কৃষ্ণচূড়া থেকে কৃষ্ণগহ্বর: কৃষ্ণ মানে কালো, ফুলটি কেন লাল

ড. মোহাম্মদ আমীন
 
 
সংযোগ: https://draminbd.com/কৃষ্ণচূড়া-থেকে-কৃষ্ণগহ্ব/
 
প্রথমে দেখি কৃষ্ণ মানে কী? √কৃষ্+ন (নক্), কৃ দিশাগ্রস্ত হয়ে নিঃশেষিত যাতে বা কেন্দ্রীভূত যাতে, কর্ষণজাত-এর রহস্যকরূপ থাকে যাতে বা যিনি প্রলয়ে বিশ্বকে নিজেতে আকর্ষণ করেন, অসিত, কালো, শ্যামলা, black প্রভৃতি অর্থে কৃষ্ণ শব্দটি বহুল প্রচলিত।
 
কৃ ও ষ্ বর্ণের অর্থ যোগ করলে যে ক্রিয়াটি পাওয়া যায়, তার স্বরূপ অনেকটা টর্চের আলোর বিপরীত স্বভাবের। টর্চের আলো ত্রিমাত্রিক শঙ্কু আকৃতির, যা টর্চ থেকে বের হয়ে সামনের দিকে প্রসারিত হয়। কিন্তু ঠিক বিপরীত যদি হয় তা হলে, প্রসারিত আলো বিপরীত মুখে ধাবিত হয়ে টর্চে প্রবেশ করে বিলীন হয়ে যাবে। অর্থাৎ সত্তার প্রসারিত অংশ যদি তার নিজের কেন্দ্রের দিকে বিপ্রসারিত বা আকৃষ্ট হয়ে না-কৃত হতে হতে কেন্দ্রে বিলীন হয়ে যায় তাকে কৃষ্ণ বলে। তার অর্থ দাঁড়ায়, ‘কৃষ্’-এর না-করণ যাতে সেটিই কৃষ্ণ। টচঁ আলোকিত করে, কিন্তু সে অন্ধকার।
 
কালো মানেই যা সঙ্কুচিত হতে হতে বিন্দুতে পৌঁছে স্বরূপকে অনালোকিত করে ফেলেছে। এটিই আধুনিক বিজ্ঞান চিহ্নিত ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর— যা থেকে মহাবিশ্বের উদ্ভব। কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’ অনুযায়ী, যিনি প্রলয়ে বিশ্ব আপনাতে আকর্ষণ করেন, তিনিই কৃষ্ণ; অর্থাৎ কালো/কাল বা ইংরেজিতে black। এই ‘কাল’-এর ভেতরে স্থান-কাল-পাত্রের কল-কল পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে। তাই সে কাল বা মহাকাল এবং কাল বা কালো; তাই সে কৃষ্ণ। তার থেকেই এ মহাবিশ্ব উৎসারিত।
 
রূপের চোখে এ কৃষ্ণই নিরাকার। আধুনিক বিজ্ঞানও বলে, সকল রঙের অনুপস্থিতি বা উপস্থিতিই হচ্ছে কৃষ্ণ। এ কালো থেকে আকারবিশিষ্ট বিশ্বজগতের উদ্ভব। এ কালোই বাংলাভাষীর কাছে— ‘কালো, গুণে আলো’।
 
নজরুল যখন বলেন, “কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন/ (তার) রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব যার হাতে মরণ বাঁচন।” তখন কালো কত রূপময় হয়ে ওঠে বাংলাভাষীর চোখে! এজন্য চোখের মণি কালো, মাথার চুল কালো, কেতাবের অক্ষর কালো। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।”জ্যোৎস্নাকে উপভোগ করা কী কৃষ্ণ-রাত ছাড়া সম্ভব? সম্ভব নয়, কারণ কালোই জগতের আলো।
 
কৃষ্ণচূড়া গাছটি অপেক্ষাকৃত অধিক সবুজ, তাই কিছুটা কালো। জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রচণ্ড গরমে চারদিক যখন অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন গাছটির চুড়োয় রক্তলাল ফুলগুলো কৃষ্ণগহ্বরের মতো সৃষ্টির উল্লাসে মণির মতো আলো এবং চুলের মতো সৌন্দর্যের মহালাস্যের প্রতীক হয়ে চারদিক আলোময় করে তোলে কালোময় মমাতার প্রেমাতুর শীৎকারে। রাতে কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো সত্যি কৃষ্ণগহ্বরের মতো নিকষ হয়ে ওঠে। এ নিকষ কৃষ্ণই দিনের বেলা গাছের চুড়োয় রঙিন স্বপ্নে জ্যৈষ্ঠ মাসের অসহ্য গরমেও দু দণ্ড শান্তির বারতা বয়ে আনে। তাই ফুলটির নাম রাখা হছে কৃষ্ণচূড়া। 
 
 
শিক্ষা বনাম দীক্ষা
 
শিক্ষা:  শিক্ষা একটি ব্যাপক বিষয়। অভিধানেও শব্দটি ব্যাপক অর্থে বিভূষিত। তৎসম শিক্ষা অর্থ (বিশেষ্যে) বিদ্যাচর্চা, অধ্যয়ন; অভ্যাস বা চর্চার দ্বারা আয়ত্তীকরণ (বিমান চালনা শিক্ষা); বিদ্যালাভ; উপদেশ, নির্দেশ ( গুরুর শিক্ষা); অভিজ্ঞতা, তিক্ত অভিজ্ঞতা (শিক্ষা নেওয়া); দণ্ড, শাস্তি; উচ্চারণসংক্রান্ত বেদাঙ্গবিশেষ। 
 
দীক্ষা: বাক্যে সাধারণত বিশেষ্যে হিসেবে ব্যবহৃত তৎসম দীক্ষা অর্থ— ধর্মোপদেশ, তত্ত্বজ্ঞান লাভের জন্য মন্ত্রগ্রহণ। অর্থাৎ ধর্ম বা মাতবাদিক শিক্ষাই হলো দীক্ষা। দীক্ষায় ধর্মীয় উপদেশ প্রদানই মূল বিষয়। এ ছাড়া আর কিছু নেই। একসময় শিক্ষার চেয়ে দীক্ষা ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দীক্ষার গুরুত্ব ক্রমশ কমে যাচ্ছে। এখানে তত্ত্বই একমাত্র বিষয়। তথ্য অনাবশ্যক।
 
অভিধানে নির্দেশিত অর্থমতে, দীক্ষা সীমিত পরিধিতে ধর্ম বা বিশ্বাস্য মতবাদে আবদ্ধ একটি সীমিত পরিসরের ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়। পক্ষান্তরে শিক্ষা ব্যাপক পরিধি আর বৈচিত্র্যময় শৈলীতে প্রায়োগিক প্রজ্ঞায় লব্ধ অভিজ্ঞানের ভিত্তিতে সজ্জিত বহুমুখী বিষয়। এখানে ধর্ম, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন সব আছে।
 
শিক্ষা সাধারণত সর্বজনীন, আধুনিক চিন্তা, বিজ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও গবেষণা নির্ভর। দীক্ষা সাধারণত বিশ্বাস, প্রথা, রেওয়াজ, শ্রুতি ও পৌরাণিক গল্প-নির্ভর। দীক্ষা হয় মুখে মুখে, এখানে শিক্ষা বা বাস্তবতা বা প্রায়োগিক অভিজ্ঞান অনাবশ্যক। শিক্ষা অর্জনের জন্য  মুখ, হাত, কলম সব প্রয়োজন। দীক্ষা বংশপরম্পরা বিশ্বাস নির্ভর, কিন্তু শিক্ষা ব্যাবহারিক সাধনায় আয়ত্তীকরণ নির্ভর।
 
যিনি দীক্ষা দেন তিনি দীক্ষক আর যিনি শিক্ষা দেন তিনি শিক্ষক।  দীক্ষক গবেষণার ধার ধারেন না। তিনি তার জানা বিষয়ের সত্যমিথ্যা যাচাই করাকেও প্রয়োজন মনে করেন না। এ বিষয়ে  প্রশ্ন তোলাও তাদের জন্য নিষিদ্ধ। দীক্ষিতেরও দীক্ষকের দীক্ষা বিষয়ে প্রশ্ন বা সংশয় করার হেতু থাকে না। শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষক বা অধীতি কারো এমন সহজ সুযোগ নেই। দীক্ষক যা শিখেছে এবং যা শেখাচ্ছে তা বিশ্বাস নির্ভর বলে কোনো প্রশ্ন তোলা যায় না। শিক্ষা বিশ্বাস নির্ভর নয় বলে যে-কোনো সময় প্রশ্ন তোলা যায়।
 
শিক্ষককে জানা বিষয় নিয়েও গবেষণা করতে হয়। তার জানা প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করাতে তার অর্জনের বিশালত্ব নির্ভর করে। শিক্ষকের ভিত্তি সন্দেহ, সংশয় ও অবিশ্বাস থেকে গবেষণার মাধ্যমে প্রায়োগিক বাস্তবতায় উপনীত হওয়া। দীক্ষকের ভিত্তি কেবল বিশ্বাস। শিক্ষার্থী শিক্ষকের জ্ঞান সম্পর্কেও প্রশ্ন বা সংশয় টানতে পারে। দীক্ষার্থী তা পারে না। দীক্ষকের কাছে বিশ্বাস এবং শ্রুতিই যথেষ্ট। তার গবেষণা অনাবশ্যক।  কিন্তু শিক্ষককে প্রতিদিন তার প্রতিটি  জানা বিষয়ে নতুন তত্ত্ব ও তথ্য দিয়ে আরও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। দীক্ষকের এসব নিয়ে ভাবনা নেই।
 
মতবাদ যা বলছে তা সত্য হোক বা মিথ্যা হোক দীক্ষিতের কাছে সেটাই সে মন্ত্রের মাধ্যমে দীক্ষিতের কাছে তুলে ধরে। জানা বিষয়ের ভুল অনুসন্ধান এবং ভুল প্রাপ্তি শিক্ষকের আনন্দ। দীক্ষকের আনন্দ হচ্ছে পুরানো বিষয় আঁকড়ে থাকা।
 
 
 
 
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
— — — — — — — — — — — — — — — — —
প্রতিদিন খসড়া
আমাদের টেপাভুল: অনবধানতায়
— — — — — — — — — — — — — — — — —
Spelling and Pronunciation
HTTPS://DRAMINBD.COM/ENGLISH-PRONUNCIATION-AND-SPELLING-RULES-ইংরেজি-উচ্চারণ-ও-বান/
error: Content is protected !!