খসড়া

 

স্যমন্তক: দ্বাদশ (১২) পর্ব 

ড. মোহাম্মদ আমীন


আড্ডা শুরু করতে যাব এমন সময় এলেন পুলিশ কমিশনার। তাঁর আসার কোনো কর্মসূচি ছিল না। আকস্মিক আড্ডা ভেঙে যাওয়ায় আমি বিরক্ত। পঞ্চকন্যা হতাশ। তাদের কাছে আমাদের প্রতিটি সঙ্গমিনিট যেন প্রতিটি বছর। বিরক্ত হয়ে বললাম, দশ মিনিটের বেশি সময় দিতে পারবে না।
পুলিশ কমিশনার সাহেব ড্রয়িংরুমে। তার সঙ্গে প্রবোধ।
কী ব্যাপার? কোনো জরুরি কিছু?
“না, ম্যাম”,  রচনার হাতে স্মারক উপহার তুলে দিয়ে পুলিশ কমিশনার বললেন, “ভেবেছিলাম আমাদের অফিসে আমন্ত্রণ জানাব। প্রবোধের কাছে শুনললাম— ভোরেই চলে যাবেন।
ধন্যবাদ দিয়ে রচনা বলল, ইচ্ছে ছিল কয়েকদিন থাকার। সুযোগ নেই।
ম্যাম, কলকাতার লোকেরা খুব খারাপ ব্যবহার করল। বাঙালি আসলে আচার-ব্যবহারে পাশব।
এটাই প্রকৃতির নিয়ম। সাহায্যের পরিমাণ সর্বদা সীমিত থাকে, প্রার্থী থাকে অনেক। দেখেন -না, মরুভূমিতে বৃষ্টি পড়লে জল টেনে নেওয়ার জন্য বালির কণাগুলো কী হুড়োহুড়ি করে।
আপনি খুব বিনীয়।
বিনয় দিয়ে সব অর্জন করা যায়। পশুও পোষ মানে।
বিনয়কে অনেকে মনে করে, দুর্বলতা। অনেকে মনে করে ব্যক্তিত্বহীনতা; আবার অনেকের কাছে আত্মবিসর্জন।
বিনয়, অহংকারের মাতো মারাত্মক মনোবৃ্ত্তিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। আমি কাউকে ঘৃণা করি না।  কিন্তু বিনয়কে যারা ব্যক্তিত্বহীনতা মনে করে তাদের ঘৃণা করি।  বিনয় জ্ঞানার্জনের পূর্বশর্ত। আমি পাঁচ-তারাকা হোটেলে বসে আপনার মাধ্যমে সব কাজ করতে পারতাম, কিন্তু বস্তির স্বাদ পেতাম কি? পেতাম কি অমল আর পঞ্চকন্যার মতো বিরল প্রতিভার সন্ধান? আপনার মতো অফিসারের সান্নিধ্য?
দশ মিনিটের মধ্যে কমিশনার সাহেবকে বিদায় করে এক নম্বর রুমে ঢুকলাম। পঞ্চকন্যা চিৎকার দিয়ে উঠল, হুররে।
ম্যাম, স্যারকে আপনি ভাব্বা ডাকেন কেন? আড্ডার প্রথম প্রশ্ন। এল রেবেকা থেকে। চিকন-চাকন বেত-মেয়েটির চোখেমুখে কৌতূহলের মুচকি মুচকি রোদ। সবাই উত্তর শোনার প্রত্যাশায় রচনার দিকে তাকিয়ে। আমিও।
তিনি আমার ভাব্বা, তাই।
ম্যাম, ভাব্বা মানে কী?
তিনি আমার ভাই, তিনি আমার বাবা, তিনি আমার বান্ধব। ভাই প্লাস বাবা প্লাস বান্ধব।
“আমার বাবাও আমার বন্ধু”, প্রমিতা বলল, “এবং ভাইয়ের মতো। তাঁকেও আমি ভাব্বা ডাকব। বাবা ডাকব না আর। বাবায় একটা, ভাব্বায় তিনটা।”
জগদ্‌গৌরী বলল, ম্যাম, আপনার ভাব্বাকে যদি আমরাও ভাব্বা ডাকি?
আমার প্রিয়জন যত বেশি জনের প্রিয় হবে আমি তত বেশি খুশি হব। ভাব্বা আমার গর্ব।                                                                                                    সবাই একসঙ্গে চিৎকার দিল— “ভাব্বা”। উছল উচ্ছ্বাসে ভরে গেল রুম, ভরে গেল বুক,  প্রশান্তিতে বুজে এল চোখ। জীবনের কিছু কিছু মুহূর্ত অতি ছোটো হলেও নানা কারণে জীবন পরিধির চেয়েও অনেক মূল্যবান হয়ে যায়।  এই ক্ষণ  তেমন একটি সময়। খুশির জল ভাসিয়ে দিল চোখ। আমি নীরব। গলা কাঁপছে অযথা।
“ভাব্বা”, মিশু বলল, “আপনার মাকালী ফ্রিজে যাচ্ছে।”
ফ্রিজে কেন?
ভাব্বাকে সেলিব্রেট করতে হবে-না!
“হ্যাঁ, হ্যাঁ; তাই তো!”, প্রমিতা রচনার দিকে তাকাল, দৃষ্টিতে অনুমতির প্রার্থনা।
“ঠিক আছে”, রচনা গম্ভীর গলায় শব্দদুটো উচ্চারণ করলেও শিশুকন্যার মতো “আমার ভাব্বা” বলে আমাকে জড়িয়ে ধরে পুরো পরিবেশটাকে বন্ধুময় করে দিল, “মেয়েরা, ইচ্ছেমতো সেলিব্রেট করো, আই’ম উইথ ইউ।”
মিশু ফ্রিজ থেকে শ্যাম্পেনের দুটো আনকোরা বোতল বের করে টেবিলের দিকে এগিয়ে এল। প্রমিতা একটি বোতল নিয়ে বারকয়েক ঝাঁকি দিয়ে খুলতে গিয়ে ইচ্ছে করে সবাইকে ভিজিয়ে দিল শ্যাম্পেন ফোয়ারায়।
দীপালী দায়িত্ব নিল পরিবেশনের।
মেয়েদের শিশুসুলভ চঞ্চলতা আর উদাস হাসির মধ্যে সারল্যের বিস্তার মুগ্ধ করে দিল। কিছু কিছু মানুষ কেবল মুগ্ধতা ছড়ায়। মুগ্ধতা ছড়ানোর জন্যই জন্মায়। এ মেয়েগুলো ঠিক তেমন। শক্তিতে প্রখর, প্রতিশোধে নখর, ভালোবাসায় প্রবর, আনুগত্যে অবিশ্বাস্যভাবে অনড়। প্রমিতা আর মিশু একটু বেশি মুগ্ধকর। তারা হাসতে হাসতে ঢলে পড়ে মমতার কোলে। নাচতে নাচতে মিশে যায় ছন্দের বোলে। বিরামহীন তাদের প্রেরণা।
“এ দুটি চেহারা কোনোদিন ভুলতে পারব না”, কানে কানে রচনাকে বললাম।
প্রমিতা? রচনা বলল।
ম্যাম?
তুমি অনেক সাহসী। মিশু, তুমিও। তোমরা সবাই। সবাই নিবেদিতপ্রাণ। আমার ভাব্বাকে মুগ্ধ করতে পারা খুব কঠিন কাজ। তোমরা তাই করতে পেরেছ।
“শুধু সাহসী নয়”, জগদ্‌গৌরী বলল, “ প্রমিতা-দি শক্তিও রাখে প্রবল। দেখলেন না ম্যাম, ছয়-সাত জন উচ্ছৃঙ্খল ষণ্ডাকে কীভাবে নিমিষে ঠান্ডা করে দিল।”
আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
“আমি ভয় পাইনি”, আমার কথা শেষ হওয়ার পর রচনা  হাসিমাখা বিষণ্নতায় বলল, “আমি বস্তির মেয়ে। প্রমিতার দল ব্যর্থ হলে আমি এগিয়ে যেতাম। আমি এখন ইংরেজ। আমার রিভলভারের শক্তি-গতিতে লর্ড ক্লাইভের প্রেতাত্ম ভর করে থাকে। আপনার শরীরে কেউ হাত দিলে রক্তের বন্যা বইয়ে দিতাম।”
“স্যার”, প্রমিতা বলল, “একটা অনুরোধ করি?”
করো।
বাবা আগামীকাল রাতে আমাদের বাসায় ডিনার করার অনুরোধ করেছেন। তিনি আসবেন আপনাকে নেমন্তন্ন দিতে।
কিন্তু- – -।
কথা শেষ হওয়ার আগে চলে এলেন প্রমিতার বাবা, শিল্পপতি কার্তিক চন্দ্র দাস। খবর নিয়ে এলেন কেয়ারটেকার।। রচনা আর আমি ড্রয়িং রুমে গেলাম। কার্তিক বাবুর কার্তিকের মতো চেহারা। ছয় ফুটের অধিক লম্বা দেহে একফোঁটা চর্বি নেই। ধবধবে ফরসামুখে অম্লান হাসি। সঙ্গে তিন বডিগার্ড। বড়োলোকদের এই এক কষ্ট, শরীরকে নিরাপদ রাখার জন্য সারাক্ষণ প্রহরী রাখতে হয়। খুব ভয়ানক জীবন। কেন যে তারা এত টাকা আয় করে! কী দুঃসহ জীবন!
কার্তিক বাবু বললেন, আগামীকাল ডিনারের সময়টা আমাদের দিলে কৃতার্থ হব। আপনি আমার দেশের মেয়ে।
আপনার দেশ মানে? আমি প্রশ্ন করলাম।
আমার জন্ম মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর। দেশ ভাগের পর বাবা সপরিবারে কলকাতা চলে এসেছেন। এখনো দেশে আমাদের অনেক জমাজমি আছে। মালিকানা নেই, হিন্দুদের রেখে আসা সব জমিজমা শত্রুসম্পত্তি হয়ে গেছে। আমি জানি না, আমরা কী শত্রুতা করেছি বাংলাদেশের সঙ্গে।
এসব বাংলাদেশ সরকার করেনি। সাতচল্লিশের পর পাকিস্তান সরকার করেছে।
রচনা বলল, আগামীকাল  ভোর ছয়টায় আমাদের ফ্লাইট। আর একবার এলে যাব। আপনার নেমন্তন্ন আমাকে গর্বিত করেছে। প্রমিতার সাহসী ভূমিকার কথা কখনো ভুলব না। লাইক ফাদার লাইক ডটার।
কার্তিক বাবু রচনার হাতে একটি উপহার বক্স তুলে দিয়ে বললেন, আমি বড়ো আশা করে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম কয়েকদিন থাকবেন।
আপনার আন্তরিকতা মনে থাকবে।
আমার মেয়েটাকে একটু দেখবেন। সে কাউকে পাত্তা দিতে চায় না। সবার অভিযোগ— সে   নাকি ভয়ানক অহংকারী। কাউকে পাত্তা দেয় না। কখন কাকে কী বলে ফেলে— তার ব্যবহারে যদি কোনো কষ্ট পেয়ে থাকেন ক্ষমা করে দেবেন ।
আপনার মেয়ে যেমন সাহসী, তেমন মেধাবী— এমন মেয়েরা অমন হয়। ধারালো দা সাবধানে রাখতে হয়। নইলে রক্তাক্ত হওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়। কিন্তু প্রয়োজনে ওটাই কাজে লাগে। ভোঁতা দা যতই নিরাপদ হোক, কাজের না। মরিচার বাসা, ধ্বংসের অপেক্ষায় থাকে। আপনার প্রমিতা ধারালো তলোয়ারের চকচকে আলো। সাবধানতার সঙ্গে না রাখলে রক্তাক্ত তো হতেই হবে।
রুমে এসে দেখি মেয়েরা রীতিমতো নৃত্য শুরু করে দিয়েছে।
কী ব্যাপার এত আনন্দ? রচনা বলল।
ভাব্বোৎসব।

স্যমন্তক: ত্রয়াদশ (১৩) পর্ব 

ড. মোহাম্মদ আমীন


“রাত তিনটায় ফ্লাইট।
রচনা যাবে লন্ডন, আমি বাংলাদেশ। মনটা খারাপ, সময় শেষ হয়ে আসছে ক্রমশ। রাতটা যদি আর শেষ না হতো! অনেক রাতের প্রার্থনা এমন হয়। এমন প্রার্থনীয় রাত যার জীবনে যত বেশি সে মনে হয় তত বেশি সুখী আবার তত বেশি বিরহকষ্টে ভোগে। যেটাই হোক— এমন রাতই সবার কামনার হয়।
প্রমি, গাইতে জানো?
একটু একটু।
একটা গান করো।
আপনার পছন্দের কোনো গান?
তোমার পছন্দমতো।
আমি আর মিশু একসঙ্গে গাইব। আমি মেয়ে, মিশু ছেলে।
গাও।
এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলো তো- – -। রচনা কণ্ঠ দিল তাদের সঙ্গে।
প্রমি গাইল। ভালোই গাইল এবং বেশ ভালো। মুগ্ধ হয়ে শুনলাম।

ম্যাম, মিশু বলল, আমাদের মতো সাধারণ ছাত্রীর সঙ্গে কী ফ্রেন্ডলি আচরণ করলেন। অথচ, আমাদের ইউনিভার্সিটির একজন লেকচারার, কী তুচ্ছ করে আমাদের! আপনি খুব সাধারণ।

অথচ কত অসাধারণ, প্রমিতা বলল, অক্সফোর্ডের প্রফেসর।
অসাধারণ কী জানো? আমি বললাম।
কী?
জৌলুসময় সামর্থ্যরে অধিকারী হয়েও সাধারণভাবে জীবনধারণ করা। এর মধ্যে যে বিরল সুখ আর সৌন্দর্য রয়েছে তার সন্ধান পাওয়ার মতো অসাধারণত্ব আর কিছু হতে পারে না। তাই প্রকৃত অর্থে তোমাদের ম্যাম সাধারণ নয়Ñ অসাধারণ। অসাধারণ বলেই তোমাদের, তাকে সাধারণ মনে হয়। অসাধারণের এই সাধারণ প্রকাশ যার ভেতর আছে তাকেই বলা মহির্মাণব। যাকে সাধারণ মনে হবে না সে কীভাবে অসাধারণ হয়?

 “আমাদের কলকাতার সময় শেষ হয়ে আসছে”, বলে রচনা জিনিসপত্র গোছগাছ করতে শুরু করে। আমি বসে আছি নিশ্চিত। সে থাকলে গোছানোর ব্যাপারে আমার কোনো দায় থাকে না। আমার দ্বারা গোছানোর কাজ হয় না, গোছাতে গেলে আরও এলোমেলো হয়ে যায়। হাজার মন ওজন মাথায় নিয়ে হিমালয়ের শৃঙ্গ থেকে নেপালের কাঠমান্ডু পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করার চেয়েও একটা ছোটো ব্যাগ গোছানো অনেক কষ্টের মনে হয়।
“ম্যাম, আমি সাহায্য করি?” প্রশ্নের কোনো উত্তরের প্রত্যাশা না করে প্রমিতা জিনিসপত্র গোছানোর কাজে লেগে গেল। তার সঙ্গে যোগ দিল অন্যরা।
“তোমারা আমার জিনিসগুলো গোছাতে থাক”, রচনা বলল, “আমি ভাব্বার লাগেজটা গুছিয়ে দিচ্ছি। তিনি একদম গোছাতে পারেন না। গোছাতে গেলে আরো এলোমেলো করে দেন।”
এজন্য তোমার ম্যাম বলে— “আমি গাধা। গাধা ঘোলা করে খায়।”
মিশু বলল, স্যার, আসলে কি গাধা ঘোলা করে খায়?
কখনো না। গাধা সর্বদা বিশুদ্ধ জল পান করে। বিশুদ্ধ না-হলে এক বিন্দু জলও পান করে না। তৃষ্ণায় মরে গেলেও। সে তো আর মানুষের মতো এত দুর্বল জীব নয় যে, এক বেলা জল পান না-করলে মরে যাবে। পরিষ্কার জল সর্বদা বিশুদ্ধ হয় না। অনেক সময় বিষাক্তও হয়। কিন্তু একসময় মানুষ বুঝতে পারত না, কোন জল সত্যি সত্যি বিশুদ্ধ। সেসময় মানুষ বনেজঙ্গলে, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে বিশুদ্ধ জলের জন্য গাধার দিকে চেয়ে থাকত। দেখত— গাধা কোন জায়গা থেকে জল পান করছে। তারপর ছুটে যেত সে জলপানে। সংগ্রহ করতে নতুবা পান করতে।
তাহলে কেন বলে—গাধা ঘোলা করে খায়? জগদ্‌গৌরী বলল।
আরে বাবা, এমন দাবি তো গাধা করে না। এটি মানুষের কথা। গাধা তো আর মানুষ নয়। সে জল পান করার পর পায়ের চাপে মাটি ধ্বসে বা কাদা উঠে কিংবা অগভীরতার কারণে অনেক সময় জল কিছুটা ঘোলা হয়ে যেত। এটাই তো স্বাভাবিক, না কি? গাধা আসার পর ছুটে যেত মানুষ বিশুদ্ধ জলের জন্য গাধার জায়গায়। গিয়ে মাঝে মাঝে দেখত—জল ঘোলা। বোকা মানুষ মনে করত— গাধা ঘোলা করে খেয়েছে। তা আদৌ ঠিক নয়। খেতে খেতে ঘোলা হয়ে যেত জল। তাও মাঝে মাঝে, কদাচিৎ। আমরা যে খাই, তা খেতে খেতে উচ্ছিষ্ট হয়। কেউ কি উচ্ছিষ্ট দিয়ে খাওয়া শুরু করে? আসলে গাধা নয়, মানুষই গাধার ঘোলা করা জল পান করত। গাধা কখনো কোনো অবস্থাতে অবিশুদ্ধ জল পান করে না। মানুষ সর্বদা নিজের সীমাবদ্ধতা উঠোনের উপর চাপিয়ে দেয়।
প্রবোধ এলেন, গভীর রাতে, “ম্যাম, সকাল পাঁচটায় বের হতে হবে। আমি  চারটার মধ্যে চলে আসব। কোনো কিছু লাগবে?
না। তুমি যাও। রেস্ট করো গিয়ে।
ওরা যাবে না?
না, পঞ্চকন্যা চিৎকার দিল।
পঞ্চকন্যার চিৎকারে বজ্র ছিল কানফাটা, কিন্তু উল্লাস ছিল না বিন্দুবৎ, ছিল না আনন্দের ছিটফোঁটা কোথাও।
চিৎকার এত অপ্রসন্ন কেন?
কেঁদে দিল প্রমিতা, “ভাব্বা, চারটা দিন খুব দ্রুত চলে গেল।” তার কান্না সংক্রমিত করল বাকিদেরও। সবাই কাঁদতে শুরু করে দিল। মেয়েরা অল্পতে কেঁদে ফেলে। কাঁদে কষ্টে, কিন্তু বুঝে না তাদের জল কত ভয়ানক অনল হয়ে অন্যের হৃদয় পোড়ায, পুড়িয়ে অঙ্গার করে দেয়। আমিও কেঁদে দিলাম তাদের সঙ্গে। রচনা কি আর না কেঁদে পারে? যত বড়ো প্রফেসরই হোক,  সেও মানুষ।
কেঁদো না, আমি কান্নাকে কান্নার ভেতর ঢুকিয়ে হৃদয়ে চালান করে দিয়ে বললাম।
“ভাব্বা, ওদের তো কিছু হবে না”, প্রমিতা বলল, “আমার তো অনেক কিছু হবে। কষ্টে কষ্টে বুক ভেঙে যাবে।”
কীভাবে?
আদরের সঙ্গে আমি ব্যথাও  পেয়েছি-না। ব্যথাম স্মৃতি থেকে সহজে যায় না।
কে বলল?
আপনিই তো বলেছন—
“চুমোতে মমতা বেশি, কামড়েতে স্মরণ
নৈকট্য বিরক্তি আনে , বিচ্ছেদ চায় বরণ।”
রচনা, প্রমিতার পঙ্‌ক্তি-চুমো আমার মুখে ছড়িয়ে দিয়ে বলল, তোমরা হাসো। ভাব্বাকে আমি দুটো চুমো দিলাম।
হাসার চেষ্টা করল। হাসি তাদের এল, তবে ম্লান। এই হাসি আলো ঠিক, তবু যেন মেঘে ঢাকা অন্ধকার। নিষ্প্রাণ।
কী হলো মাকালী? কাঁদছ কেন? সবাই হাসো।
মিশু কান্না থামানোর জন্য চেপে ধরল দুঠোঁট।
এই তো, আমার  মাকালী— মুগ্ধকর;

কী করেছি?

আমি দেখলাম— 
ওষ্ঠটা তোমার ছুঁয়ে গেল অধর বেমালুম মমতায়।

 বুঝতে কি পেরেছ তুমি কত ইতিহাস হয়ে গেল তাতে শ্রান্ত ঠোঁটের কিনারায়?

সবাই হেসে দিল দুঠোঁট চেপে। এ হাসিতে শব্দ নেই, কেবল চুমোর নিস্তব্ধতা।



সন্মিত্রা: একাদশ (১১) পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

তৃতীয় দিন বিতরণদিবস।

বিতরণ শব্দটির সঙ্গে বিস্ফোরণ কথাটির অদ্ভুত  মিল আছে। বিতরণে বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের মতো ঘটে হট্টগোল আর হইচই। আজ কোনো প্রতিযোগিতা নেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রবোধ এবং বস্তির লোকদের সহায়তায় প্রস্তুতকরা তালিকা অনুযায়ী কিছু লোককে পেশা ও দক্ষতা বিবেচনায় আয়সহায়কসামগ্রী প্রদান করা হবে। দান খুব বাজে কাজ। সবাই পেতে চায়। কিন্তু সবাইকে দেওয়া এবং সন্তুষ্ট করা মানব-অতিমানব কারো পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই দানে গন্ডগোল হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
পঞ্চকন্যা, রঞ্জন, মাছুম, স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পুলিশ-সদস্যদের নিয়ে তালিকাভুক্তদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। ঠিক দশটায় আমার মাধ্যমে এক মহিলার হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়ার মাধ্যমে আয়সহায়কসামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়।
ঘণ্টা দুয়েক ভালোভাবে চলল। হঠাৎ সাহায্যপ্রার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। কিছু লোক সারি ভেঙে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের ওপর। তাদের দাবি— সবাইকে দিতে হবে। কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না। নইলে সাহায্য প্রদান বন্ধ করতে হবে। কেউ পাবে, কেউ পাবে না; তা হবে না .তা হবে না।
অবস্থা দেখে আমি হতভম্ব। ভীতু মানুষ— কাঁপতে শুরু করি ভয়ে। আমার যাই হোক, রচনার যেন কিছু না হয়। সে দেখি অবিচল। কিছু ঘটার আগে চোখের পলকে আমি আর রচনার সামনে প্রমিতা ও মিশু এবং পেছনে দীপালী, রেবেকা ও জগদ্‌গৌরী ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সেকেন্ডের মধ্যে গড়ে তুলল অপ্রতিরোধ্য বূহ্য।
পুলিশরা এতক্ষণ কাছেই ছিল। গন্ডগোল শুরু হওয়ামাত্র একটু দূরে সরে গিয়ে দায়িত্ব পালনে আন্তরিক— এটি প্রমাণের জন্য কানফাটানো বাঁশি বাজিয়ে কোলাহল থামানোর চেষ্টার নামে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে থাকে।
মেয়েরা আপ্রাণ চেষ্টা করছে লোকদের থামাতে। জনশৃঙ্খলা বিশৃঙ্খল হয়ে গেলে থামানো কষ্টকর। বোঝা যায় না কে বন্ধু আর কে শত্রু। হুড়োহুড়িতে সবাই এক হয়ে যায়। কয়েকজন লোক রচনার দিকে এগিয়ে আসতে চাইলে। প্রমিতা আর মিশু তাদের প্রচণ্ড মার দিল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, যেন হিন্দি সিনেমা।
গন্ডগোল ক্রমশ বাড়ছে আর ছড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় প্রমিতা কোমর থেকে রিভলভার বের করে ফায়ার করল আকাশে। এটাকে বলে ব্ল্যাংক ফায়ার। আকস্মিক রিভলবারের বিদঘুটে আওয়াজে ভয় পেয়ে গেল সবাই। অনেকে পালিয়ে যেতে থাকে। মুহূর্তের মাঝে ফাঁকা হয়ে গেল অনুষ্ঠান মঞ্চ।
ভাগ্যিস, কারও কোনো ক্ষতি হলো না। তবে প্রমিতা তার ডান হাতের মধ্যমায় ব্যাথা পেয়েছে। ফার্স্ট-এইড বক্স থেকে ওষুধ নিয়ে আমিই ব্যান্ডেজ করে দিলাম। এসব বিষয়ে আমি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তেমন কিছু না— হাড়ের একটা জোড়া মচকে গেছে। ঘণ্টা কয়েক ব্যথা থাকবে। তারপর ঠিক হয়ে যাবে।
প্রমিতা মাইকে গিয়ে সাহায্যপ্রার্থীদের উদ্দেশে বলল, যদি আপনারা লাইন ধরে আমাদের কথামতো অবস্থান না করেন তাহলে আমরা চলে যাব। একজন লোক লন্ডন থেকে আপনাদের সাহায্য করার জন্য এসেছেন। তাঁর প্রতি আপনাদের এমন অভক্তি কোনোভাবে মেনে নেব না। কয়েকজন লোক সমবেত গলায় ক্ষমা প্রার্থনা করে বললেন, আমাদের দুর্নাম রটানোর জন্য জন্য রবিন দাস আর মারুফ বালার গ্রুপ এমন করেছে।
রঞ্জন আর মাছুম কোথায়? প্রবোধ জানতে চাইলেন।
খেতে গেছে।
না বলে খেতে চলে গেল? আমি বললাম।
“আমার অনুমতি নিয়ে গিছে”, রচনা বলল।
“অনুমতি দেওয়া উচিত হয়নি”, আমি বললাম, “ অমল কাল কী বলেছিল মনে ছিল না বুঝি? যাই হোক এ নিয়ে আর ভাবার কোনো কারণ নেই।”
খবর পেয়ে রঞ্জন আর মাছুম ছুটে এলেন। তাদের দেখে বস্তিবাসী পুরোপুরি শান্ত হয়ে গেল। দুচারজন লোককে কয়েকটা চড়-থাপ্পড় দিয়ে বললেন, রবিন-মারুফের লোক এসেছে, তাদের মেরে ফেললি না কেন? একটা কল্লা নিতে কত শ্রম হয়?
আবার সামগ্রী-বিতরণ কাজ শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে অমল চলে এলেন। তিনি কয়েকজন বস্তিবাসীকে ধরে নিয়ে রচনার সামনে হাজির করে বললেন, ম্যাম এরাই গন্ডগোলের হোতা। জবাই করে দেব?
না।
কী করব?
ওরা হাঁটু গেড়ে রচনার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করল।
“এরা বুঝতে পারেননি”, রচনা বলল, “হঠাৎ ভুল হয়ে গেছে। ক্ষমা করে দিন।”
এরপর সত্যি আর কোনো গন্ডগোল হয়নি।
সাড়ে তিনটায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার। খাওয়া-দাওয়া ওখানে। ঘড়ি দেখলাম দুপুর আড়াইট। যথেষ্ট সময় আছে। এখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় যেতে দশ-বারো মিনিটের বেশি লাগবে না। তিনটার মধ্যে বিতরণ কাজ শেষ হয়ে গেল। গতকালই অমলকে সম্ভাব্য সব খরচ ভারতীয় মুদ্রায় পরিশোধ করা হয়েছে। তারপরও যদি পাওনা থাকে রাতে বাসায় গিয়ে নিয়ে আসবে।
যথাসময় বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে পৌঁছলাম। খাওয়া-দাওয়ার পর সেমিনার শুরু হলো। বিষয় ছিল— “ভারতে সংখ্যালঘুদের অবস্থান, অবস্থা ও ভূমিকা”। বেশ প্রশংসা পেল রচনার ভাষণ। পঁযতাল্লিশ মিনিটের মধ্যে সেমিনার শেষ। তারপর শুরু হলো শিক্ষকদের নিয়ে আড্ডা।
পঞ্চকন্যা অদূরে বসে। এ বয়সে শিক্ষকদের ভারিক্কি কথা শুনতে ভালো লাগে না। ইচ্ছা করছিল শিক্ষকদের মাঝ থেকে সরে গিয়ে পঞ্চকন্যার মাঝে গিয়ে বসি।  শোভন হবে না। মোটেও ভালো লাগছিল না অ্যাকাডেমিক পরিবেশ।
রচনাকে কানে কানে বললাম, আড্ডা শেষ করো।
কোথায় যাব?
ড্রাইভারকে বলব—
“যেথা খুশি সেথা; নিয়ে যান দাদা,
আজ আর নেই কোনো পাঠ
নেই কোনো বাধা।”
আমার অনুরোধ রচনার জন্য নির্দেশ। সবাই আমার মনোভাব বুঝে নিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে শিক্ষকাড্ডা শেষ।  রচনা, প্রমিতার কাছে রক্ষিত একটি বক্স থেকে পাঁচটি গিফট-প্যাকেট বরে করে উপচার্যের হাতে দিয়ে বলল, এগুলো আপনি আপনার হাতে আমাদের পঞ্চকনার হাতে তুলে দিন। তাই করলেন উপাচার্য। উপহার পেয়ে মেয়েরা খুব খুশি হলো। ক্যাপ-সহ একসেট অক্সফোর্ড ড্রেস।
রচনা আর আমাকে কদমবুচি করে মেয়েরা বলল, আপনাদের সান্নিধ্য আমাদের জীবনে অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে।
“তোমাদের কাজ শেষ”, রচনা বলল, “ এখন বিদায়। আমরা কাল কলকাতা ছাড়ছি। ভালো থেকো। আবার এলে দেখা হবে। আমার ঠিকানা সবার আছে। প্রয়োজনে যোগাযোগ কোরো। অক্সফোর্ড গেলে বাসায় এসো। কোনো সংকোচ করো না। ”
কেঁদে দিল পঞ্চকন্যা, একদম শিশুর মতো হাঁউমাউ। রচনা তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। শিক্ষকগণ অবাক হয়ে দেখছেন পঞ্চকন্যার কান্না।
“চার বছর থাকে আমাদের সঙ্গে”, উপাচার্য বললেন, “কিন্তু বিদায়কালে এ পর্যন্ত কাউকে এমন হৃদয় উপড়ানো জলোপহার দিতে দেখেনি। চার দিনে আপনি তাদের মনে যে দাগ কেটেছেন তা করা আমাদের চার বছরেও সম্ভব হয় না। কীভাবে?”
“জীবন ক্ষণস্থায়ী বলে এত প্রিয়”, রচনা বলল, “যদি দীর্ঘস্থায়ী হতো এত প্রিয় জীবনটাও একসময় বিরক্তিকর বোঝা হয়ে যেত। আমি তাদের প্রতিটি মুহূর্তকে মুগ্ধ ক্ষণে ভরিয়ে রেখেছিলাম। ”
প্রমিতা আর মিশু বলল, ম্যাম, আমরা আপনাদের সঙ্গে যাব। বাসা তো আছে।
“চলো”, রচনা আর আমি একসঙ্গে বলে উঠলাম।
রেবেকা, দীপালী আর জগদগৌরীও বলে উঠল, তাহলে আমরা?
সবাই চলো।
প্রবোধ বলল, ম্যাম, প্রেসক্লাবে আমার একটা সভা আছে। শেষ করে কলকাতায় দেখা করব। এখন যাই?
যাও।
“ম্যাম”, প্রমিতা বলল, আসার সময় মিশু আপনাদের সারিতে বসেছে, এবার আমার পালা। আমি বসব।
গাড়িতে উঠলাম। আমার ডান পাশে রচনা, বাম পাশে প্রমিতা। পেছনে বাকি তিন জন। ড্রাাইভারের পাশে বডিগার্ড।
ড্রাইভার বললেন, কোথায় যাব?
যেখানে ইচ্ছা। ঘুরব আর দেখব।
সময় কতক্ষণ? গাড়ি ছেড়ে দিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের ড্রাইভার বললেন।
দুঘণ্টা। তারপর তোমার অফিস, মানে ব্রিটিশ কাউন্সিল। নয়টার মধ্যে পৌঁছতে হবে।
আজকে তো ম্যাম ওখানেই ডিনার?
হ্যাঁ।
দুঘণ্টা ঘোরার পর ব্রিটিশ কাউন্সিল। ডিনার শেষ করে আবার গাড়িতে। বাসার সদর গেইটে যখন এলাম তখন রাত দশটা দশ। কেয়ারটেকার-সহ বাসার সবাই আমাদের অপেক্ষায়।
“স্যার”, দীপালী বলল, “আমরা হাতমুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে আসছি, আড্ডা হবে জম্পেশ।”
তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে হঠাৎ উহ করে উঠল প্রমিতা।
কী হলো? আমি বললাম।
ব্যাথা।
কোথায়?
মধ্যমায়। বারোটা থেকে সে বিরক্ত করছে।
তোমার কয়টা আঙুল?
হাতে পায়ে বিশটি।
কয়বার মনে পড়েছে বাকি আঙুলগুলোর কথা? অন্য প্রত্যঙ্গসমূহের কথা?
একবারও না।
দেখো, নষ্ট প্রত্যঙ্গটা বেশি নাড়া দেয় মনে। ভালোর কথা কেউ মনেই রাখে না। দুষ্টদের প্রতি সবার নজর থাকে, দিতে হয়, না-দিয়ে উপায় থাকে না। ভালোদের-না আসলে সবাই ভুলে যায়। ভালোরা আমাদের ভালো রাখে বলে ভালোদের কেউ মনে রাখে না।
তাই তো স্যার!                                                                                                                                                                                               বললাম, চুমোতে মমতা বেশি কামড়েতে স্মরণ
নৈকট্য বিরক্তি আনে , বিচ্ছেদ চায় বরণ।

 
 
 
 
 
সন্মিত্রা: নবম (৯) পর্ব
ড. মোহাম্মদ আমীন
[ভূমিকার জন্য ‘সন্মিত্রা’র প্রচ্ছদে এবং আলোকচিত্র-পরিচিতির জন্য সংশ্লিষ্ট ছবিতে ক্লিক করুন। তারিখ: ১৯/১১/২০২০]
 
সকাল এগারোটায় অনুষ্ঠান শুরু হবে। মেয়েরা বেরিয়ে গেছে আটটায়। সব ঠিকঠাক হলে খবর দেবে যাওয়ার। তখন রচনা আর আমি রওয়ানা দেব। অনুষ্ঠানস্থল বাসা থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটা-পথ। মেয়েরা হেঁটেই গেছে। আমরা যাব গাড়িতে। প্রথম দিন শিশুদিবস; মানে সব প্রতিযোগিতা শিশুদের নিয়ে শিশুদের জন্য শিশুদের ঘিরে অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানসজ্জার সার্বিক দায়িত্বে আছেন অমল এবং তাঁর দলবল। সহায়তা করছেন স্থানীয় কাউন্সিলর বিকাশ রায়। পঞ্চকন্যা তো আছেই।
শিশুদিবসের প্রধান অতিথি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। রচনা আর আমি দুজনই তাঁকে আমন্ত্রণ জানাতে গিয়েছিলাম। তিনি খুব অসুস্থ। তবু রচনার সম্মানে সম্মতি দিয়েছেন। রচনার অনুরোধ তাঁর পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। তবে কথা দিতে হয়েছে— বেশিক্ষণ আটকে রাখা যাবে না। অল্প কিছুক্ষণ থেকে চলে আসবেন। কবিসাহিত্যিকদের মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো অসাধারণ মানুষ আমি দেখিনি। কথায় আর চলনে; আচরণ এবং বলনে একটি নিষ্পাপ শিশু। ব্যবহারে আপাদমস্তক অমায়িক। মাটির মতো তাঁর ধৈর্য। তাঁর জন্মস্থান মাদারীপুরের কালকিনি। সৈয়দ আবুল হোসেন ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পরস্পর বন্ধু। সৈয়দ আবুল হোসেনের একটি কলেজ-হোস্টেল উদ্‌বোধন করার জন্য তিনি কালকিনি গিয়েছিলেন। সে সুবাদে অনেক আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার  পরিচয় হওয়ার সুযোগ ঘটে।
দশটার পর খবর দিল প্রমিতা— সব প্রস্তুত। গিয়ে দেখি চারদিক শিশুতে শিশুতে শিশুময়— পুরো বস্তি পরিপাটি ছিমছাম। নির্ধারিত এলাকা চমৎকারভাবে সাজানো। শিশুদের সঙ্গে বস্তির অনেক নারীপুরুষও দেখা গেল। শুধু তাই নয়, বস্তির বাইরের লোকজনও এসেছেন। আসন-সজ্জাতেও পেশাদারিত্বের ছাপ। এমন ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান উপভোগের জন্য সবাই হাজির থাকবে— এতে আর সন্দেহ কী। দারুণ কাজ করছে অমল আর মেয়েরা।
আমাদের দেখে দৌড়ে এল প্রমিতা, মিশু আর অমল। জগদ্‌গৌরী ও দীপালী আবৃত্তি, লিখন-পঠন, সাধারণ জ্ঞান  এবং আইকিউ টেস্ট-সহ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতার দায়িত্বে। রেবেকা ফলাফল ও পুরস্কার ব্যবস্থাপনা শাখার প্রধান। প্রমিতা আর মিশুর প্রধান দায়িত্ব রচনার নিরাপত্তা। যদিও অন্যান্য বিষয়ও তারা দেখছে।
“ম্যাম”, অমল বলল, “আজ বস্তির অধিকাংশ নারী-পুরুষ কাজে যায়নি।”
কেন?
অনুষ্ঠান দেখার জন্য। অনেকে অফিস থেকে তিন দিনের ছুটি নিয়েছে। এমন ঘটনা তাদের জাীবনে আর ঘটেনি।
প্রমি, কেমন লাগছে তোমার? আমি প্রমিতাকে বললাম।
আমার ‘প্রমি’ সম্বোধনে খুশি হলো সে। তার অধর-ওষ্ঠের আচরণ তা  জানিয়ে দিল। এমন সুন্দরকে পুরো নামে ডাকলে রোমাঞ্চটাই কমে যায়। নাম বলতে যদি জিহ্বাকে এত সময় ব্যয় করতে হয়, তো সে কথা বলবে কখন? জিহ্বার কি স্বাদ-আহ্লাদ বলতে কিছু নেই?
হাসিতে হাসি দিয়ে প্রমিতা বলল, “সব কৃতিত্ব অমল-দার। অন্য কাউকে দায়িত্ব দিলে এই অল্প সময়ে এত জটিল কাজ এমন সুচারুভাবে হয়তো করতে পারত না। অমল-দার নেতৃত্বগুণ অসাধারণ। ব্যবস্থাপনায় একদম সুপার কম্পিউটার।
“না, না”, সলাজ হেসে অমল বলল, প্রমিদি একটু বাড়িয়ে বলছেন। তারা করছেন সব। আমি কেবল হুকুমের চাকর।
আমাদের চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে অমল চলে গেলেন। নেতৃত্বের শক্তি অপরিসীম মনে মনে বললাম। চৌকশ আর আন্তরিক হলে তো কথাই নেই। অমল চৌকশ এবং আন্তরিক। শৃঙ্খলার বিষয়টাও মুগ্ধকর। মনে হলো— যেন কোনো বিধিবদ্ধ বাহিনীর নিয়মিত অনুষ্ঠান। শিশুরা অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে নিচ্ছে অমলের নেতৃত্বে কর্মরত একদল স্বেচ্ছাসেবী। সার্বিক তত্ত্বাবধানে পঞ্চকন্য। প্রমিতা দলনেত্রী।
প্রমি, মিশু কোথায়?
“এই তো স্যার, আমি এখানে। কিন্তু আপনার ওপর রাগ করেছি।” মিশু পেছন থেকে বলল।
কেন?
প্রমিতা দিদিকে নতুন নাম দিয়েছেন। আমাকে দেননি।
রচনা বলল,  তুমি আমার মতো কালো তো, তাই। কালোকে কেউ ভালোবাসে না।
“তুমি এক্সচেপশনাল।”, আমি মিশুকে বললাম, “অতএব, নামটাও তেমন হওয়া চাই। মিশির মতো কালো, মিশকালো। না, সুবিধার মনে হচ্ছে না— আজ থেকে তুমি আমার মাকালী। পছন্দ হয়েছে?
উত্তর দিতে পারল না মিশু। তার আগে অমল দৌড়ে এসে জানালেন প্রধান অতিথি এসে গেছেন। প্রধান অতিথি মানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ঘড়ি দেখলাম— দশটা পঞ্চাশ। অসুস্থ, ব্যস্ত। তবু কী সময় জ্ঞান! রচনা, প্রবোধ, বিকাশ রায়, অমল এবং আমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে স্বাগত জানিয়ে মঞ্চে নিয়ে এলাম।
মঞ্চে গিয়ে বললেন, আমার শরীর ভালো না। বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। কিছুক্ষণ থেকে চলে যাব।বারবার নানা ওষুধ খেতে হয়।
রচনা বলল, আপনি এসেছেন, এটিই আমাদের পরম সৌভাগ্য।  এখানে কোনো বক্তৃতা-বিবৃত হবে না। শিশুরা খেলবে আমরা দেখব। আপনি শিশুদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন। তারা গর্বিত হবে বর্তমান সুনীলে আগামীর সুনীল হওয়ার প্রতিজ্ঞায়। যতক্ষণ পারেন আমাদের সঙ্গ দিয়ে গর্বিত রাখুন।
এগারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। বস্তির শিশুরা খেলছে, জয়ী হওয়ার জন লড়ছে। প্রতিটি প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে  বিজয়ী  এবং অংশগ্রহণকারীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।  প্রতিবন্ধীদের জন্যও নানা খেলাধুলার ব্যবস্থা আছে। সব বয়সের শিশুরা যাতে অংশ নিতে পারে তেমন কৌশলে অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছে। শিশুদের উচ্ছ্বাসে পড়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজের দেওয়া ‘কিছুক্ষণ’-এর কথা নিজেই বেমালুম ভুলে গেলেন।
কেমন লাগছে? আমি জানতে চাইলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে।
অসুস্থ শরীর। ভেবেছিলাম, কয়েক মিনিট থেকে চলে যাব। আপনাদের অনুষ্ঠান দেখে  সুস্থ হয়ে গেছি। শেষ না-হওয়া অবধি থাকব।
অনুষ্ঠানের শেষদিকে জগদ্‌গৌরী ও দীপালী মুনির নামের এক শিশুকে নিয়ে এল । সাধারণ জ্ঞান, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এবং আইকিউ টেস্টে শিশুটি অসম্ভব ভালো করেছে।
“ম্যাম”, দীপালী বলল, ছেলেটি অবিশ্বাস্য মেধার অধিকারী, দেখুন-না তার খাতা, কী বুদ্ধদীপ্ত উত্তর দিয়েছে।”
রচনা খাতাটি নিয়ে আমাকে দিলেন। আমি তা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে দিয়ে বললাম, প্লিজ, দেখুন।
তিনি খাতাটি নিয়ে দেখলেন। কিছুক্ষণ পর আমার দিকে  এগিয়ে দিয়ে বললেন, অবিশ্বাস্য! বস্তিতেও এমন প্রতিভা তাহলে আছে!
খাতা দেখে আমি বিমূঢ়। মুনির আসলেই মেধাবী। প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব প্রতিযোগিতায় নব্বই পেয়েছে। এটি সহজ কথা নয়। যে প্রশ্নে সে নব্বই পেয়েছে ওই প্রশ্নে আমি পঞ্চাশ পেতাম কি না সন্দেহ। রচনাকে কানে কানে বললাম— আর এক রচনা।
বড়ো হয়ে তুমি কী হবে? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মুনীরের কাছে জানতে চাইলেন।
বস্তির সর্দার হব।
তারপর কী হবে?
কাউন্সিলর হব।
তারপর?
মেয়র হব।
তারপর?
ততদিনে আমার অনেক বয়স হয়ে যাবে। এর বেশি যেতে পারব না।  ছেলেমেয়েদের আমি মেয়র পর্যন্ত পৌঁছে দেব। তারপর তাদের বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী হবে না? প্রবোধ প্রশ্ন করল।
না। ভারতে মুসলিমদের প্রধানমন্ত্রী হওয়া কঠিন। আমরা তো সংখ্যালঘু। সবাই আমাদের ঠোকরায় আর ঠোকরায়।
 লেখাপড়া না করলে কীভাবে মেয়র হবে? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন।
“মেয়র হতে ভোট লাগে” মুনির বলল, “লেখাপড়া লাগে না।”
তুমি কী লেখাপড়া করবে না?
লেখাপড়া করতে টাকা লাগে। আমার টাকা নেই। বস্তির সর্দার হতে টাকা লাগে না। বস্তির সর্দার হলে টাকা আসে। টাকা দিয়ে কাউন্সিলর হব। আরও টাকা আয় করব। তারপর মেয়র হব।
লেখাপড়ার জন্য যদি তুমি টাকা পাও? রচনা বলল।
তখন বস্তির সর্দার হব না।
কী হবে?
এপিজে আবদুল কালাম।
মুনির বস্তির সর্দার হতে চায়, কী অবাক তাই না? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন।
“দৃষ্টিভঙ্গিই জীবনভঙ্গির পরিচালক”, রচনা বলল, “এবং পরিবেশই দৃষ্টিভঙ্গির স্রষ্টা। মুনির তার পরিবেশে বস্তির সর্দারের চেয়ে ক্ষমতাবান কাউকে দেখেনি। কিন্তু টাকা পেলে সে বস্তির সর্দার হবে না, এপিজে আবদুল কালাম হবে।”
“দারুণ অভিজ্ঞতা, কার্যকর দর্শন “, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলল।
রচনা বলল, এভাবে মানুষ সম্পদে, পরিণত হয়। এটাকেই বলে মানিসকতার ইতিবাচক রূপান্তর —যা দিতে পারে কেবল শিক্ষা।
“আপনার এমন উদ্যোগ তুলনাহীন”, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, “আমাদের উচিত এদিকেও নজর দেওয়া, কিন্তু সবাই নিজেদের নিয়ে এত ব্যস্ত যে, কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছে তা বুঝতে পারছি না।”
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা চেক  দিয়ে রচনা বলল, আপনি এই চেকটা মুনীরের হাতে তুলে দিন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মুনীরের হাতে চেকটি তুলে দিলেন। এর কিছুক্ষণ পর অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হলো।
 সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, “আমার এখন খারাপ লাগা শুরু করেছে।  এতক্ষণ মনেই ছিল না যে, আমি অসুস্থ। আই অ্যাম টু টেক মেডিসিন। এত ভালো অনুষ্ঠানটা এত তাড়াতাড়ি শেষ করে দিলেন! আবার  শুরু করা যায় না? যায় না। যা, যায় তা চিরতরে যায়।”
“ঠিক বলেছেন”, রচনা বলল, “সব চলে যায় বর্তমানকে অতীতের গহ্বরে ঢেলে দিয়ে নিঃস্ব করে। চিরদিনের জন্য যায়, আর আসে না। তাই আগত বর্তমানকে আবার নতুন করে গড়ে তুলে নিতে হয়। এই আগত বর্তমানই হলো শিশু।”
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে বিদায় করে আমরা বাসার দিকে রওয়না দিলাম।  গাড়িতে নয়, পঞ্চকন্যার সঙ্গে হেঁটে। সে ছিল এক স্বপ্নবিকেল।
বাসার গেটে গিয়ে ঘড়ি দেখলাম, পাঁচটা বত্রিশ।
দু মিনিট দেরি হয়ে গেল।
 
 আগামীকাল: সন্মিত্রা: দশম (১০) পর্ব
তারিখ: ২০/১১/২০২০
 
 
 
 
 
 
 

সন্মিত্রা: অষ্টম (৮) পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

খাওয়া শেষ করে মেয়েরা পোশাক পরিবর্তন করতে চলে গেল। অমল তার দলবল নিয়ে চলে গেছেন বস্তিতে। প্রাতঃরাশের ব্যবস্থা হবে বাসায়। মেয়েরাই তৈরি করবে। বড়ো শখ তাদের— রচনাকে নিজেদের হাতে রান্না করে খাওয়াবে। আধ ঘণ্টার মধ্যে সবাই চলে এল এক নম্বর কক্ষে। তারা আসার আগে রচনা আর আমিও পোশাক পরিবর্তন করে নিই। 

পঞ্চকন্যা আগমনী পোশাক ছেড়ে নতুন সাজে আবির্ভূত হয়েছে। একদম বৃষ্টি ঝরঝর রুপোলি দুপুরে পাঁচ রোমন দেবী যেন। সাধারণ সাজ-পোশাকে তারা এখন অভিভূত প্রকৃতি। আমার মুগ্ধতা বিমুগ্ধতায় মিশে গেল আনমনে। এতক্ষণ তাদের আসল সৌন্দর্য রাসায়নিক প্রসাধনের আবরণে ঢাকা ছিল। কম সাজলে মেয়েদের কত অনিন্দ্য লাগে তা যারা বুঝে তারা কখনো বেশি সাজুগুজু করে না।ঋধিতায় সজ্জাবিতৃষ্ণা প্রবল। আমাদের বাসায় প্রসাধন সামগ্রী নেই বললেই চলে। রচনাও এমন। ঋধিতার ভাষায়, “প্রসাধন চামড়াকে কাঁটাখসখস মান্দার গাছ বানিয়ে দেয়। এ যেন  ছারা গাছের সবুজ পাতায় অ্যাসিড মাখা। ”

শীতাতপ চালু করে দিলেন পরিচারিকা মৌলী। রুমে বিশাল একটা ফ্রিজ। তার পাশে কফি-মেকার। ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁই ছুঁই করছে। বাজার সরকার বাজারের ফর্দ আর টাকা নিয়ে রাতের মতো বিদায় নিলেন। কেয়ারটেকার বাসায় থাকেন। তিনি ছাড়া আরও তিন জন পুরুষ এবং দুজন মহিলা আছেন। এরা বাসার স্থায়ী কর্মচারী। মালী দারোয়ান তো আছেনই। বড়ো লোকের বড়ো কাজ।
“হাইকমিশনার অফিস থেকে পাঠানো স্যাম্পেনের বোতলগুলো ফ্রিজে রেখেছি।” কেয়ারটেকার বললেন, “আমি কি ম্যাম একটা বোতল বের করে টেবিলে রাখব?”
“না”, রচনা বলল, “যার প্রয়োজন সে নিয়ে নেবে। মেয়েরা, তোমাদের কারও ইচ্ছা হলে নিতে পার। ভাব্বার কখন প্রয়োজন হবে তা আমি দেখব। কেয়ারটেকার সাহেব, আপনি বিশ্রামে যেতে পারেন।”
“থ্যাংক ইউ ম্যাম”, কেয়ারটেকার বললেন, “যদি প্রয়োজন হয় কলিংবেল দেবেন। মেশিনে চা-কপি দুটোই আছে।”
ধন্যবাদ। মৌলীকে বলুন—চা দিতে।
এবার গোল হয়ে নয়, ইচ্ছেমতো ঢঙে ইচ্ছেমতো জায়গায় বসা। আমার ডান পাশে রচনা। বামপাশে প্রমিতা, প্রমিতার পাশে মিশু। রচনার বাম পাশে রেবেকা, জগদ্‌গৌরী এবং দীপালী।
গল্পে গল্পে সবার কথা শোনা হলো। মিশু বাংলার এবং প্রমিতা সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্রী। রেবেকা ইংরেজি ভাষার এবং দীপালী ও জগদ্‌গৌরী অর্থনীতির ছাত্রী। সবাই বৃত্তিধারী। জগদ্‌গৌরী রাতে কেবল সবজি খেয়েছে। সে জৈন, আমার প্রিয় ধর্ম।
“ম্যাম”, প্রমিতা বলল, “আমার অক্সফোর্ডে পড়ার ইচ্ছা ছিল।”
এখন নেই?
না। আপনার সান্নিধ্য  এই মাত্র আমার ইচ্ছাকে প্রতিজ্ঞায় পরিণত করে দিয়েছে।
টোফেলে খুব ভালো স্কোর তার। বিলোনিয়ার শিল্পপতির একমাত্র কন্যা। টিউশন ফি কোনো বিষয় না। সুতরাং, প্রতিজ্ঞা যে তার প্রতিষ্ঠা পাবে সহজে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
রেবেকার মতো মহারাষ্ট্রের জগদ্‌গৌরীও বাংলা কম বুঝে। বাংলা বলতেই মন খারাপ করে ফেলছিল। আবার ইংরেজিতে আড্ডা দিয়ে বাংলার মজাও পাওয়া যাচ্ছিল না। তবু তাদের জন্য মাঝে মাঝে ইংরেজি বলতে হচ্ছিল। আমি ইংরেজি কথোপকথনে খুবই দুর্বল। সারাবছর মফসসলে চাকরি করেছি। ইংরেজি বলার সুযোগ ছিল না। এ নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। বরং গর্ব হয়। আমি মাতৃভাষায় কথোপকথন করতে পারি। নিজের মাকে জানি, পরের মাকে কম জানলেও কেউ আমাকে কুলাঙ্গার বলতে পারবে না।

আড্ডার কোন ফাঁকে আরি রচনার কোলে মাথা দিয়ে হেলে পড়েছি জানি না। হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম, “এই মেয়ের দল, তোমাদের সময় বোধ আছে? রাত যে শেষ। সকাল সকাল উঠতে হবে না?”  কথাগুলো বলার জন্য বলা। আমারও গল্প করতে ভীষণ লাগছে। রাতটা শেষ না হলে কেমন হয়?
আর একটু থাকি-না, স্যার? প্রমিতা বলল, আমাদের রাতে না মুমোলেও চলে।
“থাকো”, খুশি হয়ে বললাম, “ এমন নাক্ষত্রিক আড্ডায় হাজার বছর নির্ঘুম কাটিয়ে দিতে পারি অবলীলায়।”
আবার শুরু হলো গল্প। এর মধ্যে কয়েক বার চা-কপি, নাস্তা আর স্যাম্পেন হয়ে গেল।  কিন্তু কিছুতেই রাতের প্রস্থানকে থামানো গেল না। একসময় রাতটা শেষ হয়ে গেল। আর ঘুমানো যাবে না। গোসল-স্নান করে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।
রেবেকা বলল, ম্যাম, অক্সফোর্ডে পড়তে হলে আর কী লাগবে?
আগ্রহে প্রবল আন্তরিকতা।
মেয়েরা বের হয়ে যাওয়ার পর রচনা প্রমিতাকে ডেকে বলল,  তোমার দেওয়া উপহারগুলো সমান সাত ভাগে ভাগ করে সাতজনকে দিয়ে দাও।  আমার ভাগে একটা সাবান পড়ে যেন।
ঠিক আছে, ম্যাম।
রচনা ওয়াশরুমে ঢুকল। আমি বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম— শোয়ার জন্য নয়, এমনি। বাসায় থাকলে বেশিক্ষণ বিছানায় গা না-এলিয়ে থাকতে পারি না। অন্তমুখী মানুষের এ একটা বড়ো বদভ্যাস।
রচনা বাথরুম থেকে বের হয়ে এসে বলল, স্যার, গোসল করবেন না?
করতে হবে? আমার প্রশ্নে না-এর আনাগোনা।
ম্যাম জানি আপনাকে কী ডাকেন?
গন্ধরাজ। গোসল কম করি তো, তাই।  সোনা মেয়ে বলো তো— গোসল কম করলে কী হয়?
পরিষ্কার থাকা ভালো—এ আর কী!
আচ্ছা তুমি কি আমার শরীর থেকে গন্ধ পাও।
গন্ধ নয়, সুগন্ধ পাই।
সত্যি?
আপনার শরীরের গন্ধ আমার খুব প্রিয়— একদম প্রথম থেকে।
ধ্যাৎ!
“সত্যি বলছি, স্যার”, রচনা আমার পাশে বসতে বসতে বলল, “সারাক্ষণ শুধু শুকতে ইচ্ছে করে। এজন্য বারবার কাছে ঘেষি, জড়িয়ে ধরি।”
কিন্তু তোমার ম্যাম যে বলে – – –
আপনার শরীরের গন্ধটা না ভাব্বা, আমার কাছে আকর্ষণীয় সুগন্ধে উন্মাদ করা শিহরন। বুকের ঘামে পৃথিবীর পৃষ্ঠা, মুখের ঘামে নিষ্ঠার বরাভয়। এই ঘামের সমুদ্রে জাহাজ ভাসিয়ে বস্তি থেকে অক্সফোর্ড। ভাব্বা, মনে করে দেখুন; কত বড়ো অঘটন।
তোমার ম্যাম বলে—
কী বলেন?
আমি নাকি খাটাশ। সে সর্বদা আমার শরীরে খাটাশের গন্ধ পায়। তোমার সঙ্গে তো দু-যুগের অধিক হয়ে গেল, এমন কখনো পেয়েছ?
ম্যাম মজা করেন।
 মেয়ে, গন্ধটা আসলেই দারুণ। একদম মনমাতানো।
কীসের গন্ধ?
তোমার চুলের।
রচনার খোলা চুলে ফরাসি সাবানের গন্ধ। বয়স বাড়ার সঙ্গে মেয়েটার চুলগুলোও বাড়ছে। এলোচুল কালো মমতায় ঢেকে দিয়েছে তার পুরো পিঠ।
রচনার মন্তব্য পাওয়ার আগে ফোন এল ঋধিতার। বুকটা কেঁপে উঠল। কারো কারো ফোন ঝঞ্ঝার মতো কাঁপুনে শঙ্কা হয়ে জীবনকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য আসে। স্ত্রীর ফোন এমন একটি। বিশেষ করে যখন অন্য কোথাও মগ্ন থাকে মন।
কী করছ? ঋধিতা প্রশ্ন করল।
বিছানা ছাড়তে যাচ্ছি।
বিছানা ছাড়তে যাচ্ছ না কি বেশ্যাখানায় যাচ্ছ?
কী বলো এসব?
যা ঠিক তাই বলছি। আমি পুরুষদের বিশ্বাস করি না।
আমিও পুরুষদের বিশ্বাস করি না।
তুমি একটা অসভ্য।
ঠিক বলেছ, আমি একটা অসভ্য।
ইদানীং তার সব মন্তব্যে সমর্থন ছাড়া অন্য কিছু করি না। তাকে থামানোর জন্য এর চেয়ে উৎকৃষ্ট কোনো পন্থা আমার জানা নেই। ছেলেমেয়ে বড়ো হচ্ছে। তর্ক করে তাদের কাছে ছোটো হতে ভীষণ কষ্ট হয়।
তুমি একটা গর্দভ।
যথার্থ।
তুমি আসলে এখন কোথায়?
কলকাতায়।
কখন আসবে?
পাঁচ দিন পর।
ঋধিতার সঙ্গে কথা শেষ করে রচনাকে বললাম, তোমার ম্যাম কী বলেছে জানো?
ঠিক বলতে পারব না। তবে কেন বলেছেন তা ঠিক ঠিক বলতে পারব।
কেন বলেছে?
“কাছে থাকলে বিরক্তি,
দূরে গেলে আসক্তি—
এ হচ্ছে সম্পর্ক— স্বামী আর স্ত্রী।। ভাব্বা, ম্যামের আসক্তি ভালোবাসার জোয়ার, এমন জোয়ার হারানোর ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে। তাই বুকে কষ্ট আসে। কষ্ট মানুষকে অস্থির করে দেয়। বিষয়টা স্যার আপনাকে বুঝতে হবে।
এটা কী ঘৃণা নয়?
না।
কী?
শঙ্কিত সতর্কতার জন্য সৃষ্ট অস্থিরতা। এমন অস্থিরতা মানুষের বিবেচনাকে কিছুটা বেসামাল করে দেয়। তাই মনে হয় অবিশ্বাস বা ঘৃণাপ্রসূত। আসলে তা ঠিক নয়।
সোনা মেয়ে, তুমি সবকিছু ইতিবাচক চশমায় দেখো।
আপনি শিখিয়েছেন।
বাইরে চাপা ফুলের গাছ। জানালা দিয়ে হু হু করে ঢুকছে গন্ধ। রচনা আমার মাথার খুশকি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমি গুনগুন শুরু করি
মোর প্রিয়া হবে এস রানি, খোপায় দেব তারার ফুল।
কর্ণে দোলাব – – -।
রচনা সুর দিল আমার সঙ্গে, তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল- – -।
স্যার, মাথায় খুশকি এল কীভাবে?
খুশকি নয়।
তো কী?
ধুলো।
রচনা খুশকি বাছাই করতে করতে বলল, বাদ দেন, গোসল করতে হবে না। গোসল করলে এমন সুন্দর গন্ধ জলে ভেসে যাবে।
তাহলে করব না।
রচনা একটা বই হাতে নিয়ে আমাকে বালিশ বানিয়ে পেটের ওপর মাথটা এলিয়ে দিয়ে বড়ো বড়ো করে আবৃত্তি করতে থাকেÑ

My love for you is like the raging sea,

So powerful and deep it will forever be.

Through storm, wind, and heavy rain,

It will withstand every pain.

ম্যাম? প্রমিতার গলা, আসব?
এসো, রচনা আবৃত্তি থামিয়ে বলল।
রুমে ঢুকল প্রমিতা। তার পেছনে মিশু। দুজনের গায়ে কিচেন ড্রেস।
রান্না কি তোমরাই করছ?
হ্যাঁ, ম্যাম।
কিছু বলবে?
বলব।
কী?
আমরা-না, স্যার মানে আপনার ভাব্বাকে – – -।
বলো।
লজ্জা করে।
কীসের লজ্জা? বলে ফেলো।
আমরা-না, স্যার মানে আপনার ভাব্বাকে ভালোবাসি।
রচনা অট্টহাসি হেসে বলল, আমাকে ভালোবাস না?
ম্যাম, প্রমিতা বলল, আপনাকে ভালোবাসতে গিয়েই স্যারকে ভালোবেসে ফেলতে হলো।
তাদের কথায় আমার খুশি হওয়ার কথা। খুশি হলাম। তারপর অনুভূত হলো Ñ এতক্ষণ পঞ্চকন্যার প্রতি আমার যে উল্লাস বিগলিত উচ্ছ্বাস ছিল তা মুহূর্তের মাঝে  স্নেহমদির শিহরনে পরিণত হয়েছে।
সবাই রচনা হয়ে গেল।

 

 

সন্মিত্রা: সপ্তম (৭) পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

বস্তির অনতিদূরে সুন্দর একটা জায়গায় ড্রয়িং ও ডাইনিং বাদে তিন বেডরুমের বিশাল একটি বাসা ভাড়া করেছে অমল। বাসা না বলে প্রাসাদ বলাই যুক্তিযুক্ত। চারদিক উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। সদর দরজায় দারোয়ান। যথেষ্ট নিরাপদ। সামনে ফুলের বাগান। পেছনে ফলের। যারপর নেই সুন্দর। সদর গেট থেকে কয়েকশ গজ আসার পর রিশেপসন রুম। তার সামনে বিশ্বখ্যাত কয়েকজন মৃত মনীষীর ভাস্কর্য। বেশ অভিজাত।

কেয়ারটেকার জানালেন ব্রিটিশ কাউন্সিল এবং লন্ডন হাইকমিশনার অফিস থেকে কয়েকজন লোক রিশেপসন রুমে অপেক্ষা করছেন। তাদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য রচনা রচনা রিশেপসন রুমে ঢুকে গেল। আমার নেতৃত্বে কেয়ারটেকারের সহায়তায় পঞ্চকন্যা হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল বাসায়। রচনার অনুপস্থিতির ফাঁকে হাতমুখ ধুয়ে বাড়ির প্রতিটা রুম একনজর দেখে নিলাম। তারপর রচনার অপেক্ষায় ড্রয়িংরুমে গল্পে মেতে উঠি। কয়েক মিনিটের কথার মধ্যে পঞ্চকন্যা সত্যি সত্যি কন্যার মতো অকপট হয়ে গেল।

সবগুলো রুম বেশ বড়োসড়ো— দামি আর অভিজাত আসবাবপত্রে সাজানো। একই সঙ্গে গোছানো। দেখলে বোঝা যায় মালিক  অভিজাত, বিত্তবান এবং বনেদি। ভদ্রলোক সপরিবারে সুইডেন থাকেন।  দেশে এলে এ বাসায় উঠেন। ভাড়া দেন না কাউকে। অমলের অনুরোধে ভাড়া দিতে রাজি হয়েছেন— অক্সফোর্ডের অধ্যাপক শুনে। পাঁচ দিন থাকলেও ভাড়া দিতে হবে এক মাসের।

তিন বেডরুমের একটায় রচনা আর আমি এবং বাকি দুটোয় মেয়েরা থাকবে। অমলের প্রশংসা করতেই হয়। যদিও বাড়িটার জন্য হাতির পায়ের মতো মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়েছে। তবে ওই টাকা রচনার পাউন্ডে গেলে বকের পায়ের মতো চিকন হয়ে যাবে। থাক এসব। বড়োদের খরচে ছোটোদের নাক গলিয়ে কাজ নেই।

মেয়েরা তাদের আবাস দেখে বেশ খুশি— এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। এক ঘণ্টা পর রচনা ড্রয়িং রুমে এল। মেয়েরা তাকে ঘিরে ধরে রীতিমতো নৃত্য দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল। রচনা যেন পুরো অক্সফোর্ড। মানবীর ছদ্মবেশে কলকাতায় এসেছেন। এত খ্যাত প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রফেসর তাদের এত কাছে— মুগ্ধতার শেষ নেই। এমন ঘটনা জীবনে এই প্রথম, হয়তো বা এই শেষ।
“বেশ বড়ো রুম”, মিশু বলল, “আমাদের পাঁচ জনের জন্য একটা হলেও চলত।”

“দুটো আছে যখন দুটোই ব্যবহার করো”, রচনা বলল, “যদি মনে করো একসঙ্গে থাকবে, সেটি তোমাদের ইচ্ছা, যদি হয় সুজন বরই পাতায় ন-জন। বাসা কিন্তু শুধু শরীর রাখার জন্য নয়, মনের প্রশান্তি অনেক বড়ো বিষয়।”

সবাই গোল হয়ে বৃত্ত। আমি আর রচনা বৃত্তের কেন্দ্র। এমন গোল-কায়দার বসার বুদ্ধিটা প্রমিতার। মেয়েগুলো আসলেই চমৎকার। চোখমুখ, চুলগাল, নাক-কান, গলা-থুতনি এমনকি কানের লতি পর্যন্ত সুন্দরে সুন্দরে পূর্ণিমা। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পাঁচ জনকে ঝাঁকিদর্শনে কেবল দেখছি আর দেখছি।
“শোনো মেয়েরা”, রচনা বলল, “আমি একসময় বস্তিতে থাকতাম। আমাদের রুমটা এত ছোটো ছিল যে, ছয় জন সদস্য ঘুমাতে গেলে কোনো রকমে পিটটা কেবল রাখতে পরাতম। ওপরে ছিল মশা এবং নিচে তেলাপোকা আর পিঁপড়ে, কেঁচোও ছিল সুড়সুড়ি দিত বগলে। চুলকানোর জন্য হাতটা পর্যন্ত বের করতে কষ্ট হতো। তবু জীবন থেমে থাকেনি।”
পঞ্চকন্যার একজন রেবেকা।  বাড়ি কাশ্মীর, বাংলা বলতে পারে না। তবে ইংরেজিতে সাবলীল। গড়নে অন্যদের চেয়ে সামান্য চিকন হলেও শক্তিতে যে কম নয়, তা একবার তাকালে বোঝা যায়। চোখের নিচে চঞ্চলতা মাঝে প্রচণ্ড সতর্কতা। দেখলে ভয় হয়— বুঝি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর নারী-সদস্য আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অক্সফোর্ড নিয়ে তার আগ্রহই সবচেয়ে বেশি, কিন্তু যেমন আগ্রহী তেমন আন্তরিক মনে হলো না।
“আমাকে কী করতে হবে ম্যাম”, রেবেকা বলল, “যদি অক্সফোর্ডে পড়তে চাই?
মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করতে হবে। স্টার কিংবা এ-প্লাস অত্যাবশ্যক নয়। এগুলো অতিরিক্ত সুবিধার বিষয়ও নয়। গতকাল তোমার কটি হাত ছিল, কেমন ছিল পায়ের শক্তি তা দেখা হয় না, দেখা হয় এ মুহূর্তে তোমার কয়টি হাত আছে। তারপর তুমি কোন বিষয় নিয়ে পড়তে চাও এবং কী পড়তে চাও তা বিস্তারিত জানিয়ে আবেদন করবে। তোমার ইংলিশ দক্ষতা যাচাই করা হবে। এটাই ভর্তির অন্যতম শর্ত। ব্রিটিশ কাউন্সিলের নেওয়া ইংরেজি ভাষা জ্ঞান পরীক্ষায় ভালো করতে পারলে ভর্তি হতে পারবে। একটা বিষয় মনে রাখবে, অক্সফোর্ডের টিউশন ফি অনেক বেশি।
কত হতে পারে ম্যাম? প্রমিতা বলল।
ত্রিশ লাখ টাকার বেশি। ফুল স্কলারশিপ পেলে টিউশন ফি দিতে হবে না। তবে অক্সফোর্ডে এখন স্কলারশিপ পাওয়া সহজ বিষয় নয়।
প্রমিতা বলল, কমনওয়েলথভুক্ত দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো সুবিধা নেই?
“না”, রচনা বলল, “অথচ তারা আমাদের টাকা দিয়ে তাদের দেশকে সমৃদ্ধ করেছে। অক্সব্রিজকে সাজিয়েছে। ব্রিটেনের প্রতিটি ইঞ্চি ভারতবর্ষের সম্পদে পুষ্ট। ইংল্যান্ডের প্রতিটি কণা উপমহাদেশ এবং প্রাক্তন কলোনিসমূহের অর্থে লালিত। তবু আমরা তাদের প্রভু মানি। অথচ তারা আমাদের খেয়েপড়ে নাদুস-নুদুস। আমাদের দেশে এলে মনে করি, প্রভু এসেছে।”
আমি বললাম, এই যেমন তুমি।
“আমি তো স্যার হরিজন প্রভু”, রচনা বলল, “আমরা জীবিত যোগ্যকে মূল্যায়ন করি না। মরার পর লাশ নিয়ে টানাটানি করি। তাই প্রতিভাবানরা দেশে থাকতে চায় না। বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম বাংলাদেশকে বিজ্ঞানী উপহার দেওয়ার ব্রত নিয়ে ক্যামব্রিজ ছেড়ে বাংলাদেশ চলে এসেছিলেন। কী পেয়েছেন? অপমান।”
ঠিক বলেছ মেয়ে। বাঙালিদের চিত্তবৈকল্য মারাত্মক। তাদের দেশপ্রেম খুব কম। কিন্তু ষড়যন্ত্রে ওস্তাদ, পরশ্রীকাতরতায় অন্ধ।
প্রমিতা বলল, ভারতীয় হিসেবে আমার ঘৃণার নব্বই ভাগ ইংরেজ শাসনের প্রতি এবং দশ ভাগ মুসলিম শাসনের প্রতি।
রেবেকা বলল, মুসলিমদের প্রতি কেন?
মুসলিমদের প্রতি নয়, তাদের শাসন ব্যবস্থার প্রতি। তাদের শাসনব্যবস্থা অদূরদর্শিতায় ভরা ছিল। নইলে প্রায় হাজার বছর শাসন করার পরও অল্প সময়ের মধ্যে ভারতবর্ষে মুসলিমরা এত প্রভাবহীন হয়ে যাবে কেন? বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও তাদের কোনো কার্যকর প্রভাব নেই।
প্রমিতাকে বললাম, যদি তুমি বাংলাদেশি হতে?
তা হলে আমার ঘৃণার আশি ভাগ ইংরেজদের প্রতি, দশ ভাগ মুসলিম শাসনের প্রতি এবং দশ ভাগ পাকিস্তানিদের প্রতি নিক্ষিপ্ত থাকত।
পাকিস্তানিদের প্রতি এত কম ঘৃণার কারণ? মিশু জানতে চাইল।
রচনা বলল, ইংরেজরাই আমাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। পাকিস্তানিদের চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি। তবু আমরা অনেকে এখনও ইংরেজদের প্রতি যত ঘৃণা নিক্ষিপ্ত করা প্রয়োজন তত ঘৃণা নিক্ষেপ করি না। পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি। বাঙালিরাই তাঁকে হত্যা করেছে। পাকিস্তান কয় বছর বাংলাদেশ শাসন করেছে? আমি মনে করি, এত কিছুর পরও আমাদের লন্ডনপ্রেম ভারতীয়দের চৈত্তিক দুর্বলতার একটি লজ্জাকর ও অবিবেচক দিক।
রেবেকা বলল, ম্যাম, একটা কথা বলিÑ কিছু মনে করবেন না তো?
বলো।
আমার অক্সফোর্ডে পড়ার খুব ইচ্ছা।
ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। তবে ইচ্ছাটা হতে হবে অধ্যবসায়প্রসূত চেষ্টায় গড়া পরিষ্কার পাথরস্থির প্রত্যয়।
হয়তো দরখাস্ত দিলে ভর্তি হতে পারব, কিন্তু বাবার অত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। আপনি কি ম্যাম আমার জন্য একটা স্কলারশিপের ব্যবস্থা করতে পারবেন?
তুমি অ্যাপ্লাই করে আমাকে জানাবে। আমি চেষ্টা করব।
“মিশু?” প্রমিতা বলল, “তোমার অক্সফোর্ডে পড়ার ইচ্ছা নেই?”
না।
কেন?
নামটা কেমন যাঁড়-ষাঁড়। আমার জন্য আমার জয়দেবপুরই সেরা, মেরা ভারত মহান। ভারতবর্ষ কখনো কাউকে লুণ্ঠন করেনি। যদি করত তাহলে পুরো ইউরোপ ভারতবর্ষের অধীনে থাকত।
খুব মজা নিয়ে গল্প এগিয়ে যাচ্ছিল। আসলে, মানব মনে গল্প ছাড়া অন্য কোনো কিছু এত দিশেহারা শান্তি দিতে পারে না। সবকিছু ভুলিয়ে দেয় অতলে। আর গাল্পিকদের মধ্যে যদি এমন পঞ্চকন্যা থাকে তাহলে তো কথাই নেই। আমি যেন মুগ্ধতায় ভাসছিলাম কলম্বাসের জাহাজ নিনা, সান্তা মারিয়া আর পিন্টার মতো উদ্বেগহীন নিরুদ্দেশে।
গল্পের মাঝে দাঁড়ি টানল অমল, ম্যাম, ডিনার রেডি।
মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল।
প্রমিতা তার বিশালাকার লাগেজ থেকে চকচকে কাগজে মোড়া একটি উপহার মোড়ক বের করে রচনার সামনে এগিয়ে দিলেন, ম্যাম, আমাদের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি শ্রদ্ধা।
খোলো।
রচনার নির্দেশ পেয়ে প্রমিতা নিপুণ হাতে মোড়কটি খুলে ফেলল। সাবান-সহ নানা রকম প্রসাধনী। প্রায় সবগুলো রচনার প্রিয়। যথেষ্ট দামি।
এগুলো কোত্থেকে? রচনা জানতে চাইল।
দাদাভাইকে দিয়ে ফ্রান্স থেকে আনিয়েছি।
এই ব্র্যান্ডগুলো পছন্দ করার কারণ?
আপনার প্রিয়, তাই।
কে বলেছে?
আপনার সতীর্থ, আমাদের উপাচার্য স্যার।

“এখন থাক,” রচনা  কিছু বলতে যাওয়ার আগে আমি বললাম, “চলো, আগে খেয়ে নিই। তারপর গল্প হবে।”

প্রমিতা বলল, স্যার, সারারাত গল্প হবে।
“চলুন, স্যার”, রচনা আমাকে বাসার মতো আদুরে-মমতায় জড়িয়ে ধরে ডাইনিং রুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বলল, “গার্লস ফলো মি।”

 

 

সন্মিত্রা: চতুর্থ (৪) পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

কোন জিনিস বারবার ছাড়া যায়?
সংসার।
জায়া-পতি প্রতিদিন কে কতবার যে সংসার ছাড়ে তার ইয়ত্তা নেই। রাতের সংসার ছাড়ার প্রতিজ্ঞা সকাল হতে না হতে উধাও। ঝগড়ার রেশটুকু কেবল রয়ে গেছে মনের ভেতর অভিমানের খুদে কষ্ট হয়ে।
অফিসে ঢুকে ঋধিতার অ্যালবাম পোড়ানোর ঘটনাটা রচনাকে জানালাম। কষ্ট ভাগ করে নেওয়া― এ আর কী! জানি না, জানানো উচিত হয়েছে কি না। উচিত না-হলেও তাকে না জানিয়ে পারতাম না। কিছু কিছু কথা কিছু কিছু লোককে বলার জন্য ভেতরে বমির মতো প্রবল ঊর্ধ্ব চাপ সৃষ্টি হয়। যতক্ষণ না-জানানো যায় ততক্ষণ অস্বস্তি ক্রমশ বাড়তে থাকে। বমি যেমন আটকে রাখা যায় না, তেমনি আটকে রাখা যায় না এমন কথা। অনেকটা প্রকৃতির ডাকের মতো।
জানিয়ে দেওয়ার পর বুঝলাম, না বললে চলত, কিন্তু ভালো হতো না। বলে দিয়ে ভালোই করেছি। কষ্টটা হালকা হয়েছে। আমার ভূমিকাটাও পরিষ্কার হয়েছে। রচনা বিচার করতে জানে।  আমার কাছে ঋধিতার চেয়ে রচনার সম্পর্ক অনেক পুরানো। অধিকন্তু নিবিড় এবং গভীর। পৃথিবীতে আমার অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি যাকে কষ্ট দেবে সে হচ্ছে রচনা। দ্বিতীয় অবশ্যই ঋধিতা। তবে তাদের এই কষ্টের রূপকতায় নানা পার্থক্য আছে।
ভালোবাসার মানুষের কাছে কোনো কিছু লুকিয়ে রাখা উচিত নয়। হয়তো প্রথমে কষ্ট পাবে, কিন্তু এই কষ্ট তার মনে নতুন ধারণার জন্ম দেবে― নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটাবে। তবে স্বামী-স্ত্রীর কাছে সবকিছু বলে ফেলা উচিত নয়, কারণ এরা পরস্পর ভালোবসার মানুষ নয়, এমনকি ভালোবেসে বিয়ে করলেও। বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ভালোবাসা আইনি দায়িত্ব হয়ে যায়। দায়িত্বে বিবেচনাহীন সত্য প্রকাশ নিজের পায়ে কুড়োল মারার মতো বোকামি। দায়িত্ব কেবল দায়কে ঘিরে আবর্তিত হয়। তার আবেগ বা ভালোবাসা বলে কিছু থাকে না।
রচনা সব শুনে স্বাভাবিক গলায় বলল, ম্যাম খুব রাগ করেছেন।
তুমি কীভাবে জানলে?
তিনি আমাকে রিং করে জানিয়েছেন।
কী! আমি বিস্ময়ের সঙ্গে বললাম।
আগুন দেখে না কি আপনি ভয়ে থরথর কাঁপছিলেন। তাই না কি? আপনি যা ভীতু, কাঁপবেনই তো। আসলে, দয়ালু মানুষরা ভীতুই হয়। দয়ার বৃহদংশ ভীতির দান। অন্যের কষ্ট, ভয় পেয়ে দয়ার্দ্র হয়।
আর কিছু বলেছে?
আপনার সঙ্গে যেন কোনো ছবি না তুলি এবং কোনো সম্পর্ক না রাখি।
তুমি কী বললে?
প্রথমটা রাখা সম্ভব, কিন্তু দ্বিতীয়টা সম্ভব হবে না। আমার উত্তর শুনে ম্যাম রেগে গেলেন। অনেক কথা শোনালেন। বেশ্যা, মাগি- – -। আমি চুপ করে শুনে গেলাম। অনেকক্ষণ ইচ্ছেমতো বকা দিলেন, গালি দিলেন।নতুন কিছু গালিও শুনলাম। কথার মাঝে একটা কথাও বললাম না। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ম্যামই বলা থামিয়ে দিলেন।
তারপর! তারপর কী হলো? আমার বুক শঙ্কায় রক্তাক্ত।
আমি ম্যামকে বললাম― স্যার আমার বাবা। আপনি আমার মা। ম্যাম বললেন, “আমি তোমার চেয়ে বয়সে ছোটো, তুমিই আমার মায়ের বয়সি, তোমার মা হই কীভাবে?” আমি বললাম, “তাহলে আমি আপনার মা।”
এসব কী? ম্যাম আরও রেগে গেলেন। “ম্যাম“, আমি বলললাম, “বয়স সময়ের বিষয়, কিন্তু মা পুরোটাই মনের বিষয়। আপনি আমাদের মায়ের আসনে অধিষ্ঠিত। স্যার, আমাদের জন্মদাতা নন, কিন্তু বাবা, মানে প্রভু। তিনি আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখলেও আমাদের রাখতে হবে। তিনি আমাদের বর্তমানের সৃষ্টিকর্তা। অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যৎ তিনটি অনেক দূরের বিষয়, তবু কারও থেকে কাউকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। স্যার, আমাদের তেমনই একজন। সম্পর্ক রাখা মানে শুধু কথা বলা নয়, মনে রাখাও নয়; মনের গভীরে স্থান দিয়ে তাকে মনের মধ্যে নিবিড় আলেখ্যে লালন করা। বিপদে-আপদে পরস্পরের কাছে যাওয়া।
তোমার ম্যাম আর কী বলেছে?
তা বলা যাবে না।
কেন?
শুনলে আপনি কষ্ট পাবেন। এটুকু জেনে রাখুন, তিনি আমাদের তিন বোনকে আপনার রক্ষিতা মনে করেন।
তুমি কষ্ট পেয়েছ?
কষ্ট পাব কেন? এমন তো অনেকেই বলত, এখন বলে না। আপনি তো আমাদের রক্ষকই। রক্ষকের কাজই করে গেছেন আজীবন। এটা তো আর নতুন কিছু নয়। অনেক বার অনেকভাবে অনেকের কাছে রক্ষিতা শব্দটা শুনতে হয়েছে। এজন্য আপনাকেও তো কম কষ্ট পেতে হয়নি। দুবার বিভাগীয় মামলায় পড়তে হয়েছে, নয় কি?
কাজটা সে ভালো করেনি।
হয়তো সব মেয়েই ওরকম করত। ম্যামও করেছেন। তাঁর প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই। তাঁকে আমি আগের মতোই শ্রদ্ধা করি। তিনি তাঁর মনকে অকপটে খুলে দিতে পারেন। এমন কয়জনই বা পারে? আমি মনে করি, মা হিসেবেই তিনি আমাকে রক্ষিতা বলেছেন। আমার মাও আমাকে মাগি বলে গালি দিতেন। আমার এখনও মনে আছে। মাঝে মাঝে খানকি ডাকতেন।
আমি হেরে গেলাম, আর্দ্র গলায় বললাম।
রচনা বলল,
কিছু কিছু হার,
জয়ের চেয়েও চমৎকার।
কিছু কিছু পরাজয়,
আনন্দের মাল্যে সহাস্য মুগ্ধতা―
বর্ণিল বরাভয়।
আপনার কবিতা দিয়ে আপনাকে জবাব দিলাম। স্যার, আপনি হারেননি, হারই আপনার কাছে হেরে গেছে। প্রত্যেক মানুষ, সে যত প্রভাবশালী বা ধনীই হোক, কারও না কারো রক্ষক আবার কারও না কারও রক্ষিতা।
তুমি হলেও কি ঋধিতার মতো করতে?
অবস্থান আর বিবেচনা মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে। ওই অবস্থায় না গেলে কীভাবে বলব। মানুষ অবস্থানে না থেকে অনেক কথা বলতে পারে। আমিও তো মেয়ে না কি? বস্তির মেয়ে। সংসার নেই, আপন বলতে কেউ নেই। একটা বোন নেই, ভাই নেই, বাবা নেই, মা নেই। আপনি কী স্যার বিষয়গুলো কখনো ভেবে দেখেছেন?
হ্যাঁ।
তাহলে আমার এ অবস্থা কেন? বলেই কেঁদে উঠল রচনা।
আসলেই আমি রচনাকে বঞ্চিত করেছি, কিন্তু কেন করেছি, তা আমি জানি না। কেউ বলে ভুল করেছি আবার কেউ বলে উত্তম সিদ্ধান্ত। প্রত্যেক কিছুর ভালো-মন্দ দুটি দিক আছে। এখন এটাই আমার সান্ত্বনা। আমার সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় আসেনি। তবে বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি― ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করা মানে ভালোবাসাকে জীবন্ত আগুনে আজীবন দগ্ধ করা, দগ্ধ হতে থাকবে কিন্তু মরবে না― কী নৃশংস।
তার মানে, বলতে চাইছ তোমার ম্যাম ভুল করেনি।
তাঁর আচরণে অনেকে তাকে ভুল বুঝতে পারে, কিন্তু আমার কাছে তিনি সর্বোত্তম শ্রদ্ধার একজন অকপট মানুষ। তিনি কখনো ভুল করতে পারেন না। এ আপনার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসার প্রভাব। তার ভয় আপনি আমাদের জন্য তাকে বঞ্চিত করতে পারেন― হোক তা কম বা বেশি, সত্য বা মিথ্যা। নারী মাত্রই নারী। দুর্বল বলে শঙ্কায় ভোগে বেশি।
তোমার এমন ধারণা কেন?
ম্যাম আপনাকে ভালোবাসেন। আমাদের প্রতি বিতৃষ্ণা আপনার প্রতি তাঁর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ভালোবাসা মানুষকে শুধু অমায়িক করে না, হিংস্রও করে দেয়। এক্ষেত্রে মেয়েদের প্রতিক্রিয়া সকল হিংস্রতাকে অতিক্রম করে যায়। কারণ মেয়েরা দুর্বল। তাই দুর্বলের আশ্রয়ের প্রতি কারও দৃষ্টি তারা সহ্য করতে পারে না। আমি ম্যামের কথা এবং ব্যবহারে কষ্ট পাইনি। আপনিও পাবেন না। ভুলে যান; পরিবারের প্রতি যার এত মমতা, তিনি সবসময় শ্রদ্ধার। সবাইকে শেষ পর্যন্ত পরিবারেই ফিরে যেতে হয়; জীবনের জন্য যেমন মৃত্যু অনিবার্য তেমন সংসারীর জন্য অনিবার্য তার পরিবার।
তাহলে তুমি কী আর আমার সঙ্গে ছবি তুলবে না?
না।
কেন?
উত্তর দেওয়ার আগে ইন্টারকম বেজে ওঠল। মন্ত্রী মহোদয়, মানে সৈয়দ আবুল হোসেন। রচনাকে হোল্ড করার অনুরোধ জানিয়ে ইন্টারকমের রিসিভার তুলে নিলাম, স্যার?
তুমি কী লন্ডন যাবে?
কেন স্যার?
একটা সেমিনার আছে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে।

অপ্রত্যাশিত সুসংবাদ আমার সব কষ্ট মুহূর্তে বিনাশ করে দিল। এরূপ অশেষ সুখের আকস্মিক আগমনকে ভাগ্য বলে।
যাব, স্যার।
খবরটি শুনে রচনা বিমোহিত খুশিতে অভিভূত হয়ে কেঁদে দিল,“অদ্ভুত এক আনন্দ আমাকে ঘিরে ধরেছে চারদিকে। ভাব্বা, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে খুশিতে। আমি এখন আনন্দে ভাসব। এই সংবাদ আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষে পরিণত করে দিয়েছে। মাঝে মাঝে খুব ছোটো খবরটাও কারও কারও কাছে ব্রহ্মাণ্ডের চেয়ে বড়ো হয়ে যায়।” তারপর একটু থেমে চিৎকার দিয়ে বলল, “কল্পু  ভাব্বা আসছেন।”
‘ওহ মাই গড, আনবিলিভেবল হ্যাপিনেস’ আমার কানের রিসিভার কল্পনার বিকট আনন্দ-চিৎকারে কেঁপে উঠল।
সেমিনার কখন?
মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে।
কিন্তু ভাব্বা, আগামী সপ্তাহ শেষ হলে যে ফেব্রুয়ারি।
তাই তো! তোমার বস্তিবাস তো এসেই গেল। মনে ছিল না আমার। ফেব্রুয়ারিতে করার কথা বলেছিলে।
বলেন তো ভাব্বা, এ বছর বস্তিবাসটি কোথায় পালন করার কথা? প্রস্তাবটি কিন্তু আপনি দিয়েছিলেন। আমি কেবল সম্মতি দিয়েছিলাম। এটাও ভুলে গেছেন?
কলকাতা। এত ভুলো মনে করোনা।
ভাব্বা, ম্যামের কথায় আপনি কি খুব কষ্ট পেয়েছেন?
কষ্ট বেশি এবং কম―এটি কোনো বিষয় নয়, কিন্তু প্রতিক্রিয়া একই। মানুষ শুধু অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনায় নিজের হতাশাটাকে প্রকট করে তুলতে চায়। তাই মানুষ প্রকৃত অর্থে সুখী না। সে কেবল সুখী হওয়ার চেষ্টা করে মাত্র। আচ্ছা, তুমি বলো তো― তোমার ম্যাম যদি একা তার বন্ধুর বাসায় যায় আমি কী করব?
আপনাকে আমি যতটুকু জানি, স্বাভাবিকভাবে নেবেন। ম্যামের প্রতি আপনার আস্থা অপরিসীম।
কিন্তু সে নিতে পারছে না, এটাই আমার কষ্ট।
সব মানুষের প্রকাশ একরকম নয়।
তাহলে পরিত্রাণ?
মহাজ্ঞানী গৌতম বুদ্ধ নির্বাণ লাভকে পরিত্রাণ লাভের একমাত্র উপায় বলেছেন। দুমিনিট আগেও আমার শরীর ব্যথায় কাতর ছিল এখন আনন্দে ডাগর। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। জীবন প্রকৃতির মতো অনিশ্চিত। ভাব্বা?
বলো।
আই লাভ ইউ, লাভ ইউ ভেরি মাচ।

“আই লাভ ইউ টু” বলে রিসিভার রেখে দিলাম। আমর মনপ্রাণ প্রশান্তিতে ভরে গেল। গত রাতের সব ভুল ফুলে ফুলে বাগান। 

লিংক: https://draminbd.com/খসড়া-2/

 

সন্মিত্রা: পঞ্চম পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

“আগে আজিজ সুপার মার্কেট যাব।” ঢাকায় নেমে স্বভাবসুলভ শ্রদ্ধা-প্রণতি আর শুভেচ্ছাদি বিনিময়ের পর রচনা আবদারের ঢঙে বলল। বাংলাদেশি পাসপোর্ট সমর্পণ করার পর এই প্রথম বাংলাদেশ এল বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী রচনা, ইউকে-এর পাসপোর্টে বাংলাদেশের ভিসা লাগিয়ে।
যাবে, আমি তার আবদারের জবাবে বললাম।
রচনা তার বাহু দিয়ে আমার বাহু আঁকড়ে কাঁচি বানিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিমানবন্দরের বাইরে এসে চারদিক তাকিয়ে বলল, “দেশটা পাঁচ বছরের মধ্যে বস্তির হাভাতে মহিলার মতো যেন পঞ্চাশ বছর বুড়িয়ে গেছে। খুব পাশুটে মনে হচ্ছে।”
মেয়ে, ভালো দেখতে দেখতে চোখ তোমার উচ্চদর্শী হয়ে গেছে। পাঁচ তারকা হোটেলের খাদকদের জিহ্বায় তিন তারকার হোটেলের খাদ্যও নিম্ন মানের। আমাদের জিহ্বায় চাঁদ-তারা আর গোষ্পদ সব একাকার। তবে এটি ঠিক যে, তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশ দিন দিন বুড়িয়ে যাচ্ছে মানে পিছিয়ে যাচ্ছে।
আমার জন্মভূমি বুড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ পৃথবীর প্রতিটি দেশ সজীব হচ্ছে। তবু নিজের জন্মভূমির মাটিতে পা পড়ামাত্র শরীরটা শিউরে উঠেছে। মনে হলো― মায়ের কোল। যদিও আমি এখন আর বাংলাদেশের নাগরিক নই।
জনগণই দেশের নির্মাতা।
তাই বাংলাদেশের জনগণের মতোই দেশটি দিন দিন নিকৃষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
প্রথমে কথা ছিল, সে অক্সফোর্ড থেকে এবং আমি ঢাকা থেকে সোজা কলকাতা যাব। তার অভিমত, কলকাতা যাওয়ার আগে নিজের জন্মভূমিতে যাওয়া উচিত। তাই পূর্বের সিদ্ধান্ত কিছুটা পরিবর্তন করে বাংলাদেশ চলে এসেছে। সে দুদিন ঢাকা থাকলে আমার দেশ আমার কাছে দুদিনের জন্য বিশ্ব হয়ে উঠবে। কারো কারো উপস্থিতি প্রচণ্ড খরাতেও বাসন্তিক মুগ্ধতা বিলিয়ে দিতে পারে। রচনা আমার সন্মিত্রা। তার মতো অকপট বন্ধু কে আছে আমার?
ঋধিতা?
নিজেকে প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দিই মনে মনে, সে তো স্ত্রী। “স্ত্রী যদি বন্ধু হয় সংসার হয়ে যায় রেলওয়ে জংশন কিংবা ক্লাবঘর।” আমার কথা নয় ঋধিতার কথা― “স্ত্রী হবে স্ত্রী এবং স্বামী হবে তার মালিকানাধীন সংসার নামের খেত কর্ষণের জন্য রাতদিন বিরামহীন ধেয়ে চলা হালের বলদ।”
আসলে, সংসারে স্বামী-স্ত্রী দুজনের একজন নিত্য শোষক আর একজন নিত্য শোষিত। যেটাই ঘটুক, প্রকৃতপক্ষে দুজনের প্রত্যেকে নিজেকে বঞ্চিত ও শোষিত মনে করে। একজন মনে করে― শোষিত হচ্ছি আর একজন মনে করে শোষণ করে সুবিধা করতে পারছি না। এটি দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু অনিবার্য বিষয়। বিমানবন্দরের পেরিয়ে মহাসড়কে উঠার আগে পুলিশ আমাদের গাড়ি আটকে দিল। ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড আছে গাড়িতে। আটকানোর কথা নয়। নিশ্চয় ভয়াবহ কিছু।
জানালার কাচ নামিয়ে পুলিশকে বললাম, কী ব্যাপার?
বাইরে কিছু সন্ত্রাসী গাড়ি ভাঙচুর করছে। একটু অপেক্ষা করতে হবে।
সামনে তাকালাম। যারা গাড়ি ভাঙচুর করছে তাদের সংখ্যা আট-দশ জনের বেশি হবে না। গাড়িতে এবং রাস্তার পাশে শতশত লোক দাঁড়িয়ে-বসে কিংবা হেঁটে-হুঁটে তা মজা করে দেখছে। কেউ প্রতিবাদ করছে না, থামানোর জন্য এগিয়ে আসছে না। পুলিশ কেবল বাঁশি বাজিয়ে সন্ত্রাসীদের থামানোর চেষ্টা করছে।
কী অদ্ভুত দেশ!
আপন মনে অনুচ্চকণ্ঠে বললাম, কেবল বাঁশি বাজিয়ে যদি সন্ত্রাসী দমন করা যেত তাহলে বিশ্ব, অস্ত্র বানানোর জন্য ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় না করে কয়েক লাখ ডলার খরচ করে বাঁশি বানিয়ে আর্মি-পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিত।
কিন্তু পুলিশ থেমে আছে কেন? রচনা প্রশ্ন করল।
পুলিশ থেমে আছে এটা পৌলিশিক সীমাবদ্ধতা। হয়তো, অমন নির্দেশ আছে। নতুবা, সংখ্যায় কম বলে ভয়ে যাচ্ছে না। নিজেদের সন্ত্রাসীদের চেয়ে দুর্বল মনে করছে।
কিন্তু হাজার হাজার মানুষ, যাদের অধিকাংশই যুবক; দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসীদের ভয়ে কাঁপছে। প্রত্যেকে একসঙ্গে ফুঁ দিলেই তো এই কয়েকজন সন্ত্রাসী খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। এরা থেমে আছে কেন?
এটি জনান্তিক সীমাবদ্ধতা, আমি বললাম।
“ভাব্বা”, রচনা বলল, “সীমাবদ্ধতা, উন্নয়ন আর মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশের জন্য অত্যাবশ্যক একটি বিষয়। তবে যে মানুষগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কয়েকজন সন্ত্রাসীর অপকর্ম উপভোগ করছে, এটি সীমবাদ্ধতা নয়, নিষ্ক্রিয়তা। এমন নিষ্ক্রিয় জাতি কখনো উন্নত হতে পারে না।”
সরকার বলে― আমাদের দেশ আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে।
কিন্তু ভাব্বা, উন্নতি এমন একটি ধারণা যা সর্বদা আপেক্ষিকতার নিরিখে বিচার্য। আমি যেখানে ছিলাম সেখান থেকে একশ গজ এগিয়েছি, কিন্তু আমার দুশ গজ আগে বা একশ গজ পেছনে যে ছিল, সে এখন দুহাজার গজ এগিয়ে― উন্নতিটা হলো কীভাবে? অগ্রজনকে ধরার সম্ভবনা আরও সংকুচিত হয়ে গেল, অ্যাকচুয়ালি আমি তো আগের চেয়ে পিছিয়ে গেলাম।
এমন ভাবলে আমরা দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছি।
এ যে ছেলেগুলো এমন নির্বিচার গাড়ি ভাঙচুর করছে, যদি পারত বিমানবন্দরটাই দখল করে নিত, কিন্তু পারছে না। এটা এদের নিষ্ক্রিয়তা নয়, সীমাবদ্ধতা। তাই সীমাবদ্ধতা কখনো কখনো মানবিক উৎকর্ষের গভীর নিয়ামক।
বুঝিয়ে বলো, আমি তোমার মতো ক্রাইস্ট চার্চ কলেজের অধ্যাপক নই।
আমার প্রচুর সম্পদ আছে। ভোগ করার ইচ্ছে এবং আর্থিক সামর্থ্য দুটোই অফুরন্ত, কিন্তু পারছি না। আমার ইচ্ছে, শারীরিক সামর্থ্যকে অতিক্রম করতে দিচ্ছে না। সামর্থ্য এবং ইচ্ছে থাকার পরও ভোগের যে সীমাবদ্ধতা আমার লাগাম টেনে ধরে― সেটাই মানুষের পাশব উগ্রতার প্রতিবন্ধক। এটি না থাকলে মনুষ্য জাতি বহু আগে ধ্বংস হয়ে যেত। প্রত্যেকটা মানব হয়ে যেত ভয়ংকর এক একটা পৌরাণিক দানব। এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও যে মানুষের এত অহংবোধ, সীমাবদ্ধতা না থাকলে কী হতো!
পুলিশ হাত নাড়ল।
ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল। মহাসড়ক প্রায় ফাঁকা। কোনো বাস নেই। থাকার কথা নয়। দুদিন যাবৎ পরিবহণ ধর্মঘট চলছে।
ভাব্বা, ঢাকার রাস্তা এত ফাঁকা কেন?
পরিবহণ ধর্মঘট চলছে।
কোথায় যাব, স্যার? ড্রাইভারের প্রশ্ন।
শাহবাগ, আজিজ সুপার মার্কেট, রচনা বলল।
কিন্তু আজিজ সুপার মার্কেট কেন? রচনাকে বললাম।
বই দেখব, বই কিনব। বাংলা বইয়ের বিশাল জগৎ থেকে অনেক দিন অনেক দূরে। আজ সাধ মিটিয়ে নেব ইচ্ছেমতো।
আগের আজিজ সুপার মার্কেট আর নেই। ওখানে বই পাবে না, কাপড় পেতে পার। কাপড়, বইকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
কী হয়েছে? সাঈদ ভাইয়ের সেই বড়ো বুকস্টলটা আছে না?
নেই।
কোথায়?
তিনি বইয়ের ব্যাবসা ছেড়ে গার্মেন্টস ব্যাবসায় নিয়োজিত হয়েছেন। শুনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কষ্টকর কথা দিয়ে প্রতিবাদ করেছিলাম। ভেবেছিলাম মাইন্ড করবেন, করেননি। এখনো দেখা হলে উপহাস করি। তিনি প্রতিবাদ করেন না― কেবল হাসেন। হেসে হেসে বলেন―, শামীম ভাই, আজিজ সুপার মার্কেটে আশি ভাগই ছিল বইয়ের দোকান। এখন দশ ভাগও নেই। আগের নব্বই ভাগ বইয়ের দোকানে এখন কাপড় বিক্রি হয়। আগামী কয়েক বছরে চার-পাঁচটির বেশি বুকস্টল আজিজ সুপার মার্কেটে পাবেন না।
কিন্তু ফেসবুকে বইয়ের স্ট্যাটাসে দেখি, লাইকের ছড়াছড়ি?
লাইক দিতে টাকা লাগে না, বই কিনতে লাগে।
তাই তো! রচনার স্বগোতক্তি।
সাঈদ ভাইকে বলেছিলাম, কেন বইয়ের দোকানটা ছেড়ে দিলেন? তিনি কী বলেছিলেন জানো?
কী বলেছিলেন?
সাধে কী আর ছেড়েছি! বিস্বাদে বিস্বাদে ত্যক্ত হয়ে ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। বইসম্পর্কিত স্ট্যাটাসে বন্ধুদের যত লাইক পড়ে, বইয়ের স্ট্যাটাস যত বন্ধু পড়ে, বইয়ের দোকানে যত বন্ধু আড্ডা দিতে আসে― তার এক ভাগ বন্ধুও যদি বই কিনত তাহলে বাংলাদেশের অধিকাংশ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী তৈরি-পোশাকের দোকান  ছেড়ে বইয়ের দোকান দিত। আমি শিউরে উঠে বলেছিলাম, থাক, যা হচ্ছে ভালোই হচ্ছে। নইলে দেশে থাকা দায় হয়ে যেত।
কেন? রচনা জানতে চাইল।
গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা বইয়ের ব্যাবসায় নেমে পড়লে বাংলাদেশের এত মানুষ কাপড় পেত কোত্থেকে? বই না পড়ে থাকা যায়, কিন্তু কাপড় না পরে থাকা যায় না। জ্ঞানোলঙ্গ মনের বিষয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ জ্ঞানোলঙ্গ। তাই পরস্পরকে মেনে নেয়। জ্ঞানলোঙ্গতা বাইরের চোখে দেখা যায় না। কিন্ত বস্ত্রোলঙ্গতা  দেখা যায়।
কথায় কথায় চলে এলাম শাহবাগ। ফাঁকা রাস্তায় থামতে হলো না কোথাও। ড্রাইভার গাড়ি থামাল আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে।
মার্কেটে ঢুকে রচনা অস্ফুট গলায় বলল, এ কী!
কী?
সব তো কাপড়ের দোকান; লাইব্রেরি কোথায়?
পড়ার চেয়ে পরা অনেক বেশি জরুরি। আগে পরা তারপর পড়া। সভ্যতার প্রথম নিদর্শন কাপড়, বই নয়। সভ্যতার প্রথম চাহিদা কাপড়, বই নয়। ইকরা এসেছে পোশাকের অনেক সহস্র বছর পর। বই ছাড়া কলেজে যাওয়া যায়, কাপড় ছাড়া যায় না?

 

error: Content is protected !!