কৌশল ও ঘাস, মিসিল শব্দের অর্থ, গোগ্রাস, জিলাপি, জিলিপি ও গলগ্রহ, বাঙালি রমণীর তেজ

ড. মোহাম্মদ আমীন

কৌশল মানে ঘাস তুলতে পারার দক্ষতা

‘কৌশল’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ— কুশলতা, দক্ষতা, নৈপুণ্য, ফন্দি, ছল, চাতুর্য, কারিগরি ইত্যাদি। ‘কুশল’ থেকে কৌশল শব্দের উদ্ভব। তবে বাংলা ভাষায় কুশল শব্দটি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়।

প্রথমত, কুশল বলতে বোঝায় নিপুণ, দক্ষ, বিচক্ষণ প্রভৃতি। ‘‘কুশল’ থেকে কুশলী ও কৌশল শব্দের উদ্ভব। অন্যদিকে. ‘কুশল’ শব্দের আরেক অর্থ: মঙ্গল, শুভ, কল্যাণ, কল্যাণকর প্রভৃতি। তবে সংস্কৃতে ‘কুশল’ শব্দটি বাংলার মতো দু-রকম অর্থ বহন করে না।
সংস্কৃত ‘কুশল’ শব্দটি ‘কুশ’ হতে এসেছে। কুশ একজাতীয় তৃণ বা ঘাস। এটি অতি চিকন ও ধারালো এবং মাটির সঙ্গে শেকড় দিয়ে শক্তভাবে লেপটে থাকে। মাটি থেকে তুলতে গেলে হাত কেটে যায়। যে ব্যক্তি হাতকে অক্ষত রেখে দ্রুত ‘কুশ’ উত্তোলন করতে পারে সে হচ্ছে ‘কুশ’ এবং তার কার্যক্রম বা ভাবটা হচ্ছে কৌশল।
সুতরাং, দ্রুত কুশ বা ঘাস তুলতে পারার দক্ষতাই হচ্ছে কৌশল।
অন্যদিকে ‘কুশ’ তৃণটি পবিত্র বিবেচনায় যজ্ঞ ও পূজা-পার্বণের অনিবার্য উপকরণ। এটি ঔষধি হিসেবেও অত্যন্ত ফলদায়ক। এ কারণে ‘কুশ’ শব্দটি বাংলায় পবিত্র, মঙ্গল, কল্যাণ প্রভৃতি অর্থ পেয়েছে। তাই বাংলায় কুশল কথাটির অর্থ— কুশযুক্ত অর্থাৎ পবিত্র, শুভ, কল্যাণযুক্ত, কল্যাণকর ও মঙ্গলময়।
‘মিসিল’ শব্দের অর্থ
নবীনচন্দ্র সেন তাঁর লেখা ‘আমার জীবন’ গ্রন্থে লিখেছেন, “ – – – গিরিশেখরস্থ ধর্ম্মাধিকরণের দ্বিতল গৃহ কলকণ্ঠে পরিপূর্ণ করিয়া মিসিল পড়িতে লাগিলেন; জজ টানা পাখায় আন্দোলিত শেখরজাত স্নিগ্ধ সমীরণে নাসিকা-ধ্বনি করিয়া নিদ্রা যাইতে লাগিলেন। ‘মিসিল’ পড়া তাঁহার এত দূর স্বভাবসিদ্ধ হইয়াছিল যে, অনেক সময় তাঁহাকে নিদ্রাতেও মিসিল পড়িতে শুনিয়াছি। মিসিল বন্ধ হইলে জজের নিদ্রাভঙ্গ হইল; পিতার প্রদত্ত হুকুম দস্তখত করিলেন; বিচারকার্য্য শেষ হইল।”***
উইলিয়াম ক্যারি সংকলিত এবং ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত A Dictionary of the Bengali Language পুস্তকে ‘মিসিল’ অর্থ লেখা হয়েছে, ‘File of papers’ বা ‘পত্রাদি গাঁথিয়া রাখণার্থে শিক মিসিল’। এই ‘মিসিল’ শব্দের সম্প্রসারিত অর্থ: ‘মামলা সংক্রান্ত নথি বা ব্রিফ’।
—————————
*** সূত্র: নবীনচন্দ্র-রচনাবলী, আমার জীবন (১ম খণ্ড), সম্পাদক সজনীকান্ত দাস, প্রকাশক বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ, দ্বিতীয় সংস্করণ: মাঘ ১৪১৯, পৃষ্ঠা: ১০]

গোগ্রাস, জিলাপি ও জিলিপি এবং গলগ্রহ

‘গোগ্রাস’ শব্দের অর্থ: বড়ো গ্রাস, ঘন ঘন গ্রাস। ‘গো’ ও ‘গ্রাস’ শব্দের মিলনে ‘গোগ্রাস’ শব্দের উদ্ভব। ‘গো’ মানে গোরু এবং ‘গ্রাস’ মানে লোকমা বা একবারে যে পরিমাণ খাদ্য মুখে পোরা যায়। সুতরাং গোগ্রাস মানে গোরুর লোকমা। গোগ্রাস শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ গোরুর লোকমা হলেও এখন শব্দটি গোরুর খাদ্য বোঝাতে কেউ ব্যবহার করেন না। কোনো ব্যক্তি যখন অতি দ্রুত বেশি পরিমাণ খাদ্য মুখে দিয়ে তাড়াতাড়ি গিলতে থাকেন এবং গেলা শেষ হওয়া মাত্র আবার একই কায়দায় মুখে বড়ো গ্রাস ঢুকিয়ে দিতে থাকেন, তখন সেটাকে গোগ্রাস বলা হয়।
বিভিন্ন কারণে মানুষকে গোগ্রাসে গিলতে হয়। প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে অনেক দিন পর উপাদেয় খাবার পেলে মানুষ গোরুর গ্রাসের মতো গোরু+গ্রাসে গিলতে শুরু করে। আবার অনেকে তাড়াতাড়ি খেয়ে না-নিলে ভাগে কম পড়বে ভেবে এমনটি করে থাকে। আবার কারও কারও অভ্যাসই হচ্ছে গোগ্রাসে গেলা। আধুনিক যান্ত্রিক যুগে সময়ের অভাবের ফাঁদে পড়ে গোগ্রাসে গেলাটা অনেক বিত্তবানের করুণ কিন্তু অনিবার্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

বাঙালি রমণীর তেজ

[ছবি: সরহপাদের ব্রোঞ্জ মূর্তি।]
সরহ পা/সরহপাদ ছিলেন চর্যাপদের ২২, ৩২, ৩৮ এবং ৩৯ নম্বর পদের রচয়িতা। সরহপাদের একটি দোহায় আছে:
“বঙ্গে জায়া নিলেসি পরে
ভাগেল তোহর বিণাণা।”
অর্থ: “বঙ্গে (পূর্ববঙ্গে) যখন বিয়ে করেছিস তোর বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পেল বলে (বিণাণা = চিত্তবান অর্থাৎ সু-চেতনা)।”
বুঝেন, বউদির কেমন কঠোর শাসনে ছিলেন সরহ পা দা।
ভুসুকা পা/ ভুসুকপাদ (প্রকৃত নাম শান্তিদেব) সৌরাষ্ট্রের রাজপুত্র ছিলেন। বাঙালি বিয়ে করে বেচারার কী অবস্থা হয়েছে তা তাঁর নিজের লেখায় দেখুন। ভুসুকপাদ লিখেছেন:
‘আদি ভুসুক বঙ্গালী ভইলী
ণিঅ ঘরণি চণ্ডালী লেলী।’
অর্থ: “ভুসুক বঙালিকে যেদিন নিজের গৃহিণী করলেন সেদিন তিনি বাঙালি বনে গেলেন অর্থাৎ বাঙালসুলভ ভ্রষ্টাচারের ফাঁদে পড়লেন।”
এ না হলে বাঙালি রমণী!
সরহ পা ও ভুসুক পা দুজনে বাংলাভাষী ছিলেন। তারপরও তারা বঙ্গ ও বঙ্গের মেয়ে নিয়ে এমন মন্তব্য করলেন কেন? জ্যোতিভূষণ চাকীর মতে উভয়ে ছিলেন ঘটি। মনে হচ্ছে, তাঁদের উভয়ের স্ত্রী বাঙালি ছিলেন এবং প্রকৃত বাঙালি রমণীর মতো করে দুজন ঘটি স্বামীকে ইচ্ছেমতো শাসন করেছেন।
জয় বাঙালি রমণী।
[মন্তব্য করার সময় আমি ভাবব আমার মাও একজন বাংলাভাষী।]
সূত্র:
রঙ্গরসে বাংলা বানান, ড. মোহাম্মদ আমীন, তৃণলতা।
বাগর্থকৌতুকী, জ্যোতিভূষণ চাকী।
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
— — — — — — — — — — — — — — — — —
প্রতিদিন খসড়া
আমাদের টেপাভুল: অনবধানতায়
— — — — — — — — — — — — — — — — —
Spelling and Pronunciation
HTTPS://DRAMINBD.COM/ENGLISH-PRONUNCIATION-AND-SPELLING-RULES-ইংরেজি-উচ্চারণ-ও-বান/
error: Content is protected !!