কাক: বাংলা অভিধানে কাক: বাংলা শব্দে কাক: বাংলা শব্দে কাকের অবদান

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/কাক-বাংলা-অভিধানে-কাক-বাং/
কাক: তৎসম/সংস্কৃত কাক (√কৈ+ক) অর্থ (বিশেষ্যে)— লম্বা চঞ্চু ও কর্কশস্বরবিশিষ্ট কালো রঙের বড়ো পাখিবিশেষ। নিজের ডিম ভেবে কোকিলের ডিমে তা দেয় বলে এই পাখিটাকে পরভৃৎ ও পরপোষকও বলা হয়; বায়স। ইংরেজি নাম crow.
কাকচক্ষু:  কাকের চোখ অত্যন্ত স্বচ্ছ, নির্মল ও সুন্দর। তাই  কাকের চক্ষু নিয়ে গঠিত হয়েছে কাকচক্ষু। কাক ও চক্ষু মিলে কাকচক্ষু।  এর শাব্দিক অর্থ কাকের চোখ। কিন্তু প্রায়োগিক ও আলংকারিক অর্থ কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ ও নির্মল। (সে যেন গো কাকচক্ষু স্বচ্ছ দিঘিজল- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।)
কাকজ্যোৎস্না: কাক ও জ্যোৎস্না মিলে কাকজ্যোৎস্না। এটি তৎসম ও বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ:  রাত্রিশেষের ম্লান জ্যোৎস্না যা দেখে কাক দিনের আলো ভেবে জেগে ওঠে।কাকজোস্না নয়, কাকাজ্যোৎস্না। (প্রভাত ভাবিয়া কাক-জ্যোৎস্নায় জাগিয়া যেমন পাখী গান গায়- কাজী নজরুল ইসলাম) 
কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং : কুৎসিত হস্তাক্ষর(আমি এ বিদ্যায় এক্সপার্ট)
কাকতাড়ুয়া: পাখিকে ভয় দেখানোর জন্য রক্ষিত মানুষের প্রতিমূর্তি।
কাকতালীয়:  তাল গাছে কাক বসামাত্র তাল পতনের মতো পরস্পর সম্বন্ধহীন দুটি ঘটনা ঘটেছে এমন, কার্যকারণ সম্বন্ধহীন। এটি একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। মানুষ কথায় কথায় প্রায় সময় বলেন: কাকতালীয়। শব্দটির অর্থ— আকস্মিক যোগাযোগজাত কোনো বিষয় বা ঘটনা, হঠাৎ ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনা বা বিষয়, কার্যকারণহীন দুটি ঘটনা। কাক ও তাল থেকে কাকতালীয় বাগ্‌ভঙ্গিটির উৎপত্তি। একটি কাক তালগাছের বসল এবং বসামাত্র টুপ করে একটা তাল মাটিতে পড়ে গেল। কাকটি না-বসলেও তালটি পড়ত, হয়তো তালটি না-পড়লেও কাকটি বসত। কাকের মতো ছোটো একটি পাখির তালগাছে বসার সঙ্গে তাল-পড়ার কোনো যোগসূত্র ছিল না; সংগতকারণে থাকতে পারে না। কিন্তু ঘটনাচক্রে তালের পতন ও কাকের বসা দুটো একসঙ্গে ঘটে গেল। এটাই কাকতালীয়। আসলে প্রকৃত কারণ না-হলেও কোনো বিষয় বা ঘটনাকে অন্য কোনো বিষয় বা ঘটনার অনিবার্য কারণ বলে মনে করাকে বলা হয় কাকতালীয়।
কাকনিদ্রা: কাক ও নিদ্রা মিলে কাকনিদ্রা (কাক+নিদ্রা)। এটি তৎসম শব্দ। অর্থ: কাকের ঘুমের মতো সতর্ক ও অগভীর ঘুম; কপট ঘুম। এর সমার্থক শব্দ কাকতন্দ্রা।
কাকপক্ষ: কাক ও পক্ষ মিলে কাকপক্ষ। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত তৎসম কাকপক্ষ অর্থ: দুই কানের পাশে ঝোলানো চুলের গোছা, কানপাটা, জুলফি (শুধু কারো মাথায় কাকপক্ষ অবশিষ্ট কারও মাথায় বা শুধু টিকি- প্রমথ চৌধুরী)।
 কাকপদ: তৎসম কাকপদ (কাক+পদ) অর্থ (বিশেষ্যে)  (১) কাকের পা; (২) ত্বকের ওপর কাকের পায়ের মতো চিহ্ন; (৩) লেখায় বা ছাপায় বাদ পড়া অংশ নির্দেশের জন্য ব্যবহৃত চিহ্নবিশেষ; (৪) (^) চিহ্ন, carte; উদ্ধারচিহ্ন ‘  ’ (৫) লেখায় পরিত্যক্ত অংশ বা শূন্যস্থান নির্দেশক চিহ্ন (* * *)।  
কাকপুচ্ছ: তৎসম কাকপুচ্ছ (কাক+পুচ্ছ) অর্থ (বিশেষ্যে) কাকের ন্যায় পুচ্ছবিশিষ্ট পাখি, কোকিল।
কাকপুষ্ট : কোকিল। কারণ, কোকিল কাকের ভাষায় ডিম পাড়ে এবং কাক ওই ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা বের করে। কোকিল কাকের দ্বারা পুষ্ট হয়। তাই  কোকিলের আরেক নাম কাকপুষ্ট।
কাকফল: তৎসম কাকফল (কাক+ফল) অর্থ (বিশেষ্যে) নিমফল।
কাকবন্ধ্য: তৎসম কাকবন্ধ্য (কাক+বন্ধ্যা) অর্থ  যে নারী একবার মাত্র গর্ভ ধারণ করেছে, একগর্ভা।
কাকবলি: তৎসম(কাক + বলি ) অর্থ কাককে দেয়/প্রদেয় বলি, কাককে দেয় অন্নাদি, কাকের আহারের উদ্দেশ্যে দেয় নবান্নের অংশ।  আগের যুগে দ্বারে দ্বারে যাচ্ঞাকারী ফেরিওয়ালাকে কিছু পরিমাণ উৎপন্ন দিয়ে দিতে হতো। হয়তো দাম নিয়ে অথবা বিনামূল্যে। সে প্রদত্ত উৎপন্নকে বলা হতো কাকবলি। একসময় গ্রামাঞ্চলে বছরের একটা বিশেষ দিনে কাকের উদ্দেশ্যে রুটি, পিঠা প্রভৃতি গাছের ডালে ডালে ঝুলিয়ে রাখার আচার প্রচলিত ছিল। বাচ্চারা নানা রকম ছড়াগান গেয়ে কাককে খাদ্যবস্তু ভক্ষণের জন্য ডাকত। এটাও কাকবলি। বর্তমানে এমন আচার তেমন একটা আর দেখা যায় না।
কাকভীরু: কাক ও ভীরু মিলে কাকভীরু। তৎসম কাকভীরু অর্থ (বিশেষ্যে) প্যাঁচা।
কাকভূশণ্ডি:  কাক ও ভূশণ্ডি মিলে কাকভূশণ্ডি (কাক+ভূশণ্ডি) অর্থ (বিশেষ্যে) পুরাণে কল্পিত ত্রিকালদর্শী কাক; (আলংকারিক) বয়োবৃদ্ধ অভিজ্ঞ ব্যক্তি; (বিশেষণে) ভূশণ্ডি কাকের মতো দীর্ঘজীবী। ভূশণ্ডির কাক শব্দের আলংকারিক অর্থ হলো যে বহু বছর এবং মৃত্যুর বয়স হওয়া সত্ত্বেও জীবিত আছে; অন্যায়ভাবে দীর্ঘজীবী। আর কাকভুশণ্ডি হলো হিন্দু পৌরাণিক এক চরিত্র।
কাকভোর: সংস্কৃত কাক ও হিন্দি ভোর নিয়ে গঠিত কাকভোর (কাক+ভোর) অর্থ (বিশেষ্যে) সূর্যোদয়ের অনেক আগে যে সময়ে কাকরা উঠে কা কা রবে ডাকাডাকি করে, খুব সকাল।
কাকশীর্ষ: বকফুল, অগুস্তি। তৎসম কাকশীর্ষ (কাক+শীর্ষ) অর্থ (বিশেষ্যে) বকফুল, অগুস্তি।
কাকস্নান:  তৎসম (কাক+স্নান) অর্থ (বিশেষ্যে) কাকের মতো কেবল মাথা ভিজিয়ে অল্প জলে স্নান। কাক স্নানের সময় পুরো শরীর ভেজায় না। সামান্য জলে কেবল মাথা ভিজিয়ে স্নান সেরে নেয়। কাকের এই আচরণ থেকে কাকস্নান শব্দের উদ্ভব।  কাকের মতো সামান্য জলে কেবল মাথা ভিজিয়ে যে স্নান করা হয় কিংবা অল্প জলে যে স্নান  সম্পন্ন করা হয় তাকে কাকস্নান বলে। 
কাকোদর: তৎসম কাকোদর (কাক+উদর) অর্থ:  সর্প।
তীর্থের কাক: সাগ্রহ প্রতীক্ষাকারী, যে ধরণা দিয়ে থাকে; লোভী বা লোলুপ ব্যক্তি।
কাক-কোকিলের ভেদ : ভালোমন্দ ভেদজ্ঞান।
“কাক” শব্দের আরো অর্থ আছে। একটি অর্থ হচ্ছে এক কড়ার চার ভাগের এক ভাগ। 

কাঁক কাঁক কাক: কা-কা কাকা

১.কাঁক: সংস্কৃত কঙ্ক থেকে উদ্ভূত কাঁক অর্থ (বিশেষ্যে)— লম্বা পা ও গলাবিশিষ্ট সাদাকালো বা ফিঁকে লাল রঙের বকজাতীয় বৃহদাকার পাখি। কাঁক তদ্ভব বা খাঁটি বাংলা শব্দ।
২. কাঁক: সংস্কৃত কক্ষ থেকে উদ্ভূত কাঁক অর্থ (বিশেষ্যে)— মানবদেহের পাঁজর ও নিতম্বের মধ্যবর্তী অংশ, কটিদেশ, কোমর, কোল, কাঁকাল; বগল। কাঁক তদ্ভব বা খাঁটি বাংলা শব্দ।
৩. কাক: তৎসম/সংস্কৃত কাক (√কৈ+ক) অর্থ (বিশেষ্যে)— লম্বা চঞ্চু ও কর্কশস্বরবিশিষ্ট কালো রঙের বড়ো পাখিবিশেষ। নিজের ডিম ভেবে কোকিলের ডিমে তা দেয় বলে এই পাখিটাকে পরভৃৎ ও পরপোষকও বলা হয়; বায়স। ইংরেজি নাম crow.
৪. কা-কা: ধ্বন্যাত্বক কা-কা অর্থ— কাকের ডাক। কাক এমন স্বরে ডাকে।
৫. কাকা:কাকা ফারসি উৎসের শব্দ। অর্থ (বিশেষ্যে)— পিতার ছোটো ভাই বা তৎস্থানীয় ব্যক্তি, চাচা, পিতৃব্য।

কাকা আর কা-কা

কাকা মানে পিতার ছোটো ভাই। তিনি কাছের মানুষ। কাছেই থাকেন। তাই কাকা বানানে ফাঁক রাখতে নেই।
কা-কা মানে কাকের ডাক। মানুষের সবচেয়ে উপকারী পাখি কাক। সে একটু থেমে থেমে কা-কা করে ডাকে। কাক, কাকা নয়, কাকার মতো কাছেরও নয়। তাই কাকের ডাকের মাঝখানে হাইফেন দিয়ে লিখতে হয় কা-কা। দূরের জিনিস দূরে রাখাই উত্তম।
—————————————————–
অর্থ-সূত্র: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান।
নিমোনিক সূত্র: নিমোনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান, ড. মোহাম্মদ আমীন।
নিমোনিক (mnemonic) অর্থ: স্মৃতিজাগানিয়া।

কাকতালীয়: কৌতুকে কৌতূহল

ছাত্র: কাকতালীয় মানে কী স্যার?
শিক্ষক: কার্যকারণহীন দুটি ঘটনা আকস্মিকভাবে ঘটে যাওয়া। এটি একটি বাগ্‌ধারা। কাক ও তাল থেকে এটির উৎপত্তি।
ছাত্র: কাক-তালের মিলন হলো কীভাবে?
শিক্ষক: একটি কাক তাল গাছে বসল এবং বসামাত্র টুপ করে একটা তাল গাছ থেকে মাটিতে পড়ে গেল। কাকটি না-বসলেও তালটি পড়ত, হয়তো তালটি না-পড়লেও কাকটি বসত। কাকের মতো ছোটো একটা পাখির তাল গাছে বসার সঙ্গে তাল-পড়ার কোনও যোগসূত্র ছিল না। কিন্তু ঘটনাচক্রে তালের পতন ও কাকের বসা দুটো একসঙ্গে ঘটে গেল। এটাই কাকতালীয়। বুঝেছ?
বুঝেছি।
এবার তুমি কাকতালীয় ঘটনার একটা উদাহরণ দাও।
ছাত্র: আমার বাবার বিয়ে হলো, সঙ্গে সঙ্গে আমার মায়ের বিয়েও! এমন কাকতালীয় আর দেখিনি, স্যার। আপনি দেখেছেন?
শিক্ষক: দেখেছি।
ছাত্র: কোথায়?
শিক্ষক: তুমি জন্মগ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে একজন পুরুষ বাবা এবং একজন নারী মা হয়ে গেল।এমন কাকতালীয় ঘটনা আর কোথাও দেখেছ?
দেখেছি।
কী?
স্যার, পড়ার পরপরই আমি ভুলে যাই। আর ভুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনি প্রশ্ন করে বসেন।
পরভৃৎ, পরভৃত, পথিকৃৎ, পথিকৃত
ওপরের চারটে শব্দের মধ্যে ‘পথিকৃত’ শব্দটা ভুল। তবু মাঝে মাঝে আমরা ‘পরভৃত’ শব্দের অনুষঙ্গে এই ভুল শব্দটা লিখে ফেলি।
পরভৃৎ – [পর+(ধাতু)ভৃ+ক্বিপ] এই শব্দের অর্থ কাক, কারণ কাক পরকে মানে কোকিলশাবককে পালন করে। এই ‘ক্বিপ’ প্রত্যয়ের একটা মজা আছে। এর সবটাই ‘ইৎ’ অর্থাৎ লুপ্ত থাকে। তবে ধাতু যদি স্বরান্ত হয় তবে ধাতুর পরে ৎ-এর আগমন হয়।
পরভৃত – [পর+(ধাতু)ভৃ+ত] এই শব্দের অর্থ কোকিল, কারণ কোকিল পরের দ্বারা পালিত।
পথিকৃৎ – [পথিন্+(ধাতু)কৃ+ক্বিপ] এই শব্দের অর্থ পথপ্রদর্শক।

ব্যাকরণ মুখস্থ না করেই প্রমিত বানান আত্মস্থ করার কৌশল

ভৃত -ভৃৎ পরভৃত পরভৃৎ: সংস্কৃত ‘ভৃত’ অর্থ বিশেষণে অন্যের দ্বারা লালিত (পরভৃত, কোকিল), পালিত; ভরা, পূর্ণ। পরভৃত অর্থ কোকিল। সংস্কৃত ‘-ভৃৎ’ অর্থ বিশেষ্যে যে লালন করে, বিশেষণে লালনকারী (পরভৃৎ, কাক)। পরভৃৎ অর্থ কাক। লালনকারী ‘পরভৃৎ’ বা কাক তার আস্ত-ত-এর অর্ধেক পরভৃত বা কোকিলকে লালন করার জন্য ব্যয় করে। তাই লালনকারী পরভৃৎ বা কাককে ‘খণ্ড-ৎ’ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এজন্য তার বানান পরভৃৎ। অন্যদিকে, ‘ভৃত’ শব্দের আরেকটি অর্থ পূর্ণ। তাই তার বানানে আস্ত-ত। এজন্য কোকিল অর্থ পরভৃত এবং কাক অর্থ পরভৃৎ

কাকা চাচা

কাকা: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, কাকা ফারসি শব্দ। এর অর্থ (বিশেষ্যে) পিতার ছোটো ভাই বা তৎস্থানীয় ব্যক্তি, চাচা, পিতৃব্য। স্ত্রীবাচক: কাকি। অমুসলিম সম্প্রদায়ে কাকা সম্বোধন অধিক প্রচলিত। হিন্দু সম্প্রদায় শব্দটি অধিক ব্যবহার করেন। তাই অনেকে মনে করেন, এটি সংস্কৃত শব্দ। দেখবেন, এখানেও অনেকে মন্তব্য করে বসবেন: কাকা ফারসি শব্দ নয়।
ফারসি কাকা ছাড়া আমাদের আর একটি ধ্বন্যাত্মক কাকা আছে। এটি কাকের ডাক। কাকা থেকে পৃথক করার জন্য মাঝখানে হাইফেন দিয়ে লেখা হয়: কা-কা
কালো কাকটা কা-কা করে কাকার কান কানা কানা করে দিল।
চাচা: চাচা বাংলায় এসেছে সংস্কৃত হতে। সংস্কৃত তাত থেকে উদ্ভূত চাচা অর্থ (বিশেষ্যে) পিতার ছোটো ভাই, কাকা, খুড়া, পিতৃব্য, খুল্লতাত প্রভৃতি। স্ত্রীবাচক: চাচি। চাঁচা, চাচা-র আঞ্চলিক বিকৃত রূপ। মুসলিম সম্প্রদায়ে চাচা সম্বোধন অধিক প্রচলিত।
চেয়ারম্যানের চামচা চালেক চাচা চামুণ্ডার মতো চা চা করে চ্যাঁচায়।

কা কস্য পরিবেদনা

কা, কস্য ও পরিবেদনা—এ তিনটি শব্দ নিয়ে ‘কা কস্য পরিবেদনা’ বাগ্‌বিধিটি চয়িত। ‘কা’ অর্থ কে, ‘কস্য’ অর্থ কার এবং ‘পরিবেদনা’ অর্থ তীব্র কষ্ট, বেদনা, অন্তর্দহন। সুতরাং, ‘কা কস্য পরিবেদনা’ কথার শাব্দিক অর্থ— কে কার বেদনা/অন্তর্দহন। আলংকারিক অর্থ— সংসারে কে কার; কে কার বেদনার খবর রাখে; কে কার অন্তর্দহন বোঝে; কারও কষ্ট যতই তীব্র হোক না তাতে অন্য কারও তেমন কিছু যায় আসে না; নিজের কষ্ট নিজেকে বয়ে বেড়াতে হয়; নিজের কষ্টের কথা বলার বা শোনার কেউ নেই; অহেতুক চারপাশ বন্ধুবান্ধব কিংবা দারাপুত্র পরিবার।
মূলোৎসে কথাটির সঙ্গে পাখির সম্পর্ক থাকলেও এককভাবে কাক-এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। যদিও এখন অনেকে বাগ্‌বিধিটির ব্যাখ্যায় কাক নিয়ে আসে। একটি বিখ্যাত সংস্কৃত শ্লোক হতে কথাটির উদ্ভব। শ্লোকটি হলো:

“এক বৃক্ষসমারূঢ়া নানাপক্ষিবিহঙ্গমাঃ।

প্রভাতে তু দিশো যান্তি কা কস্য পরিবেদনা।।”

 

ব্যাখ্যার্থ: একটি বৃক্ষে অনেক পক্ষী-বিহঙ্গম সমারূঢ়া বা আরোহণ বা অবস্থান করে থাকে। রাতে তাদের সহাবস্থান হয় খুব কাছাকাছি, কিন্তু কারও সঙ্গে কারও যোগাযোগ হয় না। পুরো রাত এভাবে কেটে যায়। রাত অতিক্রান্ত হয়ে প্রভাতের সূচনায় পক্ষী-বিহঙ্গমদল বৃক্ষ ছেড়ে নিজেদের কাজে নানা দিকে ছুটে যায়। সুতরাং, কোন পাখির মনে কি পরিবেদনা বা যন্ত্রণা আছে তা অন্য পাখি জানে না, জানতে পারে না; জানার চেষ্টাও করা হয় না কিংবা অমন জানার সুযোগও থাকে না।
আলংকারিক অর্থ: সংসারে কত মানুষ কত কাছাকাছি অবস্থান করে, একই ঘরে, একই বিছানায় তবু কারও মনের খবর কেউ জানে না, রাখে না বুঝতে পারে না— বোঝার চেষ্টাও করে না কার মনে কত বেদনা লুকায়িত আছে। ফলে একজনের বেদনা অন্য জনের কাছে অজানা থেকে যায়।
প্রকৃতপক্ষে, এ সংসারে কেউ কারও নয়, তা যতই কাছের বা ঘনিষ্ঠ হোক না। শেষপর্যন্ত প্রত্যেক মানুষকে একাকিত্বের ভীষণ যন্ত্রণায় নিপতিত হয়ে বাঁচতে হয়, চলতে হয়, মরতে হয়। আমার কষ্টে অন্যের বা কার কী আসে যায়। নিজের এত কষ্টেও যখন কারও কিছু যায় আসে না, অতএব থাকগে। চলুক, চলব; চলছে যেমন আমার মতো আমি— কা কস্য পরিবেদনা
“কস্য মাতা কস্য পিতা
কস্য ভ্রাতা সহোদরঃ।
কায়ঃপ্রাণৈর্ন সম্বন্ধঃ

কা কস্য পরিবেদনা।”
ভাবার্থ: মা-বাবা ভাই-বোন কে কার? এ দেহ-কায়ার সঙ্গে যেখানে প্রাণের সম্পর্ক পর্যন্ত নেই, সেখানে ভিন্ন জন বা ভিন্ন দেহ-প্রাণের প্রতি আর কতটুকু সম্পর্ক বা অনুভব থাকেব; কে কার বেদনা কতটুকু বুঝতে পারে!
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
error: Content is protected !!