গাঙ নাম গঞ্জ

ইউসুফ খান
সংযোগ: https://draminbd.com/গাঙ-নাম-গঞ্জ/
ইউসুফ খানের সবলেখা একমলাটে:
নদী কথাটা নাকি প্রত্ন-আর্য শব্দ, কিন্তু ভারতের বাইরে কোথাও এমনকি ইরান ইউরোপেও রিভারকে নদী বলতে দেখছি না। তবে ভারতের সর্বত্র রিভার মানেতে নদী কথাটাই চলে। উত্তরের আর্য থেকে দক্ষিণের দ্রাবিড় সব ভাষাতেই চলে। এই একটা আর্যশব্দ দ্রাবিড় দক্ষিণকে ধুয়ে দিয়েছে। কিন্তু বেআড়া বাংলাকে পুরোপুরি পারেনি।
গাঙ গঙ্গা
আর্য ছোঁয়াচ লাগার আগে নদী বলতে বাংলায় চলত গাঙ আর গঙ্গা। ছোটো গাঙ আর বড়ো গাঙ্‌গা। তবে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনাতে বুড়োবুড়িরা এখনও নদী খাড়ি খালি নালা স্ট্রিম বোঝাতে বলে গঙ্গা। এখনকার পতিতপাবনী গঙ্গামাতাকেও বাঙালি গাঙই বলত। প্রায় চারশো বছর আগে বড়ু চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে লিখেছেন— 
তোহ্মে গাঙ্গ বারানসী সরুপেঁসি জাণ।
তোহ্মে মোর সবতীত্থ তোহ্মে পুণ্য স্থান॥
বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলে আছে – কোন দেব হইয়া … মস্তকে ধরে গাঙ্গ। ক্ষেমানন্দের মনসার ভাসানে আছে—  ত্রিবেণীর গাঙ্গে।
বাংলায় গাঙ দিয়ে অনেক কথা হয়। গাঙমাছ মানে নদীর মাছ। গাঙচিল গাঙশালিক গাঙটিটরি গাঙদাঁড়া গাঙচ্যালা গাঙফড়িং এগুলোতে গাঙ মানে সাধারণ নদী বোঝানো হয়েছে। গাঙ পার হয়ে কুমীরকে কলা দেখানো বা কত্তা বলেছে গাঙ কাত অতএব গঙ্গা কাত—  এগুলো বাংলার নিজস্ব উচ্চারণ।
এই গাঙ কথাটা অস্ট্রিক। কথাটা বাংলার একান্ত আপন কথা। বাংলার দেশের চারিপাশে যেখানে যেখানে আর্য দ্রাবিড় ভোট মঙ্গোল রক্তের রবরবা সেসবখানে নদীর ধারা আছে কিন্তু গাঙের ঢেউ নেই। বাংলা তার গায়ে যতই আর্যামির জ্যাকেট জড়াক জ্যাকেট ছাড়ালেই তার নিচের হাড়পাঁজর যে অস্ট্রিক সেটা এইসব কথায় ফুটে ফুটে ওঠে।
গাঙের জোয়ার
গাঙ গঙ্গার অস্ট্রিকত্ব বুঝতে একটু ঘুরে আসি চলুন। শ্রীলঙ্কায় নদী বোঝাতে জেনারেল টার্মটা হচ্ছে গঙ্গা। এই গঙ্গা তো আর, ও গঙ্গা তুমি বইছো কেন-র গঙ্গা হতে পারে না। সে তো কালাপানি পারের দেশ। মানে বাঙালিদের মতোই সিংহলিরাও নদীকে গঙ্গা বলে। আমরা বাঙ্গালী হেলায় লঙ্কা করিয়াছি জয়!
কোরিয়ান ভাষায় গাঙ মানে নদী। হান্‌গাঙ্‌ মানে হান নদী। গাঙ্‌বুক মানে গাঙের উত্তর আর গাঙ্‌নাম মানে গাঙের দক্ষিণ। এদুটো হানগাঙ নদীর দুপাড়ের দুটো শহরের নাম। কোরিয়ার গাঙনাম শহরটা খুব পশ, তাই গাঙনাম স্টাইল। এই নামের ভয়ানক ভাইরাল গানটা শুনে দেখুন, ওগানে পরিষ্কার বাংলা গাঙ্‌ বলছে, ইংরিজি স্টাইলে গ্যাং বলছে না।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় যেমন খাড়ি খালি নালা স্ট্রিম বোঝাতে বলে গাঙ, ঠিক এগুলোকেই চীন তাইওয়ানে বলে কাঙ। চীনে ভাষায় খ গ ঘ নেই বলে ওরা সবকটাকেই ক বলে, তাই আমাদের গাঙ ওদের কাঙ। প্রাচীন চীনে এবং এখনকার দক্ষিণ চীনে নদীকে বলে কিয়াং, সেও আমাদের গাঙ। যেমন ইয়াংসি কিয়াং – ইয়াংসি নদী। চীনেরা হাজার বছরেরও আগে থেকে কিয়াং কথাটাকে ওদের সাহিত্যে ব্যবহার করছে কিন্তু তাও ওরা বলে এটা ওদের ভাষায় বিদেশি শব্দ। তাহলে কি বাঙালি হেলায় চায়নাও করিল জয়!
সার কথা, দেশবিদেশ থেকে সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে যে, নদীনালার দেশের দোখ্‌নোরা ঠিকই বলে – গঙ্গা বা গাঙ মানে নদী। অস্ট্রিক খেদাও সম্পূর্ণ হলেও তাদের গঙ্গা কথাটা আর্যরা ফেলতে পারেনি, অস্ট্রিক কমন নাউনটাকেই আর্যাবর্ত প্রপার নাউন বলে চালিয়ে দিয়েছে। মানে ভাগের মা গঙ্গা নাম পায়নি। জাহ্নবী বলে একটা লেবেল সাঁটা হয়েছিলো বটে তবে সেটা স্রোতে টেকেনি।
গঞ্জ ই গ্যাঞ্জেস
তিন হাজার বছরেরও আগে থেকে গ্রিকরা ইন্ডিয়ায় যাতায়াত করছে। গ্রিকরা গঙ্গার বদলে গঞ্জা শুনে গেছে। গ জ এর অদলবদল হওয়া ভাষাতত্ত্বে খুবই কমন একটা ব্যাপার। ওদিকে ভিয়েতনামিরাও নদী বলতে বলে কনজং মানে সেই গঞ্জ। তার মানে নদী বোঝাতে গঙ্গার সঙ্গে গঞ্জ কথাটাও চলতো। গ্রিক স্টাইলে বিশেষ্য বানাতে শেষে এস জুড়ে দিয়ে করে গঞ্জ হয়েছে গঞ্জেস, যাকে ইংরেজিতে উচ্চারণ করা হয় গ্যাঞ্জেস। দেখা যাচ্ছে মা গঙ্গা দেশে নাম পেল না, কিন্তু বিদেশে তার নাম হলো। অস্ট্রিকের যে ধ্বনিকে আমরা আর্যলিপি ঙ ং ঁ দিয়ে লিখি সেটাকে ঞ দিয়ে লিখলে মূলের আরও একটু কাছাকাছি হয়। ডাঙা ডাঞা ভুঁইয়া ভূঞা গাঁইয়া গাঞা। গঙ্গা থেকে আসা বাংলা কথা গঞ্জ মানে গঙ্গার মানে নদীর গা সংলগ্ন।
গঞ্জে গ্যাঞ্জাম 
আজকাল হেভি মালপত্র ডাঙায় আনাগোনা হয় ট্রাকে আর ট্রেনে। সে যুগে হতো গোরুর গাড়িতে। তাতে আর কতটুকুই বা হতো। তাই সওদাগরি মাল পরিবহণ হতো বড়ো নৌকো আর জাহাজে। এই ব্যবসায় মূল মালগুলো হতো ধান চাল নুন কাপড়। ঢাকা চট্টগ্রাম সপ্তগ্রামের মধ্যে নুন কাপড়ের ব্যবসাও এভাবেই হতো। সওদাগরি শেঠেরা বা তাদের পাইকাররা নদী মানে গঙ্গা বেয়ে এসে গঙ্গার পাড়ে তাদের নৌকো ভেড়াতো। বড়ো চাষীরা বা পাইকেররা গাড়ি ভর্তি মাল নিয়ে এসে নদীপাড়ে ভিড় করতো। গাঙপাড়ের হাট তাই গঞ্জের হাট। যেমন হাট বসেছে শুক্রবারে বক্‌শিগঞ্জে পদ্মাপারে, মানে এই গঞ্জটা পদ্মাগাঙের পাড়ে। গাঁয়ের হাট হচ্ছে শুধুই হাট, নদীপাড়ের হাট মানে গঙ্গার হাট হচ্ছে গঞ্জের হাট। তেমনি নদীর ধারের বসতি গঙ্গের মানে গঞ্জের বসতি। সেজন্যই গাঁ আলাদা গঞ্জ আলাদা। পৃথিবীতে গঞ্জ দিয়ে যত স্থান নাম আছে তার বেশির ভাগটাই নদীনালার দেশ বাংলাদেশে। সে তো হবেই, তার কারণ দেশটাতো নদী গঙ্গা গঞ্জ দিয়েই গ্যাঞ্জাম হয়ে আছে। গঞ্জ দিয়ে যেসব পুরনো জায়গার নাম মনে পড়ছে দেখুন সেগুলো সব কোনও না কোনও নদী নালার ধারে।
বৈশ্য কথাটার মানেতেই আছে ঘুরে ঘুরে বেসাতি করা, মার্চিং মার্চেন্ট। এদেশে এটাই দস্তুর ছিলো। দোকান পসরা নিয়ে বসা হাটের জন্য পারসি কথা বাজ়ার কথাটা সে যুগে রমরম করে চলতো, যা আজও চলে। ইরানি ব্যাপারীদের হাত ধরে এদেশে আসে ছাউনি করে বসানো বাজার, যাকে বলা হতো চাঁদনি বাজার। গাঙপাড়ের বাজারের তাই এই স্পেশাল নাম গঞ্জের বাজার। তবে চিরকাল মানেটা আর গাঙপাড়েই বাঁধা থাকেনি, ধীরে ধীরে দূরে দূরেও চলে গেছে। বাংলায় গঞ্জ বসানো মানে হাট বসানো, গঞ্জ করা মানে হাটে মাল কেনা।
গঞ্জ ও গন্‌জ্‌
মোগলরা খাজনা হিসেবে শুধু টাকাকড়ি সোনাদানাই না, ধান চাল ইত্যাদি শস্যও নিত। সব ধরনের খাজানা আদায় করে সেসব সুরক্ষিত রাখতে তাদের বড়ো বড়ো সিন্দুক আর গোলা বানাতে হতো। অসময়ে দুঃসময়ে প্রজাদের জন্য এই দৌলতের সিন্দুক আর শস্যের আগার খুলে দেয়া হতো। আরবিতে খাজানার ভাণ্ডারকে বলে মুখাজ্জান। ফরাসি সাহেবরা এটা থেকে দোকানকে বলতে শিখলো মাগ্‌জ়্যাঁ মানে খাজানা ভাণ্ডার। ইংরেজরা সংবাদ আর তথ্যের খাজানা ভরা পত্রিকাকে বললো ম্যাগাজ়িন।
আরবি মুখাজ্জানের মতো মানেতে পারসি কথাটা হচ্ছে গন্‌জ্‌ যার আদি মানে ধনরত্ন জেবরভাণ্ডার। এই মানেতে প্রাচীন পারসিতে কিছু জায়গার নামে গন্‌জ্‌ কথাটা থাকতো। এগুলো কোনও বাজার না। এখনও সেরকম কিছু স্থাননাম ইরানে আছে।
ইরানের শক-রা দুহাজার বছর আগেই গন্‌জ্‌ কথাটা ইন্ডিয়ায় নিয়ে আসে। সংস্কৃতে এটাই গঞ্জ্‌ বানানে এবং রত্নাগার মানেতে ঢুকে পড়েছে। পারসি বাজ়ার কথাটা বাংলায় এত জলচল ছিল যে,  শুধু বাজার বোঝাতে গঞ্জ বলে একটা ভুল মানেঅলা পারসি কথা মূলত বাংলাতেই চালু হবে অথচ দিল্লির আশেপাশে বা বাকি ভারতে হবে না এটা হতে পারে না। আর ইরানে সমৃদ্ধ গ্রাম থেকে হওয়া শহরের নামে গন্‌জ্‌ আছে, কোনও বাজারের নামে না। ইরানে তিনটে গন্‌জ্‌ থাকলে বাংলাদেশে তিরিশটা গঞ্জ আছে। সেটা বাংলাদেশে এত গাঙ আছে বলেই। ইরানি কথাটা গন্‌জ্‌ বাংলাদেশি কথাটা গঞ্জ গঞ্‌জ্‌অ। এটা চিরকাল গঞ্জো উচ্চারণ হতো কিন্তু এখন বাংলা মায়ের কিছু অ্যাংলো সন্তান এটাকে গন্‌জ্‌ উচ্চারণ করছে। তার খানিকটা হিন্দি প্রভাবেও হতে পারে, হিন্দিতে পদ শেষের অ-টা সাধারণত ইৎ হয়ে যায়।
গঞ্জিকা পঞ্জিকা
ধ্বনির মিল থাকলেই দুটোকে একই শব্দ ধরতে হবে এমন ধারণা বিপজ্জনক। গঞ্জ মানে গাঁজা; তাহলে কি বলবো যে বাজারে শুধু গাঁজা বিক্রি হতো সেটাই গঞ্জ? গঞ্জ মানে গঞ্জনা দেওয়া; তাহলে কি বলবো যে হাটের মাঝে লোককে অপমান করা হতো সেটাই গঞ্জ? গঞ্জ মানে শুঁড়িখানা; তাহলে কি বলবো যে বাজারে শুধুই ওয়াইন শপ থাকতো সেটাই গঞ্জ? গঞ্জ মানে গোয়ালঘর; তাহলে কি বলবো যে হাটে শুধু গোয়াল থাকতো সেটাই গঞ্জ? গঞ্জ মানে কুঁড়ে ঘর, গঞ্জ মানে শব্দ করা; তাহলে কি বলবো… যাই হোক।
এই সব গঞ্জের রুট আলাদা কিন্তু ধ্বনি এক। তাই পারসি গন্‌জ্‌ আর বাংলা গঞ্জ এক করে ফেললে হবে না। কথা হচ্ছে এত কথা উঠছে কেন? কেন না সাত পণ্ডিতে সাত রকম কথা বলছেন তাই। জ্ঞানেন্দ্রমোহন ব্যুৎপত্তি দিচ্ছেন গনজ্‌ মানে শব্দ করা, দিয়ে তার আন্ডারে গঞ্জের যত মানে হয় সবকটা দিচ্ছেন। সবার এক ব্যুৎপত্তি? শব্দ করা থেকে এত সব মানে কীভাবে হয় সেসব বলতে হবে তো। হরিচরণ বলছেন গঞ্জ্‌ থেকে কিন্তু তার মানে বললেন না, সঙ্গে একটা ঘঞ্‌ লাগিয়ে দিয়ে তারপর গঞ্জের সবকটা মানে বলে দিলেন। ওদুদ সাহেব দুটোই বলে দিলেন সং গঞ্জ্‌+ঘঞ্‌ ফা: গন্‌জ্‌। এই দুটোর কোনও মানে দিলেন না, কিন্তু গঞ্জের সবকটা মানে দিয়ে দিলেন। একই কম্ম করলেন রামকমল সুবলমিত্র কেশবরায় আশুতোষ এবং ছোটোখাটো সবাই। বাংলা উইকিপিডিয়ায় যিনি লিখেছেন তিনিও এই গতেই ভেবেছেন।
সাহেবরা রাজদণ্ড পাবার পরেও এদেশে ফারসি ফড়ফড়াচ্ছে। সাহেবদের মধ্যে কেরি হটন মর্টন কেউই গঞ্জের মানেতে হাট কথাটা দেননি। কেরি সাহেবের মুন্সিরা বাংলা ডিকশনারি লেখার নামে ধরে ধরে শুধু সংস্কৃত ডিকশনারি টুকে দিয়েছেন। কিন্তু হটন সাহেব বাংলাহওয়া কোনও হিন্দুস্তানি ফারসি শব্দ তাঁর বাংলা ডিকশনারিতে দিতে ছাড়েননি। উনি ফারসি গঞ্জ্‌ দিয়েছেন, কিন্তু তাতে হাট বা বাজার মানেটা নেই। অস্যার্থ সংস্কৃত গঞ্জ ফারসি গঞ্জ্‌ কোনওটারই মানে হাট নয়। গঞ্জ গাঙপারের কথা। বাংলা কথা বাংলাদেশি কথা।
error: Content is protected !!