গিনি (Guinea) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (আফ্রিকা)

ড. মোহাম্মদ আমীন

গিনি (Guinea)

গিনি আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্গত। এর উত্তরে গিনি-বিসাউ, সেনেগাল ও মালি এবং দক্ষিণে লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন এবং কোর্ট ডিআইভরি। জলবায়ু উষ্ণ। প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যে দেশটি সমৃদ্ধ।

‘গিনি’ পর্তুগিজ গিয়েন (Guine) নামের ইংরেজিকরণ। গিনি হচ্ছে ঘানা নামের অপভ্রংশ। আবার অনেকে মনে করেন, ‘গিনি’ নাইজার বদ্বীপের বিখ্যাত স্থান জেনি (Djenne) নামের অপভ্রংশ। ঘিনাবেন, এগিনাও বা এগুইনাও (ghinawen, aginaw, or aguinaou) হতে গিনি নামের উদ্ভব- এমন ধারণাও অনেকে পোষণ করেন। উল্লেখ্য, এর অর্থ পোড়া মানুষ অথবা কালো বা কৃষ্ণাঙ্গ। এখানকার লোকজন অত্যন্ত কালো ছিল। তাই দেখতে পোড়া কয়লার মতো মনে হতো। এজন্য ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা এলাকাটির নাম দিয়েছিল গিনি।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দক্ষিণ আমেরিকায় প্রচলিত গিয়ানা (Guiana) স্থানীয় ভাষার শব্দ। এর অর্থ নদীর দেশ। কিন্তু আফ্রিকায় প্রচলিত গিনি (Guinea) শব্দটি এসেছে তুয়ারেগ (Tuareg) ভাষা হতে। এর অর্থ ভাষাহীন মানুষ (speechless people)। কারণ তুয়ারেগরা স্থানীয় ভাষা বুঝত না। সুতরাং দুটি নামের সামঞ্জস্যতা কেবল কাকতালীয়। বিংশ শতকের প্রথমার্ধে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলে তিনটি দেশ ছিল। যাদের নাম – British Guiana, Dutch Guiana Ges French Guiana । ব্রিটিশ গিয়ানা স্বাধীন হওয়ার পর নাম হয় গিয়ানা। ডাচ গিয়ানার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় সুরিনাম এবং ফ্রেঞ্চ গিয়ানা এখনও ফ্রেঞ্চ এর অংশ।

আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূলে রয়েছে গিনি (Guinea), গিনি-বিসাউ (Guinea-Bissau), গিনি উপসাগর (the Gulf of Guinea) এবং ইকুয়েটরিয়াল গিনি (Equatorial Guinea)। প্রতিটি দেশ পৃথক হলেও নামটি এসেছে অভিন্ন উৎস হতে। যদিও নিউ গিনির কিয়দংশ ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে। এটাও আফ্রিকার দেশ গিনি হতে নামটি নিয়েছে বা পেয়েছে। কারণ অভিযাত্রীরা এ সকল ভূখ-ের আদিবাসীদের আচার-আচরণে সামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছিলেন।

গিনির ব্যুৎপত্তি কিন্তু অনশ্চিত। ইংরেজি শব্দ (Guinea) সরাসরি পর্তুগিজ শব্দ (Guiné) হতে এসেছে। পঞ্চদশ শতকে শব্দটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ শব্দটি দ্বারা গিনাজ (Guineus) অধ্যুষিত এলাকা বুঝাতে ব্যবহার করা হতো। এটি ছিল একটি জাতিবাচক পদ। যদ্দ¦ারা সেনেগাল নদীর নিচের কৃষ্ণ লোকদের বুঝানো হতো। ইতিহাসবেত্তা ও ঘটনাপঞ্জী রচয়িতা গোমেজ ইয়ানস ডি জুরারা (Gomes Eanes de Zurara) ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন।

১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জন (Senhor da Guin) বা লর্ড অব গিনি (Lord of Guinea) পদবি ধারণ করেছিলেন। মনে করা হয়, পর্তুগিজরা এ শব্দটি বেরবের (Berber  ) পদ গিনিওয়েন (Ghinawen) হতে নিয়েছে। যার অর্থ পোড়া মুখ (the burned face) হতে নিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের মুখ পোড়ামুখের মত ছিল। বার্বার ভাষায় (aginaw or Akal n-Iguinawen”) অর্থ কৃষ্ণ বা কৃষ্ণদের দেশ (black” or “land of the blacks)।

আরেকটি বিপরীত তত্ত্বমতে, যা ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে লিও আফ্রিকানাস (Leo Africanus) দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গিনি(Guinea) শব্দটি (Djenne) শব্দ হতে এসেছে। (Djenne) ছিল আপার নাইজার নদীর একটি বিখ্যাত ও সমৃদ্ধ শহর। এটি একাদশ শতকে ঘানার পতনের পর থেকে ত্রয়োদশ শতকে, মালির আক্রমণে ব্যবসায় সংকট দেখা না দেওয়া পর্যন্ত স্বর্ণ ও লবণ বাণিজ্যের জন্য পশ্চিম আফ্রিকায় একক আধিপত্য বিস্তার করে চলছিল। এ সময় গিনওয়াহ (Genewah) নামটা প্রভাব বিস্তারকারী হিসাবে আরব বিশ্বের মাধ্যমে (al-Sudan – Arabic for “blacks” – is used more commonly before) ছড়িয়ে পড়ে।

অনেকে মনে করেন, ব্রিটিশ মুদ্রাকে ভারতীয় উপমহাদেশসহ বিভিন্ন এলাকায় গিনি নামে পারিচিত ছিল। এখনও অনেক দেশে গিনি বলতে মূল্যবান মুদ্রা বুঝায়। কিন্তু ইকুয়েটরিয়াল গিনি হলো কেন? কারণ এ দেশটির জনগণ গিনির লোকের মতো ছিল বা দেশটির অবস্থান ও অন্যান্য ভৌগোলিক অবস্থান গিনি নামের অন্তর্ভুক্ত দেশের ন্যায় ছিল।

গিনির মোট আয়তন ২,৪৫,৮৩৬ বর্গ কিলোমিটার বা ৯৪,৯২৬ বর্গমাইল। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে জনসংখ্যা ১,০৬,২৮,৯৭২, প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৪০.৯ বর্গকিলোমিটার। আয়তন বিবেচনায় গিনি পৃথিবীর ৭৮-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু মোট জনস্যংখ্যা বিবেচনায় ৮১-তম জনবহুল দেশ। সরকারি ভাষা ফ্রেঞ্চ। গিনির নাগরিকদের গিনিয়ায়ান (এঁরহবধহ) বলা হয়। কোনাক্রি দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের ২ অক্টোবর দেশটি ফ্রান্স হতে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে গিনির পতাকা গৃহীত হয়। জনসংখ্যার ৯০% মুসলিম এবং ৫% খ্রিস্টান। বাকিরা প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসের অনুসারী।

গিনির মোট জিডিপি (পিপিপি) ১১.৪৬৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ১,০৮২। অন্যদিকে জিডিপি (নমিনাল) ৫.২১২ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৪৯২ ইউএস ডলার। মুদ্রা গিনিয়ান ফ্রাঙ্ক। মোট জনশক্তির ৮০% কৃষিকাজে নিয়োজিত। স্বর্ণ, ডায়মন্ড, অ্যালুমিনিয়াম, বক্সাইট, কফি, মাছ ইত্যাদি প্রাকৃতিক সম্পদ গানায় প্রচুর রয়েছে।

ঘানা (Ghana) : ইতিহাস ও নামকরণ

ইথিওপিয়া (Ethiopia) : ইতিহাস ও নামকরণ

গ্যাবন (Gabon): ইতিহাস ও নামকরণ

ঘানা (Ghana) : ইতিহাস ও নামকরণ

রোয়ান্ডা (Rwanda) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র: কীভাবে হলো দেশের নাম (আফ্রিকা), ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!