কোনটি লিখব কোনটি লিখব না; কেন লিখব কেন লিখব না; কোনটি প্রমিত কোনটি অপ্রমিত

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/কোনটি-লিখব-কোনটি-লিখব-না-ক/
শুবাচির প্রশ্ন: বড় না বড়ো কোনটি প্রমিত? আমি কোনটি লিখব? ‘বড়ো’ লিখলে কি ভুল হবে?

বড়বড়ো দুটোই প্রচলিত। বর্তমানে প্রচলিত প্রায় সব কটি অভিধানে বড় বানানটি শুদ্ধ হিসেবে পরিবেশিত। তাই ‘বড়’ বানানটি অধিক প্রচলিত। অধিকন্তু অধিকাংশ

প্রকাশক: পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

কবিসাহিত্যিকের লেখায় ‘বড়’ বানানটি দেখা যায়। শব্দটি এমন কোনো ব্যাকরণ বিধি লঙ্ঘন করেনি যা দিয়ে এটাকে অশুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তাই ব্যাকরণগতভাবে এটি অশুদ্ধ হওয়ার কোনো হেতু  নেই। সুতরাং, এটিই বহুল প্রচলিত ও শুদ্ধ বানান হিসেবে প্রমিত। অর্থাৎ  ‘বড়’ আর ‘বড়ো’ দুটোই শুদ্ধ। তবে, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে কেবল ‘বড়ো’ বানানকে রাখা হয়েছে। ‘বড়’কে ঠাঁই দেয়নি। একটা অভিধানে ঠাঁই পায়নি বলে কোনো শব্দের বানানকে অশুদ্ধ বলা যায় না। আমি এখন ‘বড়ো’ লিখি। তবে ‘প্রমিত’ হিসেবে নয়, বাংলা একাডেমি হতে প্রকাশিত সর্বশেষে অভিধানের ভুক্তি হিসেবে। ‘বড়’ লিখলে ভুল হবে না। বানানবিধিতে এমন কোনো নির্দেশনা নেই, যা দিয়ে ‘বড়’ বানানকে ভুল বলা যায়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানের একমাত্র ভুক্তি গণ্যে ‘বড়’ শব্দকে ভুল বললে অন্যান্য অভিধানের ভুক্তি বিবেচনায় ‘বড়ো’ শব্দক মহা ভুল । অতএব, ভুল বলা হতে বিরত থাকুন। অতএব, ‘বড়’ লিখলে ভুল হবে না। বানানবিধিতে এমন কোনো নির্দেশনা নেই যা দিয়ে দিয়ে ‘বড়’ বানানকে ভুল বলা যায়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানের একমাত্র ভুক্তি গণ্যে ‘বড়’ শব্দকে ভুল বললে অন্যান্য অভিধানের ভুক্তি বিবেচনায় কেউ যদি ‘বড়ো’ শব্দকে মহা ভুল বলেন তাহলে?

অতএব, ‘বড়’কে ভুল বলা হতে বিরত থাকুন।
শুবাচির প্রশ্ন:   cow-এর বাংলা লিখ ‘গরু’ না কি গোরু? কোনটি প্রমিত?
Cow অর্থে ‘গরু’ লিখলে নম্বর দেব। কারণ, ‘গরু’ বানান লিখে সে বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বানানবিধির কোনো ব্যত্যয় ঘটায়নি। ওই বিধিতে এমন কোনো নিয়ম নেই যাতে ‘গরু’ লিখলে বিধি লঙ্ঘিত হবে। সুতরাং, বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বাংলা বানানবিধি অনুযায়ী ‘গরু’ ও ‘গোরু’ দুটোই শুদ্ধ। তবে শুদ্ধতা আর প্রচলনকে যদি প্রমিত বলা হয় তাহলে গোরু বানানের চেয়ে  ‘গোরু’ বানান অধিক প্রমিত।  আমি নিজে গোরু লিখি। কারণ: বাংলা একাডেমি হতে প্রকাশিত সর্বশেষ অভিধানে কেবল ‘গোরু’ বানানকে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে।
শুবাচির প্রশ্ন:ছোট না ছোট? আমি যদি ছোট লিখি তাহলে কি ভুল হবে?
ভুল শুদ্ধের বিষয়ে প্রথম দেখতে হবে, বানানটি কোনো ব্যাকরণবিধি ব্যুৎপত্তি কিংবা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত কোনো বানানবিধি লঙ্ঘন করেছে কি না। যেমন: নারী বানানটি ব্যাকরণবিধি  ও ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী ঈ-কার দিয়ে লেখার স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। তাই ই-কার দিলে ভুল হবে। মরণ বানানে ষত্ববিধি অনুযায়ী মূর্ধন্য-ণ অপরিহার্য। এখানে দন্ত্য-ন দিলে ভুল হবে। কৃষক বানানে ষত্ববিধি অনুযায়ী মূর্ধন্য-ষ আবশ্যক। তাই তালব্য-শ কিংবা দন্ত-স দিলে ভুল হবে। প্রচলন বিবেচনাতেও একই কথা প্রযোজ্য। শব্দগুলো এই বানানে বহুল প্রচলিত। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের আগে খ্রিষ্ট খ্রিষ্টাব্দ প্রভৃতি শব্দের বানান অতৎসম হিসেবে দন্ত-স দেওয়া হতো। কিন্তু উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ খ্রিষ্ট শব্দটিকে যে কারণেই হোক না, আত্তীকৃত ঘোষণা করে দন্ত্য-স লেখার নির্দেশনা দিয়েছে। তাই এখন খ্রিষ্টাব্দ লেখা সমীচীন। প্রচলিত প্রায় সব অভিধানে ‘ছোট’ বানানটি শুদ্ধ হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে।  কেবল বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘ছোট’ বানানটি রাখা হয়নি। এই অভিধান ‘ছোট’ শব্দকে ‘ছোটো’ বানানে লিখেছে, কিন্তু ‘সরু’ বানানকে ‘সোরু’ লিখেনি। অধিকন্তু, বাংলার বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় ‘ছোট’ বানানটি অধিক ব্যবহৃত হয়েছে। এসব বিবেচনায়, আমি মনে করি, ‘ছোট’ বানানটি ও-কার দিয়ে মোটা-সোটা না-করলেও চলত। উচ্চারণের কথা বলা হলে বলব, এমন অনেক শব্দ আছে যেগুলোর উচ্চারণ ও-কারান্ত, কিন্তু বানানে অ-কার। ঠিক করলে সবগুলো করা বেহতর ছিল। যেমন: সরুকে সোরু, মরুকে মোরু . . .।

অন্ত্যপদ না উত্তরপদ কোনটি শুদ্ধ?

দুটোই শুদ্ধ। তবে অর্থ ভিন্ন। ব্যাকরণিক পরিভাষায় সন্ধি কিংবা সমাসে যে শব্দ বা পদ পরে বা শেষে থাকে তাকে বলা হয় অন্ত্যপদ। এর অন্য নাম উত্তরপদ। যেমন: বিদ্যালয় একটি সমাসবদ্ধ শব্দ। সন্ধিজাতও বলা যায়। এ শব্দটিতে আছে দুটো শব্দ। যথা: ‘বিদ্যা’ ও ‘আলয়’। তন্মধ্যে ‘আলয়’ হলো অন্ত্যপদ বা উত্তরপদ। অনুরপ:

  • মহাপুরুষ শব্দের অন্ত্যপদ: পুরুষ;
  • শব্দকোষ শব্দের অন্ত্যপদ: কোষ;
  • শব্দাভিধান শব্দের অন্ত্যপদ: অভিধান।

সংক্রমিত বনাম সংক্রামিত: কোনটি শুদ্ধ এবং কেন?

অভিধানমতে সংস্কৃত সংক্রম (সম্+√ক্রম্‌+অ) এবং সংস্কৃত সংক্রাম (সম্+√ক্রম্‌+অ) দুটোই শুদ্ধ এবং সমার্থক। ব্যাকরণগতভাবেও শব্দ দুটি শুদ্ধ। সংক্রম ও সংক্রাম শব্দের আরেকটি সমার্থক শব্দ সংক্রমণ (সম্‌+√ক্রম্‌+অন)। তিনটি শব্দের অর্থই Infection বা দেহে রোগজীবাণুর অনুপ্রবেশ। সংক্রম ও সংক্রাম দুটোই ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ ও সমার্থক। কাজেই, সংক্রমিত ও সংক্রামিত বানানও শুদ্ধ, প্রমিত এবং সমার্থক। অতএব, সংক্রমিত বা সংক্রামিত যে-কোনো একটি বলতে পারেন, লিখতে পারেন।
মহেন্দ্রক্ষণ না কি মাহেন্দ্রক্ষণ, কোনটি সঠিক এবং কেন?

‘মহেন্দ্রক্ষণ’ বানানের কোনো শুদ্ধ শব্দ বাংলায় নেই। বাংলা ব্যাকরণমতে মহেন্দ্রক্ষণ বানানের কোনোশব্দ অর্থপূর্ণভাবে গঠিত হতে পারে না। এটি অর্থহীন। শব্দটির শুদ্ধ, ব্যাকরণিক ও অর্থপূর্ণ রূপ— মাহেন্দ্রক্ষণ। কেন মহেন্দ্রক্ষণ হতে পারে না দেখুন— ‘মহেন্দ্র’ বিশেষ্য। এর অর্থ— পৌরাণিক চরিত্রবিশেষ, ব্যক্তিনাম, নামবিশেষ।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

সাধারণভাবেমহেন্দ্র অর্থ— ‘দেবরাজ ইন্দ্র’। ক্ষণ শব্দটিও বিশেষ্য। একটি বিশেষ্য আরেকটি বিশেষ্যকে সরাসরি বিশেষায়িত করতে পারে না। ‘মহেন্দ্র’ শব্দটি ‘ক্ষণ’ শব্দের সঙ্গে যুক্ত করে ‘মহেন্দ্রক্ষণ’ বানালে অর্থ হবে— ‘দেবরাজ ইন্দ্র ক্ষণ’, দেবরাজ ইন্দ্র সময়; যা অর্থহীন এবং হাস্যকর। তাই, সময় নির্দেশক বিশেষ্য ‘ক্ষণ’-এর পূর্বে ব্যক্তিবাচক বিশেষ্য ‘মহেন্দ্র’ সরাসরি যুক্ত না-করে বিশেষণ বানিয়ে যুক্ত করতে হয়৷ তাহলে এটি অর্থসমৃদ্ধ হয়। এটিই বাংলা ব্যাকরণের নিয়ম।

তৎসম বিশেষ্যকে বিশেষণে পরিণত করার একটি সহজ উপায়— ‘ষ্ণ (অ)’ প্রত্যয় যুক্ত করা। মহেন্দ্র শব্দের সঙ্গে ‘ষ্ণ’ প্রত্যয় যুক্ত করলে কেমন হয় দেখুন— মহেন্দ্র+ষ্ণ=মাহেন্দ্র(বিশেষণ)। এখানে বৃদ্ধির সূত্রানুসারে প্রথম অ-স্বর, আ-স্বরে পরিণত হয়েছে। তৎসম মাহেন্দ্রক্ষণ শব্দের অর্থ— শুভক্ষণ, উপযুক্ত সময়; জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী কল্পিত শুভযোগ।
নিশাত ও নিশিত এবং নিশীথ ও নিশুতি এই শব্দগুলো মধ্যে কোনটি ভুল?
একটাও ভুল নয়।নিশাত ও নিশিত সমার্থক। দুটোই তৎসম এবং বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, নিশাত ও নিশিত শব্দের অর্থ— তীক্ষ্ণীকৃত, শানিত, অত্যন্ত ধারালো।
“এই নাও হাতে শপথে স্বপথে নিশিত নাঙ্গা তরোয়াল
কেটে ফেলো সব নির্দয় হুংকারে যত আছে জঞ্জাল।”
নিশীথ ও নিশুতি: তৎসম নিশীথ অর্থ—(বিশেষ্যে) মধ্যরাত, গভীর রাত এবং (বিশেষণে) গভীর। সংস্কৃত নিষুপ্তি থেকে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা নিশুতি অর্থ— (বিশেষ্যে) মধ্যরাত,
গভীর রাত, গভীর রাতের নিদ্রা এবং (বিশেষণে) নিস্তব্ধ, নির্জন।
“আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা- – -।” (রবীন্দ্রনাথ)।
যে-কোনো যেকোনো যে কোনো এর মধ্যে শুদ্ধ কোনটি? আমি কোনটি লিখব? 
সবগুলো শুদ্ধ। আপনার যেটি মনে হয় সেটি লিখতে পারেন। তবে, একই রচনায় বা একই গ্রন্থে অভিন্ন রূপের সমতাবিধান বাঞ্ছনীয়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ভুক্তি হিসেবে যে-কোনো শব্দটি দেওয়া আছে। তবে এই অভিধানের নানা ভুক্তিতে যে কোনো কথাটি বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। অতএব, যে-কোনো ও যে কোনো দুটোই শুদ্ধ। যে-কোনো এবং যেকোনো অভিন্ন শব্দ। হাইফেন কেবল উচ্চারণ কিংবা অর্থবিভ্রাট নির্দেশকের কাজ করে।
উল্টা বানান শুদ্ধ না কি অশুদ্ধ?
‘উলটা’ একটি বাংলা শব্দ। তৎসমের মতো এর কোনো নির্দিষ্ট ব্যুৎপত্তি নেই যে, উল্টা লিখলে ভুল হবে। প্রমিত বানান বিধিতেও এমন কোনো নির্দেশনা নেই, যদ্দ্বারা আমরা ‘উল্টা’ রূপকে ভুল বলতে পারি। যেমন: প্রমিত বানান বিধি অনুযায়ী ‘ঈগল’ বানানকে ভুল বলতে পারি এজন্যই যে, ওই বিধি অনুযায়ী “অতৎসম শব্দে ঈ-কার বিধেয় নয়”। মূলত, বানান সহজীকরণের প্রাসঙ্গিকতায় আধুনিক বাংলা অভিধানে বানানটি ‘উলটা’ রূপে লেখা হয়েছে। বলুন, উল্টা শব্দের আধুনিক বানান উলটা এবং বানানের সমতায়ন ও সহজীকরণের জন্য উলটা লেখা বিধেয়। তাই বলে উল্টা রূপটি ভুল হয়েছে বলা যাবে না। প্রমিত বাংলা বানান বিধির ব্যত্যয় ঘটলে ভুল বলা যাবে।

আমি শুবাচ থেকে বলছি

— — — — — — — — √— — — — — — — — —

প্রতিদিন খসড়া

error: Content is protected !!