কেঁচে গণ্ডূষ কথাটার আসল মানে: কেঁচে গণ্ডূষ অর্থ কী

 ইউসুফ খান

এই পেজের সংযোগ: https://draminbd.com/কেঁচে-গণ্ডূষ-কথাটার-আসল-ম/

কেঁচে গণ্ডূষ কথাটার আসল মানে: কেঁচে গণ্ডূষ অর্থ কী

 
কেঁচে যাওয়া
কেঁচে যাওয়া কথাটা আমরা সবচেয়ে ভালো বুঝি লুডো খেলতে গিয়ে। লুডোয় নিজের ঘর থেকে বেরোনো ঘুটি প্রায় পেকে যেতে যেতে অন্যের হাতে কাটা পড়ে আবার ঘরে ফিরে এলে আমরা বলি ঘুটিটা কেঁচে গেছে, মানে পাকা ঘুটি কাঁচা হয়ে গেছে। তাকে আবার তার ঘর থেকে বের করতে আবার নতুন করে দান চালতে শুরু করতে হবে। মানে পরীক্ষায় ফেল করে নতুন করে একই ক্লাসে ফিরে এসে পুরনো পড়া শুরু করার মতো।
 
গণ্ড
আদিম মানুষ প্রথম দিকে যে সব শব্দ তৈরি করেছে তা তার হাতের কাছের গাছ পাথর দেখে আর তার নিজের হাত পা মুখ মাথা দেখে দেখে। সব জীবন্ত ইডিঅমেটিক ভাষার এটা লক্ষণ। খাঁটি বাংলা ডিকশনারিতে হাত পা মুখ মাথা চোখ কান আঙুল ইত্যাদি নিয়ে লিখতে গেলে অনেক
ইউসুফ খান
প্যারাগ্রাফ খরচ করতে হবে। এই রকম একটা দেহজ শব্দ – গণ্ড। গণ্ড কথাটার মূল মানে গাল, যে গাল টিপে আমরা আদর করি। এই গণ্ডের মানের বিস্তার হয়ে গণ্ড বহুউউদূর পৌঁছে গেছে।
গণ্ড কথাটা উত্তর মধ্য পূর্ব ভারতের সব ভাষারই বহু শব্দে বহু রূপে ঢুকে বসে আছে। গণ্ড ধ্বনিতে গ ণ ড আছে। দ্রাবিড় তামিলে ঘোষ ধ্বনি গ ড নেই, আর আর্যরা মূর্ধন্য ধ্বনি ণ ড পরে শিখেছে। তাই গণ্ডের প্রাগার্য প্রাক্‌-দ্রাবিড় মুণ্ডারী ঐতিহাসিকতা স্বতঃসিদ্ধই মনে হয়।
 
গণ্ডগোল
কোলের বাচ্চার গাল দুটো ফুলো ফুলো গোল গোল হয়। হাঁটা-বাচ্চার গাল ফুলো হলে আমরা তাকে রাগাই ‘গালফুলো গোবিন্দর মা’ বলে। ইসকুলের ছোঁড়ারা প্রথম প্রথম যখন বিড়ি ফুঁকতে শেখে তখন একমুখ ধোঁয়া নিয়ে গালদুটো ফুলিয়ে রাখে। এই ফোলা ফোলা গোল গোল টোবো গালই হচ্ছে গণ্ড। গণ্ড থেকে ব্যঞ্জনায় গোল-ফোলা-মোটা আসে, এই মূল কথাটা মাথায় রাখলে উত্তর ভারতীয় বহু ভাষার গণ্ড-যুক্ত বহু শব্দের মূলোদ্ধার হয়ে যাবে। প্রাকৃত ভাষা থেকে প্রাচীন এবং অর্বাচীন সংস্কৃতে যেসব গণ্ড-গোলের শব্দ নেওয়া হয়েছে সেগুলোরও মানে বোঝা যাবে।
 
গালগোল
গণ্ড মানে গাল। গাল পেতে শোবার গোল বালিশ হচ্ছে গালবালিশ গণ্ড-উপধান গণ্ডোপধান। গালের টোলকে বলে গণ্ডকূপ।
গণ্ড মানে গোল। বুদবুদ ফোঁড়া গাঁট এরা সবাই গোল তাই এরা গণ্ড। গাঁটকে গণ্ডু-ও বলে। ছেলেদের পরার জন্য গোল গোল সোনার পুঁতির মালা হচ্ছে গণ্ডমালা।
গণ্ড মানে ফোলা। ঘাড় গলা বগল কুঁচকির গাঁট ফুলে যা হয় তা গণ্ড। সাঁওতালিতে কুঁচকি আর বগলের ফোঁড়াকে এখনও গণ্ড্‌-ই বলে। গলা ফোলা রোগের নাম গলগণ্ড। আতার গায়ে ফোলা ফোলা ফোঁড়ার মতো তাই আতার আর এক নাম গণ্ডগাত্র। হাড়গিলে পাখির গলায় গণ্ড আছে তাই হাড়গিলের আর একটা নাম গলেগণ্ড।
 
গণ্ডোপল
মুঠোয় ধরার মতো গোল গোল কালো পাথরকে বলে গণ্ড-উপল গণ্ডোপল। যে যে পাহাড় থেকে এই গণ্ডশিলা পাওয়া যায় তা গণ্ডক গণ্ডকী। যে নদী থেকে এই গণ্ডশিলা পাওয়া যায় তা গণ্ডকী নদী। গণ্ডকী নদীর শিলা তাই গণ্ডকী শিলা। গণ্ডকী নদী নেপাল থেকে বেরিয়ে পাটনার কাছে এসে ভাগীরথীতে পড়েছে। এই নদীতে যে কালো গণ্ড পাথর পাওয়া যায় তা পুরুতদের কাছে বিষ্ণুর প্রতীক। গণ্ডকী নদীর পথে শালগ্রাম এলাকা থেকে এই গণ্ডোপল পাওয়া যেতো তাই একে বলে শালগ্রাম শিলা।
 
গণ্ডগ্রাম
গণ্ড মানে বড়ো। গণ্ডর এই বৃহত্তর মানে বাঙালীর নিজস্ব আবিষ্কার। বাংলায় তাই বড়ো গ্রাম হচ্ছে গণ্ডগ্রাম। ১৮৩৫ সালে সমাচার দর্পণে লেখা হয়েছে ‘গণ্ড ও ক্ষুদ্র গ্রাম’। এখন অবশ্য গণ্ডগ্রামের মানে লোকে বোঝে ছোটো গ্রাম।
বাঙালীর অর্বাচীন সংস্কৃতে গণ্ডমূর্খ মানে মহামূর্খ। এই গণ্ডমূর্খই এখন হয়েছে গাণ্ডু। যদিও বাংলায় এটা এসেছে হিন্দি হয়ে, খারাপ মানে থেকে।
পারসিতে গোল মানে হচ্ছে চেঁচামেচি হইচই ঝামেলা। সেটাই বেশি বেশি করে হলে সেটা গণ্ডগোল।
পাহাড় থেকে ধ্বসে বা ভূমিকম্পে বা অগ্ন্যুৎপাতে খসা বিরাট পাথর হচ্ছে গণ্ডশৈল। ‘সুমেরু বাহিয়া পড়িলা গণ্ডশৈলে’ – গঙ্গামঙ্গল।
বেশিবেশি বা বাড়াবাড়ি মানেতে সাঁওতালি কথাটা হচ্ছে গাণ্ডে-মুণ্ডে। ‘গাণ্ডে মুণ্ডেকো দালকেদেআ’ মানে, তারা ওকে খুব পিটিয়েছে। ‘গাণ্ডে মুণ্ডেএ জোমকেদা’ মানে, সে বাড়াবাড়ি রকমের খেয়েছে। এখান থেকেই বাংলা গাণ্ডেপিণ্ডে কথাটা এসেছে। গণ্ড মানে বড়ো এই মানেটা বাঙালি বোধহয় সাঁওতালি থেকেই পেয়েছে।
 
গণ্ডগাণ্ড্‌
গণ্ড মানে ফোলা। গোল হয়ে ফোলা ফোঁড়া হচ্ছে গণ্ড আর বড়ো টিউমার হচ্ছে গাণ্ড বা গাঁড়। গোদের ওপর বিষফোঁড়া ‘গণ্ডোপরি বিস্ফোটক’। গলা জুড়ে বড়ো বড়ো আলুর মতো ঝুলে থাকা টিউমারকে বলতো গণ্ডমালা বা গাঁড়মালা। গোল এবং ফোলা বলে আমাদের পাছাকেও বলে গাণ্ড গাঁড়। এটা একটা সাধারণ কথাই ছিলো, কিন্তু হিন্দির প্রভাবে এটাকে এখন গালি ভাবা হয়। গাঁড় ঠেকিয়ে বসার পিঁড়েকে ২৪ পরগনায় বলে গাঁড়কাঠ। পিঁড়েকে সাঁওতালিতে বলে গণ্ডো আর কাঠের বড় গুঁড়িকে বলে গণ্ড্‌কে।
 
গেণ্ডাগুণ্ডা
গণ্ড মানে মোটা। মোটাসোটা গাঁট্টাগোট্টা রাইনোর নাম তাই গণ্ডক গণ্ডাঙ্গ গণ্ডাল গণ্ডার; হিন্দি মারাঠিতে গেণ্ডা, অসমীয়াতে গঁড়্‌, বাংলায় গ্যাঁড়া, সাঁওতালিতে গাণ্ড-গৗরুর।
খাগ মানে শর গাছ হচ্ছে সরু কঞ্চির মতো ঘাস। কিন্তু মোটা বেত গাছের নাম গেণ্ডাগল্লা। আরও মোটা হচ্ছে গেণ্ডারি মানে আখগাছ। বিশাল বড়ো একটা গাছেরও নাম গেণ্ডারি গাছ।
আগে গাঁট্টাগোট্টা হাট্টাকাট্টা শক্তপোক্ত ষাঁড়ের মতো চেহারার লোকদের বলতো ষণ্ডাগণ্ডা গোণ্ডা গুণ্ডা। হতে পারে এই কারণেই কোইতুর বা কোই জাতির লোকেদের লোকে বলতো গোণ্ড্‌। এরা খুব ভালো পালকিবাহক হতো। অবশ্য নৃতত্ত্ববিদ জেনারেল কানিংহাম আন্দাজ করছেন এরা গৌড়ের লোক তাই গোণ্ড্‌।
 
গুণ্ডিগণ্ডি
গণ্ড মানে গোল। গাছের সবচেয়ে মোটা গোলাকার অংশটা হচ্ছে গাছের কাণ্ড, তাই এর নাম গুণ্ডি গুঁড়ি। গাছের শাখা যতদূর বিস্তৃত মানে দুপুরের রোদে গাছের তলায় যতটা এলাকায় গোল হয়ে ছায়া পড়ে ততটা এলাকা হচ্ছে গণ্ডি। গণ্ডি অর্বাচীন সংস্কৃত। গণ্ডির মধ্যে টু-ডি গোল ব্যাপারটা আছে। এ থেকে বৃত্তাকার ঘেরকে বলা হতো গণ্ডি। পরে গণ্ডি মানে হয় মন্ত্রপূত গোল ঘের যার ভেতরে বা বাইরে কোনও অপদেবতা মানুষ জীব যেতে আসতে পারে না। কৃত্তিবাসী রামায়ণে আছে –
গণ্ডি দিয়া বেড়িলেন লক্ষণ সে ঘর।
প্রবেশ না করে কেহ ঘরের ভিতর॥
পুরো বৃত্ত না হলেও অর্ধবৃত্ত বা বৃত্তচাপ আকারের হয় বলে ধনুককে বলে গণ্ডি গণ্ডী। ‘গণ্ডিখান ভাঙিলেন রাম’ – শ্রীধর্ম্মমঙ্গল, মানিক গাঙ্গুলি।
 
গাল গণ্ডূষ
গণ্ড মানে গাল, যে গাল বাইরে থেকে দেখা যায়। এই গণ্ড থেকেই মুখের ভেতরে গালের দিকটাও গণ্ড। মুখের ভেতর যতটা খাবার ধরানো যায় সেই পরিমাণ খাবার হচ্ছে এক গাল এক গণ্ডোল। মুখের ভেতরে গালের মধ্যে যতটা জল ধরে রাখা যায় তা এক গণ্ডূষ পরিমাণ। মুখের ভেতরের চিকিৎসার জন্য আয়ুর্বেদ মতে ওষুধ-গোলা তিল তেল মুখে পুরে এমনি ধরে রাখাকে বলা হতো গণ্ডূষঅ বা গণ্ডূষা। তেলটা না ফেলে মুখের ভেতরে রেখেই কুলকুচো করাকে বলতো কৱল, মানে কুলি কুল্লি কুলকুচো। পরে এই গণ্ডূষ বা গণ্ডূষার মানেই দাঁড়িয়েছে মুখভর্তি জল। আর এক গণ্ডূষ জল গেলার নাম হয়েছে গণ্ডূষ করা।
 
তেলো গণ্ডূষ
গাল বাইরে থেকে গোল ফোলা, কিন্তু ভেতর থেকে গোল গভীর। তাই গোল গভীরকেও গণ্ড বলা হয়। কুলকুচো করার জন্য পুকুর থেকে এক গণ্ডূষ জল নিতে আমরা এক হাতের আঙুলগুলো জুড়ে হাতের তেলোটাকে খোঁটর বাটি মতো করি, হাতের এই গণ্ডতে যতটা জল ধরে রাখতে পারি সেটাও হলো এক গণ্ডূষ। হাতির শুঁড়ের শুরুটাও তাই গণ্ডূষ।
হাতের এক গণ্ডূষ জল খুব অল্পই। তাই অল্পবিদ্যে লোক বেশি ফটরফটর করে বলে বাংলার অর্বাচীন সংস্কৃতে একটা লোকপ্রসিদ্ধ উদ্ভট শ্লোক আছে –
অগাধ জলসঞ্চারী বিকারী ন চ রোহিতঃ।
গণ্ডূষজলমাত্রেণ সফরী ফরফরায়তে॥
অগাধ জলের রুইমাছের বিকার নেই, গণ্ডূষ জলে পুঁটিমাছ ফরফর করে।
 
গণ্ডূষ করা
খাওয়ার আগে পরে হাতের গণ্ডূষে জল নিয়ে মন্ত্র পড়ে জলটা খাওয়াকে বলে গণ্ডূষ করা। গণ্ডূষ করা বা গণ্ডূষ করে লাগা – মানে কুলকুচো করে খেতে বসা। ফিরা গণ্ডূষ – মানে একবার খাওয়ার পর আবার খাওয়া। মুখে গণ্ডূষ জল দেয়া – মানে রোগীর মুখে জল দেয়া। এক গণ্ডূষ জল দেয়া – মানে পিতৃপুরুষের তর্পণ করা।
 
কেঁচে গণ্ডুষ
এখন গণ্ডূষ করা মানে দাঁড়িয়েছে খাওয়া শুরু করার আগে এবং শেষ করার পরে কর্তব্য বিশাল শাস্ত্রাচার। এটা করার অধিকার শুধু ব্রাহ্মণ বৈশ্য ক্ষত্রিয় বর্ণের পুরুষদের। শূদ্র এবং নারী বিবর্জিতা।
প্রথমে মুখ ধুয়ে পঞ্চার্দ্র হয়ে পূবদিকে মৌনী হয়ে বসে খাবারের ওপর জলের ছিটে দিয়ে দশবার গায়ত্রী মন্ত্র পড়ে পঞ্চবায়ুকে ভূতিবলি দিতে হবে। তার জন্য অল্প অন্নকে পাঁচ ভাগা করে সব ভাগাতে অল্প করে জল দিতে হবে আলাদা আলাদা পাঁচ রকম মন্ত্র পড়তে পড়তে। এরপর এক তেলো জল নিয়ে তার অর্ধেকটা চুমুক দিয়ে খেয়ে বাকিটা আবার খাবারের ওপর ছিটোতে হবে। এরপর আবার মন্ত্র পড়ে আঙুল দিয়ে খাবারে ঘি ছিটিয়ে নিয়ম মেনে খাওয়া শুরু করতে হবে। খাওয়া শেষে আবার এক গণ্ডূষ জল নিয়ে মন্ত্র পড়ে আধ গণ্ডূষ খেয়ে বাকিটা মাটিতে ফেলতে হবে। একে বলে গণ্ডূষ ত্যাগ।
সংক্ষেপে ব্যাপারটা এই, কিন্তু বলতে গেলে সে আরও অনেক কথা।
পেটুক ব্রাহ্মণ তার যজমান বাড়িতে পুরো কাণ্ডটা করে খাওয়া দাওয়া একদফা সেরে ফেলার পর তার আবার একবার খেতে ইচ্ছে করলে ব্রাহ্মণ তার গেরস্ত শিষ্যকে ডেকে বলতো – আগের বার শাস্ত্রাচারে একটু ভুল হয়ে গেছে, তাই পুরো ব্যাপারটা কেঁচে গেছে, তাকে আবার গণ্ডূষ করতে হবে। মানে পুরো প্রসেসটা এবং খাওয়া দাওয়া ব্যাপারটা নতুন করে করতে হবে। একেই বলে কেঁচে গণ্ডূষ করা বা ফিরা গণ্ডূষ করা। ইডিআম হয়ে গিয়ে যার মানে দাঁড়িয়েছে – একবার করে ফেলা এবং হয়ে যাওয়া কাজ আবার নতুন করে করা।
(ত্রুটি মার্জনীয়, শুদ্ধি প্রার্থনীয়)
 
error: Content is protected !!