কিংবদন্তি, গুজব, হুজুগ, জীবন্ত কিংবদন্তি, লিজেন্ড (legend)

এবি ছিদ্দিক

কিংবদন্তি, গুজব, হুজুগ, জীবন্ত কিংবদন্তি, লিজেন্ড (legend)

কিংবদন্তি

‘কিংবদন্তি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘লোকপরম্পরায় শ্রুত কাহিনি’, ‘গুজব’ প্রভৃতি। শব্দটির আভিধানিক অর্থে সুস্পষ্ট দ্বিচারিতা লক্ষণীয়। অবশ্য এই দ্বিচারিতার পেছনে কারণও রয়েছে। বিষয়টি স্পষ্ট করতে কিংবদন্তি শব্দের আভিধানিক অর্থ বাদ দিয়ে প্রায়োগিক অর্থে গুরুত্ব দিতে হবে।
 
ইংরেজি ‘legend’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘কিংবদন্তি’। যদিও বাংলায় আভিধানিক অর্থে শব্দটি কোনো বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেয়; কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে শব্দটিকে ব্যক্তি ধারণ করে। অর্থাৎ, কিংবদন্তি ব্যক্তির কর্মে জন্ম নেয়। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কৃতকর্ম যখন ওই ব্যক্তিকে অনন্য প্রমাণ করে, তার প্রজন্ম এবং তার পরবর্তী প্রজন্ম পরম্পরা অনুসারে তার কৃতকর্মের গল্প বলে বেড়ায়, তবে ওই ব্যক্তিকে কিংবদন্তি বলা হয়। কিছু উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি বুঝতে সুবিধে হবে—
স্যার উইলিয়াম শেকসপিয়র মারা গিয়েছেন চারশত বছরেরও বেশি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু লোকে এখনও তাঁর অসামান্য সাহিত্যপ্রতিভার কাহিনি শোনায়, তাঁর লেখা নাটক-কবিতার বিশেষত্ব জাহির করে। এই যে লোকপরম্পরায় শেকসপিয়রের গুণকীর্তন গেয়ে আসা হচ্ছে, এসবই শেকসপিয়রকে একজন কিংবদন্তি সাহিত্যিক বানিয়েছে।
 
খ্রিষ্টেরও জন্মের আগে থেকে হেক্টর-একিলিসদের যে বীরগাথার চর্চা শুরু হয়েছিল, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধারণ করে একবিংশ শতাব্দী অবধি নিয়ে এসেছে। লোকশ্রুতিতে এভাবে বেঁচে থাকাটাই হচ্ছে কিংবদন্তি।
 
ক্রিকেটে যখনই কোনো ভালো টেস্ট ব্যাটসম্যানের কথা বলা হয়, তখন স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের নাম চলে আসে, তাঁর অবিশ্বাস্য ৯৯.৯৪ গড় রানের প্রসঙ্গ চলে আসে। এভাবে যুগের পর যুগ তাঁর কীর্তির চর্চা তাঁকে ক্রিকেটের কিংবদন্তি বানিয়ে দিয়েছে।
 
বর্ণনামূলক ব্যাকরণের প্রসঙ্গ এলেই পাণিনি নাম বলা হয়, সংস্কৃত ভাষার চূড়ান্ত বিধিবদ্ধ রূপ নির্ধারণের উদ্দেশ্যে রচিত তাঁর ‘অষ্টাধ্যায়ী’ গ্রন্থের কথা বলা হয়; হাজার বছর ধরে এভাবেই চলে আসছে। তাই, ভাষার সুবিস্তৃত আঙিনায় তিনি একজন কিংবদন্তি। আরও দৃষ্টান্ত হিসেবে অ্যারিস্টটল, লিও তলস্তয়, মাইকেল জ্যাকশন, নেলসন ম্যান্ডেলা, আব্রাহাম লিংকন, শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস প্রমুখ ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা যায়।
 
এবার কিংবদন্তি শব্দের ‘গুজব’ অর্থটি নিয়ে কিছু বলা যাক। শুরুতে যে কথাটি বলেছি— কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কৃতকর্ম যখন ওই ব্যক্তিকে অনন্য করে তুলে, তার প্রজন্ম এবং তার পরবর্তী প্রজন্ম পরম্পরা অনুসারে তার কৃতকর্মের গল্প শুনিয়ে বেড়ায়, তবে ওই ব্যক্তিকে কিংবদন্তি বলা হয়। অনেকক্ষেত্রে কৃতকর্মের এরূপ লোকশ্রুতির কোনো সত্যতা থাকে না; এমনকি মাঝেমধ্যে ঝুটা বলেও প্রমাণিত হয়। ওরকম ক্ষেত্রে স্রেফ গুজব কিংবা শোনা-কথাই কোনো ব্যক্তিকে অনন্য বানিয়ে দেয়। যেসকল ক্ষেত্রে পরম্পরানুসারে চলে আসা লোককাহিনির সত্যতার নিশ্চয়তা বা প্রমাণ থাকে না, সেসকল ক্ষেত্রে ‘কিংবদন্তি’ শব্দের ‘গুজব’ অর্থটি মোটেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একারণেই ‘কিংবদন্তি’ শব্দটিকে ‘রূপকথা’ শব্দটির সঙ্গে তুলনা করা হয়। বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনির মহাবীরদের ক্ষেত্রে ‘কিংবদন্তি’ শব্দের এই অর্থটি বেশ যায়।
 
‘কিংবদন্তি’ শব্দটি নিয়ে বলতে গেলে ‘জীবন্ত কিংবদন্তি’ প্রসঙ্গটিও চলে আসে। বিষয়টি একেবারে সাধারণ— যাঁর কৃতকর্ম বা সাফল্যের গল্প বর্তমানে তো চলছেই, পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের মুখে চর্চিত হওয়াটাও নিশ্চিত, তিনিই জীবন্ত কিংবদন্তি। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার ‘পেলে’ তেমনই একজন জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের এবং পেশাদার ফুটবল ম্যাচে ১২৮৩* গোলের রেকর্ড নিয়ে যুগ যুগ ধরে যে মাতামাতি, তা আগামী প্রজন্মের মধ্যেও চলমান থাকবে বলে ধরে নেওয়া যায়। আর, এই বিশ্বাসই তাঁকে জীবন্ত কিংবদন্তি বানিয়ে দিয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানে নোয়াম চমস্কি, টেনিসে রজার ফেদেরার, ক্রিকেটে শচীন টেন্ডুলকার-রিকি পন্টিং, দৌড়ে উসাইন বোল্ট, সাঁতারে মাইকেল ফেলপ্‌স, ভারতীয় সংগীতে লতা মঙ্গেশকর প্রমুখ জীবন্ত কিংবদন্তির প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
 
error: Content is protected !!