রবীন্দ্রনাথের পাদ, গোরু বলদ: বাবা আমার বর

ড. মোহাম্মদ আমীন
“বাবা কচু খেতে যাবে।” বাক্যের অর্থ  কী? 
আমার প্রশ্নের উত্তরে মৌটুসকি মুচকি হেসে মউ মউ করে বলল, “বাবা কচু চাষের জমিতে যাবে।” এখানে খেতে অর্থ: ক্ষেত্রে।

আমি বললাম, ঠিক বলেছ মেয়ে। খেত থেকে খেতে (খেত+এ)। এখানে খেত পদের অর্থ: চাষের জমি, শস্য উৎপাদনের মাঠ। বাক্যে সাধারণত বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত খেত

ড. মোহাম্মদ আমীন

শব্দটি সংস্কৃত ক্ষেত্র হতে বাংলায় এসেছে। এর উচ্চারণ: খেত্‌। এটি খাঁটি বাংলা শব্দ। অনেকে ক্ষেত লিখে থাকে। প্রমিত বাংলা বানানবিধি অনুযায়ী ক্ষেত শুদ্ধ নয়। কারণ, এটি অতৎসম শব্দ। অতৎসম শব্দের বানানে সাধারণত ক্ষ(ক্‌+ষ) বিধেয় নয়।

বইয়ে পড়েছি ‘খেত’  তদ্ভব শব্দ।
তদ্ভব শব্দের অপর নাম খাঁটি বাংলা শব্দ। যেটি তদ্ভব শব্দ সেটিই খাঁটি বাংলা শব্দ। তদ্ভব জন্মনাম আর ‘খাঁটি বাংলা’ কর্মনাম।
মৌটুসকি বলল, খেতে অর্থ: চাষের জমি। আবার খেতে অর্থ: খাওয়ার জন্য বা খাইতে। প্রথমটি বিশেষ্য এবং দ্বিতীয়টি ‘খায়’ ক্রিয়ার রূপবিশেষ। কেউ যদি বাক্যটির অর্থ: “বাবা কচু খাওয়ার জন্য যাবে।” এমন বুঝে থাকে, তো তাকে কী দোষ দেওয়া যাবে?
না, দোষ দেওয়া যাবে না। যে ব্যক্তি  অমন বুঝে সে একটা বরা। বরাকে দোষ দেওয়া ঠিক হবে না।
বরা মানে তো বরণ করা।
বরণ করা অর্থ দ্যোতিত বরা শব্দটি ক্রিয়াবিশেষণ। এটি সংস্কৃত বরণ থেকে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা শব্দ। বাংলায় আর একটি বরা আছে। তার অর্থ: শূকর।   শূকর বরাহ সংস্কৃত বরাহ থেকে উদ্ভূত একটি খাঁটি বাংলা শব্দ। বরাহ হলেন হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর অবতার। ভারতীয় পুরাণমতে, বরাহ অবতার নামে বিষ্ণু বন্য শূকরের রূপ ধারণ করেছিলেন।  বুঝেছ? 
জি, স্যার।
কী বুঝেছ?
“বাবা কচু খেতে যাবে।” কথার অর্থ যে  ব্যক্তি  “ কচুখাওয়ার জন্য যাবে” বুঝে, সে একটি শূকর। 
ঠিক বলেছ।
মৌটুসকি বলল, যদি কেউ  বলে: “আমি তোমাদের কচু/বেগুন/লাউ/আলু খেতে আসব।” এ দিয়ে আমি কী বুঝব? 
তুমি কী বুঝেছ?
সে আমাদের কচু/বেগুন/লাউ/আলু খেত দেখার জন্য আসবে। যে খেত অর্থ কচু চাষের ক্ষেত্র এবং যার উচ্চারণ খেত্‌।  
মনে রাখবে, মানুষ কচু বেগুন লাউ আলু খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে কারও বাড়িতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে না। ভাত, নাস্তা, চা-পানি খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। তবু যদি কেউ  ‘এসব সবজি-আনাজ খেতে আসা’ বাক্যের মাধ্যমে লাউ খাওয়ার জন্য আসার আগ্রহ প্রকাশ বুঝিয়ে থাকে ধরে নিতে হবে যে বলেছে সে একটা গোরু বলদ, নতুবা যে ওই রূপ অর্থ বুঝেছে সে একটা অজ।
শুধু বাংলায় নয়, পৃথিবীর প্রত্যেক  ভাষায় একই শব্দের একাধিক অর্থ আছে। বাংলায় তিন লাখ শব্দের কয়টি সমার্থক শব্দ আছে জানো?
কয়টি?
ত্রিশ লাখ।
গড়ে প্রতিশব্দের জন্য দশটি ?
হ্যাঁ।
 ‘বর’ অর্থ: স্বামী আবার ‘বর’ অর্থ: আশীর্বাদকারও কন্যা যদি তার বাবাকে বলে, ‘আমার বাবা আমার বর।” তাহলে তুমি কী বুঝবে?
মৌটুসকি  বলল,  অতি সাধারণ জ্ঞানের অধিকারী বাংলাভাষীও  বুঝে নিতে পারবে, বাক্যটির অর্থ: “আমার বাবা আমার আশীর্বাদ।”
কেউ যদি এই ‘বর’ শব্দের অর্থ: ‘স্বামী’ মনে করে বসে, তো কী হবে?
ধরে নিতে হবে সে একটা ‘বলদ’। 
একদম!
বলুন তো স্যার, এখানে বলদ মানে কোন বলদ?
‘বলদ’ শব্দের তিনটি মুখ্যার্থ— (১) গোরুবিশেষ, (২) আহম্মক এবং (৩) বলদায়ক । তুমি এখানে যে বলদের কথা বলছ সেটি গোরু বলদ নয়, আহম্মক বলদ।  ঠিক আছে?
জি, স্যার। তিন প্রকার বলদের বিবরণ দিন-না?
বাংলায় ‘বলদ’ তিন প্রকার। প্রথমটি খাঁটি বাংলা বলদ, দ্বিতীয়টি বাংলা বলদ এবং তৃতীয়টি সংস্কৃত বলদ। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত এবং সংস্কৃত ‘বলীবর্দ’  থেকে আগত খাাঁটি বাংলা  ‘বলদ’  অর্থ: ষাঁড়, বৃষ, যে ষাঁড়ের মুণ্ড ছিন্ন করা হয়েছে, যে গোরু হাল বা গাড়ি টানে, গোরুবিশেষ। দ্বিতীয়টি  বাংলা বলদ। এর অর্থ: নির্বোধ, আহম্মক, অপদার্থ। যা তোমার ম্যাম আমাকে প্রায় সময় ডাকে। তৃতীয় ‘বলদ’ সংস্কৃত হতে আগত তৎসম বলদ। সংস্কৃত (বল্+√দা+অ) অর্থ – বল দেয় এমন, বলদায়ক।  এর উচ্চারণ অবশ্য বলোদ্‌ নয়;  বলোদো। যেমন: জলদ, ফলদ।  বর অর্থ স্বামী আর পুত্র অর্থ পুরুষসন্তান।  এটি মনে করে যারা বরপুত্র অর্থ  স্বামীর সন্তান বুঝে তাদের  তুমি কী বলবে?
গণ্ডমূর্খ।
গণ্ড অর্থ কী? গাল।
তাহলে গণ্ডমূর্খ অর্থ কী হয়?
মূর্খ গাল।
কিন্তু গণ্ডমূর্খ অর্থ মূর্খ গাল নয়। এর অর্থ: আকাট মূর্খ, অত্যন্ত নির্বোধ।
মৌটুসকি?
স্যার?
পাগলশালা অর্থ কী?
শালা শব্দের তিনটি মুখ্যার্থ রয়েছে। প্রথমটি: বাড়ি, কারখানা, সঞ্চয়স্থান, গুদাম প্রভৃতি; দ্বিতীয়টি: স্ত্রীর ছোটো ভাই এবং তৃতীয়টি: গালিবিশেষ। পাগলশালা অর্থ: পাগলাগরদ। যেখানে পাগলদের রাখা হয় সেটাকে পাগলশাল বলা হয়। কেউ যদি  পাগলশালা অর্থে কারো ‘শালা’ একটা পাগল কিংবা গালি মনে করে বা শালার নাম পাগল বুঝে, তাহলে তাকে কী করতে হবে?
 পাগলশালায় পাঠিয়ে দিতে হবে।
ঠিক বলেছ।
 “নদী আপন বেগে পাগল পারা- – -” গানের পঙ্‌ক্তিটির ‘পারা’ শব্দের অর্থ কী?
এই পাদ রবীন্দ্রনাথের।
কী বলেন স্যার! এটি রবীন্দ্রনাথের পাদ হবে কেন?
তাহলে কার পাদ? তোমার তো না?
মৌটুসকি লজ্জায় ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে হাসল, স্যার, কী বলেন এসব!
 ‘পারা’ শব্দের পাঁচটি মুখ্য অর্থ রয়েছে— (১) সামর্থ্য (can), (২) পারদ, (৩) মতো, (৪) পবিত্র কোরআনের ত্রিশটি পরিচ্ছদের যে-কোনো একটি  এবং (৫) খণ্ড। “নদী আপন বেগে পাগল পারা—।” পাদে ‘পারা’ অর্থ: মতো। সুতরাং,  পাগল পারা অর্থ: পাগলের মতো। যদি কেউ এই ‘পারা’ শব্দের অর্থ: সামর্থ্য পারদ বা খণ্ড ধরে নেয় তাহলে তাকে ‘অজ’ ধরে নেওয়া যায়। আবার অজ শব্দের চারটি মুখ্য অর্থ— ছাগল, শিব, নিরেট (নিরেট মূর্খ)।
আপনি পাদে বললেন কেন?
 তো কী বলব?
পাদ অর্থ: পাদকর্ম আর পাদে অর্থ: তো পাদকর্ম করে।
তুমি একটা কূপমণ্ডূক।
“কূপ মানে কুয়া আর মণ্ডূক মানে ব্যাং।” মৌটুসকি মলিন মুখে বলল,  “আমি কুয়ার ব্যাং হতে যাব কেন? আমি তো আপনার মৌটুসকি। ”
দেখো মেয়ে, পাদ অর্থ: (১) পায়ুপথ দিয়ে নিঃসৃত বায়ু, (২) পাদকর্ম, (৩) পা, (৪) শিকড়, (৫) নিম্নভাগ (হিমালয়ের পাদদেশ), (৬) চার ভাগের এক ভাগ মানে চতুর্থাংশ, (৭) গানের পঙ্‌ক্তি এবং (৮) নামান্ত। কয়টি অর্থ হলো?
আটটি।
আরও আছে।
প্রভুপাদ প্রথম পাদ দেখেছেন, দ্বিতীয় পাদ, তৃতীয় পাদ এবং চতুর্থ পাদ এখনো দেখেননি। এখানে শেষের তিন পাদ অর্থ কী?
বুঝেছি। বাক্যের শেষের তিন পাদ অর্থ এক চতুর্থাংশ। 
রবীন্দ্রনাথের পাদ অর্থ কী?
রবীন্দ্রনাথের পাদের অর্থ গানের পঙ্‌ক্তি।
কেউ যদি মনে করেন এই পাদ অর্থ পায়ুপথ দিয়ে নিঃসৃত বায়ু, তাহলে রবীন্দ্রনাথের কী অবস্থা হবে?
প্রভুপাদ শব্দের অর্থ করে নিতে পারে: প্রভু পাদকর্ম করো।
অথচ প্রভুপাদ শব্দে বিদ্যমান পাদ  অর্থ সম্মানসূচক নামান্ত।
ধন্যবাদ, স্যার।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের অসংখ্য পাদ দিয়ে গেছেন।  এই কথাটির অর্থ কী হবে?
রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য  অসংখ্য পঙ্‌ক্তি রচনা করে গেছেন। 
ক্রমশ- – –
এরকম হাজার হাজার শব্দ আছে। এমন কোনো শব্দ নেই যা একাধিক অর্থ ধারণ করে না। তাই কেউ যদি ‘ঘরে চাল নেই’ কথার অর্থটি না বুঝতে পারে তাহলে তার সংসার করারই বা কী প্রয়োজন?
error: Content is protected !!