ওমান (Oman) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

ওমান (Oman)

ওমান আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত একটি মুসলিম রাষ্ট্র। এটি মরুময়, যেখানে সুউচ্চ পর্বতমালার পাশে দেখা যায় উজ্জ্বল শুভ্র বালুর বিশাল সৈকত। এখানে সংখ্যালঘু মুসলমান ইবাদি গোত্রের লোকেরা বাস করে। এরা শিয়া ও সুন্নীদের চেয়ে স্বতন্ত্র। ১৭শ থেকে ১৯শ শতক পর্যন্ত ওমান একটি ঔপনিবেশিক শক্তি ছিল। ওমানের রাজা ‘সুলতান’ উপাধি ব্যবহার করেন এবং দেশটির সরকারি নাম ওমান সুলতানাত। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ওমানের পতাকা গৃহীত হয় এবং ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে তা পুনরায় গৃহীত হয়। পৃথিবীর যে কয়টি দেশে পতাকায় অস্ত্র খচিত রয়েছে তন্মধ্যে ওমানের পতাকা অন্যতম।

প্লিনি দ্যা এল্ডারের (Pliny the Elder‘s) ওমানা এবং টলেমির (Ptolemy) ওমানা (Omana) শব্দের সঙ্গে আধুনিক ‘ওমান’ নামের ব্যুৎপত্তিগত সংশ্লিটতা রয়েছে। দুটোই ছিল বিখ্যাত প্রাচীন অঞ্চল সোহার (Sohar) এর অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীকালে শব্দটি আমেন বা আমাউন (aamen or amoun) রূপে আরবিকরণ হয়ে যায়। এর অর্থ বসতিস্থাপনকারী লোকজন, যার বিপরীত শব্দ হচ্ছে বেদুঈন। আরবীয় বেদুঈন জীবনের পরিবর্তে অনেকে এখানে স্থায়ীভাবে নিবাস গড়ে তুলে। তাই এলাকাটির নাম করা হয় ওমান। অনেকে মনে করেন, ইয়েমেন উপাত্যাকা (valley in Yemen) হতে ওমান নামের উদ্ভব। পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসবেত্তাদের অন্যতম ইয়ালাইনাস (Yalainous) ২৩-৭৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। তিনি ওমান সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন।

ওমানের রাজধানী মাস্কাট। মাস্কাট গ্র্যাপ বা মাস্কাট আঙুর (Vitis vinifera) পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও মিষ্টি আঙুরের অন্যতম। উত্তম সকল আঙুর প্রজাতির তালিকায় এটির স্থান ছিল সবচেয়ে উপরে। ভূমধ্যসাগর ও আরব উপদ্বীপে এটি জন্মাত। বর্তমান ওমানের রাজধানী ছিল মাস্কাট আঙুরের উৎপাদন ও বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত। তাই অনেকে মনে করেন, মাস্কাট আঙুর (Muscat grape) হতে এলাকাটির নাম হয় মাস্কাট।

ওমানের মোট আয়তন ৩,৯০,৫০১ বর্গকিলোমিটার বা ১,১৯,৪৯৮ বর্গমাইল। দেশের অভ্যন্তরে কোনো জলভাগ নেই বললেই চলে। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে ওমানের মোট জনসংখ্যা ৩২,৮৬,৯৩৬ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটার লোকসংখ্যা ১৩ জন। আয়তন বিবেচনায় ওমান পৃথিবীর ৭০-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় ১২৯-তম। আবার জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ২১৬-তম জনবহুল দেশ। সরকারিভাবে ওমানের অধিবাসীগণ ওমানি নামে পরিচিত। জনসংখ্যার অধিকাংশ মুসলিম।

১৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে ওমান পর্তুগিজ হতে স্বাধীনতা লাভ করে। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে ওমানের জিডিপি (পিপিপি) ১৬৩.৬২৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৪৪,০৬২ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ৮০.৫৩৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে মাথাপিছু আয় ২১.৬৮৭ ইউএস ডলার। দেশটির মুদ্রার নাম রিয়াল।

ওমানের পশ্চিমে ইয়েমেন, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, পূর্বে আরব সাগর, উত্তরে ওমান উপসাগর অবস্থিত। ওমানের সবচেয়ে উত্তরের অংশ মুসান্দাম উপদ্বীপ হর্মুজ প্রণালীর দক্ষিণ তীর গঠন করেছে। পারস্য উপসাগরে ওমানের কয়েক কিলোমিটার তটরেখা আছে। ওমানের শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি এলাকা মরুভূমি, ১৫% পর্বত এবং মাত্র ৩% উপকূলীয় সমভূমি। বেশির ভাগ লোকালয় সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত।

ওমানে সুলতান হলেন একাধারে রাষ্ট্র ও সরকার-প্রধান। ওমানের সুলতানেরা বংশানুক্রমে ক্ষমতায় আসেন। বর্তমানে কাবুস ইবন সাইদ আস-সাইদ দেশটির সুলতান এবং তাঁকে সহায়তা করার জন্য একটি মন্ত্রিসভা আছে। আদর্শ আরবি ভাষা ওমানের সরকারি ভাষা। ওমানের আরবি ভাষীদের মধ্যে দ্বিভাষিকতা (diglossia) বিদ্যমান। আনুষ্ঠানিক ও সরকারি কর্মকা-ে কথ্য ও লিখিত ভাষা হিসাবে আদর্শ আরবি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তায় স্থানীয় আরবি উপভাষাগুলো বেশি ব্যবহৃত হয়।

ওমানে বহু বিদেশীর বাস। এখানকার ৩৫ লাখ লোকের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ওমানি নন, মূলত ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইরান থেকে আগত বিদেশি কর্মী। এই বিদেশিরা ওমানে ভাষাগত বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে আগত ওমানিদের অনেকে বালুচি ভাষায় কথা বলে। বিদেশ থেকে আগত নতুন কর্মীরা বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ও ফার্সি ভাষায় কথা বলেন। ইংরেজি ভাষা ওমানে সবচেয়ে বেশি শেখান বিদেশি ভাষা। মাধ্যমিক স্তর-পরবর্তী সব লেখাপড়া ইংরেজি মাধ্যমে করা হয়।

ওমানে নানবিধ কোমল পানীয় বিভিন্ন দোকানে বা হোটেলে সহজলভ্য হলেও কোকাকোলা কোথাও বিক্রি হয় না বললেই চলে। এর কোনো কারণ নেই। সবচেয়ে বেশি চলে লেমন ডিও। লেমন ডিওকেওমানি বিয়ার বলে থাকেন। ওমানে কাউকে অ্যালকোহল পান করতে পুলিশ থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। লাইসেন্স ফি মাসিক আয়ের ১০%। পৃথিবীতে কেবল ওমানেই ব্যতিক্রমী একটি শপিং সেন্টার রয়েছে, যার নাম উইমেন-অনলি সৌক (women-only souq)। এটি সৌক নামে সমধিক পরিচিত। এ মার্কেটে কেবল মহিলা প্রবেশ করতে পারে। পুরুষদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মার্কেটের কেনাকাটাসহ সব কাজ কেবল মহিলারাই করে থাকে।

ফ্রাঙ্কিনসেন্স বৃক্ষ (Frankincense trees) ওমানের একটি অসাধারণ বৃক্ষ। এর চাষ করা হয় না, বনেই এটি জন্মে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং পারফিউম শিল্পসহ আরও নানাবিধ কাজে গাছটির ব্যবহার রয়েছে। গাছটির প্রবল ওষধি গুণ রয়েছে। ওমানিদের কাছে এটি শুধু বৃক্ষ নয়, তাদের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি, ইতিহাস, সমাজ ও ভৌগোলিক ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।

ওমান আরব বিশ্বের প্রাচীনতম রাষ্ট্র। ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দ হতে আল-সাঈদ পরিবার এটি শাসন করে আসছেন। ওমানের নাগরিকেরা অমায়িক, বন্ধুবৎসল, অতিথিপরায়ণ এবং খোলামেলা। নাগরিকদের সারল্য ওমানের সবচেয়ে সুন্দর বিষয়। এমন সারল্য পৃথিবীর আর কোনো দেশের মানুষে দেখা যায় না। ওমানে সাপ্তাহিক ছুটি বৃহস্পতি বার ও শুক্রবার। তবে এটি পরবর্তন করে শুক্র ও শনিবার করার প্রস্তাব রয়েছে।

ওমানের প্রায় সব স্থাপনাই সাদা। স্থাপনায় সাদা রঙ করাতে কোনো অনুমতি লাগে না। তবে অন্যান্য রঙ দ্বারা রঞ্জিত করতে হলে সরকারের বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন। ওমানে সবুজ ও লাল রঙ ইসলাম এবং রাজকীয়তার চিহ্ন। ওমানিদের ঘরের দরজা বিচিত্র পটে অঙ্কিত। অতি গরীবের ঘরের দরজাতেও নানা আল্পনার অঙ্কন দেখা যায়। ওমান খেজুর উৎপাদনে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কয়েকটি দেশের অন্যতম। এখঅনে প্রায় ৮ মিলিয়ন খেজুর গাছ রয়েছে। কফির সঙ্গে শুকনা খেজুর পরিবেশন ওমানি ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আরব বিশ্বে ওমানই প্রাচীনতম স্বাধীন দেশ। এখানে কোনো অপরাধ নেই বললেই চলে। ছোট দেশ হলেও এখানে শত শত বিলাসবহুল হোটেল রয়েছে। গ্র্যান্ড হায়াত মাস্কাট ওমানের সবচেয়ে বিলাশবহুল হোটেল। শীতকালই ওমান ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। ওমানে কোনের আয়কর নেই। কাউকে ব্যক্তিগত আয়কর দিতে হয় না। মধ্যপ্রাচ্যে কেবল ওমানে বিখ্যাত আরবি ঘোড়া উৎপাদিত হয়।

লাও (Laos) : ইতিহাস ও নামকরণ

লেবানন (Lebanon) : ইতিহাস ও নামকরণ

নেপাল (Nepal) : ইতিহাস ও নামকরণ

নর্থ কোরিয়া ( North Korea) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!