গুণ, গুণী, গুণ টানা, গুনি এবং গুনিন

ড. মোহাম্মদ আমীন
তৎসম ‘গুণ(√গুণ্‌+অ)’ শব্দের অনেকগুলো অর্থের মধ্যে অন্যতম হলো: দড়ি, সুতো; নৌকাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য মাস্তুলে বাঁধা লম্বা দড়ি। গুণ আর গুন এক নয়। গুন বাংলা শব্দ। ‘গুণ’ সংস্কৃত শব্দ। বানানে মূর্ধন্য-ণ অপরিহার্য। ‘গুণ’ বানানের ‘ণ’ স্বাভাবিক ‘ণ’।   গোপাল উড়ে লিখেছেন—
“থাকতে হয় লো কাদার জলে,
গুণ ফেলে ধনী”
গুন: গুন খাঁটি বাংলা শব্দ। সংস্কৃত গোণী হতে উদ্ভূত এবং বাক্যে সাধারণত (বিশেষ্য) হিসেবে ব্যবহৃত গুন অর্থ: চট সেলাই করার মোটা সুচ; চটের থলি। সুতরাং, গুণ আর গুন শব্দ ব্যবহারে সতর্কতা বাঞ্ছনীয়। তবে দেশি অব্যয়বাচক গুনগুন শব্দের সঙ্গে সুচ বা চটের থলির কোনো সম্পর্ক নেই। গুনগুন অর্থ: মধুর ধ্বনি, মৃদু গুঞ্জন।
গুণ টানা: নৌকার মাস্তুলে লম্বা দড়ি বেঁধে নৌকা টানাকে বলা হয় গুণ টানা। সাধারণত পণ্যবাহী বা মহাজনী নৌকাকে গুণ টেনে নিয়ে যাওয়া হতো। এখন যন্ত্রই টেনে নিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—
“. . .মহাজনী নৌকা গুণের টানে মন্থরগতিতে চলতে থাকে, ডিঙিনৌকা পাটকিলে রঙের পাল উড়িয়ে হু হু করে জল চিরিয়ে যায়. . ।” রবীন্দ্রনাথের উক্তি, ২০শে অক্টোবর ১৯৩৬; প্রভাত-রবি, রবিচ্ছবি।
গুনি: যারা গুণ টানে তাদের বলা হয় গুনি। এই ‘গুনি’ শব্দটি দড়ি অর্থে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘গুণ(√গুণ্‌+অ)’ থেকে উদ্ভূত। গুনি অতৎসম । তাই বানানে দন্ত্য-ন। মহাজন বললেন, চার জন গুণী গুনি নাও হে মাঝি।
তবে ‘গুণী’ বানানের সঙ্গে ‘গুনি’ বানানকে গুলিয়ে ফেলা চলবে না। তৎসম ‘গুণী (গুণ+ইন্‌) অর্থ (বিশেষণে) গুণ আছে এমন, কলাবিদ; সত্ত্ব তমঃ ও রজঃ গুণযুক্ত; মন্ত্রদ্বারা বশ করতে পারে এমন।
গুনিন: গুনিন বাংলা শব্দে। এর অর্থ (বিশেষ্যে) মন্ত্রবলে সাপেকাটা ভূতেধরা প্রভৃতি রোগীকে সুস্থ করতে পারে বলে দাবি করে এমন হাতুড়ে চিকিৎসক, ওঝা, রোজা; বাজিকর।
গুণ: তৎসম গুণ(√গুণ্‌+অ) অর্থ (বিশেষ্যে) (১) ধর্ম, স্বভাব, প্রকৃতি (২) চরিত্রের বৈশিষ্ট্য (গুণবান) (৩) হিত,কল্যাণ, সুফল (ভেষজগুণ), (৪) ফলদায়ক শক্তি (ওষুধের গুণ) (৫) নৈপুণ্য, দক্ষতা, (৬) প্রকৃতির ত্রিবিধি ধর্ম (সত্ত্ব রজঃ তমঃ), (৭) দড়ি (গুণ টানা), (৮) গুণন (৫ কে ৬ দিয়ে গুণ করো), (৯) বশীকরণ (গুণ করা), (১০) ধনুকের জ্যা (ধনুর্গুণ)।
error: Content is protected !!