তবেই অবান্তর আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক আলোচনায় রূপ নেয়। (১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২১)
ক্রমশ
ক্ষণ যে-কারণে মহেন্দ্র ও সরা হতে পারে না 

Language
error: Content is protected !!