কবিতা ছড়া নাটক উপন্যাস ছোটোগল্প অণুগল্প প্রবন্ধ ভ্রমণকাহিনি ভাষণ স্মৃতিকথা

ড. মোহাম্মদ আমীন
১. কবিতা: ভাবপ্রধান রচনাকে কবিতা বলে।আদর্শ কবিতার জন্য ভাব, ভাষা, অর্থ, ছন্দ ও অলংকারের কুশলী সমন্বয় অপরিহার্য। অনেক কবিতায় শব্দ বা বাক্যের অর্থ নয়, বরং পুরো কবিতার ভাব দিয়ে শব্দার্থ বা বাক্যার্থকে অনুধাবন করতে হয়।

ড. মোহাম্মদ আমীন

কবিতা ব্যক্তির অভিজ্ঞতালব্ধ দর্শন থেকে উত্থিত বাণী। ব্যক্তি মনের দাগ যখন নিপুণ বিন্যাসে বাণীবদ্ধ হয় তখন সেই দাগটি কবিতা হয়ে ওঠে শব্দের বাগানে বাগানে মনোহর সজ্জায়।কবিতা হচ্ছে ছড়ার পরবর্তী সংস্করণ।

২. ছড়া: সাধারণভাবে স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত মুখে মুখে উচ্চারিত ঝংকারনিনাদ পদ্যই ছড়া।ছন্দ মেনে অন্ত্যমিল, সহজবোধ বিষয়, সাবলীল শব্দচয়ন, রসাত্মক পরিবেশন, আকর্ষণীয় সুর, নিবিড় শব্দের গ্রাহী সমন্বয় সাধনে সহজ-সরল বা শিশু মনোপযোগিতার অকৃত্রিম ভাব – ছড়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ছড়া দিয়ে ছন্দ শুরু।
৩. নাটক: সংলাপপ্রধান কাহিনিকে নাটক বলে। অভিনয় করার উদ্দেশ্যে নাটক রচিত হয়। তাই রচনার পূর্বে তাকে অভিনয়যোগ্য করে নিতে হয়। নাটকে সংলাপ ছাড়াও স্থান, সময় ও পরিবেশের বর্ণনা আবশ্যক।
৪. উপন্যাস: বর্ণনাপ্রধান বৃহৎ বা মাঝারি আকারের কাহিনিকে উপন্যাস বলে। উপন্যাস হচ্ছে গদ্যে লিখিত এমন একটি আকর্ষনীয় বিবরণ বা কাহিনি যেখানে প্রাত্যহিক জীবনযাপনের বাস্তবতা প্রকৃতি ও পরিবেশ-সহযোগে বস্তুনিষ্ট কিন্তু হার্দিক অভিজ্ঞতা মিশ্রিত কল্পনায় পরিবেশিত হয়। অষ্টাদশ শতাকে ইংল্যান্ডে প্রথম আধুনিক উপন্যাস রচিত হয়।
৫. ছোটোগল্প ও অণুগল্প: স্বল্প পরিসরে রচিত বর্ণনাপ্রধান খুদে কাহিনিকে ছোটোগল্প বলে। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে স্বল্প পরিসরে রচিত, কিন্তু আবশ্যিকভাবে  রূপকপ্রধান কাহিনিকে বলা হয় অণুগল্প। স্বল্প পরিসরে রচিত গল্পে রূপকের প্রাধান্য প্রবল হলে তা অণুগল্প হয়ে যায়। রূপকতা অণুগল্পের প্রধান ও অনিবার্য বৈশিষ্ট্য। এটি স্বল্প পরিসরে বাহুল্যহীন বর্ণনায় এমনভাবে রচিত হয় যা ভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্নার্থ দিতে পারে। সে অর্থে অণুগল্পে কবিতার ভাবচরিত্র পাওয়া যায়। অণুগল্পে লেখক কেবল উপমাটাই তুলে ধরেন, কিন্তু বোঝার দায় চাপিয়ে দেন পাঠকের কাঁধে।

ছোটোগল্প ও অণুগল্প: পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দুটি অণুগল্প: পৃথিবীর সবচেয়ে ছোটো গল্পটির লেখক মার্কিন সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (Ernest Hemingway)। গল্পটি মাত্র ৬টি শব্দে রচিত। দেখুন গল্পটি: For sale. Baby shoes. Never worn. অনুবাদ: বেচার জন্য শিশু জুতো, পরা হয়নি কখনো।

পৃথিবীর দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম অণুগল্পটির নাম ‘Knock’।লেখক মার্কিন গাল্পিক ফ্রেডরিক ব্রাউন (Fredric Brown )। অনেকে এটাকে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম ভৌতিক গল্পও বলে থাকেন। দেখুন গল্পটি: The last man on Earth sat alone in a room. There was a knock on the door…”। অনুবাদ: পৃথিবীর সর্বশেষ মানুষটি একা একটি রুমে বসে আছেন। আকস্মিক কে যেন ধাক্কা দিল দরজায় তার —।

৬. প্রবন্ধ: বিষয়, তত্ত্ব ও তথ্যপ্রধান রচনাকে প্রবন্ধ বলে। প্রবন্ধ হলো মূলত তথ্যভিত্তিক ও গবেষণাপ্রধান। যুক্তি ও বিশ্লেষণ প্রবন্ধের ভাবকে যৌক্তিক বর্ণনায় উপস্থাপন করে। তথ্য ও যুক্তির আলোকে বর্ণনার প্রকৃষ্ট বন্ধনই হচ্ছে প্রবন্ধ। তাই প্রবন্ধকে বিষয়ের যুক্তিপূর্ণ সংক্ষিপ্ত রচনা বলা হয়।
৭. ভ্রমণকাহিনি: ভ্রমণের কাহিনিকে ভ্রমণকাহিনি বলে। অন্যকথায় ভ্রমণপ্রধান কাহিনিকে ভ্রমণকাহিনি বলা হয়।লেখকের ভ্রমণ বিবরণই এর উপজীব্য। ভ্রমণকে কেন্দ্র করে এই কাহিনি রচিত হয়। লেখকের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে লব্ধ বিবিরণ ভ্রমণকাহিনির মূল উপজীব্য। ব্যক্তিগতভাবে ভ্রমণ না-করে কী ভ্রমণকাহিনি রচিত হতে পারে? এখন শারীরিকভাবে ভ্রমণ না করেও বিভিন্নভাবে স্থান সম্পর্কে ভ্রমণের ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা অর্জন করা যা।  সেসব অভিজ্ঞতার কহিনিও ভ্রমণ কাহিনি হতে পারে।
৮. ভাষণ: কোনো সভাসমিতি বা অনুষ্ঠানে বলার বা পঠনের জন্য রচিত রচনাকে ভাষণ বলে। ভাষণের পরিসর সাধারণত বৃহৎ হয় না।এটি নির্দিষ্ট সভাসমিতি বা অনুষ্ঠানকে উপজীব্য করে ভাষণ রচিত হয়। তবে কোনো কোনো ভাষণ সর্বজনীনতার কারণে সাহিত্যের মর্যাদায় উন্নীত হয়। যেমন: আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ-এর ভাষণ।

৯. স্মৃতিকথা: স্মৃতি থেকে অতীত ঘটনাকে উপজীব্য করে রচিত কথা বা রচনাকে স্মৃতিকথা বলে। স্মৃতিকথা ইতিহাসের উপজীব্য হতে পারে। তবে ইতিহাসের মতো স্মৃতিকথাতেও সংশ্লিষ্ট ঘটনা লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে উপস্থাপিত হয়। তাই স্মৃতিকথা  ইতিহাসের মতো বিতর্কিত এবং লেখকের বিবেচনা প্রাধান্য পায়। মানুুষ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে পারে না বলে স্মৃতিকথাও সাধারণত নিরপেক্ষ হয় না।
——————–
error: Content is protected !!