গরু ও গোরু: গরু বনাম গোরু

ড. মোহাম্মদ আমীন

গরু ও গোরু: গরু বনাম গোরু

সংযোগ: https://draminbd.com/গরু-ও-গোরু-গরু-বনাম-গোরু/

ড. মোহাম্মদ আমীন
Cow শব্দের বাংলা ‘গরু’ না ‘গোরু’ এ নিয়ে অনেকের সংশয়। বানান নিয়ে সংশয় অমূলক নয়। কারণ ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের আগেও লেখা হয়েছে গরু। তাহলে আবার ‘গোরু’ কেন?
বাংলা ভাষার আদি হতে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যায়। পঞ্চাশটি চর্যাপদের মধ্যে ‘গরু’ শব্দ নেই। মধ্যযুগের কাব্যে Cow এর বাংলা অর্থ হিসেবে ছয় রকম বানান পাওয়া যায়। সেগুলো হচ্ছে : গরু, গরুঅ, গরূ, গোরু, গোরো, গো।
১৪৫০ -১৫০০ খ্রিষ্টাব্দে বড়ু চণ্ডীদাস লিখেছেন গরু, গরূ, গোরো এবং বিদ্যাপতি লিখেছেন ‘গরুঅ’। ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দে মালাধর বসু লিখেছেন ‘গোরু’, ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে মুকুন্দ দাস লিখেছেন ‘গোরু’ এবং ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল ইসলাম লিখেছেন ‘গোরু। ১৯২৯/৩০ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের লেখাতেও ‘গোরু’ বানান দেখা যায়। যদিও পরে তিনি ‘গরু’ লিখতে শুরু করেন।পশ্চিমবঙ্গেও সে সূত্রে গরু প্রচলিত হয়ে যায়। যদিও সুনীতিবাবু লিখতেন গোরু।রবীন্দ্রনাথ ‘গরু’ লেখাতে ওই বানানটিই বহুল প্রচলিত হয়ে পড়ে।
গো (সংস্কৃত, গম+ও) / গোরু/গরু (সংস্কৃত, গরূপ) অর্থ হলো: জ্ঞান, ঐশ্বর্য, ধনু, গাভি, ষাঁড়, বৃষ, নিরেট বোকা/মূর্খ প্রভৃতি। বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি উচ্চারণ অভিধান ও ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘গরু’ লেখা হয়েছে। কারণ সংবৃত অ-ধ্বনির পরে ই/ঈ/উ/ঊ-কার থাকলে অ-ধ্বনি ও-ধ্বনি উচ্চারিত হয়। যেমন : গরু>গোরু। জামিল চৌধুরী সম্পাদিত ‘বাংলা একাডেমি অধুনিক বাংলা অভিধান’ (২০১৬খ্রিষ্টাব্দ) লিখেছে ‘গোরু’।
গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প

সুনীতি বাবু একদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বললেন, গুরুদেব, আপনি তো জানেন গো থেকে গোরু। তাই আমি চাইছি, গরু বানান পরিবর্তন করে গোরু

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

করতে। কেমন হবে?

কিছু তো একটা হবেই, রবীন্দ্রনাথ বললেন।
কী হবে গুরুদেব?
রবীন্দ্রনাথ বললেন, গ-য়ে ও-কার দিলে তোমাদের চিকন-চাকন গরুগুলো একটু মোটা হবে; এ আর কী! আর কিছু বলবে?
বৌ বানান বউ করে দিলে কেমন হয়?
এমন করলে বৌ-এর ঘোমটা যে থাকবে না?
গুরুদেব, ভাবীকালের আধুনিক বউগণ ঘোমটা পরবে না। তাই আগেভাগে সরিয়ে দেওয়া ভালো নয় কি?
তোমাদের যা ইচ্ছে করো। আমার বয়স হয়েছে, আর কত!
 
গুরুদেবের কথা শুনে বিফল হয়ে চলে এসেছিলেন সুনীতিকুমার। দীর্ঘদিন অভিধানে চিকন গরু আর মোটা গোরু দুটোই পাশাপাশি ছিল। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে’ তার পৃষ্ঠায় চিকন গরুকে স্থান দেয়নি। কেবল মোটা গোরুটাকে স্থান দিয়েছে। আমার কোনো দোষ নেই।

গরু না কি গোরু

অনেকে প্রশ্ন করেছেন, “গরু না কি গোরু”। বানান পরিবর্তনের অধিকার কার?
জামিল চৌধুরী সম্পাদিত ও বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ অভিধান বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, একমাত্র প্রমিত বানান গোরু। এ বিষয়ে সন্দেহ করার কেনো সুযোগ নেই। ওই অভিধানে গরু বানানের কোনো শব্দ-ভুক্তি নেই।

বানান পরিবর্তন করার অধিকার সংরক্ষণ করেন বাংলা একাডেমি। তবে বাংলা একাডেমি এককভাবে কোনো বানান পরিবর্তন করেননি। একাডেমি কেবল

প্রকাশক: পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত বাংলা বানান বিধি অনুসরণ করে থাকেন।অনেক আগে বানান পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি না, জানার আগ্রহ, পরিবেশ ও সুযোগ কোনোটাই সন্তোষজনক ছিল না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যক্রম ছিল না বললেই চলে।

সবচেয়ে বড়ো কথা, বাংলা একাডেমি পরিবর্তিত বানান সম্পর্কে আমাদের অবগত করার বিষয়ে ন্যূনতম উদ্যোগও গ্রহণ করেননি। পরিবর্তিত বানান অভিধানে ভুক্ত করে দায়িত্ব শেষ করেছেন।পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনের কারণাদি সর্বস্তরে উপযুক্ত উপায়সমূহের মাধ্যমে প্রচার করলে বানান নিয়ে বাংলাভাষীর এমন দ্বিধা ও সাংঘর্ষিকতা সৃষ্টি হতো না।এই যেমন: গোরু অনেক পুরানো বানান হলেও শুবাচের মাধ্যমে তা ব্যাপক প্রচার পায়। এ বিষয়ে শিক্ষকবৃন্দের ভূমিকাও ছিল হতাশার জনক। তাদের নিষ্ক্রিয়তা খুবই দুঃখজনক।
বাংলা একাডেমি প্রণীত বানান অনুসারে বানান লেখা বাধ্যতামূলক করা উচিত। আমাদের বাধ্য না করলে স্বেচ্ছাচারই প্রবল থাকে।এজন্য একই শব্দের বানান নানাজন নানাভাবে লিখে যাচ্ছেন।
সবার বৌদি, গরিবের বউ—
যেমন ইচ্ছা তেমন করো,
দেখার তো নেই কেউ।
সংগতকারণে সাধারণ মানুষ পড়ছেন বিভ্রান্তিতে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ দায় এড়াতে পারেন না। শিক্ষকগণ কী জবাব দেবেন? শ্রেণিকক্ষে সবকিছু আবদ্ধ করে রাখলে জ্ঞানের সন্তোষজনক বিকাশ কখনো সম্ভব নয়।এমন তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও বাংলা ভাষা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আদৌ কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
বাংলা একাডেমির উচিত ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের প্রমিত বানান বিধিকে ভিত্তি করে পরিবর্তিত প্রতিটি বানান বিষয়ে যথাযথ প্রচারের ব্যবস্থা করা; তাদের প্রণীত বানান বিধি সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা; লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।
নইলে বাংলা অচিরে ভাঙলা হয়ে যাবে। এবং তা হবে উচ্চশিক্ষিতদের গাফেলতির জন্য।
প্রাসঙ্গিক তথ্য:
সূত্র: বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
error: Content is protected !!