খোলনলচে পরিবর্তন এবং ঢালাও আর ঢালাওভাবে

ড. মোহাম্মদ আমীন

খোলনলচে পরিবর্তন এবং ঢালাও আর ঢালাওভাবে

এই পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/খোলনলচে-এবং-ঢালাও-আর-ঢালা/

খোলনলচে
খোলনলচে শব্দের অর্থ আমূল পরিবর্তন, পুরো পরিবর্তন, ব্যাপক পরিবর্তন, বিদ্যমান ব্যবস্থা বা সাজসজ্জাকে সম্পূর্ণ পালটে নতুনভাবে সজ্জিতকরণ। কোনো বিষয় বা ব্যবস্থার আংশিক পরিবর্তনে  ঢেলে সাজানো  এবং এর চেয়ে ব্যাপক পরিবর্তন নির্দেশে খোলনলচে  পাল্টানো বা খোলনলচে পরিবর্তন  বা খোলনলচে বদলানো কথাটি ব্যবহৃত হয়।
 
খোলনলচে শব্দের সমন্বয়ে খোলনলচে শব্দের উদ্ভব।  ‘খোল’ হলো হুঁকোর মূল কাঠামো। যা নারকেলের মালা দিয়ে তৈরি। অন্যদিকে, এর সঙ্গে যুক্ত কাঠের নলটিকে বলা হয় নলচে। অর্থাৎ হুুঁকোর পূর্ণ কাঠামো হচ্ছে খোলনলচে। সুতরাং, খোলনলচে পরিবর্তন মানে হুঁকোর আমূল পরিবর্তন।
 
ঢেলে সাজানো কথাটি এসেছে কোনো কিছু ঢেলে পুনরায় সাজানো থেকে। এটি যে-কোনো কিছু হতে পারে।  তামাকসেবীদের হুঁকোর পুরানো জল, কল্কি,  পোড়া তামাক, পুরানো জল, টিকা প্রভৃতি  নতুনভাবে সাজিয়ে পরিবেশন করাকেও ঢেলে সাজানো বলা হয়। হুঁকো পানের পর নির্ধারিত সময়ে কলকে, তামাক, টিকা, জল প্রভৃতি পরিবর্তন করা হলে তাকে বলা হতো ঢেলে সাজানো। এই ঢেলে সাজানো কথাটি হুঁকো থেকে প্রাত্যহিক জীবনের সর্বত্র কোনো কাজ নতুনভাবে করা বা  কোনো বিষয় সাধারণভাবে সাজানো অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে। এখন এটি এই অর্থ প্রকাশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত একটি জনপ্রিয় বাগ্‌ভঙ্গি।
 
সবসময় ঢেলে সাজানোয় কাজ হয় না। সময়ের প্রয়োজনে হুঁকোর মূল কাঠামো বা খোলনলচেও  পরিবর্তন করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য হুকোর খোলনলচে পাল্টাতে হয়। হুুঁকোর আমূল পরিবর্তন মানে তার মূল কাঠামো বা খোল আর নলচে পরিবর্তন বা পাল্টানো। যা একদম আমূল বা পুরো পরিবর্তন করার তুল্য।  অর্থাৎ বিদ্যমান পুরো কাঠামোয় পরিবর্তন আনাকে বলা হয়   ‘খোলনলচে পাল্টানো’। কথাটি এখন হুঁকো থেকে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সর্বত্র ব্যবহৃত হচ্ছে।
 
ঢালাও /ঢালাওভাবে
 
‘ঢালাও’ বা ‘ঢালাওভাবে’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ বাছবিচার না-করে কোনও কিছু করা, বিস্তৃত, প্রশস্ত, নির্বিশেষে, বিবেচনাবোধহীন, নির্বিচারে, যথেচ্ছা প্রভৃতি। ‘ঢালা’ ক্রিয়া থেকে থেকে ‘ঢালাও’ বা ‘ঢালাওভাবে’ শব্দের উদ্ভব। ‘ঢালা’ ক্রিয়ার অর্থ পাত্র বা সংরক্ষণস্থান হতে কোনও কিছু উপড়ে দেওয়া, ছিটিয়ে দেওয়া, বিছিয়ে দেওয়া, ঢেলে দেওয়া বা ছুড়ে দেওয়া। গিন্নি শুধু রান্নার পাত্রে তৈল ঢালেন না, মাঝে মাঝে রেগে গেলে তৈলপাত্র উপড়ে সারা মেঝেতে ঢেলে দিতেও দ্বিধা করেন না। শুধু তাই নয়, কখনো কখনো নিজের ব্যবহারের প্রিয় রূপ-সজ্জার জিনিসপত্রও ঢেলে দেন। প্রথমটি আবেগের দ্বিতীয়টি রাগের। দুটোই কিন্তু ঢালা। মানুষ যখন কোনও পাত্র হতে কিছু ঢালেন তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেশি ঢালুক বা কম ঢালুক কোনটি ঢালবেন বা কোনটি ঢালবেন না এ নিয়ে কোনও বাছবিচার করেন না। অবশ্য ঢালার আগে তা যথার্থভাবে করাও সম্ভব নয়। তাই পাকা ফল পাড়তে গেলে কাচা ফলও পড়ে যায়। ঢালার পর প্রয়োজন হলে বাছবিছার শুরু করেন।
 
ব্যবসায়ী বা কৃষক ফসলাদি বাছবিছার করে বিভক্ত করার জন্য আগে ঢালেন, তারপর শুরু করেন বাছাই — ভালো-মন্দ, উৎকৃষ্ট-মাঝারি প্রভৃতি শ্রেণিতে বিভক্তকরণ। শস্যদানা থেকে ছিটা – বাছা গ্রামবাংলার একটি প্রাচীন রেওয়াজ। তবে ছিটা-বাছার আগে শস্যকে ঢেলে নিতে হয়। ঢালার সময় কোনও বাছবিচার করা হয় না, ভালো-মন্দ নির্বিশেষে পুরোটাই ঢেলে দেওয়া হয়। ঢালার পর শুরু হয় বাছবিচার বা ছিটা-বাছার কাজ। রাগের বশে কেউ যখন কোনও বস্তু ঢেলে দেন তখন কোনও বাছবিচার থাকে না। ঢালার পর রাগ কমে গেলে শুরু হয় বোধ, এটি চেতনা বা বাছবিচারের অনুভূতি। তখন আফসোস হয়, ঢেলে দেওয়া বস্তু হতে যতটুকু সম্ভব উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়। বাগভঙ্গিটির সঙ্গে আবার হুঁকো সাজানোর কর্মটিও যুক্ত রয়েছে। হুঁকো ঢেলে সাজানো অর্থ হুকোর পুরানো জল, টিকা, তামাক প্রভৃতি ঢেলে বা ফেলে দিয়ে নতুনভাবে ওসব দিয়ে হুুঁকো পরিবেশন।
 
পুলিশ অনেক সময় ঢালাওভাবে গ্রেফতার করেন। তারপর শুরু করেন বাছবিচার। ঢালার কাজটা বাছবিচারহীনভাবে করা হয়। এ বাছবিচারহীন ‘ঢালা’ থেকে বাংলা বাগভঙ্গি ‘ঢালাও’ বা ‘ঢালাওভাবে’ শব্দের উৎপত্তি। ঢালার আগে সাজানো যায় না, ঢেলে সাজাতে হয়। ঢেলে সাজানো’ বাগ্ভঙ্গির সঙ্গে বিবেচনা করলে ‘ঢালাও’ বা ‘ঢালাওভাবে’ বাগ্ভঙ্গির অর্থ ও ব্যুৎপত্তি আরও স্পষ্ট হবে।
error: Content is protected !!