কুলাঙ্গারের ভাষাবোধ

ড. মোহাম্মদ  আমীন
 ভাষা কোনোভাবে নদীর মতো নয়, প্রকৃতির মতো। ভাষা হচ্ছে প্রকৃতি, আর  নদী প্রকৃতির একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সে হিসেবে নদীকে ভাষার সঙ্গে নয়, বরং এক একটি নদীকে ভাষার এক একটি শব্দের সঙ্গে তুলনা করা যায়। প্রকৃতির মতো অফুরন্ত সম্ভার আর সীমাহীন বৈচিত্র্যের অধিকারী এবং প্রচণ্ডভাবে বিস্তৃত ও শক্তিশালী ভাষার স্বাভাবিক প্রবণতাই হচ্ছে উদ্দেশ্য বিস্তারের লক্ষ্যে স্বতস্ফুর্ত মমতায় বাধাহীন গতিতে আর পূর্ণ স্বাধীনতায় অগ্রসর হওয়া। যা মনুষ্য জীবনের মতো প্রত্যেকটি ভাষাজীবনের স্বাভাবিক প্রবহমানতার জন্য অনিবার্য। বাধা পেলে জীবনের স্বাভাবিকতা যেমন নিষ্প্রভ হয়ে যায়, তেমনি নিষ্প্রভ হয়ে যায় ভাষা।
 
মানব জাতির সব সদস্যের কিছু স্বাভাবিক ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যা দিয়ে একটা জীব —মানুষ, না অন্য প্রাণী তা চিহ্নিত করা যায়। প্রত্যেক মানুষের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকলেও প্রত্যেকটি মানুষ এককভাবে অদ্বিতীয় সত্তার অধিকারী। ভাষাও ঠিক তেমনি; প্রত্যেক ভাষার কিছু স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য এবং উদ্দেশ্য আছে, তবে প্রতিটি ভাষা অদ্বিতীয় সত্তার মতো অদ্বিতীয় আচরণ করে থাকে। তাই এক ভাষাকে অন্য ভাষার উদাহরণ টেনে তার আদল-আচরণ এবং অবয়ব সজ্জা পরিবর্তন করা মানে  সার্জারির মতো অস্ত্রোপাচার করে প্রকৃতিবিরুদ্ধ পরিবর্তনের ন্যায় ভয়াবহ পরিণতি ঢেকে আনা। মনে রাখা উচিত, ভাষা জীবন্ত হলেও মাইকেল জ্যাকসনের মতো অপরিনামদর্শী নয় যে, সে নিজে নিজে জোর করে চেহারা পরিবর্তন করে ফেলবে।
বাংলা ভাষার প্রকৃত সৌন্দর্য হচ্ছে যুক্তবর্ণ। এই যুক্তবর্ণই বাংলাকে এমন  একটি অপরিমেয় শক্তি দিয়েছে যার কারণে সে পৃথিবীর অধিকাংশ শব্দই উচ্চারণ করার সামর্থ রাখে— যা পৃথিবীর আর কোনো ভাষা দিয়ে সম্ভব নয়। অনেকে মনে করেন, বাংলার সমোচ্চারিত শব্দ শ ষ স, জ য় ই ঈ উ ঊ ণ ন প্রভৃতি অপ্রয়োজনীয়। তাই এগুলোর কয়েকটি ছাঁটাই করা উচিত। যারা এটি বলে তারা কিন্তু নিজেদের দুই চোখের এক চোখ ছাঁটাইয়ের কথা বললে  সাপের মতো ফোঁস করে ওঠে। অনেক বাঙালির মুখে শুনেছি- বাংলা কঠিন ভাষা। সেদিন আমার এক বন্ধু কথা প্রসঙ্গে বললেন, বাংলা আসলে খুবই কঠিন।বললাম— সহজ ভাষা কোনটি? বলল— ইংরেজি। এরপর তাকে — “মাতৃভাষা মায়ের মতন, অবহেলাই ভুলের কারণ’ বাক্যটি ইংরেজি করতে বললাম, সে অনুবাদ করল না; বরং রেগে গেল। যেসব বাঙালি বাংলাকে কঠিন বলে, সেসব বাঙালি কী বলতে পারবে, সহজ ভাষা  কোনটি এবং ওই ভাষায় তার দক্ষতা কত প্রখর? মাইকেল মধুসূদনের পর এমন কোনো লোক জন্মগ্রহণ করেছে— এমন আমার জানা নেই। যিনি মাতৃভাষাকে কঠিন বলেন, প্রকৃতপক্ষে তিনি কোনো ভাষাই জানেন না, জানবেন কীভাবে? তার ভাষারই তো জন্ম হয়নি—  মাতৃভাষাই তো ভাষার মা। মা ছাড়া কেউ কি জন্ম নিতে পারে? যারা মাতৃভাষাকে কঠিন বলেন, তাদের ভাষা জানোয়ারের চিৎকারের মতো কেবল ইঙ্গিতবহ—  বোঝা যেতে পারে, কিন্তু ভাষার বৈশিষ্ট্যে পড়ে না।
মা-রূপী মাতৃভাষা ব্যক্তি-সত্তার হৃৎকম্পনের মতো অনিবার্য সুন্দরের নিপুণ অভিলাষ। যে-লোক নিজের ভাষাকে কঠিন মনে করে অন্যের ভাষার উদাহরণ টেনে নিজের ভাষাকে অন্যের ভাষার মতো গড়ে নিতে চায়, বা অনুরূপ ইচ্ছা প্রকাশ করে — সে যেন প্লাস্টিক সার্জারি করে নিজের চেহারাট বদলে নেয়। প্রকৃতিরুদ্ধ পরিবর্তন করে অনেকে সুন্দর হতে চেয়েছে, কিন্তু পরিবর্তে  কুৎসিত  কষ্ট আর অসহ্য যন্ত্রণায় ডুবে মরেছে। এই কারণে সংস্কৃত আর ল্যাটিনের মতো প্রভাবশালী ভাষকেও মরে যেতে হয়েছে। 
মা আর মাতৃভাষা দুটোই আত্মার নিবিড় বন্ধনে একাত্ম অনুভূতি। সন্তানের কাছে মা সবসময় শ্রেষ্ঠ, সম্মার্নাহ, পূজনীয় এবং ভালোবাসার মাধুর্য। মাতৃভাষার ঐশ্বর্য, সৌন্দর্য আর সমৃদ্ধির প্রতি সন্দিহান হয়ে, যে লোক মাতৃভাষাকে অবহেলা করে অন্য ভাষার সৌন্দর্যে লোলুপ হয়ে নিজ ভাষাকে জোর করে বিকৃত করে নিতে যায় তারা আসলেই কুলাঙ্গার। সপ্তদশ শতকের কবি আবদুল হাকিম তাদের জারজ  আখ্যায়িত করছেন। যারা এমন কুলাঙ্গার চরিত্রের অধিকারী তারাই কেবল মাতৃভাষার প্রতি এমন ঘৃণ্য বিদ্বেষ আর নিষ্ঠুর মনোভাব পোষণ করে। যারা মাতৃভাষার প্রতি এমন আচরণ করে, তারা যেন নিজের মায়ের প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ করে। এ ধরণের লোক সেসব লোকের মতো মতো— যারা নিজের মাকে লাথি দিয়ে ধনী প্রেমিকার মায়ের পাযের নিচে পড়ে থাকে, কুকুর হয়ে দু-মুঠো অন্নের লোভে।এমন লোভীরা বাঁচতে পারে,তবে মানুষের মতো নয়। স্বকীয় মূল্যবোধ নেই বলেই আমরা ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছি।
আকর্ষণীয় হওয়ার জন্য সাজা বা সাজানো আর অস্ত্রোপাচার করে চেহারা পাল্টানো এককথা নয়। বাংলা বানানের কার্যকর সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করার জন্য কিছু কিছু যুক্তবর্ণকে চেনারূপে নিয়ে আসা যায়— এটি হবে অলংকার পরিধান করানোর মতো প্রেমময় কাজ। কিন্তু, যদি বাংলা বানানকে সহজ করার অজুহাতে যুক্ত বর্ণ ভেঙে লেখার কথা বলা হয়, তো সেটি হবে প্লাস্টিক সার্জারি করে চেহারা বদলে ফেলা— এমন যারা করেছে তাদের কারও ভাগ্য কখনও সুখকর হয়নি। এমন হলে কীভাবে লিখব— স্তব্দ (স্‌+ত্‌+ব্‌+দ), ক্ষমা (ক্‌+ষ্‌+ম), প্রতিক্ষণ, কীভাবে লেখা হবে নন্দিনী আর ননদিনি?
 
আমি পরিবর্তনের বিপক্ষে নই, বরং পক্ষে; তবে, তা ধর্ষণের মতো জোরপূর্বক নয়, ভালোবাসার মতো নিবিড়। জীবন্ত ভাষা জীবন্ত প্রাণীর মতোই পরিবর্তনশীল। তবে, এই পরিবর্তন হতে হবে স্বাভাবিক। মানব শিশু জন্মের পর যেরূপ অবয়ব আর চিন্তাশক্তি নিয়ে জন্মায় — সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঠিক তেমন থেকে যায় না, পরিবর্তন হয় নানাভাবে, কিন্তু এ পরিবর্তন হয় প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে এত ধীরে হয় যে, পরিবর্তিত সত্তা এমন কি তার চার পাশের লোকজনও তা বুঝতে পারে না। ভাষার পরিবর্তনও এভাবে হওয়া উচিত। শিশু বড়ো হবে তাই তাকে যদি রাতারাতি পশু মোটা তাজকরণের মতো কৃত্রিম উপায়ে মোটা করার  চেষ্টা করলে যেমন হবে, ভাষাকে জোর করে পরিবর্তন করতে গেলেও তেমন হবে।
 আধুনিকতা, সহজকরণ আর পরিবর্তনের অজুহাতে যারা যুক্তাক্ষর পরিত্যাগ এবং ‘প্রায় সমোচ্চারিত’ বর্ণ বিলোপের কথা বলে— তারা কেন নিজের দু-চোখের এক চোখ, দু-কানের এক কান কিংবা শরীরের অতিরিক্ত অংশ ফেলে দেয় না?
যারা সহজকরণ আর আধুনিকতার দোহাই দিয়ে মাতৃভাষার স্বকীয়তা বিপর্যস্ত করার কথা বলে, তারা যেন নিজের মাকে প্যারিসের রাস্তায় অর্ধ উলঙ্গ করে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে। এ দুটোর মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য দেখি না।
মাতৃভাষা মায়ের ভাষা বলেই মাতৃভাষাকে অন্য ভাষার চেয়ে বেশি অধ্যয়ন করা আবশ্যক। নিবিড় সাহচর্য, পর্যাপ্ত অধ্যয়ন ও ভালোবাসার অভাব এবং দূরত্ব আর যোগাযোগহীনতা খুব কাছের মানুষকেও অপরিচিত এবং জানা বিষয়কেও কঠিন করে তোলে। যে ব্যক্তি নিজের মাতৃভাষাকে কঠিন বলে— সে নিশ্চয় কুলাঙ্গার সন্তানের মতো দীর্ঘ দিন জন্মদাত্রীকে অযত্ন-অবহেলায় পিষ্ট করেছে।
মধুসূদন বাংলাকে অবহেলা করে ইংরেজ হওয়ার জন্য দেশ ছাড়ার সংকল্প নিলে, মাতৃভাষারূপী বাংলা জননী মধুকে বলেছিল —
“যাস নে, বাবা। রাখব তোকে অরূপ যতন সাদরে।”
“কে গো বুড়ি ভিক্ষুক, জড়িয়ে আমায় শ্রীহীন এমন আদরে?” [মধুর জবাব]
“আমি তোর মা”,
জবাব দিল মধু— “চিনি না বুড়ি, হাত ছাড়্‌।”
“দিলাম ছেড়ে, চলে যা তুই— হারামজাদা কুলাঙ্গার,
ভিক্ষুক হয়ে আমার কোলে;
আসতেই হবে ফিরে—
error: Content is protected !!