কিরগিজিস্তান (Kyrgyzstan) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

কিরগিজিস্তান (Kyrgyzstan)

কিরগিজিস্তান মধ্য এশিয়ার পূর্বাংশে অবস্থিত একটি স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। এর সরকারি নাম কিরগিজ প্রজাতন্ত্র। দেশটির উত্তরে কাজাকিস্তান, পূর্বে গণচীন, দক্ষিণে গণচীন ও তাজিকিস্তান এবং পশ্চিমে উজবেকিস্তান অবস্থিত। বিশকেক শহর কিরগিজিস্তানের রাজধানী ও দেশের বৃহত্তম শহর।

তিনটি পারসি শব্দ যথাক্রমে কির্গ (kyrg), ইজ (yz) এবং স্তান ((-stan) সমন্বয়ে খিরগিজিস্তান নামের উদ্ভব। কির্গ শব্দের অর্থ চল্লিশ, ইজ অর্থ উপজাতি এবং স্তান শব্দের অর্থ ভূমি। এখানে যে উপজাতির কথা বলা হয়েছে, তারা পূর্ব-তার্কিক (ঞঁৎশরপ) অঞ্চলে বসবাস করতেন। এ তিনটি শব্দ একত্রিত করলে যে অর্থ হয় সেটি হচ্ছে : চল্লিশ উপজাতির দেশ। উপজাতীয় সর্দারগণ নিজেদেরকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রয়াস নেন। নেতৃবন্দ স্থানীয় চল্লিশটি উপজাতীয় গোষ্ঠীকে একীভূত করে একক শাসনের আওতায় একটি জনপদ বা দেশ গড়ে তোলেন। তাই এর নাম হয় কিরগিস্তান বা চল্লিশ উপজাতির দেশ। অনেকের মতে, উপজাতির সংখ্যা চল্লিশেরও বেশি ছিল। তবে প্রভাবশালী উপজাতিদের সংখ্যা চল্লিশ বা তার কাছাকাছি ছিল।

কিরগিজরা একটি মুসলিম জাতি যারা কিরগিজ নামে পরিচিত একটি তুর্কীয় ভাষায় কথা বলে। এরা কিরগিজিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। উজবেক ও রুশ জাতির লোকেরা এখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। ১৯শ শতকের শেষের দিকে কিরগিজিস্তান রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা পায়। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে কিরগিজিস্তাকে একটি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা দেওয়া হয়। এটি তখন কিরগিজিয়া নামেও পরিচিত ছিল। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে কিরগিজিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে। এর দু বছর পর ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মার্চ স্বাধীন কিরগিজিস্তানের জাতীয় পতাকা গৃহীত হয়।

সুউচ্চ পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতি কিরগিজিস্তানের পরিবহন ব্যবস্থার উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। কিরগিজিস্তানের সড়কগুলো খাড়া পাহাড়ি ঢাল বেয়ে সর্পিলাকারে উঠে নেমে চলে গেছে। অনেকসময় সড়কগুলোকে সমুদ্র সমতল থেকে ৩০০০ মিটার উঁচু গিরিপিথের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। রাস্তাগুলো প্রায়ই ভূমি-ধ্বস এবং হিমানি সম্প্রপাতের শিকার হয়। শীতকালে উচ্চ উচ্চতার দূরবর্তী অঞ্চলগুলিতে ভ্রমণ দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। সোভিয়েত আমলে নির্মিত বেশির ভাগ সড়ক আন্তর্জাতিক সীমান্তের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। ফলে এসব সড়কে সীমান্ত প্রোটোকল মেনে চলতে গিয়ে প্রচুর সময় নষ্ট হয়। কিরগিজিস্তানে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় পরিবহনের মাধ্যম হিসাবে এখনও ঘোড়া বেশ জনপ্রিয়।

‘কিরগিজ’ কিরগিজিস্তানের সরকারি ভাষা। এ ভাষায় কিরগিজিস্তানের অর্ধেকের বেশি লোক কথা বলে। এ দেশের প্রায় ১৬% লোক রুশ ভাষায় কথা বলেন। এখানে প্রচলিত অন্যান্য ভাষার মধ্যে উজবেক, চীনা, মঙ্গোলীয় ও উইগুর ভাষা উল্লেখযোগ্য।

কিরগিজিস্তানের মোট আয়তন ১,৯৯,৯৫১ বর্গকিলোমিটার বা ৭৭,১৮১ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় অংশের পরিমাণ ৩.৬ ভাগ। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে দেশের মোট জনসংখ্যা ৫৮,৯৫,১০০ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা ২৭.৪। আয়তন বিবেচনায় এটি বিশ্বের ৮৭-তম এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় ১১২-তম বৃহত্তম দেশ। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ১৭৬-তম জনবহুল দেশ। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে কিরগিজিস্তানের জিডিপি (পিপিপি) ১৩.১২৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার, সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ২,৩৭২ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ৫.৯২০ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ১০৭০ ইউএস ডলার। গিনি ৩০.৩ এবং এইচডিআই ০.৬২৮ (মধ্যম)। মুদ্রার নাম সম ( কেজিএস)। রাজধানী বিশকেক।

কিরগিজিস্তানের জনগণ খুব চা-পাগল। তারা চায়ের এত ভক্ত যে পানি কী, তা জানে না বললেই চলে। প্রত্যেকে সঙ্গে করে চা রাখেন। অন্যান্য দেশের মানুষ যেমন রাখে পানীয় জল। হ্যান্ডস্যাক কিরগিজিস্তানের জনগণের নিকট অত্যন্ত প্রিয় ও মজ্জাগত আচরণ। একজন আর একজনের সঙ্গে দেখা হলেই হ্যান্ডস্যাক করে। এমনকি কর্মস্থলে বা অন্য কোথাও একজন লোকের সঙ্গে দৈনিক যতবারই দেখা হোক না কেন, হ্যান্ডস্যাক করবেই। তবে মেয়েদের সঙ্গে পুরুষের হ্যান্ডস্যাক করার চেষ্টা অভদ্র ও অশোভনীয় বলে গণ্য করা হয়। অন্যান্য দিক হতে নিরাপদ হলেও এখানে রাস্তায় কোনো লাইট দেখা যায় না। এমনকি রাজধানী বিশকেক শহরের রাস্তাঘাটও সূয ডোবার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারে ঢেকে যায়। রাতে রাস্তায় লাইট জ্বালানো শক্তির অপচয় মনে করা হয়।

বিসকেক শহরকে অনেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সবুজতম শহর বলে থাকেন। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকে অপার সবুজে মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম মহাকাব্যের গৌরব কিরগিজদেরই প্রাপ্য। তাদের মহাকাব্য পৃথিবীর দীর্ঘতম মহাকাব্য এবং এটি ৫ লক্ষ লাইন নিয়ে রচিত। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ও উচুস্থানে অবস্থিত হ্রদ ইসিক-কুল (Issyk-kul) কিরগিজিস্তানে অবস্থিত। এটাকে পার্ল অব তিয়েন সান (Pearl of Tien Shan) বলা হয়। কিরিগজ ভাষায় ইসিক-কুল শব্দের অর্থ উষ্ণ-হ্রদ। এ হ্রদের পানি প্রচ- শীতের সময়েও বরফ হয় না। তাই এর নামক ইসিক-কুল। কিরগিজিস্তানে অবস্থিত আখরোট বন পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাকৃতিক আখরোট বন। এমন অপূর্ব সুন্দর আখরোট বন পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না।

——-

কাম্বোডিয়া (Cambodia) : ইতিহাস ও নামকরণ

সাইপ্রাস (Cyprus) : ইতিহাস ও নামকরণ

জজিয়া (Georgia) : ইতিহাস ও নামকরণ

ইন্ডিয়া / ভারত (India) : ইতিহাস ও নামকরণ

ইন্দোনেশিয়া (Indonesia): ইতিহাস ও নামকরণ

ইরান(Iran): ইতিহাস ও নামকরণ

ইরাক (Iraq) : ইতিহাস ও নামকরণ

বার্মা (Burma) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!