ক্লিক (click) শব্দের অর্থ ব্যুৎপত্তি ও বাংলা: গড়ে, গড়ে গোরু, গণকবর: ভাতি ভাতিছ

 
ডাচ-ফ্রিসিয়ান klikken/klik শব্দ হতে আধুনিক ক্লিক (click) শব্দের উদ্ভব। ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ হতে ডাচ প্রদেশ ফ্রাইসল্যান্ড (Friesland) ও ডাচ গ্রন্থাদিতে শব্দটির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এর আগে শব্দটি অগ্রন্থিত হিসেবে ফ্রাইসল্যান্ডবাসীর মুখে মুখে  প্রচলিত ছিল। গ্রন্থিত হওয়ার পর শব্দটি প্রথমে জর্মান এবং পরে ফরাসি ও নরওয়েজিয়ান ভাষায় সমার্থে ঠাঁই পেয়ে যায়। ফরাসি থেকে চলে যায় ইংরেজের ঘরে। দেখা যাক তখন শব্দটির অর্থ কী ছিল— যে কাজ একটি দুর্বল ও তীক্ষ্ণ শব্দ সৃষ্টি করে তাকে বা ওই শব্দকে ক্লিক বলা হতো। অর্থাৎ দুর্বল ও তীক্ষ্ম শব্দ এবং তার ক্রিয়াদি প্রকাশের জন্য ফ্রাইসল্যান্ড ও ডাচবাসীরা ক্লিক শব্দটি ব্যবহার করত। সুতরাং, শব্দটি একই সঙ্গে ক্রিয়া, বিশেষণ ও বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো।  বর্তমানেও শব্দটির এই বৈচিত্র্যময় অর্থ বহাল আছে। প্রাচীন ফরাসি ভাষায় শব্দটি clique রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়। ফরাসি ভাষায় শব্দটির সঙ্গে  আরেকটি অর্থ যুক্ত হয়। সেটি হচ্ছে—  ঘড়ির টিকটিক শব্দ। ফরাসি থেকে ইংরেজিতে এসে ডাচ klik কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে click রূপ ধারণ করে।  অর্থ কিন্তু অভিন্ন থেকে যায়। তবে উপমহাদেশ ক্লিক শব্দটি ইংরেজি হতে পায়নি। পেয়েছে ফরাসি  হতে। কিন্তু বানান নিয়েছে ইংরেজি হতে।
 
বাংলায় ব্যবহৃত ক্লিক অর্থ— দুর্বল ও তীক্ষ্ণ শব্দ। কোনো সুইচ বা কোনো যন্ত্রাদি টিপলে বা কোনো ছোটো যন্ত্রকে আলতোভাবে টোকা দিলে কিংবা চাপ দিলে অথবা দুটি যন্ত্রের স্পর্শে বা ঘর্ষণে যে দুর্বল কিন্তু তীক্ষ্ম শব্দটি শোনা যায় তাই ক্লিক। যেমন: কম্পিউটারের মাউস টিপলে কিংবা ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে যন্ত্রাংশের স্পর্শে যে শব্দ হয় সেটিই—  ক্লিক। বাংলায় click শব্দের অর্থ টিকটিক শব্দ। অধুনা শব্দটি  মোবাইল কম্পিউটার প্রভৃতির কী-বোর্ড বা মাউস টেপার অর্থ প্রকাশে অধিক ব্যবহৃত হয়।
 
গড়ে,  গড়ে  গোরু, গড়ে বলদ এবং গড়ে মানুষ
বাংলায় দুটি গড়ে আছে। একটির উচ্চারণ গড়ে এবং অন্যটির উচ্চারণ গোড়ে। তবে বানান অভিন্ন— গড়ে। গড়ে উচ্চারিত গড়ে শব্দের অর্থ— (ক্রিয়াবিশেষণে) গড়পড়তায়। যেমন:  পাঁচ জন মানুষের মধ্যে ৩০টি আম ভাগ করে দিলে গড়পড়তায় ৬টি আম পাবে। গোড়ে উচ্চারণের গড়ে অর্থ— (বিশেষণে) অলসপ্রকৃতির, দীর্ঘসূত্রী। গড়ে মানুষের ‍উন্নতি সুদূরপরাহত।
 
গড়ে গোরু:  লাঙল টানতে টানতে শুয়ে পড়ে এবং সহজে উঠতে চায় না এমন গোরুকে গড়ে গোরু বলে। এদের গড়ে বলদও বলা হয়। কিছুক্ষণ কাজ করে যারা ফাঁকি মারে তাদের বলা হয় গড়ে মানুষ।
গণকবর
গণকবর: এটি একটি মিশ্র উৎসের বাংলা শব্দ। সংস্কৃত ‘গণ’ এবং আরবি ‘কবর’ মিলে গণকবর। অর্থ: বহুলোকের একত্র সমাধি। ইংরেজিতে যাকে বলা হয়: mass grave. এর সমার্থক: গণসমাধি, গণসৎকার।
বাংলায় গণ দিয়ে গঠিত বহুল শব্দ আছে। যেমন:
 
গণঅভ্যুত্থান, গণ আন্দোলণ, গণচেতনা, গণজমায়েত, গণজাগরণ, গণটোকাটুকি, গণতন্ত্র, গণদেবতা, গণনাটক, গণনায়ক, গণপতি, গণপরিষদ, গণপিটুনি, গণপ্রজাতন্ত্রী, গণপ্রহার, গণবিক্ষোভ, গণবিরোধী, গণভবন, গণভোট, গণমত, গণমাধ্যম, গণমানস, গণশক্তি, গণশত্রু, গণশিক্ষা, গণহত্যা প্রভৃতি।
 
 
 
ভাতি ভাতিছ ও প্রদীপভাতি শব্দের অর্থ 
 
  • ভাতি (√ভা+তি) সংস্কৃত শব্দ। বাংলায় তৎসম। অভিধানমতে, তৎসম ভাতি শব্দের অর্থ— শোভা, উজ্জ্বল, দীপ্তি, কান্তি; প্রকাশ, উদয়, আবির্ভাব, আলোর দীপ্তি, প্রোজ্জ্বল।
  • ভাতিছ: ভাতিছ অর্থ— (ক্রিয়ায়) অর্থ জ্বলছ, শোভা পাচ্ছ, আলো ছড়াচ্ছ, উদয় হচ্ছ, আলো দিচ্ছ, উজ্জ্বলতা দিচ্ছ প্রভৃতি।
  • প্রদীপভাতি: প্রদীপভাতি অর্থ— (বিশেষ্যে) উজ্জ্বল বাতি, প্রজ্জ্বোল বাতি, আলো দিচ্ছে এমন বাতি।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—
“আমি যামিনী তুমি শশী হে
ভাতিছ গগন মাঝে।”
 
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার অপব্যয়ের ফল কবিতায় লিখেছেন—
“যে জন দিবসে মনের হরষে
জ্বালায় মোমের বাতি,
আশু গৃহে তার দেখিবে না আর
নিশীথে প্রদীপভাতি।”
কবিতায় শব্দটি প্রদীপ ভাতি নয়, প্রদীপভাতি (সূত্র: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান, পৃষ্ঠা: ১০৪২)।
 
error: Content is protected !!