ক্যাপ ভার্দে (Cape Verde) ইতিহাস ও নামকরণ

ড. মোহাম্মদ আমীন

ক্যাপ ভার্দে (Cape Verde)

কেপ ভার্দে বা ক্যাবো ভার্ডে পশ্চিম আফ্রিকা উপকূল হতে প্রায় ৫৭০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ১০টি আগ্নেয়দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। রাজধানীর নাম প্রাইয়া। প্রাইয়া অর্থ সমুদ্র সৈকত। দীর্ঘদিন হতে এটি সমুদ্র সৈকত হিসাবে বিখ্যাত ছিল। ক্যাপভার্দে আফ্রিকার দেশ হলেও এখানে আন্তর্জাতিক সংষ্কৃতির ছোয়া পাওয়া যায়।

পর্তুগিজ ক্যাবো ভের্ডে শব্দজোড়া হতে ক্যাপ ভার্ডে বা ক্যাপ ভার্দে নামের উদ্ভব। ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ অভিযাত্রীরা দ্বীপটি খুঁজে পাওয়ার পর থেকে এর নাম হয় ক্যাপ ভার্ডে। পর্তুগিজ ভাষায় ক্যাবো শব্দের অর্থ অন্তরীপ এবং ভার্ডে শব্দের অর্থ সবুজ। সুতরাং ক্যাবো ভার্ডে শব্দের অর্থ সবুজ অন্তরীপ বা গ্রিন ক্যাপ । আসলেই এটি একটি সবুজ অন্তরীপ। চারিদিকে সবুজের সমাহার আর পশুপাখির মুগ্ধকর অবস্থান।

ক্যাবো ভার্ডে অন্তরীপটি আধুনিক সেনেগালের গোর দ্বীপের পাশে অবস্থিত। এর ফ্রেঞ্চ নাম ক্যাপ-ভার্ট । অন্তরীপ হলেও এখানে মিষ্টি জল ও বৃষ্টিপাতের বড় অভাব। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ একটি ঘোষণা দেন যে, সরকারি নাম অন্য কোনো ভাষায় অনুবাদ করা উচিত নয়। সুতরাং ‘ক্যাপ ভার্দে’ নানের পরিবর্তে এটি প্রকাশে ‘রিপাবিলিক অব ক্যাবো ভাডে’ নাম ব্যবহার করা সমীচীন।

ক্যাবো ভার্ডের মোট আয়তন ৪,০৩৩ বর্গকিলোমিটার বা ১,৫৫৭ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ প্রায় শূন্য। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, ক্যাবো ভার্ডের জনসংখ্যা ৫,২৫,০০০ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটার লোকসংখ্যা ১২৩.৭ জন । আয়তন বিবেচনায় ক্যাবো ভার্ডে পৃথিবীর ১৭২-তম বৃহত্তম দেশ এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় ১৬৭-তম। কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় পৃথিবীর ৮৯-তম জনবহুল দেশ। দেশে যত ক্যাপভার্ডিয়ান বাস করে তার চেয়ে বেশি বাস করে দেশের বাইরে।

২০১৫ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, ক্যাবো ভার্ডের জিডিপি (পিপিপি) ২.৩০৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৬,৫৯৬.৮২১ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ২.১১০ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৪,০১৯.৮৬৮ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম এসকুডো। প্রাইয়া রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। সরকারিভাবে ক্যাবো ভার্ডের অধিবাসীদের ক্যাবো ভার্ডিয়ান বলা হয়। নাগরিকদের ৯৫% খ্রিস্টান। তবে স্বল্পসংখ্যক মুসলিম রয়েছে।

১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ জুলাই দেশটি পর্তুগাল হতে স্বাধীনতা লাভ করে। সরকারি ভাষা পর্তুগিজ। এছাড়া ক্যাবো ভার্ডিয়ান ক্রেয়োল ও আরও কয়েকটি ভাষা প্রচলিত আছে। দেশের মোট ভূমির মাত্র একদশমাংশ কৃষিকাজের উপযোগী। স্বাধীনতার পরও ক্যাবো ভার্ডে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গিনি বিসাউর অংশ হিসাবে একসঙ্গে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উইনস্টন চার্চিল দেশটি আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিল। তবে আক্রমণের দুই মিনিট আগে তা আবার বাতিল করা হয়।

১০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত ক্যাপ ভার্ডে রাষ্ট্রটির মানচিত্র দেখতে অনেকটা ঘোড়ার-ক্ষুরের নাল এর মতো। সান্টিয়াগো আয়তনে সবচেয়ে বড় দ্বীপ। দেশের রাজধানী প্রাইয়া এ দ্বীপে অবস্থিত। মোট জনসংখ্যার অর্ধেক সান্টিয়াগো দ্বীপে বাস করে। জনগণের ৭১% ক্রেয়োল, ২৮% আফ্রিকান এবং ১% ইউরোপীয়ান। আবহাওয়া সারা বছর উষ্ণ থাকে।

৬৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ব্রাভা দ্বীপে জনবসতি সবচেয়ে কম। ৩৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সান্তা লুজিয়া সবচেয়ে ছোট দ্বীপ। এখানে কোনো জনবসতি নেই। ভাস্কো ডা গামা ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দ এ দ্বীপ পরিদর্শন করেন। এ যাত্রায় পরে তিনি ইন্ডিয়া খুঁজে পান। ডারউইন এ দ্বীপে গবেষণার জন্য কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। প্রাইয়ার চাইনিজ অ্যামবাসিকে অত্যন্ত সম্মানজনক ভবন হিসাবে দেখা হয়। ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে কলম্বাস এ দেশের বর্তমান বোয়া ভিসতা  দ্বীপে অবতরণ করেছিলেন।

সম্পদে সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আফ্রিকার দেশসমূহের মধ্যে ক্যাবো ভার্ডের আর্থিক ভিত্তি যেমন স্থায়ী তেমনি শক্তিশালী। এখানে পাওয়া যায় অত্যন্ত বিরল প্রজাতির কচ্ছপ এবং আরও কিছু দুর্লভ পাখি ও প্রাণী। এগুলো দেখার জন্য এবং গবেষণার জন্য অনেকে এখানে আসেন।

বুরুন্ডি

error: Content is protected !!