গোগ্রাস, জিলাপি ও জিলিপি এবং গলগ্রহ

ড. মোহাম্মদ আমীন

গোগ্রাস, জিলাপি ও জিলিপি এবং গলগ্রহ

জিলাপি ও জিলিপি

জিলাপি ও জিলিপি উভয় বানান শুদ্ধ ও প্রমিত। এটি দুয়ের অধিক প্যাঁচবিশিষ্ট প্রায় গোলাকার বা কুণ্ডলাকার একপ্রকার মিঠাই। প্রত্যন্ত গ্রাম এবং রাজধানীর রাজবাড়ি হতে বস্তি পর্যন্ত সর্বত্র এর প্রবল চাহিদা ও জিহ্বাপ্রিয়তা রয়েছে। তবে জিলাপি বা জিলিপি নামের উৎপত্তি বাংলাদেশ নয়। হিন্দি ‘জলেবি’ থেকে বাংলা জিলাপি বা জিলিপি শব্দের উদ্ভব। অন্যদিকে, ফারসি ‘জলব’ থেকে হিন্দি ‘জলেবি’ শব্দের সৃষ্টি। তার মানে ‘জলব’ শব্দটি ফারসি হতে হিন্দিতে এবং হিন্দি হতে বাংলাদেশে এসে জিলাপি বা জিলিপি হয়ে গেছে।

ফারসি ‘জলব’ শব্দের অর্থ ‘গোল হতে হতে চলতে থাকা’ বা ‘প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে’ চলতে থাকা’। জিলাপির প্রস্তুত প্রক্রিয়ার সঙ্গে গোল

ড. মোহাম্মদ আমীন

হতে হতে বা প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে চলতে থাকা বাগ্‌ভঙ্গির কার্যপ্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে জড়িত। কাপড়ের ছোটো পুঁটলিতে জিলিপির উপকরণ নিয়ে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বা প্যঁচিয়ে প্যঁচিয়ে কড়াইয়ের তপ্ত তেলে ঢেলে জিলাপি তৈরি করা হয়। এ প্যাঁচালো প্রস্তুত পদ্ধতির জন্য এর নাম হয়েছে জিলাপি বা জিলিপি।

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, হিন্দি জিলাপি/জিলিপি অর্থ (বিশেষ্যে) চিনির রসে ভেজানো ময়দার তৈরি প্যাঁচানো নকশাবিশিষ্ট কুণ্ডলাকার মিঠাইবিশেষ। উৎস: বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, ড. মোহাম্মদ আমীন
গলগ্রহ 
অনভিপ্রেত বোঝা বা দায়িত্ব, পরের ওপর যা ভারস্বরূপ, অনিচ্ছাসত্ত্বেও যার ভার নিতে হয়, এমন বিষয় যা গ্রহণ করাও যায় না আবার বর্জন করাও যায় না।
গলগ্রহ প্রকৃতপক্ষে গলার এক প্রকার কঠিন যন্ত্রণাদায়ক রোগ। প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত চিকিৎসক ‘সুশ্রুত’-এর লেখায় তৎকালীন দুশ্চিকিৎস্য এ রোগের ভীষণ রকম বর্ণনা পাওয়া যায়।
গলগ্রহ রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির পক্ষে কোনো কিছু গলাধঃকরণ করা অতি কষ্টকর। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা, কিন্তু গলার যন্ত্রণায় কোনো কিছু গেলা সম্ভব হয় না— এটাই ‘গলগ্রহ’ রোগের লক্ষণ। এ অবস্থাটিই উপমাস্বরূপ বাগ্‌ভঙ্গিটিতে ব্যবহার করা হয়েছে। যাকে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না আবার ত্যাগ করাও সম্ভব নয়— এমন অবস্থা সৃষ্টিকারী ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়ই হচ্ছে ‘গলগ্রহ’। উৎস: বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, ড. মোহাম্মদ আমীন

গোগ্রাস

‘গোগ্রাস’ শব্দের অর্থ: বড়ো গ্রাস, ঘন ঘন গ্রাস। ‘গো’ ও ‘গ্রাস’ শব্দের মিলনে ‘গোগ্রাস’ শব্দের উদ্ভব। ‘গো’ মানে গোরু এবং ‘গ্রাস’ মানে লোকমা বা একবারে যে পরিমাণ খাদ্য মুখে পোরা যায়। সুতরাং গোগ্রাস মানে গোরুর লোকমা। গোগ্রাস শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ গোরুর লোকমা হলেও এখন শব্দটি গোরুর খাদ্য বোঝাতে কেউ ব্যবহার করেন না। কোনো ব্যক্তি যখন অতি দ্রুত বেশি পরিমাণ খাদ্য মুখে দিয়ে তাড়াতাড়ি গিলতে থাকেন এবং গেলা শেষ হওয়া মাত্র আবার একই কায়দায় মুখে বড়ো গ্রাস ঢুকিয়ে দিতে

পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

থাকেন, তখন সেটাকে গোগ্রাস বলা হয়।

বিভিন্ন কারণে মানুষকে গোগ্রাসে গিলতে হয়। প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে অনেক দিন পর উপাদেয় খাবার পেলে মানুষ গোরুর গ্রাসের মতো গোরু+গ্রাসে গিলতে শুরু করে। আবার অনেকে তাড়াতাড়ি খেয়ে না-নিলে ভাগে কম পড়বে ভেবে এমনটি করে থাকে। আবার কারও কারও অভ্যাসই হচ্ছে গোগ্রাসে গেলা। আধুনিক যান্ত্রিক যুগে সময়ের অভাবের ফাঁদে পড়ে গোগ্রাসে গেলাটা অনেক বিত্তবানের করুণ কিন্তু অনিবার্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। উৎস: বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, ড. মোহাম্মদ আমীন

কুপোকাত: কুপোকাত অর্থ: পতন, ভূমিসাৎ, পর্যুদস্ত প্রভৃতি। কুপো কাত শব্দের মিলনে কুপোকাত শব্দের উদ্ভব। কুপো অর্থ— মোটা পেট ও সরু গলাবিশিষ্ট পাত্র, যাতে সাধারণত তৈল রাখা হয়। কাত অর্থ হেলে পড়া বা মাটিতে ঢলে-পড়া। সুতরাং, কুপোকাত অর্থ তেলের পাত্র মাটিতে কাত হয়ে পড়া।

পাত্রের তেল মাটিতে গড়িয়ে পড়লে যেমন ভীষণ বিপর্যয়কর অবস্থার সৃষ্টি হয় তেমনি কোনো ব্যক্তিবিশেষ কুপোকাত হলেও একই রকম করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাই কুপোকাত শব্দটি কুপো নামের পাত্র হতে ব্যক্তির চিৎপাত, পরাজয়, বিনষ্ট, এলোমেলো, বিপর্যস্ত, পঞ্চত্বপ্রাপ্ত প্রভৃতি অর্থ ধারণ করে নিজের বিস্তারকে আরও শক্তপোক্ত করে তুলেছে। এটাকে বলে শব্দার্থের বিস্তার ও বিবর্তন। উৎস: বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, ড. মোহাম্মদ আমীন
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
এই পোস্টের ওয়েব লিংক: কিছু প্রয়োজনীয় পোস্ট
error: Content is protected !!