গল্পে গল্পে শুদ্ধ বানান চর্চা: কথায় কথায় বাংলা বানান: হাসতে হাসতে বাংলা বানান

ফেসবুকে লেখালাপ (চ্যাটিং) চলছে।
আসলাম, সালামকে উদ্দেশ করে  লিখল, কেমন আছ বঁধু?
“ভালো নেই সাথি ”, সালাম লিখল, একটা নূতন রেডিও কিনে স্টুডিও কক্ষে  ভিডিও দেখতে গিয়েছিলাম।
ভালোই তো। মন খারাপের কী হলো?
ভাল আমার খারাপ।ভিডিও দেখতে পাইনি। বাসায় এসে দেখি, দোকানদার নষ্ট একটি রেডিও ধরিয়ে দিয়েছে। স্টুডিও  থেকে বের হওয়ার সময় অনবধানতায় ভাঙা ইটে  হোচট খেয়ে কপোল গেছে ছিঁড়ে। কপালে জেগেছে আম।
এমনই তো হওয়ার কথা।
কেন? 
বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের সব স্টুডিও  ভেঙে স্টুডিয়ো করে দিয়েছে। ভাঙা জায়গায় ঢুকতে গেলে হোচট তো খাবেই।  রেডিও আর  ভিডিও আপাতত বাতিল। এদের পরিবর্তে বাজারে এসেছে  রেডিয়ো আর ভিডিয়ো। এখন  রেডিয়ো  কিনতে হবে।  ভিডিয়ো দেখার জন্য স্টুডিয়ো। স্টুডিও বাদ।
“বাংলা একাডেমি এমন কাজটা করল কেন?” সালাম লিখল।
এসব শব্দের শেষে ও-থাকলে বাংলাভাষীর প্রত্যয় দিতে ঝামেলা হয়।  কষ্ট পায় ‘ও’।
‘ও’ কষ্ট পাবে কেন?
ও-এর মাথায় মাত্রা নেই। মাত্রা, মাথার ছাদের মতো।  তাই ও-বর্ণটি প্রত্যয় এলে অসহায় হয়ে পড়ে।
কারণ কী?
রেডিয়ো হতে রেডিয়োর এবং রেডিয়োতে, কিন্তু রেডিও হতে রেডিওর এবং রেডিওতে। মাঝখানে মাত্রাহীন ও-বর্ণটি একঘরে। মাথায় কোনো ছাদ নেই। দুপাশের ছাদওয়ালা প্রতিবেশির মাত্রাহীন চাপে বেচারা ও-এর বেহাল দশা।  এমন অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য সে বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিল।
কীসের আন্দোলন? দাবি ছিল কী?
আমাদের মাথায় ছাদ দিন, নইলে আমাদের সরিয়ে নিন। ও বর্ণের দাবি ছিল যৌক্তিক। যেমন: কোনোখানে লেখা কোনওখানে লেখার চেয়ে সহজ।  যৌক্তিক হলেও বাংলা একাডেমির পক্ষে ও-বর্ণের দাবি মানা সম্ভব হচ্ছিল না।
কেন?
জন্মগতভাবে ‘ও’ বর্ণ ছাদ তথা মাত্রাহীন প্রতিবন্ধী।  ও-এর যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করাও কষ্টকর মনে হচ্ছিল। উভয় সংকটে পড়ে বাংলা একাডেমির ত্রিশঙ্কু অবস্থা। এসময় খোদার বিশাল রহমত বর্ষিত হলো বাংলা একাডেমির ওপর।
এটা আবার কী?
জনগণ দাবি করল বাংলা বানান সহজ করতে হবে। এমতাবস্থায় এবং এ অবস্থায় বাংলা একাডেমি, পশ্চিমবঙ্গের বাংলা আকাদেমির সঙ্গে আলোচনা করে দেখল ‘ও’ আর ‘জনগণ’ উভয়ের দাবি অভিন্ন। তাই ‘ও’ বর্ণকে সরিয়ে স্টুডিও, ভিডিও, রেডিও বানান যথাক্রমে স্টুডিয়ো, ভিডিয়ো এবং রেডিয়ো করে দেওয়া হলো। লাভ হলো দুটি।
কী কী?
এক: বানান চিকন হলো এবং দুই: সহজ বানান পেয়ে জনগণ খুশি হলো।
“কিন্তু” সালাম লিখল, “গরু বানানের গ-য়ে ও-কার দিয়ে মোটা করে  দেওয়া হলো। বিষয়টা সাংঘর্ষিক নয় কি?
না।
কীভাবে?
আজ নয়,  বউ খেতে ডাকছে।
কখন?
আগামীকাল, এসময় আবার চলবে লেখ্যালাপ। 
লেখালাপ না কি লেখ্যলাপ?
আগামীকাল, গেলাম।  
বাই।
 
 
 
 
দুই
বৌ না কি বউ?
বউ। এখন কোনো বৌ নেই। কারও বৌ নেই। সবাই বউ। বাংলা একাডেমির অভিধানেও নেই। শিশুদের পুস্তকেও নেই।
বউ লিখলে বৌএর ঘোমটার কী হবে গো, আসলাম ভাই?
কিচ্ছু হবে না। ব-য়ে ঘোমটা পরা বৌ লিখলে কেউ তাকে বিয়েই করবে না। আইবুড়ো হয়ে থাকতে হবে আমরণ।
কেন?
আধুনিক বউ ঘোমটা পরে না। বৌরা এখন ঘোমটা ছেড়ে প্রমিত বউ। কে থাকতে চায় অপ্রমিত। অপ্রমিত থাকলে তো তুমি সালামও  বিয়ে করবে না, তাই না? তোমার বউ কি ঘোমটা পরে? 
না।
তো, অন্যের বউকে ঘোমটা পরানোর এত সখ কেন? মুরোদ থাকলে নিজের বউকে গোমটা পরিয়ে বউ বানিয়ে ফেল।
এমন হলো কেন গো আসলাম ভাই?
যুগের চাহিদা।
আগে ঘোমটা-পরা বউ (বৌ) পড়তাম: “বাক বাক্‌ কুম পায়রা / মাথায় দিয়ে টায়রা; বৌ সাজবে কাল কি /চড়বে সোনার পালকি।”
এখন ঘোমটা-পরা বৌ পড়ি না, ঘোমটাবিহীন পড়ি। ওই দিন বললাম বউকে, গোমটা পরো। সে বলে:
“বাক বাক্‌ কুম পায়রা/ মাথায় দিয়ে টায়রা
বউ সাজবে কাল কি/ চড়বে সোনার পালকি।”
শুধু কি বউয়ের গোমটা খুলে ফেলা হয়েছে?
না, আরো অনেকের। 
যেমন?
ওই, মউ, অথই, খই, কই, দই, বইকি, বই। তবে, চৌদ্দ কিন্তু চউদ্দ এবং মৌমাছিও মউমাছি হয়নি। যাদের একলা পেয়েছে তাদের ঘোমটাটাই কেবল ছিনিয়ে নেওয়া হয়ছে। দুর্বলের বউ সবার ভাবী। এটাই এখন ভাবি।
 
তিন
 
গতকাল বউ কী খেতে ডেকেছিল?
সবজি খেতে। 
সবজি খেতে মানে খাওয়ার জন্য নয়। ফিল্ড। 
এতদিন লিখেছি গরু, এখন গোরু কেন? প্রশ্ন করল সালাম।
আসলাম লিখল, এটাও জনগণের দাবি। জনসংখ্যা বেড়ে গেছে। গরু বানানের গ-য়ে ও-কার দিয়ে চিকন গরুটা মোটাতাজা গোরু করা হয়েছে।
কিন্তু দীর্ঘদিন গরু লিখে আসছি, হঠাৎ আবার গোরু? জনগণের দাবি এতদিন কেনই বা উপেক্ষা করা হয়েছিল?
 শক্তি পায়নি তাই। আন্দোলন-দাবি প্রভৃতি শক্তি না পেলে মানা হয় না।
হঠাৎ শক্তি পেল কীভাবে?
গরু নিজেই তার বানান পরিবর্তনের আন্দোলন শুরু করেছে। 
তার আবার কী হলো?
সে আর চিকন থাকতে চায় না। উলঙ্গও থাকতে চায় না। 
উলঙ্গ মানে?
গরু বানানের গ-য়ে ও-কার না দিলে কেমন ন্যাংটো ন্যাংটো মনে হয়। গোরু বলেছে আমাকে নিযে রচিত গোশালা, গোয়াল, গোপাল, গোমাংস, গোদুগ্ধ,  গোমূত্র প্রভৃতি বানানে ও-কার আছে। আমি কী দোষ করলাম?  গোরুরা আবেদন করেছে এসব শব্দের বানানে ও-কার থাকলে আমার ও-কার থাকবে না কেন?
তাই গরু এখন গোরু।  গোরু তাদের পূর্বরূপ ফিরে পেয়েছে।
 
চার

কোন কোনো কোনও কোণ কোন কোনা কোনাকুনি কেন কেনো কখন কখনো কখনও- শব্দের প্রয়োগ

উল্লাস, গুনগুন করে গাইছে: “তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা/ তোমায় কোথায় দেখেছি যেন কোন স্বপনের পারা- – -।” রিকশা এগিয়ে বেইলি রোডের দিকে। ফুরফুরে বাতাস আমেজ দিয়ে যাচ্ছে সুরে।
“গান থামাও”, কনুইয়ের ধাক্কা-সহ উল্লসিতার আদরাঘাত।
কেন?
তোমার ভাই কোন দেশে জানি থাকেন?
আমেরিকা। চোখের কোণে অভিমান ঢেলে কোনাকুনি দৃষ্টি ফেলল উল্লাস।
কোন অঙ্গরাজ্য?
পেনসিলভেনিয়া।
কোন শহর?
ফিলাডেলফিয়া। এটি আমেরিকার উত্তর পূর্ব কোনায়। ফ্রিডম বেল এখানে রয়েছে। এখানেই কলম্বাস অবতরণ করেছিলেন।
কখন?
পঞ্চদশ শতকে। দেশটা অনেক সুন্দর নাকি। কোনোদিন যাইনি। কখনো (কখনও) যদি যেতে পারি আর কখনো ফিরব না।
যাবে না?
তোমাকে ছাড়া কোনো সময় কখনো কোথাও গিয়েছি?
কখন যাবে?
যে কোনো সময় যে কোনোদিনযে-কোনো একটা উপায় চলে আসতে পারে। তবে কখন আসবে জানি না।
আমেরিকা গিয়ে কী করবে শুনি? উল্লসিতার প্রশ্ন।
কোনোরকমে একবার যেতে পারলেই হলো। কোনো না কোনো একটা কাজ পেয়ে যাব।
উল্লাস ?
বলো।
তুমি কখনোকোনোদিন কোনোভাবে আমাকে কষ্ট দেবে না, দেবে না তো?
কোনোভাবেই না, কোনোদিনও না, কোনোমতেই না- তিন কসম।
তুমি কত ভালো, মুখটা এগিয়ে দাও আমার দিকে।
কেন?
ঠোঁট-তুলি দিয়ে তোমার মুখে এঁকে দেব প্রেমদাগ।
আমাদের পাড়ার উত্তর কোণে একটা শিমুল গাছ আছে, দেখেছ?
দেখব না কেন উল্লসিতা বলল, “ওই গাছের নিচে বসেই তো আমরা গাইতাম, কোন গানটা জানি? বলো-না, মনে পড়ছে না কেন গো?- – – মনে পড়েছে।
সুর দাও।
কোনো এক গাঁয়ের বধুর কথা তোমায় শোনাই শোনো
রূপকথা নয় সে নয়– – -।”
কথায় কথায় আর গানেপ্রাণে পথ শেষ। রিকশা ছেড়ে রাস্তার কোনার কোনাকুনি এক দোকানে ঢুকে পড়ল। উল্লসিতা একটি জামা হাতে নিয়ে বলল, এই জামাটি তুমি কেনো না কেন? কতবার বলেছি, তুমি না আসলে আমার কোনো কথাই শোনো-না।
আগে তুমি একটা শাড়ি কেনো।
না।
তুমি কোন শাড়িটি চাও? উল্লাস জানতে চাইল প্রেমাতুর গলায়।
আমি কখন কোন জিনিসটা তোমার কাছে চেয়েছি, চেয়েছি কখনো?
চাওনি; তবু বলো-না কোন শাড়িটি তুমি চাও?
আমি কোনো শাড়ি চাই না।
কী চাও?
শুধু তোমাকে। তোমাকে পেলে আমার সব পাওয়া পূর্ণ হয়ে যাবে। তুমি আমার ভালোবাসার নিত্য মহাকাল- – -।
 
[ ওপরের লেখায় শব্দগুলির প্রয়োগ বুঝে গেলে নিচেরগুলি পড়ার প্রয়োজন নেই। তবে, মুদ্রণপ্রমাদ দেখলে বলবেন।
 
——————————————————————–
কোন: কী, কে, কোনটি ( কোন দিন, কোনটি চাই, কোন জন)। কী প্রকারে, কীভাবে, কীসে (তুমিই বা কোন লাট বাহাদুর)। “তুমি কোন জামাটি চাও”— বাক্যে একই অর্থ প্রকাশের জন্য ‘কোনও’ বা ‘কোনো’ পদ ব্যবহার করা যাবে না। কোন শব্দের উচ্চারণ- কোন্।
কোনও: অনির্দিষ্ট একটি বা একজন, বহুর মধ্যে এক। অর্থের দিক হতে এটি ‘কোনো’ শব্দের সমার্থক। ‘কোনও’ শব্দের পরিবর্তে ‘কোনো’ লেখা যায়। তবে কোনো নির্দিষ্ট রচনায় যে-কোনো একটি লেখা সমীচীন।
কোণ: পরস্পর মিলিত দুটি সরলরেখার মধ্যবর্তী স্থান (ত্রিভুজের কোণ), কোনা, দুই পাশের মিলনস্থান (ঘরের কোণ) ইত্যাদি।
কোনা: প্রান্ত, ধার, কোণযুক্ত, কোণবিশিষ্ট।
কখন: কবে।
কখনো: কোনো সময়ে। কখনো এবং কখনও সমার্থক।
কেন শব্দের উচ্চারণ হবে ক্যানো)
 
 
পাঁচ

চন্দ্রবিন্দু সমাচার

ছাত্র: স্যার, দাঁড়াও শব্দের মাথায় চন্দ্রবিন্দু আছে, কিন্তু দৌড়াও শব্দের মাথায় নেই কেন?
শিক্ষক: তুমি কি মাথায় বোঝা নিয়ে দৌড়াতে পারবে?
না, স্যার।
শিক্ষক: তারপরও যদি বোঝা নিয়ে দৌঁড় দাও, তো কী হবে?
ছাত্র: বোঝাটা মাথা থেকে পড়ে যাবে। হাঁটু ভেঙে যাবে।হাঁটতে পারব না আর।
শিক্ষক: ধরে নাও, চন্দ্রবিন্দু তোমার মাথার বোঝা। দাঁড়ানো অবস্থায় ওটি মাথায় ছিল। কিন্তু দৌড় দেওয়াতে পড়ে গেছে। তাই দাঁড়াও শব্দে চন্দ্রবিন্দু আছে, কিন্তু দৌড়াও শব্দে নেই।
ছাত্র: হাঁটা আর হাঁটু শব্দে চন্দ্রবিন্দু কেন?
হাঁট-হাঁটু দৌড় নয়। বুঝেছ?
বুঝেছি।
কী বুঝেছ?
ছাত্র: দাঁড়ানো অবস্থা থেকে হাঁটা পর্যন্ত হাঁটু অবধি চন্দুবিন্দু থাকে। দৌড় শুরু করলে মাথার ‘চন্দ্রবিন্দু’ ধুলায় গড়াগাড়ি খায়। তাই দাঁড়া, হাঁটা ও হাঁটু বানানে চন্দ্রবিন্দু, কিন্তু দৌড়া বানানে চন্দ্রবিন্দু নেই। কিন্তু, স্যার হাঁস বানানে চন্দ্রবিন্দু কেন?
চন্দ্রবিন্দু হচ্ছে হাঁসের নৌকা।
 
ছয়
 

বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক কে?

আপনার নাম? সাক্ষাৎকার বোর্ডের সভাপতির প্রশ্ন।
প্রার্থী মোজাম্মেল হক শিকদার বললেন, স্যার রহমত আলী।
‘স্যার’ উপাধিটা পেলেন কখন?
স্যার, আমাকে স্যার ডাকবেন না। আমি স্যার নই।
জানতে চাইছি, ‘স্যার’ উপাধিটা পেলেন কখন, দিল কে? এমন ভাবে বললেন, মনে হলো আপনি শিকদার নন, স্যার আইজাক নিউটন।
‘স্যার’ আমি নই, ‘স্যার’ হলেন গিয়ে আপনি। আমি তো স্যার, ষাঁড়।
ষাঁড় মানে?
ষাঁড়ের একটি অর্থ বলদ।
বলদ হবেন কেন?
চাকুরি না-পাওয়া পর্যন্ত প্রত্যেককে বলদই থাকতে হয়।
আপনার বাবার নাম?
জীবিত ছাদেক আলী শিকদার।
জীবিত মানে?
বাবা এখনও জীবিত আছেন। তাই জীবিত ছাদেক আলী শিকদার। মরে গেলে সবাই মৃত লিখেন। না মরলে তো জীবিতই, তাই না স্যার?
জীবিত বলা কী প্রয়োজন?
ঠিক আছে স্যার, আপনি যখন বললেন- আর জীবিত বলব না। গুরুজনের কথা ফেলতে নেই।
এবার তাহলে বলুন আপনার বাবার নাম কী?
অমরহুম ছাদেক আলী শিকদার।
অমরহুম আবার কী?
মরহুমের বিপরীত। মারা গেলে মরহুম, জীবিত থাকলে অমরহুম।আমার বাবা এখনও মরহুম হননি। তাই তিনি অমরহুম। আপনিও অমরহুম।
অমরহুম বলার কারণ?
পিএসসির মরহুম চেয়ারম্যান সাদত স্যার বলেছেন, সাক্ষাৎকারে যা বলার তা স্পষ্টভাবে বলা উচিত। কোনো কিছু লুকানো যাবে না। মারা গেল যদি মরহুম বলি, জীবিত থাকলে তো অমরহুমই বলতে হয়।
শিকদার কী?
মুঘল আমলের রাজস্ব আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারীদের শিকদার বলা হতো। আমার পূর্বপুরুষগণ শিকদার ছিলেন।
শিকদার বলা হতো কেন?
তারা লোহার শিক দ্বারা প্রজাদের গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে শিক কাবাবের মতো করে রাজস্ব আদায় করতেন। তাই তাদের শিকদার বলা হয়।
ঠিক আছে। এখন বলুন, মাদার উপন্যাসের লেখক কে?
ম্যাক্সিম গোর্কি। রাশিয়ায় বাড়ি, লম্বা লম্বা দাড়ি।
দাড়িতে চন্দ্রবিন্দু ছিল?
না।
কেন?
দাড়ি ঝুলে থাকে। চন্দ্রবিন্দু দিলে পড়ে ভেঙে যাবে তাই।
ম্যাক্সিম গোর্কি না কি ম্যাক্সিমাম গোর্কি?
আপনি যেটা বলেন স্যার। মনে হয় ম্যাক্সিমাম গোর্কি। এত বড়ো লেখক মিনিমাম হবে কেন। আপনি স্যার ঠিকই বলেছেন। ম্যাক্সিমাম গোর্কি।
সব্যসাচী মানে কী?
যার দুই হাত সমান চলে।
উদাহরণ?
টাইপিস্ট। তার দুই হাত সমান চলে। কম্পিউটার ম্যান; তারও দুহাত সমান চলে। শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি- তারাও সব্যসাচী।
বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক কে?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
না। এই লেখক রবীন্দ্রনাথের চেয়ে এক লাখগুণ বেশি লিখেছেন। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, মধুসূদন, অমিয় ভূষণ, অন্নদাশঙ্কর, জসীম উদ্‌দীন, সুনীল, কায়কোবাদ সবাই মিলে যা লিখেছেন এই লেখক তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি লিখেছেন, লিখছেন এবং লিখবেন। প্রতিদিন হাজার হাজার লেখা লিখছেন। তাঁর লেখা পড়েনি এমন কোনো লোক-লোকি বঙ্গদেশে নেই। বলেন তো- এই বিখ্যাত লেখকের নাম কী?
মোজাম্মেল হক শিকদার কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, জনাব সংগৃহীত।
ঠিক বলেছেন। সংগৃহীত সাহেবের বাবার নাম?
Mr, Collected.
এমন খ্যাতিমান লেখক আর একজন আছেন। তার নাম কী?
সংগ্রহীত।
তিনি কে?
উনি স্যার Mr. Collected সাহেবের অবৈধ সন্তান। সংগ্রহীত হলেন গিয়ে সংগৃহীত সাহেবের জারজ ভাই।
তাঁদের পিতামহের নাম?
Mr. Anonymous.
কারেক্ট। আচ্ছা সেক্স পি আর সাহেবের একটি নাটকের নাম বলুন তো?
অলস ওয়েল দ্যাটস এন্ড ওয়েল।
অলস মনে কী?
Lazy,
lazy দিয়ে একটি বাক্য বলুন তো?
The quick brown fox jumps over the lazy dog. হইছে স্যার?
হইছে।
এবার যাই?
যাই নয়, বলুন আসি।
আসি স্যার?
আসি নয়, বলুন যাই।
 
 
সাত
 
ভুঁড়ি ভূরি :
বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত দেশি ‘ভুঁড়ি’ শব্দের অর্থ মোটা পেট, বড়ো পেট, স্থূল উদর প্রভৃতি। অন্যদিকে বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত তৎসম ‘ভূরি (√ভূ+রি)’ শব্দের অর্থ অনেক, প্রচুর, অতিশয় প্রভৃতি। উচ্চারণ প্রায় অভিন্ন বলে অনেকে শব্দ দুটি লিখতে গিয়ে বানানে ভুল করে ফেলেন। তন্মধ্যে আমি অন্যতম। অনেক সময় ‘ভূরিভোজন(অতিশয় ভোজন)’ লিখতে গিয়ে লিখে ফেলি ‘ভুঁড়িভোজন(পেটভোজন)’। এমন হাস্যকর সংশয় দূর করার জন্য একটি স্মৃতি-জাগানিয়া কৌশল প্রয়োগ করা যেতে পারে :
অতৎসম শব্দে ‘দীর্ঘ ঊ-কার’ ব্যবহৃত হয় না আবার তৎসম শব্দে ‘চন্দ্রবিন্দু’ ব্যবহৃত হয় না। মোটা পেট, স্থূল উদর প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত ‘ভুঁড়ি’ অতৎসম শব্দ। তাই ‘ভুঁড়ি’ শব্দের বানানে দেশীয় পণ্ডিতগণ বুদ্ধি করে হ্রস্ব উ-কার এবং চন্দ্রবিন্দু দিয়েছেন।
 
কিন্তু ‘ড়’ কেন?
ভুঁড়ি শব্দের অর্থ বড়ো পেট। তাই বড়ো পেটের প্রমাণস্বরূপ ‘ভুঁড়ি’ বানান ‘ভুঁড়ি’। কয় বার ‘ভুঁড়ি’ শব্দটি লেখা হয়েছে গুণে দেখুন। এত বার ‘ভুঁড়ি’ দেখলে ‘ভুঁড়ি’ বানানে ভুল হবার শঙ্কা অনেকটা কমে যাবে।
‘ভুরি’ সংস্কৃত শব্দ তাই শব্দটির বানানে দীর্ঘ ঊ-কার তৎসমের প্রতীক ।
 
তো ‘র’ কেন?
‘ভূরিভোজন’ যাতে ‘ভুঁড়িভোজন’ না-হয়ে যায় সেজন্য পাণিনি বাবু বুদ্ধি করে ‘প্রচুর’ অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত ‘ভূঁরি’ শব্দের বানানে ‘র’ বসিয়ে দিয়েছেন।
ম্যানুয়েল ত্রিপুরার নিমোনিক: ভুঁড়ি যেহেতু নাড়ির ধারক এবং সম্পর্কিত, সেহেতু অন্তস্তলস্থিত নাড়ি দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় নাড়ির ‘ড়’ ভুঁড়িতে ভর করেছে। আর, দেদার, ঢের, প্রচুর শব্দসমূহ ‘র’ দ্বারা গঠিত বলে অনেক অর্থজ্ঞাপক ভূরিতে ‘র’ বসেছে।
তবে সতর্কীকরণ অনুরোধ, অনেকে গরু-ছাগলের নাড়িভুঁড়ি খেয়ে থাকেন।
কিন্তু ভুলেও কেউ যেন ভুল করে কোনো নারীভুঁড়ি খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ না করেন।
দেখুন তো কোথাও ‘ভুঁড়ি’ আবার ‘ভূরি’ হয়ে গিয়েছে কি না।

আট

কিছু সাধারণ ভুল, যা অনেকে করেন

কাচ: কাচ বানানে চন্দ্রবিন্দু নেই। কাচের জিনিস ভেঙে গেলে চন্দ্রও ভেঙে যেতে পারে। তাই কাচ বানানে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। একটা মাত্র চাঁদ, ভেঙে গেলে জ্যোৎস্না আপুর কী হবে?
পচাপচা বানানে চন্দ্রবিন্দু নেই। যেমন: পচা মাছ। পচা জায়গায় চন্দ্র থাকে না। পচা মাথায় চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। পাঁচ-এর মাথায় দেবেন।
যাবৎ: যাবৎ বানানে ত নেই, ৎ দিতে হবে। যাবৎ বানানে আস্ত-ত দিলে ‘যাব ত’ হয়ে যাবে। যাবৎ আর ‘যাব ত’ এক জিনিস নয়।
এযাবৎ: এযাবৎ লিখুন, এযাবত লিখবেন না।
তফাত: তফাত বানানে ৎ নেই, দুটোই আস্ত-ত। কাউকে আস্ত-ত আবার কাউকে খণ্ড-ৎ দিলে পাপ হবে। ন্যয়বিচার করুন। আল্লাহ দয়া করবেন।
উচিত: উচিত বানানে ৎ দেবেন না। প্রিয়জনের জন্য খণ্ড জিনিস নিয়ে যাওয়া উচিত হবে না। উচিত মানুষ কখনো অনুচিত কাজ করে না।
দাড়ি, দাঁড়ি: মুখের দাড়িতে চন্দ্রবিন্দু নেই, কিন্তু বাক্যের দাঁড়িতে চন্দ্রবিন্দু লাগবে। মুখের দাড়ি ঝুলে থাকে। তাই চন্দ্রবিন্দু পড়ে যায়। বাক্যের দাঁড়ি, দাঁড়িয়ে থাকে। তার মাথায় দাঁড়া বানানের চন্দ্রবিন্দু দিলে পড়ে না।
গা গাঁ: গা যদি শরীর হয় চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। গাঁ যদি গ্রাম হয়, চন্দ্রবিন্দু দিতে হয়। শরীরের ওপর চন্দ্রবিন্দু থাকে না; গ্রামের ওপর চন্দ্রবিন্দু থাকে।
কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোনো রূপকথা নয় সে নয়—। হেমন্ত বাবুর গানটি মনে রাখবেন।
আজ এ পর্যন্ত। আমার যদি ভুল হয় বলে দেবেন। যারা ধরেন ভুল তাঁরাই আমার আসল বন্ধু কৃতজ্ঞে আকুল।
উৎস: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
বাংলা পচা অর্থ (ক্রিয়াবিশেষ্যে) গলে যাওয়া, বিকৃত হওয়া, দুর্গন্ধযুক্ত হওয়া; (বিশেষ্যে) বিকৃত, খারাপ, নষ্ট।নষ্ট, বিকৃত, খারাপ প্রভৃতি অর্থে পচা লিখুন। পঁচা লিখবেন না। নষ্ট বা খারাপ জিনিসে চন্দ্রবিন্দু থাকে না। যেমন: পচা মাছে ভারি দুর্গন্ধ। পচা জিনিস খেলে পেট খারাপ হয়। পচা লোক পচা কথা বলে
পচা মানে নষ্ট, কিন্তু পঁচা মানে পঞ্চ বা পাঁচ। সংস্কৃত পঞ্চ থেকে উদ্ভূত পাঁচ আঞ্চলিক ভাষায় কোথাও কোথাও পঁচা। কথ্য এমনকি প্রমিত কথাতেও পাঁচ অর্থে পঁচা শব্দের ব্যবহার আছে। পঞ্চগড়কে একসময় বলা হতো পঁচাগড় (পঞ্চগড়)। পঁচা দিন গেল, তবু লোকটি আমার এলে না। পঁচা বছর আগের কথা।
আলমের পঁচা সাবান মানে আলমের বিকৃত বা নষ্ট সাবান নয়; পঞ্চ সাবান, পঁচা মিয়ার সাবান ইত্যাদি।
পঁচানব্বই মানে নষ্টনব্বই নয়, ৯৫।
পঁচা+আশি= পঁচাশি।
৮৫।
 
চমৎকার চন্দ্রবিন্দু
-সুমন বিশ্বাস
———————————
থালা-বাসন ‘ধোয়া’ হলে নিভাই চুলোর ‘ধোঁয়া’-
‘ফোটা’ ফুলে জলের ‘ফোঁটা’ পরে দেই একপোয়া।
ভাবি শরীর ‘ভাঁজা’র পরে ডিম’ভাজা’-ভাত খেয়ে-
‘গাঁ’র বিলে আজ ‘গা’ ভাসাতে যাবো নৌকো বেয়ে।
এমন সময় ‘গোঁ’ ধরা দল- কয় ও কাকা গো-
‘গো’ ছেড়ে আজ ‘চন্দ্রবিন্দু’ ঠিক শেখাবে তো!
ওদের কথায় ‘দাড়ি’ কাটায় দিলাম দিয়ে ‘দাঁড়ি’-
‘খাঁড়া’ ধরার আগেই ‘খাড়া’ জ্ঞানসাগরে পাড়ি।
‘কুড়ি’ টাকার মুড়ি-ভাজা ফুল’কুঁড়ি’দের তরে,
‘শাঁখা’ তো নয় গাছের ‘শাখা’র আমও ছিলো ঘরে।
‘গোড়া’ থেকে বুঝিস সবাই ‘গোঁড়া’ হওয়া নয়,
‘বাঁ’ হাতের খেল ‘বা’ সোজা খুব এমনি যদি হয়।
শোন্ তবে সব, চন্দ্র যখন বিন্দু নিয়ে আসে-
খোকা ‘হাসে’ খুকুর কোলে ‘হাঁসে’ জলে ভাসে।
উঁঅ, ইঁঅ, মূ্র্ধোন্নো ন, দন্ত্য ন ও ম-
আর অনুস্বার লোপ পেলে সব চন্দ্রবিন্দু ক।
তৎসম বানানের বেলা নাসিক্য ধ্বনি-
তদ্ভবে তা চন্দ্রবিন্দু চিরোদিন মণি।
পঙ্ক, অঞ্চল- পাঁক, আঁচল হয় কঙ্কন- কাঁকন-
ভাণ্ড- ভাঁড়া, দন্ত্য- দাঁত আর কম্পন- কাঁপন।
‘রাধা’ জানে রাঁধা-বাঁধা তাই তো ‘বাধা’ সোজা-
‘গাদা’ চুক্তি নিতে গেলে ‘গাঁদা’ ফুলও বোঝা।
থাকলে ‘কাদা’ পিছলে ‘কাঁদা’ ব্যথায় হতে পারে,
কাপড়ে দাগ ‘কাঁচা’ আমের- ‘কাচা’ দিলেই সারে!
বিঁধলে ‘কাঁটা’ বের করা যায় জল যাবে না ‘কাটা’-
‘বাটা’ ভালো মশলাপাতি আর ন্যায্যতায় ‘বাঁটা’।
‘খাঁটি’ পেতে সবাই ‘খাটি’ ছুটি কাজের পিছু-
জ্ঞানের ‘আধার’ নাশে ‘আঁধার’ জানবি, শিখবি কিছু।
**ত্রুটি থাকলে সেরে দেবেন।
 
“চন্দ্রবিন্দু”
গগনে উঠেছে ওই | পূর্ণিমার চাঁদ। ||
রেখ না মনের কোণে | এতটুকু ফাঁদ।। ||
বাতাসে বাতাসে ভাসে | কীসের ঐ ধোঁয়া। ||
পবন গতিতে ছুটে | যায় না কো ছোঁয়া।। ||
ধানের খেতের পাশে | মেঠো পথ বাঁকা। |
মাঝি দাঁড় দেয় টান | যেন ছবি আঁকা।। ||
দিঘির জলেতে দেখ | সাদা সাদা হাঁস । ||
ছোটো ছোটো কুঁড়েঘর | গড়া দিয়ে বাঁশ।। ||
জলদে ছাইল ধরা | তরসে এ হাঁটা। ||
সমাধান পেতে তাই | বই নিয়ে ঘাঁটা।। ||
শেষ হয়ে গেল বুঝি | গরিবের পুঁজি। ||
দিশাহারা হয়ে তাই | বারে বারে খুঁজি।। ||
ছেলেগুলো মারে ঢিল | ফলগুলো কাঁচা। ||
দেখে ফেলে বাবুরাম | নিজ জান বাঁচা।। ||
ওই দেখ পড়ে গেল | জানে না সাঁতার। ||
তাড়াতাড়ি কূলে তোল | ঘনায় আঁধার।। ||
চল সবে মাছ ধরি | মেখে গায়ে পাঁক। |
পাখি সব আকাশেতে | উড়ে ঝাঁকে-ঝাঁক।। ||
 
 
ভাবির কথা ভাবি না
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত ভ্রাতৃজায়া (স. ভ্রাতৃজায়া>) থেকে উদ্ভূত এবং বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত অতৎসম  ‘ভাবি’ শব্দের অর্থ জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পত্নী, বউদি ইত্যাদি।
সংস্কৃত ‘ভাবী’ (ভবিষ্যৎ) থেকে উদ্ভূত এবং বাক্যে ক্রিয়াবিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ‘ভাবা’ অর্থাৎ চিন্তা করা অর্থ প্রকাশেও  উত্তম পুরুষে  ভাবি (চিন্তা করি) ব্যবহৃত হয়। প্রয়োগ: জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পত্নী, বৌদি (বিশেষ্য) : বড়ো ভাই দানু মিয়ার বউকে আমি বড়ো ভাবি ডাকি। চিন্তা করি (ক্রিয়াবিশেষ্য) : আমি এসব নিয়ে আর ভাবি না। উভয়ার্থে : ভাবি (বৌদি), বিদেশে আমি সারাক্ষণ শুধু  দেশের কথা ভাবি (চিন্তা করি)। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘ভাবী’ (স.  √ভূ+ইন্‌) শব্দের অর্থ ভবিষ্যৎ, অনাগতকাল, ভবিষ্যতে হবে এমন। প্রয়োগ: ভবিষ্যৎ : ভাবী তার উজ্জ্বল। অনাগতকাল :  আশীর্বাদ করি, ভাবী তোমার মঙ্গলময় হোক।ভবিষ্যতে হবে এমন : বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব ভাবী-শিশুদের জন্য পৃথিবীকে নিরাপদ রাখা।
 
  ‘ভাবি’ বিশেষ্য এবং ‘ভাবী’ বিশেষণ। বানান এবং অর্থের মতো উৎস আর পদ-বিশেষেও শব্দ দুটো ভিন্ন।অনেকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পত্নী অর্থে ‘ভাবী’ লিখেন— এমন লিখবেন না। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পত্নী অর্থে ব্যবহৃত ‘ভাবি’ শব্দটি অতৎসম। এটার বানানে ই-কার হবে, ঈ-কার নয়।  বড়ো ভাইয়ের বউকে বলা হয় ‘ভাবি’, ‘ভাবী’ নয়।  যেমন :সে আমার ভাবী পুত্রবধূ। আমি শুধু তার কথা ভাবি, ভাবি বললেন আমি এত ভাবি না,আমি বললাম না ভাবি, আমিও এত ভাবি না, অল্প অল্প ভাবি, কী আছে ভাবী-জীবনের ভাবী-সন্তানদের জন্য একটা ভাবতে হয় বইকি।
সে আমার ভাবী পুত্রবধূ। তার কথা ভাবি কেবল,ভাবি বললেন এত ভেব না,আমি বললাম না ভাবি এত ভাবি না,অল্প অল্প ভাবি,কী আছে ভাবী-ভবিষ্যতে।
 
 
 
এই পোস্টের সংযোগ
https://draminbd.com/গল্পে-গল্পে-শুদ্ধ-বানান-চ/
 
 
দুই
ফোঁটা ও ফোটা: দেখতে হবে না মেয়েটি কার (বানান নিমোনিক)
মা লিখতে বলেছে, “এক ফোঁট জল পেলে সজীব হয়ে উঠত ফোটা ফুলটা।”
শামীমা লিখল, “এক ফোট জল পেলে সজীব হয়ে উঠত ফোঁটা ফুলটা।”
বাক্যটি বারবার দেখছিল শামীমা ।
ফোটা আর ফোঁটা নিয়ে ভারি মুশকিলে পড়ে যায় সে।
হঠাৎ শামীমার চুল থেকে তারার মতো দুই বিন্দু জল টুপ করে ঝরে পড়ল খাতায়। এক বিন্দু জল ‘ফোটা’ শব্দের ‘ফ’ বর্ণে চন্দ্রবিন্দু হয়ে বসে গেল। আর এক বিন্দু জল ‘ফোঁটা’ শব্দের চন্দ্রবিন্দুটা অমাবস্যার চাঁদের মতো বিলীন করে দিল।
হায় হায়, কী হবে, বানান ভুল হলে তো মা আস্ত রাখবে না। শামীমা হাত দিয়ে ‘ফোঁটা’ আর ‘ফোটা’ শব্দদুটোকে আগের মতো করতে যাবে এসময় তার মা এসে গেল।
খাতা দেখে মা বলল, এতদিন পর তুমি ফোঁটা আর ফোটা শব্দের বানান ঠিকভাবে লিখতে পারলে। মা আমার ভালো হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
শামীমা খুশি হলো। কিন্তু সে তো জানে এই কৃতিত্ব তার নয়, চুলবিন্দুজলের।
আসল কথা জানিয়ে দেওয়ার জন্য মাকে বলল,
শুদ্ধ কীভাবে হলো জানো মা?
মা বলল, জানি।
– কীভাবে?
মা বলল, ‘ফোঁটা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে তরল পদার্থের বিন্দু, টিপ, তিলক, ছোটো, বিন্দুচিহ্ন ইত্যাদি। তাই তুমি বিন্দু অর্থ প্রকাশিত ফোঁটা শব্দের মাথায় চন্দ্রবিন্দু দিয়েছ। আমরাও ছোটোবেলায় এভাবে মনে রেখেছি। ‘ফোটা’ শব্দের অর্থ প্রস্ফুটিত হওয়া, প্রকাশিত হওয়া, বিস্ফোরিত হওয়া, সেদ্ধ হওয়া, উন্মিলিত হওয়া ইত্যাদি। এখানে বিন্দুর কোনো কাজ নেই। তাই তুমি বিন্দু দাওনি। ঠিক বলেছি না?
মায়ের কথায় শামীমা বুঝে গেল ফোঁটা আর ফোটা কী। সে আর আসল কথা খুলে বলল না।
বুদ্ধিমান মেয়ের মতো বলল, মা, তুমি বড্ড চালাক। কিন্তু – – –
– কিন্তু আবার কী?
আমি তোমার চেয়েও চালাক!
শামীমার মা বলল, দেখতে হবে না মেয়েটা কার!
 
খেত থেকে আসি।
 
খেত থেকে আনা সতেজ সবজি দিয়ে খেতে বসে গেছে বসে গেছে।

কাটি বনাম কাঠি: ট=ঠ

সংস্কৃত কাষ্ঠিকা থেকে উদ্ভূত কাঠি অর্থ— (বিশেষ্যে) কাঠ, বাঁশ, ধাতু প্রভৃতির তৈরি লম্বা ও সরু শলাকা। যেমন: দেশলাইয়ের কাঠি। কাঠির মতো চিকন লোক।
কাটি বাংলা শব্দ। বানান ভিন্ন হলেও কাটি আর কাঠি সমার্থক। যেমন: দেশলাইয়ের কাটি। কাটির মতো চিকন লোক। যা লাউ তা কদুর মতো যা কাটি তাই কাঠি।
অর্থাৎ কাটি= কাঠি।
সুতরাং, ট=ঠ।

লক্ষ বনাম লক্ষ্য

 
লক্ষ করে দেখুন, প্রত্যেক আদর্শ নেতার লক্ষ্য ছিল জনকল্যাণ।
‘লক্ষ’ ও ‘লক্ষ্য’ দুটি ভিন্ন শব্দ। যেমন অর্থে তেমন বানানে। অথচ বাক্যে ব্যবহারে অনেকে ভুল করে থাকেন। শব্দ-দুটোর অর্থ, আচরণ এবং দ্যোতনাগত পার্থক্য রয়েছে। সংখ্যাবাচক পদ হিসাবে ‘লক্ষ’ শব্দের বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। অঙ্ক বা সংখ্যা প্রকাশের ক্ষেত্রে সর্বদা ‘লক্ষ’ বসবে।
যেমন : দশ লক্ষ টাকা দিয়ে গাড়িটা কেনা হলো। আবার ‘খেয়াল রাখা’ অর্থ প্রকাশেও ‘লক্ষ’ ব্যবহার করা হয়। এটি তখন ক্রিয়াপদ। যেমন : শিশুটির প্রতি ‘লক্ষ’ রেখ। আমার লক্ষ্য ছেলেটির প্রতি লক্ষ রেখে তাকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়া। লক্ষ করে দেখলাম এখানে থেকে লক্ষ্য ভেদ করা সম্ভব হবে না। যে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ লক্ষ্যহীন, সে দেশে লক্ষ লক্ষ প্রকল্প নিলেও লক্ষ্য অর্জন করা লক্ষ বছরেও সম্ভব হয় না।
বিশেষ্য হিসাবে ব্যবহার করা হলে ‘লক্ষ’ বানানে ‘য-ফলা’ (লক্ষ্য) ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু ক্রিয়াপদ ও সংখ্যাবাচক পদ হিসাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘য-ফলা’ ব্যবহার বিধেয় নয়। সাধারণত উদ্দেশ্য প্রকাশের জন্য ‘লক্ষ্য’ ব্যবহার করা হয়।যেমন : নেতার লক্ষ্য জাতির উন্নয়ন। আমার লক্ষ্য এখনও স্থির করতে পারিনি।
‘লক্ষ’ করার যোগ্য বা ‘লক্ষ’ করার বস্তু অর্থে, অর্থাৎ বিশেষ্য ও বিশেষণে ‘লক্ষ’ই একমাত্র বানান। যেমন : লক্ষ না-থাকায় লক্ষ টাকা বেহাত হয়ে গেল।
 
রানি (রাণী) 
পটোল (পটল) 
ঘুস (ঘুষ) ঠ্যালা (ঠেলা) 
ফরসা (ফর্সা)
পিরের (পীর)
সাথি (সাথী) 
চীনা এক লোক, 
কই (কৈ) মাছ বলে ব্যাং (ব্যাঙ)
 
অঙ্ক (অংক) কষে
বিদায়ি (বিদায়ী)
ভাষণ দিয়ে চীন 
 
 খ্রিষ্টান পাদরি (পাদ্রী)
 
ঠ্যালাগাড়ি (ঠেলাগাড়ি)
 
 বউভাত (বৌভাত)
 
 ইদ (ঈদ) ম
ওসিলায় (ওছিলা) অ
পেতনি (পেত্নী)।
 
আপস (আপোস) 
 
তরি (তরী) ভাড়া
 
রজনি (রজনী) 
পরিস্কার (পরিষ্কার)
বইকি (বৈ কি)। 
 
(ক্ষুধামন্দা) ক্ষুধামান্দ্য 
ফরমুলা (ফর্মুলা)। 
মহামারি (মহামারী)
ফারসিদের (ফার্সি)
ইগল (ঈগল) 
অংশীদারিত্বে (অংশীদারত্বে)
। বিবদমান (বিবাদমান)
অনুষ্ঠাতব্য (অনুষ্ঠিতব্য) একটা সম্মেলনে। রোহিঙ্গাদের গণহত্যা নিয়ে বৈচারিক (বিচারিক) অবস্থান স্পষ্ট করতে বললো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। অহর্নিশ (অহর্নিশি) লেগে আছে এখন চীন আর ভারত। আরে অপু ভাই, এসব যে সব প্রবহমান (প্রবাহমান) কিছু ঘটনা!
 
error: Content is protected !!