খারেজি মাদ্রাসা, খারিজ ও খারিজি, খারেজিন, ওয়াহাবি, মাদ্রাসা, দারুল উলুম মাদ্রাসা; আলেম বনাম জাহেল, আলেম হওয়ার শর্ত

ড. মোহাম্মদ আমীন

খারেজি মাদ্রাসা, খারিজ ও খারিজি, ওয়াহাবি, মাদ্রাসা, দারুল উলুম মাদ্রাসা; আলেম বনাম জাহেল, আলেম হওয়ার শর্ত

খারেজি মাদ্রাসা: খরেজি মাদ্রাসা কাকে বলে? আরবি ‘খারেজ’ ও ‘মাদ্রাসা’ মিলে ‘খারেজি মাদ্রাসা’ বাগ্‌ভঙ্গিটি গঠিত। অর্থ (বিশেষণে) সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার বহির্ভূত ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত দারুল উলুম দেওবন্দের পাঠ্যসূচি অনুসারে পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

খারজি ও খারিজি: মোহাম্মদ হারুন রশিদের সংকলন সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি হতে প্রকাশিত `বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ব্যবহৃত বিদেশি শব্দের অভিধান’ গ্রন্থের ১৪১ পৃষ্ঠায় `খারিজ’ ও `খারিজি’ শব্দের যে অর্থ/সংজ্ঞার্থ প্রদান করা হয়েছে তা নিচে দেওয়া হলো।ওই গ্রন্থ বলছে: ‘খারিজ’ আরবি উৎসের শব্দ। অর্থ (বিশেষণে) অগ্রাহ্য; বাহির; পরিত্যক্ত; বাতিল (আমার মনে হয় তিনি হফমানের বইখানা পড়েননি, নয় একপেশে বলে খারিজ করেছেন— সৈয়দ মুজতবা আলী)। (বিশেষ্যে) পরিবর্তন, অগ্রাহ্যকরণ। একই গ্রন্থের একই পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘খারিজি’ আরবি উৎসের শব্দ। (বিশেষ্যে) ১. ইসলাম ও মুসলমানদের মূল ধারা থেকে যারা বেরিয়ে গিয়েছিল তাদের খারিজি বলা হতো। এরা হজরত আলি (রা.)-কে কিছুতেই সহ্য করতে পারত না; তাই তারা মূল ধারা থেকে বেরিয়ে গিয়ে হজরত আলি (রা.)-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে দেয়। এ বিদ্রোহী সম্প্রদায়ের হাতেই হজরত আলি (রা.) শেষ পর্যন্ত শহিদ হন। ২. হজরত আলি (রা.)-এর বিরোধী সম্প্রদায়বিশেষ।

খারেজিন:  মোহাম্মদ হারুন রশিদের সংকলন সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি হতে প্রকাশিত `বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ব্যবহৃত বিদেশি শব্দের অভিধান’ গ্রন্থের ১৪১ পৃষ্ঠায় বলা হচ্ছে, ‘খারেজিন’ আরবি ‘খারেজিন’ হতে উদ্ভূত। অর্থ (বিশেষ্যে) মুসলিম ধর্মভ্রষ্ট প্রতিষ্ঠান; ইসলামের মূলধারা থেকে বিচ্যুত সম্প্রদায় যারা হজরত আলীকে (রা.) খলিফা বলে স্বীকার করত না (রোয়ে ‘ওজ্জা হোবল’ ইবলিশ খারেজিন নজরুল ইসলাম)।

ওয়াহাবি: ‘ওয়াহাবি’ বানানটা কি সঠিক? ‘ওয়াহাবি’ অর্থ কী? বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ‘ওয়াহাবি’ বানান সঠিক। এটি ফারসি শব্দ। বিদেশি উৎসের শব্দের বাংলা বানানে ঈ-কার পরিহার্য। বাক্যে সাধারণত বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত ‘ওয়াহাবি’ শব্দের অর্থ: ইসলাম ধর্মের সংস্কারক আবদুল ওয়াহাবের অনুসারী। ওয়াহাবি শব্দের উচ্চারণ: ও্‌আহাবি।

মাদ্রাসা: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ‘মাদ্রাসা’ হলো ইসলাম-ধর্মসংক্রান্ত বিষয় অধ্যয়নে বা অনুশীলনে গুরুত্ব দেওয়া হয় এমন শিক্ষাকেন্দ্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটি আরবি উৎসের শব্দ। উচ্চারণ /মাদ্‌রাসা/।

দারুল উলুম মাদ্রাসা: দারুল উলুম কথাটি আরবি। এর অর্থ— জ্ঞানালয়, জ্ঞানগৃহ, জ্ঞানাগার, যেখানে জ্ঞান দান করা হয়, শিক্ষা দেওয়া হয়। কথাটি দ্বারা সাধারণত ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষালয় বোঝানো হয়। দারুল উলুম দেওবন্দ ভারতের একটি ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইসলামি শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে কয়েকজন ইসলামি পণ্ডিত উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। দারুল উলুম অন্যান্য মাদ্রাসার অনুরূপ হলেও এতে বিশেষ পাঠ্যসূচি রয়েছে। সেলজুক সাম্রাজ্যের নিজামিয়া ইসলামিক বিদ্যালয়গুলো থেকে দারুল উলুম-এর উদ্ভব। বাংলাদেশে অবস্থিত দারুল উলুম নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ দারুল উলুম দেওবন্দকে অনুসরণ করে থাকে।

আলেম বনাম জাহেল: আলেম হওয়ার শর্ত: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, আরবি উৎসের আলেম শব্দের প্রধান অর্থ: ইসলাম ধর্মতত্ত্বজ্ঞ। অপ্রধান অর্থ: পণ্ডিত, বিদ্বান ব্যক্তি। এখন আলেম শব্দটি ইসলাম ধর্মতত্ত্বজ্ঞ বা ইসলাম ধর্মবিষয়ক পণ্ডিত ব্যক্তি’ কথার পরিভাষা হিসেবে আভিধানিক ও প্রায়োগিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং বহুল প্রচলিত। তাই বাংলায় আলেম বলতে মুখ্যত বা সাধারণত ইসলাম ধর্মতত্ত্বজ্ঞ বা ইসলাম ধর্মবিষয়ক জ্ঞানী/বিদ্বান ব্যক্তি বা পণ্ডিতকে প্রকাশ করে। অন্য কাউকে নয়। উৎস ভাষায় আলেম শব্দটির অর্থ যাই থাকুক বা যাই হোক না, বাংলায় এখন আলেম শব্দটি ইসলাম ধর্মতত্ত্বজ্ঞ, ইসলাম ধর্মবিষয়ক পণ্ডিত ব্যক্তি’ কথার পরিভাষা হিসেবে আভিধানিক ও প্রায়োগিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত, সুস্বীকৃত এবং বহুল প্রচলিত। উৎস ভাষায় আলেম শব্দের অর্থ কী বা কী ছিল তা বাংলায় বিবেচ্য নয়। এমন কোনো সুযোগও নেই। এরূপ অনেক শব্দের অর্থ বাংলা এসে নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করেছে। মন্দির অর্থ ছিল গৃহ। এখন এর একমাত্র অর্থ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনা গৃহ। কথাটি আলেম শব্দের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 

যার জ্ঞান আছে সে জ্ঞানী। এই জ্ঞান যে বিষয়ের হোক না। কিন্তু বাংলায় আলেম বলতে কেবল ইসলাম ধর্মতত্ত্বজ্ঞ বা ইসলাম ধর্মে বিশেষজ্ঞকে বুঝায়। পাদ্রি, পুরোহিত, রাব্বি প্রমুখও জ্ঞানী। তাদের জ্ঞানী, পণ্ডিত, শাস্ত্রজ্ঞ বলা যায়, বিদ্বানা বলা যায়, কিন্তু বাংলায় আলেম শব্দের প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত অর্থ জ্ঞাপনে আলেম বলা সমীচীন হবে না। তারাও খুশি হবে না। … … … ইসলাম ধর্মতত্ত্বজ্ঞ নয়, এমন কেউ যতই উচ্চশিক্ষিত হোক না, বাংলায় তাকে কেউ আলেম বলে না, জ্ঞানী, বিদ্বান, পণ্ডিত প্রভৃতি বলে। আরবি উৎসের জাহিল বা জাহেল অর্থ (বিশেষণে) অজ্ঞ, নির্বোধ এবং (বিশেষ্যে) অশিক্ষিত ব্যক্তি। … … … এর সঙ্গে ইসলাম ধর্মে অজ্ঞ-অনজ্ঞবিষয়ক কোনো সম্পর্ক নেই। … জাহেল শব্দের উৎস অর্থ কী ছিল বা কী আছে তা বিবেচ্য নয়। এখন এটি বাংলা শব্দ। তাই বাংলা অর্থই বিবেচ্য। অভিধানে প্রদত্ত অর্থানুসারে, যে কেউ জাহিল বা জাহেল হতে পারে। তবে ইসলাম ধর্মবিষয়ক জ্ঞান না থাকলে বা ইসলাম ধর্মতত্ত্বজ্ঞ না হলে তাকে সাধারণ প্রচলিত অর্থে আলেম বলা যায় না। তাকে বিদ্বান, পণ্ডিত, জ্ঞানী বলা যায়। অর্থাৎ সকল আলেম, জ্ঞানী/বিদ্বান/পণ্ডিত , কিন্তু সকল জ্ঞানী/বিদ্বান/পণ্ডিত, আলেম নয়।
.
সূত্র: বাংলা একাডমি আধুনিক বাংলা অভিধান।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ব্যবহৃত বিদেশি শব্দের অভিধান, সংকলন ও সম্পাদনায় মোহাম্মদ হারুন রশিদ; প্রকাশক: বাংলা একাডেমি।
সহায়ক গ্রন্থ: #subach

Leave a Comment

You cannot copy content of this page

poodleköpek ilanlarıankara gülüş tasarımıantika alanlarPlak alanlarantika eşya alanlarAntika mobilya alanlarAntika alan yerler
Casibomataşehir escortjojobetbetturkey