কর্মপ্রবচনীয়: কর্ম প্রবচনীয় প্রবচন বচনীয় বচন অভিধার্থ অনুসর্গ অর্থ ব্যুৎপত্তি

খুরশেদ আহমেদ
সংযোগ: https://draminbd.com/কর্মপ্রবচনীয়-কর্ম-প্রবচ/

প্রথাগত বাংলা ব্যাকরণের পারিভাষিক সংস্কৃত শব্দ ‘কর্মপ্রবচনীয়’। শব্দটির অভিধার্থ কী? শব্দটি কত পুরোনো? একজন বাংলাভাষীর কাছে এর উপযোগিতা বা প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
১। ‘কর্মপ্রবচনীয়’ শব্দটির অভিধার্থ কী?
‘অনুসর্গ’-র বিকল্প বা সমান্তরাল পরিভাষা ‘কর্মপ্রবচনীয়’; অথবা, ‘কর্মপ্রবচনীয়’-এর বিকল্প বা সমান্তরাল পরিভাষা ‘অনুসর্গ’।
কিন্তু, আমাদের আজকের অনুসন্ধানযোগ্য বিষয় ‘কর্মপ্রবচনীয়’-এর বা ‘অনুসর্গ’-র সংজ্ঞার্থ (বা definition) নয়; বরং, একটি শব্দ হিসেবে ‘কর্মপ্রবচনীয়’ ব্যুৎপত্তিগতভাবে কী অর্থ প্রকাশ করে? ‘কর্মপ্রবচনীয়’-তে যে ‘কর্ম’ শব্দটি নিহিত আছে, ওই ‘কর্ম’ কী অর্থ প্রকাশ করছে সেখানে? ‘প্রবচনীয়’ মানে কী? ‘কর্মপ্রবচনীয়’ মানে কী?

২। ‘অনুসর্গ’ আমরা বরং সহজে বুঝি: অনুসর্গ এমন একটি শব্দ যা নামপদের (বিশেষ্য বা সর্বনামের) ‘অনু’-তে—অর্থাৎ পরে—বসে এবং সেখানে বসেই বাক্যে সে তার ব্যাকরণিক ভূমিকা পালন করে। ‘সর্গ’-এর একটি অর্থ ‘ত্যাগ’ বা ‘বিসর্জন’। আমরা কল্পনা করতে পারি, অনুসর্গ নামপদের পরে (বা পশ্চাতে) নিজেকে ত্যাগ করে বা বিসর্জন দেয় বা উৎসর্গ করে।

৩। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান  থেকে ‘অনুসর্গ’, ‘অনু’ ও ‘সর্গ’ ভুক্তি দেখে ‘অনুসর্গ’-র ব্যুৎপত্তিগত অর্থ সম্পর্কে যেটুকুই বোঝা গেল না কেন, ওই একই অভিধান থেকে ‘কর্মপ্রবচনীয়’, ‘কর্ম’, ‘প্রবচনীয়’, ‘প্রবচন’, ‘বচনীয়’ ও ‘বচন’ দেখে ‘কর্মপ্রবচনীয়’-এর সে-রকম অর্থ কিছুই বোঝা গেল না।

৪। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক ১৯৯৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকরূপে নির্ধারিত এবং  মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী রচিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৫, পুনর্মুদ্রণ ২০১৭) তার অষ্টম পরিচ্ছেদের নামের শুরুতেই লিখেছে ‘অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয়’, কিন্তু বইটি ‘অনুসর্গ’ বা ‘কর্মপ্রবচনীয়’-এর ব্যুৎপত্তিগত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি কোথাও।

৫। অশোক মুখোপাধ্যায়ের সংসদ ব্যাকরণ অভিধান [প্রথম প্রকাশ ১৯৮৯; পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ ২০০৫, দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০০৯; সাহিত্য সংসদ; কলকাতা] সংজ্ঞাগুলোর অর্থ-নিষ্কাশনের চেষ্টা না-করেই লিখেছে, অনুসর্গের “অন্য নাম কর্মপ্রবচনীয়, বা পরসর্গ বা সম্বন্ধীয়।”

৬। ভাষা সৌরভ তার ১৩ নম্বর পরিচ্ছেদের নাম লিখেছে ‘অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয়’; কিন্তু পুরো পরিচ্ছেদে কোথাও বলেনি ‘কর্মপ্রবচনীয়’-এর ব্যুৎপত্তি-নিষ্কাশিত অর্থ কী। এ-পরিচ্ছেদটি অনুসর্গের প্রয়োগ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছে। কৌতূহলজনক যে, ওই মন্তব্যে রবীন্দ্রনাথ ‘অনুসর্গ বা পরসর্গ’ পরিভাষা দুটি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু ‘কর্মপ্রবচনীয়’ পরিভাষাটি ব্যবহার করেননি।

৭। বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ [প্রথম প্রকাশ: মাঘ ১৪২০/জানুয়ারি ২০১৪] প্রধানত ব্যবহার করেছে ‘অনুসর্গ’; একটিমাত্র বার প্রসঙ্গত উল্লেখ করেছে ‘কর্মপ্রবচনীয়’: “বাংলা ভাষায় এক ধরনের সহায়ক শব্দ বাক্যে অন্য কোনো পদের পরে বসে পদটিকে বাক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করে কিংবা বিভক্তির মতো কাজ করে। এগুলি অনুসর্গ (post position) নামে পরিচিত। এদের পরসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয়ও বলা হয়ে থাকে।” এখানেও নেই ‘কর্মপ্রবচনীয়’-এর ব্যুৎপত্তি-নিষ্কাশিত অর্থ।

৮। জ্যোতিভূষণ চাকী তাঁর বাংলা ভাষার ব্যাকরণ [প্রথম প্রকাশ ১৯৯৬, তৃতীয় মুদ্রণ ২০১৩] বইটিতে ‘কারক-বিভক্তি-অনুসর্গ’ পরিচ্ছেদে ‘অনুসর্গ’ পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন; কিন্তু ওই বইটিতে তিনি আদৌ উল্লেখ করেননি ‘কর্মপ্রবচনীয়’।

৯। বাংলা একাডেমী সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান [প্রথম প্রকাশ সেপ্টেম্বর ১৯৯২]  লিখেছে, কর্মপ্রবচনীয় ‘অব্যয় শব্দ’, ‘কারক-বিভক্তির কাজ করে’, ‘কারক-অব্যয়’।

১০। রাজশেখর বসুর চলন্তিকা বলেছে, ‘কর্মপ্রবচনীয়’ ‘অব্যয়’, ‘বাক্যের পদে বিভক্তির কাজ করে’।

১১। ১৮৮৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত বৃহৎ সচিত্র প্রকৃতিবোধ অভিধান বলেছে, ‘প্রবচনীয়’ মানে ‘প্রকৃষ্টরূপে বাচ্য’।

১২। সুবল চন্দ্র মিত্রের সরল বাঙ্গালা অভিধান (অষ্টম সংস্করণ, এপ্রিল ১৯৬০) ‘কর্মপ্রবচনীয়’-এর ব্যুৎপত্তি নির্দেশ করেছে এভাবে: “কর্মন্‌—প্র—বচ্‌+অনীয় করণ অতীতে।” এই ব্যুৎপত্তিতে কৌতূহল-উদ্দীপক ও তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ‘+অনীয় করণ অতীতে’।

১৩। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ [দ্বিতীয় খণ্ড, প-হ, প্রথম প্রকাশ ১৩৪০-৫৩, ১৯৪৬] বলেছে, ‘প্রবচনীয়’ মানে: “১ প্রকৃষ্টভাবে কথনীয়, অর্থানুসন্ধানপূর্ব্বক বাচ্য বা ব্যাখ্যেয়। … ২ … প্রবক্তা, ব্যাখ্যাতা। … ৩ [+অনীয়-ক, ভূতে বাহুলকে (বালমনোরমা)] প্রোক্তবান্‌। “কর্ম্মপ্রবচনীয়াঃ পা ১.৪.৮৩।” লক্ষ করে থাকবেন, ‘কর্ম্মপ্রবচনীয়াঃ’ শব্দটির প্রসঙ্গে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় [খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের] পাণিনির রেফারেন্স দিয়েছেন।

১৪। শ্রীনগেন্দ্রনাথ বসু সংকলিত বিশ্বকোষ তৃতীয় খণ্ড (১২৯৯ সাল) লিখেছে, “কর্ম্মপ্রবচনীয় … কর্ম্ম প্রোক্তবান্‌, কর্ম্মন্‌-প্রবচ-অনীয়র্‌। পাণিনি ব্যাকরণোক্ত সংজ্ঞাবিশেষ; (কর্ম্ম প্রবচনীয়াঃ। পা ১।৪।৮৩)।”

১৫। হুমায়ুন আজাদ তাঁর বাক্যতত্ত্বে লিখেছেন: “যাস্ক শনাক্ত করেছিলেন চার রকম পদ: নাম (বিশেষ্য), অখ্যাত [যদ্দৃষ্ট; (আখ্যাত)] (ক্রিয়া), উপসর্গ, ও নিপাত। … কেউ কেউ যাস্কের ‘চত্বারি পদজাতানি’র সাথে ‘কর্মপ্রবচনীয়’ নামক একটি নতুন পদ যুক্ত ক’রে পাঁচ প্রকারের পদ নির্দেশ করেছেন।”

১৬। Technical Terms and Technique of Sanskrit Grammar  [Khitish Chandra Chatterji; Kolkata; First Reprint Edition 2003] লিখেছে: ক) “Karmapravacaniya is probably the longest technical term in Sanskrit grammar. It is evidently derived from “karmapravacana” with the secondary suffix cha (-iya) and means literally “concerned with the setting forth of an action”. Acc. to Indian grammarians it means ‘that which spoke of an action’ (karma i.e. kriyam proktavantah. Bahulakat bhute kartari aniyar). This probably means that which one [sic; (once)] referred to actions but now governs substantives. This agrees fully with the views of modern philologists.” এবং

খ) “Like many other technical terms of Panini “karmapravacaniya” is found in the Pratisakhyas of the Atharva Veda.”
সুতরাং, ‘কর্মপ্রবচনীয়’ শব্দটি অন্তত অথর্ব বেদের প্রতিশাখ্যর সমান প্রাচীন, অর্থাৎ, অন্তত তিন হাজার বছর পুরোনো!

১৭। A Dictionary of Sanskrit Grammar by Mahamahopadhyaya Kashinath Vasudev Abhyankar [https://bit.ly/306BBxl] [Oriental Institute, Boroda; Third Edition (Reprint) : 1986] লিখেছে: কর্মপ্রবচনীয় “a technical term used in connection with a preposition which showed a verbal activity formerly, although for the present time it does not show it; …”।
লক্ষ করে থাকবেন, কর্মপ্রবচনীয় ‘showed a verbal activity formerly’। তো, এখন ‘কর্মপ্রবচনীয়’ কোন ‘কর্ম’-টি আমাদেরকে প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাপন করে?

১৮। srimanchatterjee.blogspot.com ৩ জানুয়ারি ২০১৯ তার ব্লগে লিখেছে: “কর্মপ্রবচনীয়বিষয়ক পাণিনির অধিকার সূত্রটি হল-“কর্মপ্রবচনীয়াঃ” (১-৪-৮৩)। … কর্মপ্রবচনীয় শব্দে ‘কর্ম (ক্রিয়াং) প্রোক্তবন্তঃ’ -এই অর্থে … অতীতকালে কর্ত্রর্থে অনীয়র্ প্রত্যয় হয়েছে। সুতরাং তাৎপর্য হল অতীত কালে ক্রিয়াকে প্রকাশ করত, কিন্তু বর্তমানে কোনো ক্রিয়াকে প্রকাশ করছে না। তবে সম্বন্ধের ভেদ অবশ্যই প্রকাশ করে। প্র, পরা প্রভৃতি ২০টি দ্যোতক অব্যয় (যার কোনো নিজস্ব অর্থ নেই, কোন শব্দ বা ধাতুর সাথে মিলিত হয়ে যা বিশেষ বিশেষ অর্থের দ্যোতনা করে, তা দ্যোতক অব্যয়) ক্রিয়ার সাথে যুক্ত হলে “উপসর্গাঃ ক্রিয়াযোগে” (১-৪-৫৯) এবং “গতিশ্চ” (১-৪-৬০) সূত্রানুসারে যথাক্রমে উপসর্গ অথবা গতি সংজ্ঞা প্রাপ্ত হয়। যে সকল প্র, পরা প্রভৃতি অব্যয় ধাতুর সঙ্গে ব্যবহৃত না হয়ে স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহৃত হয়ে বিশেষ্যকে নিয়ন্ত্রিত করে তাদেরকে কর্মপ্রবচনীয় বলে। গতি ও উপসর্গ সংজ্ঞার বাধ করাই এই সংজ্ঞার উদ্দেশ্য। ভর্তৃহরি তাঁর বাক্যপদীয় গ্রন্থে কর্মপ্রবচনীয়ের স্বরূপ বলেছেন–
‘ক্রিয়ায়া দ্যোতকো নায়ং সম্বন্ধস্য ন বাচকঃ।
নাপি ক্রিয়াপদাক্ষেপী সম্বন্ধস্য তু ভেদকঃ।।’
“ক্রিয়ার দ্যোতক নয়, সম্বন্ধের বাচক নয় এবং কোনো ক্রিয়াপদকে আক্ষিপ্ত করে না অর্থাৎ টেনে আনে না, সম্বন্ধের ভেদক (বিশেষণ) মাত্র অর্থাৎ সম্বন্ধকে বিশেষিত করে।”

১৯। ‘কর্মপ্রবচনীয়’-এর নিহিতার্থ যদি হয় “অতীত কালে ক্রিয়াকে প্রকাশ করত, কিন্তু বর্তমানে কোনো ক্রিয়াকে প্রকাশ করছে না”, তাহলে, সংস্কৃত ভাষা ও ব্যাকরণের জন্য ‘কর্মপ্রবচনীয়’-এর যত প্রত্নমূল্যই থাকুক না কেন, একবিংশ শতাব্দের বাংলা ব্যাকরণে ‘অনুসর্গ’ বোঝাতে আরেকটি পারিভাষিক শব্দ ‘কর্মপ্রবচনীয়’-কে—শিক্ষার্থীদের জন্য শব্দটির কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া—পাঠ্য বইয়ে ধরে রাখা ও তা নিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে প্রশ্ন করা বাংলা ভাষা ও বাংলা শিক্ষার্থীদের প্রতি একটা জুলুম ছাড়া আর কিছু নয়!

২০। মাতৃভাষা বাংলার একজন শৌখিন ছাত্র হিসেবে, ‘কর্মপ্রবচনীয়’ নিয়ে আমার এটুকু পড়াশোনার পর, আমার মনে হয়েছে, সংস্কৃত-না-জানা আমার জন্য ‘কর্মপ্রবচনীয়’-এর ইতিহাস বা ব্যুৎপত্তিগত অর্থ না-জানাটা আমার জন্য বা এমনকি বাংলা ভাষার জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর কিছু নয়।

২১। আমার আরও মনে হয়েছে, যে-পরিভাষা তার আজকের পারিভাষিক অর্থ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোনোভাবেই জ্ঞাপন করে না, বরং যেখানে তার বিপরীতে সরাসরি অর্থ-প্রকাশক পরিভাষা রয়েছে, যেমন ‘কর্মপ্রবচনীয়’-এর বিপরীতে ‘অনুসর্গ’, সেখানে সে-পরিভাষা এখন আমাদের স্কুল-কলেজের পাঠ্য ব্যাকরণ বই থেকে যত তাড়াতাড়ি দূর করা যাবে, আমাদের জন্য তত মঙ্গল হবে।

২২। শিক্ষার্থীদের কাছে বাংলা ভাষা কেন কঠিন মনে হয় তার একটা জাজ্বল্যমান উদাহরণ এ-পোস্টে আমাদের আলোচিত এবং বহুকাল আগে জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও প্রথাগত ব্যাকরণে এখনও বিরাজমান এই ‘কর্মপ্রবচনীয়’ পরিভাষাটি।

প্রিয় শুবাচি, আপনার প্রবচনতুল্য ধৈর্য ও মনোযোগের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা!

 শুবাচে প্রকাশ: ১৮ই জানুয়ারি, ২০২০ 

 
 
কিছু প্রয়োজনীয় সংযোগ
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
 
— — — — — — — — — — — — — — — — —
প্রতিদিন খসড়া
আমাদের টেপাভুল: অনবধানতায়
— — — — — — — — — — — — — — — — —
Spelling and Pronunciation
 
 
 
 
error: Content is protected !!