গম্বুজ বনাম মিনার, গাং বনাম গঙ্গা, সরকারি কিন্তু সহকারী

ড. মোহাম্মদ আমীন

গম্বুজ বা Dome স্থাপত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা নির্মাণশৈলী। এটি কোনো নির্দিষ্ট কাজে নির্মিত নির্দিষ্ট নামের অবকাঠামো নয়। বরং নির্মাণের  একটি বিশেষ পদ্ধতি। গম্বুজ বিশিষ্ট প্রাসাদ নানা কাজে ব্যবহৃত হয়।   গম্বুজ দেখতে সাধারণত ভবনের ওপর একটি গোলকের উচ্চতর অর্ধেকের মতো। এটি মূল প্রাসাদের অংশ হিসেবে মূলভবনের ওপরের অংশে সঙ্গে যুক্ত থাকে। গম্বুজ স্থাপত্যশৈলীর অতি প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য। প্রাচীনকাল থেকে  সাধারণত ধর্মীয় এবং সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবনকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তোলার জন্য স্থাপত্যশৈলীর এই বিশেষ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়ে আসছে। সরকার প্রধান এবং প্রধান ধর্মীয় নেতার বাসভবন বা গুরুত্বপূর্ণ অফিসসমূহে সাধারণত গম্বুজবিশিষ্ট প্রাসাদ হতো। আমাদের বঙ্গভবন গম্বুজবিশিষ্ট।  বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ফারসি গম্বুজ অর্থ (বিশেষ্যে) প্রাসাদ, মন্দির, মসজিদ, গির্জা প্রভৃতির বর্তুলাকার শীর্ষদেশ।  গম্বুজে কোনো গ্যালারি থাকে না। এখানে উঠারও কোনো সিঁড়ি যুক্ত থাকে না। যা মিনারে থাকে। বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ (গম্বুজের সংখ্যা ৮১), টাঙ্গাইলের ২০১ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ বাংলাদেশের অন্যতম স্থাপনা।
 
মিনার
মিনার হচ্ছে সাধারণভাবে মসজিদের সঙ্গে যুক্ত স্থাপত্য। এটি একটি নির্দিষ্ট কাজে নির্মিত নির্দিষ্ট নামের অবকাঠামো বিশেষ। এটি মূল প্রাসাদের অংশ নয়।  ভিত্তি, উত্থিত অংশ এবং একটি একক গ্যালারি সমন্বয়ে মিনার গঠিত। মিনারের শীর্ষভাগ মসজিদের থেকে উচু হয়। এর শীর্ষভাগ সুচালো বা পেয়াজাকৃতির হয়ে থাকে। আজানের আওয়াজ দূরে পৌছানোর জন্য মিনারের নির্মাণ ও ব্যবহার হয়। আধুনিক যুগে মাইকের সাহায্যে আজান দেওয়া হয়। তবুু ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য  মসজিদ নির্মাণে  এখনো মিনারের ব্যবহার  দেখা যায়।  মিনারের শীর্ষে মাইক যুক্ত করা হয়। ৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত  তিউনিসিয়ার উকবা মসজিদের মিনার পৃথিবীতে টিকে থাকা প্রাচীনতম মিনার।  সর্বোচ্চ মিনারটি মরক্কোর কাসাব্লাংকার দ্বিতীয় হাসান মসজিদে অবস্থিত। এর উচ্চতা ২১০ মিটার বা ৬৮৯ ফুট। ইট নির্মিত সর্বোচ্চ মিনার দিল্লির কুতুব মিনার। কুতুব মিনারের উচ্চতা ২৩৮ ফুট। কিছু পুরনো মসজিদের মিনার ওয়াচটাওয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। যেমন: যেমন দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের মিনার। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, আরবি মিনার অর্থ (বিশেষ্যে) অট্টালিকা, উপসনালয়, স্মৃতিসৌধ প্রর্ভতির উঁচু চূড়া। 
 

উঁচু জাতের গঙ্গা নীচু জাতের গাং

‘গাং’ অর্থ নদী। “আমার গহিন গাঙের নাইয়া”— বাংলার একটি জনপ্রিয় গান। একসময় ‘গাং/গাঙ’ বানানের কোনো শব্দ বাংলায় ছিল না। সংস্কৃত ভাষায় বহুল-ব্যবহৃত এবং হিন্দু পুরাণমতে পবিত্র ‘গঙ্গা’ নাম বাংলায় এসে ঐতিহ্য হারিয়ে ‘গাং/গাঙ’ হয়ে গেছে। কিন্তু কেন?
 
বঙ্গদেশ ছিল অনার্য-প্রধান অঞ্চল। কেউ কেউ বলেন— বঙ্গদেশের অনার্যরা যাতে উৎস থেকে প্রবাহিত পবিত্র গঙ্গার জলে স্নাত হয়ে সহজে পুণ্য লাভ করতে না-পারেন এবং পুণ্য লাভের জন্য ভারতের গঙ্গার দ্বারস্থ হতে হয় সেজন্য আর্যরা বঙ্গদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গাকে ‘গাং’ বানিয়ে দিয়েছেন। যা থেকে ‘গাং’ শব্দের উদ্ভব। এজন্য বঙ্গদেশের অধিবাসীকে গঙ্গা স্নানের জন্য ভারতের গঙ্গায় যেতে হয়। যদিও বঙ্গদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত গাঙের জল ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গা হতেই আগত এবং অভিন্ন।

সরকারি বনাম সহকারী

ফারসি সরকার থেকে সরকারি। সুতরাং ‘সরকারি’ অতৎসম শব্দ। বিদেশি বা অতৎসম শব্দে সাধারণত ই বা ই-কার হয়; ঈ বা ঈ-কার হয় না। তাই সরকারি বানানে ই-কার। অন্যদিকে, সহকারী (সহ+√কৃ+ইন্‌) তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ। তাই সংস্কৃত ব্যাকরণমতে, বানানটিতে ঈ-কার হয়েছে।
 
নিমোনিক: ব্যক্তি না হলে সেসব শব্দের বানানে সাধারণত তরকারি বানানের ‘-কারি’ দেবেন। যেমন: পাইকারি, পায়চারি, সরকারি, দরকারি, তরকারি। এসব শব্দ ব্যক্তি বোঝায় না। তাই তরকারি বানানের -কারি।ব্যক্তি প্রকাশ করলে ‘-কারী’ দিতে হবে। কারণ, ব্যক্তির সঙ্গে তরকারি দিলে খেয়ে ফেলবে। তাই ব্যক্তি প্রকাশে ‘-কারি’ হয় না; ‘কারী’ হয়। যেমন: সহকারী, উপকারী, কর্মচারী, দরখাস্তকারী, হঠকারী, নভোচারী, অন্যায়কারী।
 
 
প্রয়োজনীয় লিংক:

শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com

All Link

All Links/1

All Links/2 শুবাচির পশ্ন থেকে উত্তর

মৌলবাদ ও মৌলবাদী শব্দের অর্থ কী জানতে চাই

error: Content is protected !!