গ্রিস (Greece) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

গ্রিস (Greece)

গ্রিস এর সরকারি নাম হেলেনিক রিপাবলিক Hellenic Republic)। এটি বলকান উপদ্বীপের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের একটি রাষ্ট্র যা। এর উত্তরে বুলগেরিয়া, মেসিডোনিয়া ও আলবেনিয়া; পূর্বে তুরস্ক। গ্রিসের মূল ভূমির পূর্বে ও দক্ষিণে এজিয়ান সাগর এবং পশ্চিমে আইওনিয়ান সাগর। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের উভয় অংশে গ্রিসের অনেকগুলো দ্বীপ রয়েছে। গ্রিস ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার মিলন স্থলে অবস্থিত। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা, বাইজান্টাইন সম্রাজ্য এবং প্রায় ৪ শতকব্যাপি স্থায়ী অটোমান সম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র ছিল গ্রিস। এটি পশ্চিমা বিশ্বের জ্ঞান বিজ্ঞানের সূতিকাগার এবং গণতন্ত্রের জন্মস্থান হিসাবে পরিচিত। পশ্চিমা দর্শন, অলিম্পিক গেম্স, পশ্চিমা সাহিত্য, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং নাটকÑ সব মিলিয়ে গ্রিসের সভ্যতা সমগ্র ইউরোপে সবচেয়ে প্রভাবশালী সভ্যতা ছিল।  গ্রিসের মানচিত্র সুচালো টুপি পরিহিত বুড়ো লোকের মতো।

প্রাচীন ইংরেজি শব্দ গ্রেচাস (Grecas) ও ক্রেচাস (Crecas), ল্যাটিন গ্রেসেচাস (Græcus) বা গ্রিক গ্রেইকো (Graikoí) শব্দ হতে গ্রিস নামের উদ্ভব। এটি একটি উপজাতির নাম। ইপিরাস ও এরিস্টোটলের লেখা হতে জানা যায়, ইলিরিয়ান ভাষার শব্দ গ্রি (Graii) শব্দটির মূল উৎস এবং স্বদেশিরা এ উপজাতিকে এ নামে অভিহিত করত। প্রাচীনকাল হতে গ্রিস ও আশেপাশের অঞ্চলকে বলা হতো গ্র্যেজ(grauj)। পটো গ্রিক শব্দ Graikoí হতে নামটির উদ্ভব। এর অর্থ দীর্ঘকাল বা দীর্ঘবছর বা দীর্ঘবয়স বা দীর্ঘ যুগ (old age)। অন্যদিকে প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয়ান উৎসের শব্দ গেরি হতে গ্রিস নামের উদ্ভব। এর অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, সমৃদ্ধ হওয়া বা প্রাচীন হওয়া old age)। এ জাতিগোষ্ঠী অনেক প্রাচীন এবং জ্ঞানবিজ্ঞান ও সাহিত্য সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ ছিল। তারা শুধু সমৃদ্ধ হয়ে থেমে থাকেনি, দিন দিন তাদের সমৃদ্ধি, প্রসার ও সৃষ্টিকর্ম বেড়ে চলেছিল। এজন্য এ জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা এ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে তাদের বসবাসরত এলাকা ও চতুপাশ এই নামে বিকশিত হয়।

গ্রিসের মোট আয়তন ১,৩১,৯৫৭ বর্গকিলোমিটার বা ৫০,৯৪৯ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় অংশের পরিমাণ ০.৮৬৬৯%। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, মোট জনসংখ্যা ১,০৮,১৫,১৯৭ জন। প্রতি  বর্গকিলোমিটারে জনসংখার ঘনত্ব ৮২। আয়তন বিবেচনায় গ্রিস পৃথিবীর ৯৭-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় ৮০-তম। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ১২০-তম জনবহুল দেশ। গ্রিসের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর এথেন্স। অধিকাংশ জনগণ ইস্টার্ন অর্থডক্স ধর্মের অনুসারী। সরকারিভাবে গ্রিসের জনগণ গ্রিক নামে পরিচিত। দাপ্তরিক ও জাতীয় ভাষা গ্রিক।

২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে গ্রিসের জিডিপি (পিপিপি) ২৮৫.২৯৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ২৫,৯৫৪ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ২৩৭.৯৭০ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ২১,৬৪৮ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম ইউরো। মাথাপিছু আয় বিবেচনায় গ্রিস পৃথিবীর ৩৮-তম ধনী দেশ।

গ্রিক ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি অটোমান সাম্রাজ্য হতে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি স্বীধনতা পায়। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জুন বর্তমান সংবিধান গৃহীত হয়। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ জানুয়ারি গৃহীত পতাকা হতে ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর গ্রিসের বর্তমান পতাকাটি সরকারিভাবে গৃহীত হয়।

গ্রিস ইউরোপের সবচেয়ে রোদ্রকরোজ্জ্বল শহর। প্রতিবছর ২৫০দিনই রোদ্রোজ্জ্বল বা প্রতিবছর ৩০০০ ঘণ্টা রোদ্রোজ্জ্বল দিন উপভোগ করে। গ্রিসকে পৃথিবীর সবচেয়ে অধিক যৌন-সক্রিয় জাতি বলা হয়। ইউরোপের ইতিহাসে গ্রিসের একটা সিনেমায় ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে  মুক্তি পাওয়া অ্যাফানিস এন্ড ক্লাওয়ি (aphnis and Chloe) নামের চলচ্চিত্রে প্রথম উলঙ্গ দৃশ্য দেখান হয়। ডুরেক্স জরিপ অনুযায়ী গ্রিকরা বছওে ১৬৪ বার যৌন সঙ্গম করে। ব্রাজিলিয়ানরা এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয়। তারা করে বছরে ১৪৫ বার এবং জাপানিরা ৪৮ বার। গ্রিক পুরুষের গড় উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি। পুরুষের গড় উচ্চতা বিবেচনায় গ্রিস পৃথিবীর অষ্টাদশ নম্বরে অবস্থিত।

২০১১ খ্রিষ্টাব্দের আদম শুমারি অনুযায়ী গ্রিসের মোট জনসংখ্যার ৫৫% মহিলা এবং ৪৫% পুরুষ। ফলে গ্রিসের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের প্রায় ৬৫% শিক্ষার্থী মহিলা। গ্রিসের মহিলাদের গড় আয়ু ৮২.২ এবং পুরুষের ক্ষেত্রে তা ৭৭ বছর। এখানে রয়েছে ৪০০০ এর অধিক রকমের ঐতিহ্যবাহী দেশীয় নৃত্য। গ্রিস পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে প্রতিবছর পর্যটকের সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার দ্বিগুণ হয়। গ্রিক বর্ণমালাকে সৃষ্টির শুরু হতে এ পর্যন্ত অবিচ্ছন্নভাবে ব্যবহৃত পৃথিবীর প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এবং বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অধিক ব্যবহৃত বর্ণমালার অন্যতম বলা হয়। সান্তা ক্লসের আসল নাম সেন্ট নিকোলাস। তিনি ছিলেন গ্রিকের বিশপ এবং চতুর্দশ শতকে মাইরা (গুৎধ)নামক স্থানে বসবাস করতেন।

আয়তনে তেমন বড় না হলেও গ্রিসে ৩০০০ এর অধিক দ্বীপ ও খাঁড়ি রয়েছে। গ্রিসে ৩,১০০ এর অধিক আধুনিক বাণিজ্যিক জাহাজ রয়েছে। সংখ্যা বিবেচনায় জাপানের পর গ্রিসের স্থান। গ্রিসের জাহাজ ব্যবসায়ী অ্যারিস্টোটল ওনাসিস পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জন্মদিন পালন করা হয় কিন্তু গ্রিসে জন্মদিনের চেয়েও অধিক পালন করা হয় নেমস ডে বা নামরাখার দিবস। যেদিন শিশুর নাম রাখা হয়েছিল সেদিনটি নাম দিবস হিসাবে পালন করা হয়। গ্রিসে রয়েছে ১০০ টি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত অধিকসংখ্যক প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর নেই।

৯,৭৫০ ফুট উঁচু মাউন্ট অলিম্পিয়াস গ্রিসের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। গ্রিকদের বিশ্বাস এখানে অলিম্পিয়ান দেবতা দেবীগণ বসবাস করেন। এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজারের অধিক লোক অলিম্পাস শৃঙ্গে অবতরণ করেছেন। তবে কেউ সেখানে জিউস বা অন্য কোনো দেব- দেবী দেখার দাবি করেননি।

গ্রিকের কর্মচারীদেরকে প্রতিবছর কমপক্ষে এক মাসের সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়। গ্রিস এর মুদ্রা দ্রাকমা ২,৬৫০ বছরের প্রাচীন। এটি ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন মুদ্রা। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে  দ্রাকমার পরিবর্তে ইউরোকে মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা হয়। গ্রিকের প্রাচীন ধাতব মুদ্রায় ছিল দেব- দেবীর মুখচ্ছবি। আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট প্রথম গ্রিক শাসক, যার ছবি প্রথম ধাতব মুদ্রায় উৎকীর্ণ করা হয়।


ফ্রান্স (France) : ইতিহাস ও নামকরণ

জর্জিয়া (Georgia) : ইতিহাস ও নামকরণ

জার্মানি (Germany) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও প্রধান

বাংলা সংবাদপত্র সাময়িকী ও সাহিত্যপত্রিকা প্রথম ও প্রধান/১

 

error: Content is protected !!