কোজাগরি

ড. মোহাম্মদ আমীন

কোজাগরি

প্যাঁচায় কুড়কুড়ায়, খোড়ইল্যা সোনার তুক পায়।
 
শরৎকালের পূর্ণিমার রাত বৎসরের সবচেয়ে উজ্জ্বল রাত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই রাতে ধনসম্পদ, প্রাচুর্য, সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী বিষ্ণুলোক হতে ধরায় নেমে আসেন এবং মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে “কে জেগে আছ?” এই প্রশ্ন করেন (নিশীথে বরদা লক্ষ্মী কোজাগর্তিভাষিণী- অর্থ নিশীথে বরদাত্রী লক্ষ্মীদেবী, ‘কে জেগে আছ’ বলে সম্ভাষণ করেন)।
 
যে বা যারা এই রাতে লক্ষ্মীব্রত করে জেগে থাকেন দেবী তার কাছ থেকে সাড়া পান এবং ওই গৃহে প্রবেশ করে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করেন। কোজাগর বা কোজাগরি শব্দের আক্ষরিক অর্থ “কে জেগে আছ?” তবে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথি এবং ওই তিথিতে অনুষ্ঠিত লক্ষ্মীপূজাকে যথাক্রমে কোজাগরি পূর্ণিমা এবং কোজাগরি লক্ষ্মীপূজা অভিহিত করা হয়।
 
কোজাগরি একটি সন্ধিবদ্ধ সংস্কৃত শব্দ। কঃ (কে) + জাগর ( জেগে আছ?)। এটা আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথি। এর অন্যান্য প্রতিশব্দ দ্যূতপূর্ণিমা, লক্ষ্মীপূর্ণিমা ও আশ্বিনী পূর্ণিমা। এই সময় বাংলায় সবচেয়ে অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করে। হিন্দুদের দাশরথি রায়ের পাঁচালিতে আছেঃ ‘ঘূমে লক্ষ্মী হন বিরূপা, জাগরণে লক্ষ্মীর কৃপা, নৈলে কেন জাগে কোজাগরে?’ লক্ষ্মী বলেন, এই পূর্ণিমায় যে জাগে, তাহাকে ধন দিব। এই তিথিতে অক্ষক্রীড়া নারিকেলজল-পান ও চিপিটক (চিড়া) ভক্ষণ বিহিত।
 
কোজাগরি নিয়ে একটি সুন্দর প্রাবদও আছে। লক্ষ্মী দেবী মর্ত্যে এলেন। প্যাঁচা আনন্দচিত্তে দেবীর সঙ্গে সারারাত কোলাহল করে বেড়াল। প্যাঁচা ভোরের আলো দেখে গাছের কোটরে ঢুকে পড়ে এবং কাঠঠোকরা আলো দেখে গাছের কোটর হতে বের হয়ে এল। দেবী কাঠটোকরাকে দেখে ভাবলেন ইনিই তিনি, যিনি সারা রাত আমার সঙ্গে ঘুরেছেন। দেবী, আনন্দচিত্তে কাঠঠোকরার মাথায় মুকুট পরিয়ে দিলেন। জন্ম হলো চাকমা প্রবাদের- “প্যাঁচায় কুড়কুড়ায়, খোড়ইল্যা সোনার তুক পায়।”
 
সূত্র: ড. মোহাম্মদ আমীন, বাংলা ভাষার মজা, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

শব্দে ফাঁক- অফাঁক 

শব্দ শুধু একা নিজেকে প্রকাশের জন্য যথেষ্ট নয়। সে অনেক সময় যে বাক্যে ভর করে সে বাক্যকে সমীহ করতে বাধ্য হয়। এমনকি ফাঁক- অফাঁকও শব্দের অর্থে প্রভাব বিস্তার করে। যেমন: ‘ধূমপানমুক্ত এলাকা’ মানে এমন একটি এলাকা যেখানে ধূমপান থেকে বিরত থাকা হয়, ধূমপান করা হয় না, ধূমপান থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে।
 
অন্যদিকে, ‘ধূমপান মুক্ত এলাকা’ মানে ধূমপানের জন্য খোলা এলাকা, এমন এলাকা যেখানে ধূমপান করলে একটা জায়গায় আবদ্ধ হয়ে থাকবে না এবং অন্যের ক্ষতি বা বিরক্ত সৃষ্টির আশঙ্কা নেই। ‘ধূমপান মুক্ত’ বাগ্ভঙ্গিটি ধূমপানের জন্য নির্ধারিত এলাকা বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়। এখানে ‘মুক্ত’ মানে ‘ধূমপান করায় বাধা নেই’।
 
সূত্র: ড. মোহাম্মদ আমীন,ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
জগদ্দল পাথর
জগদ্দল = জগৎ + দল। পৃথিবী দলন করে এমন পাথরকে জগদ্দল পাথর বলে। যে পাথর পৃথিবীকে দলিত করে তা খুব ভারি হবে। এমন গুরুভার পাথরকে জগদ্দল পাথর বলা হয়। রূপকার্থে  জগদ্দল পাথর বলতে দুঃসহ দুঃখ-কষ্ট ছাড়া আর কিছু বুঝাবে না। জগদ্দল কথার আক্ষরিক অর্থ হলো “জগতের দলন কর্তা”। বিশ্ব দলনে সক্ষম গুরুভার পাষাণ। এটি পুংলিঙ্গ। জগৎ পূর্বক দল ধাতু যোগে অন প্রত্যয়। জগদ্দল পাথর বুকে বলতে বুক যে পাষাণ এর গুরুভার বইতে অক্ষম। যখন কোনো অব্যক্ত বেদনা একের পর এক নিজের বুকের ওপর চেপে বসে তখন এই শব্দ টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
 
কাঠামোগত ও অবকাঠামোগত
কাঠামোগত অর্থ: কোনোকিছু নির্মাণের জন্য বাঁশ, কাঠ বা লোহার তৈরি গড়ন, আকৃতি, ধরন। অবকাঠামোগত অর্থ: কোনোকিছু স্থাপনের বা নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎসরবরাহ প্রভৃতি।
প্রয়োগ:  কাঠামোগত দুর্যোগ মোকাবেলার তুলনায় অকাঠামোগত দুর্যোগ মোকাবিলা সহজ।
 
সূত্রড. মোহাম্মদ আমীন,কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ. পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
error: Content is protected !!