কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ: প্রীতিলতার কথা

ড. মোহাম্মদ আমীন

কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ

ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও উপমহাদেশের প্রথম বিপ্লবী মহিলা শহিদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই মে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলার  পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে

বীরকন্যা প্রীতিলতা

জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পিতা ছিলেন মিউনিসিপ্যাল অফিসের হেড কেরানি জগদ্‌বন্ধু ওয়াদ্দেদার এবং মাতা প্রতিভাদেবী। প্রীতিলতার ডাকনাম রাণী এবং বিপ্লবী ছদ্মনাম ছিল ফুলতারা। তিনি প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দের নামেও পরিচিত। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে সেপ্টেম্বর রাত ১২.০২ মিনিটে (মতান্তরে ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ১১.৫৫ মিনিটে) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

১৯১৮  খ্রিষ্টাব্দে প্রীতিলতা ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কস-সহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর আইএ পড়ার জন্য  ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আইএ পরীক্ষায়  মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করেন। এজন্য জন্য তিনি মাসিক ২০ টাকা বৃত্তি পান। এরপর তিনি কলকাতার বেথুন কলেজ়ে বিএ পড়তে যান। প্রীতিলতা  ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে ডিসটিংশান নিয়ে  বিএ পাশ করেন। তবে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায়  প্রীতিলতা এবং   তাঁর সঙ্গী বীণা দাসগুপ্তের পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা হয়। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে মার্চ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তাঁদের মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে প্রীতিলতার মাস্টারদা সূর্য সেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অন্যতম পরিকল্পনা ছিল পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ। কিন্তু গুড ফ্রাইডের কারণে ওই পরিকল্পনা  সফল করা সম্ভব হয়নি। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই আগস্ট পুনরায়  ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের দিন ধার্য

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় প্রীতিলতার ভাস্কর্য।

করা হয়। ওইদিন শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে সাতজনের একটা দল  ক্লাব আক্রমণ করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর প্রতিজ্ঞা ছিল ক্লাব আক্রমণের কাজ শেষ হবার পর নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার সুযোগ থাকলেও  তিনি আত্মবিসর্জন দেবেন। সে হিসেবে তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। গভীর রাতে কাট্টলীর সমুদ্রসৈকতে তাঁর মৃতদেহ সমাহিত করা হয়।

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মাষ্টারদা পুনরায় ইউরোপীয়  ক্লাবে হামলার সিদ্ধান্ত নেন। প্রীতিলতার বিশেষ অনুরোধে এবং যোগ্য বিবেচনায় মাস্টারদা এই আক্রমণের দায়িত্ব প্রীতিলতার ওপর অর্পণ করেন। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে সেপ্টেম্বর  রাত আনুমানিক ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে ইউরোপীয়  ক্লাব আক্রমণ শুরু হয়। ক্লাবে কয়েকজন ইংরেজ অফিসারের কাছে রিভলবার ছিল। তারা পাল্টা আক্রমণ করেন। আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে একজন মিলিটারি অফিসারের রিভলবারের গুলিতে প্রীতিলতার বাম-পাশে গুলির আঘাত লাগে। তবে ওই আঘাত গুরুতর ছিল না। প্রীতিলতা ইচ্ছা করলে অন্যান্য সঙ্গীদের সঙ্গে পালিয়ে যেতে পারতেন।  পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী সেদিনের এই আক্রমণে মিসেস সুলিভান নামের  একজন ইংরেজি নিহত  এবং চারজন পুরুষ ও সাত জন মহিলা আহত হয়।

প্রীতিলতার এমন বিদ্রোহী হওয়ার পেছনে রয়েছে একটি করুণ কাহিনি। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের কথা। সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষা শেষে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বাবা জগদ্‌বন্ধু ওয়াদ্দেদারের সঙ্গে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় বেড়াতে যান। পাহাড়তলীতে গড়ে তোলা হয়েছে ইউরোপীয় ক্লাব। ক্লাবের নজরকাড়া ভবন দেখে শিশু প্রীতিলতা উল্লসিত হয়ে সেখানে ঢোকার জেদ ধরেন।
বাবা বললেন, ওখানে যাওয়া যাবে না।
কেন?
পিতা জগদ্‌বন্ধু ক্লাবের প্রধান ফটকের অনতিদূরে টাঙানো একটি সাইন বোর্ডের দিকে কন্যার দৃষ্টি টেনে বললেন, পড়ো এবং দেখো; এই সাইনবোর্ডে কী লেখা আছে।
ড. মোহাম্মদ আমীন

প্রীতিলতা সাইনবোর্ডটি পড়লেন।তাতে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা: “Dog and Indian prohibited. অর্থাৎ কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ।

সাইনবোর্ড পড়ে শিশু প্রীতিলতার মনে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব জেগে উঠে।
বাবাকে বললেন, আমি এই সাইনবোর্ড ও ক্লাব ধ্বংস করে দেব। যারা ভারতের খেয়েপরে ভারতীয়দের কুকুরের সঙ্গে তুলনা করে তাদের ভারত থেকে না-তাড়ানো পর্যন্ত শান্তি পাব না। প্রয়োজনে জীবন দেব।
সেদিন থেকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে ব্রিটিশ-তাড়ানোর কাজে আত্মত্যাগ করা তাঁর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে যায়।
১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার ইডেন কলেজে আইএ প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পরপরই প্রীতিলতা বিদ্রোহীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেন। একই সঙ্গে অস্ত্র ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে অল্প সময়ের মধ্যে যে-কোনো আক্রমণে নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতা অর্জন করেন। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০.৫৫ মিনিটের দিকে প্রীতিলতা ১৫ জনের একটি দল নিয়ে ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ শুরু করেন। প্রথমে ভেঙে দেওয়া হয় সাইন বোর্ড।

আক্রমণকালে প্রীতিলতার বাম-পাশে গুলি লাগে। তবে আঘাত ছিল সামান্য। প্রায় এক ঘণ্টার কাছাকাছি আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ চলে। আক্রমণ শেষে ক্লাব থেকে কিছু দূরে এসে পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রীতিলতা নিজের মুখে পটাসিয়াম সায়ানাইড পুরে দেন। তখন রাত বারোটা বেজে গেছে। কালীকিংকর দে’র কাছে প্রীতিলতা তাঁর রিভলবারটা দিয়ে আরো পটাশিয়াম সায়ানাইড চাইলে, কালীকিংকর আরও কিছু পটাসিয়াম সায়ানাইড

ইউরোপীয় ক্লাবের পাশের এই স্থানে প্রীতিলতা আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। স্থানটি এখন তাঁর স্মরণে সংরক্ষিত।

প্রীতিলতার মুখের মধ্যে ঢেলে দেন।

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে সেপ্টেম্বর রাত ১২.০২ মিনিটের দিকে (মতান্তরে ২৩শে সেপ্টেম্বর রাত ১১.৫৫ মিনিট) প্রীতিলতা পটাসিয়াম সায়ানাইডের তীব্র বিষক্রিয়ায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সঙ্গীয় বিপ্লবীরা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে অকুস্থল ত্যাগ করেন।পরদিন পুলিশ ইউরোপীয় ক্লাব থেকে ১০০ গজ দূরে মৃতদেহ দেখে প্রীতিলতাকে সনাক্ত করে। ময়না তদন্তের পর জানা যায় গুলির আঘাত তেমন গুরুতর ছিল না এবং পটাশিয়াম সায়ানাইড ছিল প্রীকিলতার মৃত্যুর কারণ।

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

মিনহা সিদ্দিকার পোস্ট: শুবাচ

অর্হণা সমগ্র পর্ব ওয়েব সংগ্রহ

error: Content is protected !!