খয়ের খাঁ ও চামচা

ড. মোহাম্মদ আমীন

খয়ের খাঁ ও চামচা

চামচা

দেশি ‘চামচা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ (বিশেষ্যে) অনুচর, তোষামোদকারী পার্শ্বচর, তাঁবেদার, চাটুকার, মোসাহেব প্রভৃতি। তবে চামচ এসেছে সংস্কৃত চমস থেকে। চামচ খাঁটি বাংলা শব্দ।
 
ফারসি ভাষায় ছোট হাতাওয়ালা চামচকে চম্‌চহ্‌ বলা হয়। রান্নাঘরে, খাওয়ার টেবিলে এমনকি ক্রোকারিজ বিক্রির দোকানেও ছোটো চামচের সঙ্গে বড়ো চামচও রাখা হয়। তবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, শেলফে রাখা চামচের মধ্যে বড়ো চামচের সংখ্যা ছোটো চামচের চেয়ে অনেক কম রাখা হয়। চামচ যত ছোট হয়, বড়ো চামচের সঙ্গে তাদের রাখার সংখ্যাটাও বেড়ে যায়। বৃহত্তম চামচ একাধিক তেমন দেখা যায় না।
 
বড়ো চামচ বড়ো নেতা আর ছোটো চামচ আয়তন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বড়োদের অনুসারী। একজন বড়ো নেতা বা ক্ষমতাশীল ব্যক্তির আশেপাশে অনেক মাঝারি আর ছোটো ছোটো নেতা ঘুরঘুর করে। ঠিক যেন বড়ো চামচের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেকগুলো ছোটো চামচ। ছোটো নেতাদের কাজ হল বড়ো নেতার চারিদিকে ঘিরে তোষামোদ ও আদেশ নির্দেশ পালন করা।
 

খয়ের খাঁ

‘খয়ের খাঁ’ বাগ্‌ভঙ্গির আভিধানিক অর্থ— চাটুকার, চামচা, তোষামুদে, উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য মিথ্যা প্রশংসাকারী প্রভৃতি। আরবি ‘খায়ের’ মানে শুভ, মঙ্গল, কল্যাণ। ফারসি ‘খাহ্’ মানে চাওয়া। এ-দুয়ে মিলে সৃষ্ট ‘খায়ের খাহ্’ কথাটির অর্থ হয় ‘শুভার্থী’, সুহৃৎ, শুভকামনাকারী। তবে বঙ্গদেশে এসে বাগ্‌ভঙ্গিটির অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়।
 
কারণ, বঙ্গদেশের অধিকাংশ লোক শুধু আত্মস্বার্থ সিদ্ধি সাধানের লক্ষ্যে শুভকামনার অজুহাতে চাটুকারিতায় ব্যস্ত থাকত। উদ্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য তাদের মনে প্রকৃতপক্ষে কোনো শুভকামনা থাকত না। তাদের স্বরূপ ছিল: “বগলে ইট, মুখে শেখ ফরিদ”—কথার মতো ভয়ংকর। আসল উদ্দেশ্য থাকত নিজের সুবিধা আদায়।
 
বঙ্গদেশে নকল শুভার্থী বেড়ে গেলে ইতিবাচক ‘খায়ের খাহ্’ কথাটি হয়ে যায় নেতিবাচক ‘খয়ের খাঁ’। অর্থ পরিবর্তন হয়ে নতুন অর্থ নিল— চাটুকার বা মোসাহেব। বাংলাদেশে এসব স্তাবকের মোসাহেবি আরও বেড়ে গেলে তুচ্ছার্থে ‘খয়ের খাঁ’ হয়ে যায় ‘চামচা’।
 
 
error: Content is protected !!