কাতা, সব্যসাচী, ভোর বনাম ভোর; ‘গবেষণা’ অর্থ গোরু খোঁজা না কি আলো অনুসন্ধান?

ড. মোহাম্মদ আমীন
কাতা, সব্যসাচী, ভোর বনাম ভোর; ‘গবেষণা’ অর্থ গোরু খোঁজা না কি আলো অনুসন্ধান?

সংযোগ: https://draminbd.com/কাতা-সব্যসাচী-ভোর-বনাম-ভো/

কাতা

‘নারেকেলের ছোবড়ায় তৈরি রশি বা দড়ি’ কথাটিকে একশব্দে কাতা বলা হয়। নাপিতের কাঁচি, ক্ষুর, চিরুনি প্রভৃতি রাখার থলেকেও কাতা বলা হয়। কাতা খাঁটি বাংলা শব্দ। সংস্কৃত কর্তিকা হতে কাতা শব্দের উদ্ভব। কাতা দিয়ে বাঁধা কাতা বয়ে চলে নাপিত।
সব্যসাচী
সব্যসাচী শব্দের মূল অর্থ ডান ও বাম উভয় হাতে যিনি অসামান্য দক্ষতায় শর নিক্ষেপ করতে সক্ষম। মহাভারতের তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন এমন দক্ষতার অধিকারী ছিলেন বলে তাঁকে সব্যসাচী বলা হত। তবে সংস্কৃত থেকে বাংলা এসে সব্যসাচী অর্থটির ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। এখন সব্যসাচী বলতে নানাবিধ কর্মসম্পাদনে সক্ষম ব্যক্তিকে বুঝানো হয়। যিনি একধারে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, ছড়া, প্রবন্ধ প্রভৃতি সৃষ্টিতে সক্ষম তিনি সব্যসাচী লেখক।

ভোর বনাম ভোর

অভিধানে ভোর শব্দের দুটি পৃথক ভুক্তি দেখা যায়। একটি হিন্দি উৎসের ভোর আরেকটি সংস্কৃত উৎসের ভোর
  • বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হিন্দি উৎসের ভোর অর্থ— প্রাতঃকাল, উষা, প্রত্যুষ, প্রভাত; নিশাবসান।
ভোর হলো দোর খোলো খুকুমনি উঠরে— নজরুল
  • সংস্কৃত বিহ্বল থেকে উদ্ভূত ভোর অর্থ (বিশেষণে) বিভোর, অভিভূত, মুগ্ধ, তন্ময়।
“প্রাণ পেয়েছে মন, বিভোর এ জীবন”— ড. মোহাম্মদ আমীন, স্যমন্তক
‘গবেষণা’ অর্থ গোরু খোঁজা নাকি আলো অনুসন্ধান?
গবেষণা শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়– গো + এষণা৷ অনেক জায়গায় দেখেছি এই ‘গো’ এর অর্থ লেখা ‘গোরু’ এবং ‘এষণা’ এর অর্থ লেখা ‘খোঁজা/অনুসন্ধান করা’। তাহলে শাব্দিকভাবে ‘গবেষণা’ শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় গোরু খোঁজা৷ মনে প্রশ্ন আসে, তত্ত্বান্বেষণ (research) মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দের শাব্দিক অর্থ গোরু খোঁজা কেন? আসলেই কি গো দ্বারা এখানে গোরু বোঝাচ্ছে? এষণা দ্বারাই তো অনুসন্ধান বোঝায়৷ তাহলে আবার গোরুকে অনুসন্ধান করতে হবে কেন?
গবেষণা শব্দটির অন্য একটি শাব্দিক অর্থ খোঁজার চেষ্টা করি৷ গবেষণা শব্দটি বাংলা ভাষায় একটি তৎসম শব্দ হিসেবে প্রচলিত৷ গবেষণা শব্দটি যদি বৈদিক সাহিত্যে উপলব্ধমান হয় তবে খুব সহজেই মেনে নেওয়া যায় যে এটিতে ব্যবহৃত ‘গো’ শব্দটি গোরু অর্থে ব্যবহার হয়নি। কারণ লৌকিক সংস্কৃত আর বৈদিক সংস্কৃততে শব্দের অর্থগত দিক থেকে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান৷ লৌকিক সংস্কৃততে গো শব্দটি গোরু বাচক হলেও বৈদিক সংস্কৃততে এটির বহুবিধ অর্থ দৃশ্যমান হয়। বেদে অধিক ব্যবহৃত শব্দগুলোর থেকে নির্বচিত কিছু শব্দের সমার্থক শব্দের তালিকা দেওয়া আছে ‘নিঘণ্টু’ নামক গ্রন্থে৷ সেই গ্রন্থের ১ম অধ্যায়ের ৫ম খণ্ডে আলোকরশ্মি বাচক ১৫টি বহুবচনাত্মক শব্দ দেওয়া আছে৷ তার মধ্যে একটি হলো ‘গাবঃ’। এই গাবঃ শব্দটি হলো ‘গো’ শব্দের বহুবচনাত্মক রূপ। ফলে বৈদিক সাহিত্যে ‘গো’ দ্বারা যে ‘আলোকরশ্মি’ বোঝানো হত এটি বোঝা যাচ্ছে। আবার নিঘণ্টুর ব্যাখ্যাগ্রন্থ নিরুক্তের ২য় অধ্যায়ের ৬ষ্ঠ খণ্ডে সূর্যের আলো কর্তৃক চাঁদের আলোকিত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে সূর্যের আলোকরশ্মির বিষয়ে বলা হচ্ছে– “সোঽপি গৌরুচ্যতে” অর্থাৎ তাকেও (সূর্যরশ্মিকেও) গো বলা হয়৷
এসব প্রমাণ ও উদাহরণ দেখলে মনে হয়, গবেষণার ‘গো’ গোরু নয়, বরং এখানে ‘গো’ বলতে আলোকরশ্মিকে বোঝানো হচ্ছে। আর গবেষণা বলতে গোরু খোঁজা নয়, বরং আলোর অনুসন্ধান করা বোঝানো হতো৷ কারণ এষণা অর্থই খোঁজা৷ আর কোনো বিষয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে বের হওয়ার জন্য যে আলোকরশ্মি খোঁজা হতো, তাই মূলত গো + এষণা = গবেষণা৷
উপর্যুক্ত লেখাটি সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব মনের খেয়ালে লেখা৷ বিষয়টি কতটুকু যথাযথ হতে পারে তা নিয়ে বিজ্ঞদের মতামত কাম্য।
শিল/ উঞ্ছবৃত্তি
শিল:  তিনি একজন শিল। এখানে শিল কথাটির অর্থ কী? খেত থেকে শস্য কেটে নেওয়ার পর পড়ে থাকা ধান প্রভৃতি সংগ্রহ করার বৃত্তিকে একশব্দে বলে শিল। তিনি একজন শিল মানে তিনি খেত থেকে শস্য কেটে নেওয়ার পর পড়ে থাকা ধান প্রভৃতি সংগ্রহ করা তার পেশা। এটি উঞ্ছবৃত্তি নামেও পরিচিত। শিল ও উঞ্ছবৃত্তি দুটোই তৎসম।
ইঁদুর কপালি: খেত থেকে ধান কেটে নেওয়ার পর যারা ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহ করে তাদের বলা হয় ইঁদুর-কপালি।
Language
error: Content is protected !!