কয়েকটি শব্দের প্রমিত বানান: কথিত নতুন বানান: কারণ ও কেননা, ঘড়েল; দেওয়াল বনাম দেয়াল; মন হাচারা মাঝি

ড. মোহাম্মদ আমীন

কয়েকটি শব্দের প্রমিত বানান: কথিত নতুন বানান: কারণ ও কেননা, ঘড়েল; দেওয়াল বনাম দেয়াল; মন হাচারা মাঝি

সংযোগ: https://draminbd.com/কয়েকটি-শব্দের-প্রমিত-বান/

কারণ ও কেননা

বাক্যে কারণ ও কেননা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠিন কোনো ব্যাকরণিক বিধি নেই। তবে, অনেকে মনে করেন, বাক্যে প্রথম কারণের অনুকূল প্রসঙ্গে ‘কারণ’ এবং প্রতিকূল প্রসঙ্গে কেননা বসানো সমীচীন। যেমন:
রহিম ভালো ফল করবে, কারণ সে নিয়মিত স্কুলে যায়।
কামাল ভালো ফল করবে না, কেননা সে নিয়মিত স্কুলে যায় না।
বৃদ্ধ বয়সেও তার ফুসফুস সবল, কেননা তিনি ধূমপান করেন না।
অল্প বয়সেই তার ফুসফুস দুর্বল হয়ে গেছে, কারণ তিনি ধূমপান করেন।
নিমোনিক: যেসব বাক্যের দ্বিতীয়াংশে প্রথম হেতুর বিপরীত প্রসঙ্গ জ্ঞাপনে ‘না, নি, নেই’ ইত্যাদি আছে; সেসব বাক্যে ‘কেননা’ বসে।
সূত্র: ড. মোহাম্মদ আমীন, ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।

ঘড়েল

ঘড়েল শব্দের আভিধানিক অর্থ: ফন্দিবাজ, কুচক্রী, ধুরন্ধর প্রভৃতি। ঘড়া মানে বড়ো আকারের জলপাত্র বা বড়ো কলস। ঘড়ি বা ঘটি বা ঘটিকা মানে ছোটো আকারের জলপাত্র বা কলসি। প্রাচীনকালে মানুষ সময় জানার জন্য জলঘড়ি ব্যবহার করত। এ জলঘড়ি থেকে ঘড়েল শব্দের উৎপত্তি। বড়ো একটা ঘড়া থেকে ঘটিকা বা ঘটিতে জল ফেলে সময় জানার জন্য বিশেষ কৌশলে জলঘড়ি তৈরি করা হতো। ঘড়ার নিচে থাকত ছিদ্র। সে ছিদ্র দিয়ে ঘড়ার নিচে রাখা ঘটিকায় বিন্দু বিন্দু জল পড়ত। ঘটি পূর্ণ হয়ে গেলে ঘণ্টা বাজিয়ে জানিয়ে দেওয়া হতো যে, এক ঘটিকা পূর্ণ হয়েছে। এরপর পূর্ণ ঘটিকা সরিয়ে আর একটি খালি ঘটিকা ঘড়ার নিচে রেখে দেওয়া হতো।
এরূপ যত ঘটিকা পূর্ণ হতো, সময় বলা হতো তত ঘটিকা। আমাদের বর্তমান ঘটিকা শব্দটি এ ঘটি ও ঘড়া হতে এসেছে। ঘড়ি শব্দটি এসেছে ঘড়া হতে। কোনো সাধারণ লোকের বাড়িতে জলঘড়ি থাকত না। রাজা, জমিদার প্রমুখ বিত্তশীলদের বাড়িতে জলঘড়ি রাখা হতো। কেউ সময় জানতে চাইলে রাজবাড়িতে এসে তা জেনে নিত। রাজবাড়িতে জলঘড়ির পূর্ণ ঘটিকার হিসাব রাখার দায়িত্ব যার ওপর ন্যস্ত থাকত তার পদবি ছিল ‘ঘটিকাপাল’। এ ঘটিকাপাল শব্দটি ক্রম পরিবর্তন ও বিকৃতির মাধ্যমে ‘ঘড়েল’ শব্দে এসে রূপ নিয়েছে।
এখন একটা প্রশ্ন থেকে যায়, ঘটিকাপাল কীভাবে ফন্দিবাজ, কুচক্রী বা ধুরন্ধর হয়ে গেল? ঘটিকাপালকে ঘটিকা পূর্ণ হওয়া মাত্র ঘণ্টা বাজিয়ে ঘটিকার হিসাব জানিয়ে দেওয়ার জন্য সর্বদা সতর্ক থাকতে হতো। এক মুহূর্তের অসতর্কতার জন্য সময়ের হেরফের হয়ে যেত। তাই সবসময় চালাকচতুর ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে ঘটিকাপাল হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হতো। তাদের বেতনও ছিল অন্যান্য সম-মানের কর্মচারীদের তুলনায় অধিক। তাই চালাকচতুর ও বুদ্ধিমান বিশেষণগুলো ঘটিকাপাল হিসাবে নিয়োগের অন্যতম শর্ত হয়ে যায়। আর এ কথা কার না-জানা, যিনি বুদ্ধিমান ও চালাকচতুর তিনি সাধারণত ধুরন্ধর, ফন্দিবাজ ও কুচক্রীও হন!

উৎস: বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস ও বিবর্তন, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

‘দেওয়াল’ না ‘দেয়াল’?

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে, সঠিক হলো ‘দেওয়াল’। যেমন: দেওয়ালগিরি, দেওয়ালঘড়ি, দেওয়ালপঞ্জি, দেওয়ালপত্রিকা, দেওয়ালি প্রভৃতি।

মন হাচারা মাঝি

“অডা বিডাইল্লামি ছাড়ি দেগুই
চউখকুন সাদু গড়ি ল- – –
মন হাচারা মাঝি তোর সাম্পানত চৈত্তাম ন।”
চাটগাঁইয়া ভাষায় রচিত একটি বিখ্যাত গানের কয়েকটি পঙ্‌ক্তি। গানটি প্রথম গেয়েছেন শেফালী ঘোষ। গীতিকার: এম এন আলম।
প্রমিত ভাষায় কী রূপ হবে পঙ্‌ক্তিগুলো?
অডা, বিডাইল্লামি, দেগুই, চউখকুন, সাদু, হাচারা ও ‘চৈত্তাম ন’ অর্থ কী?

কয়েকটি শব্দের প্রমিত বানান: কথিত নতুন বানান

বাংলা একাডেমি প্রকাশিত সর্বশেষ অভিধান বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে কয়েকটি শব্দের বানান। এগুলোকে অনেকে নতুন/ সংশোধিত বানান মনে করেন। তবে তা ঠিক নয়, অধিকাংশই পুরানো বানান):

অঙ্ক।

অনুষ্ঠাতব্য

অহর্নিশ

অংশিদারত্ব

ইদ।

ইগল (কারণ এটি ইংরেজি শব্দ)।

ইতোমধ্যে।

উল্লিখিত।

এতদ্দ্বারা (এতদ্‌+দ্বারা)

ওসিলা।

কই (মাছবিশেষ)

ক্ষুধামান্দ্য

গোরু ( গরু শব্দের সংশোধিত বানান)।

ঘুস (অতৎসম শব্দ, তাই ষ হবে না)

ঠ্যালাগাড়ি

ঠ্যালা

দরজি।

তরি (নৌকা)

পটোল (সবজিবিশেষ)।

পির।

পাদরি (বিদেশি শব্দে ঈ-কার বিধেয় নয়।)

ফরসা।

বাঙালি।

বিদায়ি।

বিবদমান

ব্যাং।

ব্যাবহারিক (এটি ব্যবহারিক শব্দের সংশোধিত বানান)।

পির

পেতনি

প্রবহমান

ফরমুলা

বউভাত

ভিডিয়ো।

মহামারি

রজনি (রাত)

রানি (অতৎসম শব্দে ণত্ববিধি কার্যকর হয় না)।

সাথি (অতৎসম শব্দে ঈ-কার বিধেয় নয়।)

সংগৃহীত: ড. মোহাম্মদ আমীন, ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।

 

error: Content is protected !!