কোট কোটি

ইউসুফ খান

কোট
নরম মাটিতে শক্ত খোলামকুচি দিয়ে দাগ টানলে মাটিতে সেই দাগটা কেটে বসে। সেজন্য বলা হয় দাগ কাটা। দাগ কেটে চৌকো বা

ইউসুফ খান

গোল করে ঘেরা ঘরটা কোট। কোটের এই প্রাথমিক মানেটা বাংলার বহু কথায় টিকে আছে। কিতকিত খেলায় মাটিতে দাগ কেটে কোট বানাতে হয়। উঠোনডাঙা খেলায় দাঁড়ানোর জায়গা হিসেবে এরকম কোট কাটা হয়। হিঙেডাঁড়ি বা দাড়িয়াবান্ধা খেলায় কোদাল দিয়ে মাটিতে গভীর দাগ কেটে কোট বানাতে হয়। ষোলোঘুটি আর বাঘবন্দি খেলা আউটডোরে খেললে খোলামকুচি বা কাঠি দিয়ে মাটিতে কোট কাটতে হয়,  ইনডোরে হলে মেঝের সানে রঙিন ঘুটিং দিয়ে বা খড়ি দিয়ে কোট কাটতে হয়। দাবার ছকে ৬৪টা ঘরকে কোট বলে। লুডোতে ঘুটিগুলো সারা পথ ঘুরে পেকে এসে শেষে কোটে ওঠে। হাডুডু কবাডি খেলাতেও দুদিকে দুটো কোট থাকে। সবগুলোতেই কোট মানে দাগ দিয়ে ঘেরা ঘর।  করোনার সময়ে দূরে দূরে দাঁড়ানোর নির্দেশনা-সমেত বাজারে স্টেশনে চক দিয়ে যে ঘর কেটে দেয়া হচ্ছে সেটাও কোট। জ্যোতিষীরা দাগ দিয়ে কাটকুট খেলার মতো যে ছক কাটে সেটাও কোট, যার সংস্কৃত হয়েছে কোষ্ঠী। ইংরেজি কোর্ট এর মানেও এই কোট। একই প্রত্নভাষা থেকে আসা শব্দ। টেনিস-কোর্ট ভলিবল-কোর্ট ফুটবল-কোর্ট। এছাড়া আছে বিচারের কোর্ট আর কোর্টশিপ। কোর্টশিপে ছেলেময়েকে একটা কোটের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রোপোজ় করতে হতো। ইংরেজিতে সমতলে দাগ দিয়ে ঘেরা ঘর মানেতেই কোর্ট কথাটা বেশি চলে। বাংলায় তথা উত্তরভারতে কোট এর ব্যবহার বহুতর এবং বেহতর।

কোটে  পাওয়া নেওয়া
কোট মানে আয়ত্তি, অধিকার, জোরের-জায়গা, সীমানা, সরহদ। আমার কোট আমার দুর্গ। বাংলা প্রবাদে বেঁচে আছে এই আপন আয়ত্তির কোট – ‘আপন কোটে পাই, চিঁড়ে কুটে খাই’। হিন্দিতে বলা হয়:  আও কভি হাবেলি পে, দেখ লেঙ্গে তুমকো। এই একই অর্থ প্রকাশে  ৬০০ বছর আগে লেখা কৃত্তিবাসী রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে আছে শত্রুঘ্ন অশ্বমেধের ঘোড়া ছেড়েছে,
‘সে ঘোটক আটক না হয় কোন কোটে।
পশ্চিম-দিকেতে অশ্ব তারা যেন ছোটে॥’
২০০ বছর আগে লেখা দাশরথি রায়ের পাঁচালিতে আছে, কংসের ধনুর্যজ্ঞে শ্রীকৃষ্ণ মথুরায় যাবে শুনে মাতা নন্দরাণী ভয় পেয়ে কৃষ্ণকে বোঝাচ্ছেন –
‘… সে নিষ্ঠুর হাতে কেন যাইস্‌?
এবার লয়ে নিজ কোটে, ফেলিবে ঘোর সংকটে,
যাস্‌নে রে, – মায়ের মাথা খাইস্‌॥’

কোট ধরা
কিতকিত খেলায় একটা একটা করে কোট দখল করতে হয়। একে বলে ‘কোট ধরা’। নিজের কোটে দম ফেলা যায় নিঃশ্বাস ছাড়া যায়। কাবাডি খেলায়  নিজের কোটে থাকলে তাকে কেউ ছুঁতে বা মারতে পারে না। নিজের আয়ত্তি সীমানা সরহদ থেকে বাইরে যাওয়াকে বলে ‘কোটের বাইরে যাওয়া’। কিতকিতের ঘুটি কোটের বাইরে চলে গেলে ঘুটিটা মরে যায়। নিজের আয়ত্তি ধরে থাকা অধিকার-না-ছাড়া হচ্ছে ‘কোট ধরে থাকা’, ‘কোট বজায় রাখা’। ‘তুই তো শুধু নিজের কোটটাই ধরে বসে আছিস, অন্যদের কথা ভাবছিসই না’। এখান থেকেই এসেছে ‘কোট ধরে বসে থাকা’ মানে গোঁ-ধরে-থাকা জিদ-করা অনমনীয় থাকা। ‘কোট করে বসা’ মানে পণ করে বসা।

কোট কোটাল
একেকটা কোট একেকজনের অধিকারের শাসনের সীমানাবদ্ধ এলাকা। এই এলাকা-পাড়া-গ্রাম-নগর-জনপদ মানেতে বহু স্থাননাম আছে – রাজকোট শিয়ালকোট মঙ্গলকোট নাঙ্গলকোট বারকোট আচিলকোট ধামালকোট … অনেক। পাঠানকোট। এই কোট থেকেই কোটৱাল কোতোয়াল নগররক্ষক।

কোটা  কোঠা
ঘর বা খোপ মানেতে কোট এর কোটে থাকা আর একটা কথা কোটা বা কোঠা। ‘মেয়ের বয়েস তো তিরিশের কোটায় যেতে চলল, এবার বে দে দাও।’ এখন বলে তিরিশের কোঠায় তিরিশের ঘরে। আগে অঙ্কের মাস্টার বলতেন ‘কালকে ৯-এর কোঠার নামতাটা মুখস্থ করে আনবি’। এখন বলে নয়ের ঘরের নামতা বা নয়ের নামতা।

কোটি
কোট এর কগনেট কথা কোটি মানেও খোপ পর্ব বিভাগ বর্গ। উচ্চকোটির মানুষ, নিম্নকোটির সমাজ, তেত্রিশ কোটি দেবতা। এগুলোতে কোটি মানে বিভাগ। এই কোটি হচ্ছে পরিসংখ্যানের cohort কোহর্ট, ক্লাসিফিকেশনের অ্যালগরিদম বাকেট সর্টিং এর বাকেট খোপ প্রকোষ্ঠ।

কোট কোটা কোঠা
এতক্ষণ যত সব কোট এর কথা বললাম সেগুলো সবই টু-ডি। কোট থ্রি-ডি হলে কোট সম্বন্ধীয় সহস্র শব্দের নতুন একটা ডাইমেনশনের উন্মোচন হয়ে যায়। কোষ্ঠ চেম্বার ঘর বোঝাতে তখন চলে আসে কোট্ট কোটো কোটা কুটি কোঠা কুঠি কোটর কুটুরি কুটির। দালানকোঠা মাঠকোঠা নীলকুঠি। দু কুটরি ঘর, চার কোঠা বাড়ি। কোটক মানে ঘরামি। কোট কোট্ট ইংরিজিতে cote cottage হয়ে আছে। শুধু এগুলো নিয়ে লিখলেই অনেক বড়ো একটা লেখা হয়ে যাবে। অন্য একদিন। কোট কোটবি কোট্টবি কোটরি এসব আর এক ধরনের থ্রি-ডি কোট, যা গণপরিসরে আলোচনার জিনিস নয়। আজ টু-ডি পর্যন্তই থাক।

সূত্র: কোট কোটি, ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

ইউসুফ খান, কলকাতা, ২০২০ সেপ্টেম্বর ২৩


শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
error: Content is protected !!