কোয়ারেন্টিন আইসোলেশন: অর্থ ব্যুৎপত্তি ও ইতিহাস

ড. মোহাম্মদ আমীন

কোয়ারেন্টিন (quarantine)/ কোয়ারেন্টাইন শব্দের আভিধানিক অর্থ চল্লিশ দিন। কারণ, চল্লিশ অর্থ-দ্যোতক কোয়ারেন্টানা (quarantena) থেকে কোয়ারেন্টিন (quarantine) শব্দের উদ্ভব। বর্তমানে কোয়ারেন্টিন বলতে চল্লিশ দিন বোঝায় না। এর অর্থ ও প্রয়োগ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন কোয়ারেন্টাইন অর্থ— নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্বাভাবিক চলাফেরা নিয়ন্ত্রণপূর্বক পৃথক থাকা বা রাখা।  শব্দটির বাংলা অর্থ সঙ্গরোধ বা সঙ্গনিরোধ।  খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সর্বপ্রথম  সঙ্গরোধ বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পৃথক থাকা বা রাখার বিষয়টি বিশেষ কিছু রোগের চিকিৎসার অংশ হিসেবে গুরুত্বসহ চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রবেশ করে। চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকে ভেনেটিয়ান ( Venetian) ভাষায় কোয়ারেন্টিন শব্দটির ব্যবহার প্রথম শুরু হয়। ১৩৭৭ খ্রিষ্টাব্দে সরকারিভাবে কালমৃত্যু প্লেগের মহা প্রাদুর্ভব ঠেকানোর জন্য  জাহাজযাত্রীদের প্রথমে একনাগাড়ে কমপক্ষে ত্রিশ দিন (trentino) পৃথক রাখার নির্দেশনা জারি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকগণের সিদ্ধান্তে পরবর্তীকালে চল্লিশ দিন নির্ধারণপূর্বক স্পষ্টভাবে কোয়ারেন্টিন শব্দটি ব্যবহার করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কোয়ারেন্টিন শব্দটি কর্ডন স্যানিট্যায়ার (cordon sanitaire)-এর সমার্থক হিসেবেও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। স্বাস্থ্যগত কারণে রোগ ছড়িয়ে পড়া প্রতিহত করার লক্ষ্যে সতর্কতার অংশস্বরূপ স্বাভাবিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে বিশেষ ভৌগোলিক এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখাকে কর্ডন স্যানিটায়ার বলা হয়। কোয়ারেন্টিন শুধু  মানুষের ‍ওপর নয়, জীবজন্তু, এমনকি বস্তু বা যানবাহনের ওপরও আরোপ করা হয়।

১৫০৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে জন্মগ্রহণকারী বিশ্বের প্রথম মহিলা শাসক প্রাচীন মিশরের হ্যাচহেপসুট (Hatchepsut) জানামতে, বিশ্বের প্রথম কোয়ারেন্টিনার। তিনি  খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৭৯ খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৫৮ পর্যন্ত ২১ বছর মিশর সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী (ফারাও) ছিলেন।  হ্যাচহেপসুট ছিলেন প্রথম থুটমোজ ও তাঁর প্রথম স্ত্রী আহমেজ এর কন্যা। তাঁর স্বামী দ্বিতীয় থুটমোজ ছিলেন প্রথম থুটমোজ ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী মুটনেপেরেট-এর সন্তান। ১৪৫৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে তিনি অসুস্থ বোধ করছিলেন। খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে প্রচণ্ডভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসগণ অভিমত দিলেন: তিনি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত।  এটি হতে পারে  সংক্রামক এবং ছোঁয়াচে, তবে নিশ্চিত নয়। হ্যাচহেপসুট ছিলেন জনদরদী শাসক। চিকিৎসকের কথা শোনার পর  রোগের ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধের লক্ষ্যে সম্রাজ্ঞী নিজে নিজেই স্বাভাবিক চলাফেরা এবং জনসমাগম হতে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। জানামতে, এটিই হচ্ছে বিশ্বের প্রথম কোয়ারেন্টিন।

চল্লিশ দিন (অনুমান) সঙ্গনিরোধে থাকার পর খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৫৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ১৬ই জানুয়ারি হ্যাচহেপসুট মারা যান। কথিত হয়, বিভিন্ন ধর্মে চল্লিশ দিন বা তার কাছাকাছি সময় পর মৃতের আত্মার শান্তির জন্য বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থাও এখান থেকে ‍উদ্ভূত।  মমি পরীক্ষা করে জানা যায় তিনি বোন-ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন। মহারাজকীয় সমাধিস্থল এস্পিওজ আর্টমিডজ এর দায়ার এল বাহরির টেম্পল অব কার্নাকে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। এখনও সেখানে তার স্মৃতিসৌধ মহাগৌরবে দাঁড়িয়ে।

খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকের পূর্বে রচিত বাইবেলিক গ্রন্থ লেভিটিকাসে ( book of Leviticus) চিকিৎসার কারণে সঙ্গনিরোধ বা বর্তমান কোয়ারেন্টিন-এর অনুরূপ বিষয়ের নজির পাওয়া যায়। লেভিটিকাস হলো তোরাহ ও ওল্ড টেস্টামেন্টের বরাতে মোজেস আইনে (Mosaic Law) রচিত তৃতীয় গ্রন্থ (৫৩৮-৫৩২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রচিত)। এখানে রোগব্যাধি ছড়ানো প্রতিরোধ করার জন্য কাউকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার নির্দেশনার নজির পাওয়া যায়। উমাইয়া খলিফা ৭০৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম আল-ওয়ালিদের আমলে দামাস্কাস হাসপাতাল নির্মিত হলে ক্ষয়রোগ (leprosy)-সহ বিশেষ কিছু রোগে আক্রান্তদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হাসপাতালে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ইবনে সিনা কোয়ারেন্টিনকে কার্যকর চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ এবং সার্বিক জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মনে করতেন।

কোয়ারেন্টিন অর্থ রোগজীবাণু, ক্ষতিকর ক্ষুদ্র কীট(pest) প্রভৃতির ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধের জন্য স্বাভাবিক চলাফেরা, প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড, পরিবহণ বা চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ। ডাক্তারি পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়নি কিংবা পরীক্ষাও করা হয়নি, কিন্তু  সংক্রামক রোগের কারণ হতে পারে বা সংক্রামক রোগের জীবাণু থাকতে পারে বা অনুরূপ বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে অনুমিত হলে সংশ্লিষ্ট রোগের প্রকৃতি বিবেচনায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। যেমন: করোনাভাইরাসবাহী সন্দেহে কোভিন-১৯ রোগ ছড়িয়ে পড়া রোধ করার জন্য সন্দেহভাজনদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। প্ল্যাগ প্রতিরোধের জন্য রাখা হতো চল্লিশ দিন। 

আইসোলেশন আর কোয়ারেন্টিন এক নয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় যাদের রোগ নিশ্চিত হয়েছে তাদের বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। এটাকে বলা হয় মেডিক্যাল আইসোলেশন বা  চৈকিৎসাক বিচ্ছিন্নতা। আক্রান্তদের কাছ থেকে যাতে অনাক্রান্ত বা সুস্থ লোকের মধ্যে রোগজীবাণু ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য তাদের সাধারণত চিকিৎসালয়ে কঠোরভাবে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে জনবিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়।আইসোলেশন হচ্ছে অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য, আর কোয়ারেন্টিন হচ্ছে সুস্থ বা আপাত সুস্থ কিংবা সন্দেভাজন ব্যক্তিদের জন্য। আইসোলেশনে কতদিন রাখা হবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। পুরোপুরি সেরে না ওঠা পর্যন্ত  আইসোলেশনে রাখা হয়।

কোয়ারেন্টিন অর্থ- একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পৃথক থাকা। তবে তার মানে এই নয় যে, কাউকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা।কতদিন কোয়ারেন্টিনে রাখা হবে তা রোগের প্রকৃতি ও রোগজীবাণুর আচরণের ‍উপর নির্ভর করে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কমপক্ষে ১৪ দিন  কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলা হয়। কোয়ারেন্টিনে সর্বোচ্চ চার থেকে ছয়জন একসঙ্গে রাখা যায়। এভাবে বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য লোক কোয়রেন্টিনে থাকতে পারে।করোনা ভাইরাসের কারণে শুধু ইতালিতেই ১ কোটি ১৬ লাখ মানুষকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। চতুর্দশ শতকে (১৩৭৭ খ্রিষ্টাব্দ) প্লেগ রোধ করার জন্য ইউরোপ-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাত কোটি লোককে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়েছিল। কোয়ারেন্টিনে থাকা মানে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলা নয়, চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ। স্বাভাবিক চলাচল ছাড়া বাকি সব কাজ স্বাভাবিকভাবে করা যায়। 


All Link

বিসিএস প্রিলি থেকে ভাইভা কৃতকার্য কৌশল

ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা বইয়ের তালিকা

বাংলা সাহিত্যবিষয়ক লিংক

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/১

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/২

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন /৩

কীভাবে হলো দেশের নাম

ইউরোপ মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১

দৈনন্দিন বিজ্ঞান লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৩

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৪

কীভাবে হলো দেশের নাম

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/১

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/২

বাংলাদেশের তারিখ

ব্যাবহারিক বাংলা বানান সমগ্র : পাঞ্জেরী পবিলেকশন্স লি.

 

error: Content is protected !!