কর্মকর্তা ও কর্মচারী: অর্থ পার্থক্য বিভাজন এবং প্রয়োগ

ড. মোহাম্মদ আমীন

এই পেজের সংযোগ: https://draminbd.com/কর্মকর্তা-ও-কর্মচারী-অর্/

 
কর্মকর্তা (কর্মন্‌+√কৃ+তৃ) শব্দের মুখ্যার্থ ‘কর্মনির্বাহী’ ও ‘আধিকারিক’। কর্মচারী (কর্মন্ + √চর্+ই) শব্দের মুখ্যার্থ ‘বেতনভোগী কর্মী’ ও ‘নির্দিষ্ট কাজের জন্য নিয়োজিত ব্যক্তি’। উভয় শব্দ বিশেষণ এবং সংস্কৃতজাত। অবশ্য গৌণার্থে ‘কর্মকর্তা’ শব্দের অর্থ ‘প্রধান ব্যক্তি’ এবং ‘কর্মচারী; শব্দের অর্থ ‘আমলা’ নির্দেশ করা হয়েছে। গৌণার্থ-প্রয়োগ সাধারণ উপমায় আনা হয় না।ব্যুৎপত্তির মধ্যেও শব্দদুটোর পার্থক্য বেশ ভালোভাবে লক্ষণীয়। অতএব, শব্দ দুটোর আভিধানিক অর্থ যে অভিন্ন নয় তা সহজে অনুমেয়।
 
অবশ্য ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’ কিংবা ‘সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি’ বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনে ‘কর্মচারী’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে ‘কর্মকর্তা’ শব্দটি নেই, থাকা যৌক্তিকও নয়। কারণ বিচার্যক্ষেত্রে ‘পদ’ নয়, ‘আচরণ’ (চর্) দিয়ে পদাধিকারীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তাই আইনের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা ও কর্মচারী শব্দকে সরাসরি অভিন্ন দেখা যায়। এটি বৈচারিক বিষয়। মানুষ সাধারণ-প্রায়োগিক ক্ষেত্রে বৈচারিক শব্দকে গ্রাহ্য করে না।
 
আইনে যাই লেখা থাকুক না কেন, মানুষ সধারণত যে পরিচয়টা দিতে বেশি আগ্রহী ও গৌরব বোধ করেন সেটি ‘কর্মকর্তা’। কেউ সাধারণত নিজেকে কর্মচারী পরিচয় দিতে চান না। কারণ ‘কর্মকর্তা’ শব্দের সঙ্গে সমাজিক উচ্চ-মর্যাদা, অধিক সম্মান, মোটা বেতন, ক্ষমতা প্রভৃতি জড়িত। যা কর্মচারী শব্দে অনেক কম।সুতরাং মর্যাদা বিবেচনাতেও শব্দদুটোর পার্থক্য রয়েছে।
 
তবে ছোটোবেলায় বিনাবেতনে অধ্যয়নের অনুমতি প্রার্থনা করে প্রধান শিক্ষকের কাছে লেখা কাল্পনিক পত্রে বিনয়ের সঙ্গে লিখতাম, ‘আমার বাবা একজন গরিব কর্মচারী’। কাল্পনিক চিঠির ‘কর্মচারী’ শব্দটি ছিল বাবার কম বেতনের প্রমাণ উপস্থাপন করে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা। এখানেও কর্মচারী শব্দের সঙ্গে কিছুটা অমর্যাদা নিহিত।সুতরাং, কর্মচারী শব্দটি শুধু মর্যদার দিক থেকে পিছিয়ে নয়, বেতনের দিক থেকেও পিছিয়ে। তাই শাদিয়ে মোবারকের ক্ষেত্রেও ‘কর্মকর্তা’ শব্দটি পক্ষদ্বয়কে যত আকৃষ্ট করে ‘কর্মচারী’ শব্দটি তত আকৃষ্ট করে না।
 
‘কর্মকর্তা’ সাধারণত ‘কর্মচারী’ নয়। সচিবালয়ে আগে যে পদবিটা ছিল ‘পিএ (ব্যক্তিগত সহকারী)’ এখন তা ‘এও (প্রাশাসনিক কর্মকর্তা)’। আগে ছিল ‘তহশিলদার’, ‘সহকারী তহশিলদার; এখন তাঁরা ‘ইউনিয় ভূমি কর্মকর্তা ও ‘সহকারী ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা’। আন্দোলন করে তাঁরা নিজেদের পদে কর্মকর্তা লাগিয়েছেন। এতে ‘পিএ’ বা ‘তহশিলদার’দের বেতন না-বাড়লেও নাময়িক মর্যাদা বেড়েছে বলে তারা মনে করেন।
অতএব আইনে যা-ই থাকুক না কেন, অভিধান ও প্রায়োগিক বিবেচনায় কর্মকর্তা ও কর্মচারী শব্দের সম্পর্ক যথাক্রমে ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন- এর মতো। উচ্চপদে কর্মরতদের কর্মকর্তা এবং নিম্নপদে কর্মরতদের কর্মচারী বলা হয় । তাই শব্দদুটো ক্ষেত্রবিশেষে আপেক্ষিকও বটে।
 
 
 
ঊর্ণিষা অর্থ কী (Anuradha Paul)
অনুরাধা পাল যা লিখেছেন, ঊর্ণিষা=ঊর্ণ +ঈষা। স্বরসন্ধির নিয়মানুসারে শব্দটির বানান হওয়া উচিত ‘ঊর্ণেষ’।  যেমন গণেশ, ধর্মের ইত্যাদি। তবে শব্দ সর্বদা ব্যাকরণ মানে না। তাই এটি উর্ণিষা। সংস্কৃত “ঊর্ণ” শব্দের অর্থ বয়ন করা।  শব্দটি দিয়ে তন্তুও প্রকাশ করা হয়। এই জন্যই মাকড়সাকে ঊর্ণনাভ বলা হয়। সে হিসেবে ” ঊর্ণ” শব্দের একটি আলংকারিক ও প্রয়োগিক অর্থ সৃজনশীলতা। সংস্কৃত ঈষা শব্দের অর্থ আধার, পাত্র, ধারক। লাঙ্গলের ফলা প্রকাশেও  শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু “মনীষা” তে ‘ঈষা’ যেমন আধার অর্থে ব্যবহৃত হয়, ঊর্ণিষা শব্দেও তেমনি ঈষা শব্দটি আধার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সে হিসেবে, ‘ঊর্ণিষা’ অর্থসৃজনশীলতার আধার, সৃজনশীলতার ধারক। প্রশ্ন আসতে পারে এমন হলে বানানে হ্রস্বই না হয়ে দীর্ঘই হওয়া উচিত। অর্থাৎ ঊর্ণিষা না হয়ে উর্ণীষা হওয়া উচিত। কিন্তু বাংলা বানানের আধুনিক নিয়মে   অতৎসম শব্দে দীর্ঘই হয় না, তাই ঊর্ণিষা বানান ভুল নয়।
 
Language
error: Content is protected !!