ঘটিবাঙাল কথাটাতে ঘটি মানে কী

ইউসুফ খান
সংযোগ: https://draminbd.com/ঘটিবাঙাল-কথাটাতে-ঘটি-মান/
বাটী বাড়ী: যে ক্ষেতজমির চারিদিকে বেড়া দেয়া হয়েছে সেটা এখন শুধুই ক্ষেত নয়, সেটাকে বলে বাটী। বেড়াঘেরা বেগুন ক্ষেতকে বলে বেগুনবাটী। যে আবাসের চারিদিক বেড়া দিয়ে ঘেরা তাও বাটী। জমিদারদের প্রাসাদকে বলা হতো রাজবাটী। বাবুদের চোহেল করার জায়গা ছিলো বাগানবাটী। বাগানবাটী ঘেরা হতো যাতে ছোটোলোকরা ঢুকে না পড়ে। ভাষার নিয়মে অনেক ট ঠ পরে ড ড় হয়ে যায়। উল্টোটা হয় না। শালি ভিটি দুই বাটীই পরে হয়েছে বাড়ী বাড়ি। বেগুনবাড়ি রাজবাড়ি বাগানবাড়ি। হিন্দিতে বলে খেতী.বাড়ী।
ঘর বাড়ি:  বিদ্যাসাগরী বাংলায় ‘কল্য আমাদিগের বাটীতে আইস’ মানে বাড়িতে ডাকছে – আও কভী হাৱেলি পে। বাড়িতে এলে গল্প করবে পিঁড়েতে মানে দাওয়ায় মানে চাতালে বসিয়ে বা উঠোনে কাঠের পিঁড়েতে বসিয়ে। ঘরে ঢুকিয়ে নয়, নট ড্রয়িং ইন দ্য রুম। কারণ ঘর মোটেই পাবলিকের ড্রইংরুম না। একদম নিজের লোকেদের যাদের সঙ্গে দহরম মহরম আছে শুধু তাদেরই এন্ট্রি আছে এই স্যাঙ্ক্‌টাম্‌ স্যাঙ্ক্‌টোরামে। অন্যে পরে সঙ্কটম্‌। এইবাংলার গ্রামের সাধারণ মুসলমান বাড়িতে বিয়ে সম্বন্ধী কুটুমদেরকে ঘরের ভেতরের খাটে বসতে দেয়া হয়। তাদেরকে শুধু বাটীতে ডেকে নয়, ঘরে ঢুকিয়ে বসতে না দিলে খাতির করেনি বলে কথা ওঠে। বাংলায় ‘তুমি তো আমার ঘরের লোক’ কথাটা এত অন্দরের কথা এত অন্তরের কথা।
ঘটী ঘট্টী:  একই ধাতুতে গড়া বাটি বাটা হচ্ছে আধার আশয় আর বাটী বাড়ি হলো আবাস আশ্রয়, মানুষের আয়েসের আশয় আস্তানা। তেমনি ঘটি ঘড়া ঘড়ি হলো আধার কিন্তু তার প্যারালাল আবাস কই? ছিলো – ঘটী ঘটা ঘড়ি যাদের মানে হলো ঘর। আদি বাংলায় এবং ওড়িআয় কথাগুলো ছিলো। আঞ্চলিক ওড়িআয় এখনও আছে। আঞ্চলিক ওড়িআতে ঘট্টি ঘট্‌ঠি ঘট্‌ঠেইঁ ঘটি ঘঠি ঘঠিঁ ঘঠেঁ ঘঠেইঁ ঘট্‌ঠেইঁ মানে ঘরে, ঘট্টিকি ঘট্‌ঠিকি ঘঠেক্কি মানে ঘরপানে, ঘট্‌ঠু ঘঠউঁ ঘট্‌ঠউঁ মানে ঘর থেকে। নাগরিক ওড়িআয় এ তিনটে হয়েছে ঘরঠারে ঘরঠাকু ঘরঠারু। মানে ঘর-র আদিরূপ ছিলো ঘট ঘট্ট ঘঠ ঘট্‌ঠ। ওড়িআ উচ্চারণ সব অ-কারান্ত। তেলুগুতে ঘর ঘটী হচ্ছে গডি। বাংলার অনেক কথার প্রত্নরূপ ওড়িআ ভাষা ধরে রেখেছে, বাইরের হামলা ঝাপ্‌টা সামলে। আজকের ওড়িআর মতোই বাংলার অনেক উচ্চারণ অ-কারান্তই ছিলো, হসন্ত বা ও-কারান্ত নয়। চর্যা পড়তে গেলে এটা বোঝা যায়।
রাঢ়ী ঘটী:  বাংলাতে ঘর মানেতে ঘটী ঘটি এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বাংলার আদি ঘটী গড়াতে গড়াতে ঘড়ী ঘড়ি ঘড়া ঘড় হয়ে এখন ঘরে ঢুকে পড়েছে।
বন্দ্যঘটী। যে গ্রামে রায়দের বাটী আছে সেই গ্রামের নামই হয়ে গেছে রায়বাটী। তেমনি করে বৈদ্যবাটী জয়রামবাটী ইত্যাদি। কাটোয়ার এক গ্রামের নাম ছিলো কাঁটার। একসময়ে এখানে একঘর বন্দ্য পরিবার এসে বাস করতে শুরু করে তাই লোকমুখে গ্রামের নাম হয়ে গেলো বন্দ্যঘটী কাঁটার, মানে যে কাঁটারে বন্দ্যদের ঘটী আছে। বীরভূমের যে গাঁয়ে বন্দ্য ব্রাহ্মণরা ঘটী করে বাস করা শুরু করেছিলো সেই গ্রামের নামই হয়ে গেলো বন্দ্যঘটী এবং সেই ব্রাহ্মণ কুলের গাঞী পরিচয় হলো বন্দ্যঘটী গাঞী। সেই রাঢ়ী বন্দ্যরা এখনকার বন্দ্যোপাধ্যায়।
ঘড়ি। চর্যা তিনে বিরূপাপাদ লিখেছেন –
চউশটি ঘড়িয়ে দেল পসারা।
পইঠেল গরাহক নাহি নিসারা॥
চর্যার এই ঘড়ি হচ্ছে আধার ঘটি যে ঘড়িতে শুঁড়িনি মদ ঢেলে দিচ্ছে। আর ১৭৫০ সালে সৈয়দ সুলতান লিখেছেন – না জানি কোন ঘড়ি যাই। এই ঘড়ি হচ্ছে আবাস ঘটী।
ঘটীবাটী। ঘেরা জায়গাকে বলে বাটী বা বাড়ী, আর মাথা গোঁজার ধাঁচাকে বলে ঘর গৃহ। গৃহ আসলে ঘর গ্‌র্‌হ, বাঙালি গ্রিহো উচ্চারণ করে। ঘর আর বাড়ি একসঙ্গে হলে তাকে বলে ঘরবড়ি ঘটীবাটী। আসল মানেতে ফ্ল্যাটবাড়ি বাড়ী নয় বাসা মাত্র। ‘ঘটীবাটী বেচে মামলা লড়া’ বা ‘ঘটীবাটী বেচে বাবার চিকিৎসা করা’ কথাগুলোতে ঘটীবাটী বেচা মানে ঘরবাড়ি বেচা। এই ঘটীবাটী মোটেই হেঁশেলের ঘটিবাটি জলের ঘটি ঝোলের বাটি নয়, টাম্‌লার বোওল নয়। টামলার বেচে মামলার খরচা উঠবে না।
ঘাটা। বগুড়ায় বাড়ির চৌহদ্দিকে বলে ঘাটাখুলি মানে ঘটীর বাইরের খোলা জায়গা।
ঘটাটোপ। ঘর মানেতে ঘটা কথাটাও চলতো। বাড়ির কোনও জিনিস বক্স মতো কিউব মতো বা নিদেন পিরামিড মতো হলে সেটাকে বলতো ঘটা ঘট ঘড়। ঘরের কোণে পাকাপাকি রেখে দেয়া এই শেপের জিনিস ঢাকার জন্য যে কাপড়টা ব্যবহার হতো টুপির মতো টোপের মতো সেই কাপড়টাকে বলা হতো ঘটাটোপ ঘড়াটোপ, এখন যা হয়েছে ঘেরাটোপ। পালকির ধাঁচাটা ঘরের মতো ঘটার মতো। তাই পালকির গিলাফ জামাটাকে বলতো ঘটাটোপ ঘেরাটোপ। ঘটাটোপের মানে না বোঝা লোকেরা পালকিটাকেই বলতো ঘটাটোপ।
ঘট্টী ঘোড্ডি: ঘটী মানে ঘর। ঘটীর লোক ঘরের লোক বোঝাতে রাঢ়ে যে কথাটা চলতো সেটা হচ্ছে ঘট্টী লোক, উচ্চারণ ঘোট্‌টি। ঘট্টী মানে ঘরের ঘরোয়া লোকাল এদেশী স্থানীয়। বর্ধমানের গ্রামে কথাটা এখনও চলে, ঘড্ডি ঘোড্ডি রূপে। আগে একেকটা গ্রাম কি একেকটা পাড়া জুড়ে সব ঘরই হতো একই বংশের কি একই পরিবারের। তাই তারা সবাই হতো ঘরের লোক ঘড্ডি লোক। যারা ঘড্ডি নয় তারা সবাই বাইরের লোক ভিনগাঁয়ের লোক ভেন্ন লোক।
বর্ধমানে আজও অন্য প্রদেশের অন্য জেলার জন মুনিষ ব্যাপারী সবাইকেই ধরা হয় বাইরের লোক বহিরাগত, কেউ ঘড্ডি না। আমাদের বয়স্করা মেয়ের বাবাকে বলতো – ‘মেদনিপুরে মেয়ে দিবি, একটা ঘড্ডি ছেলে পেলি না বিয়ে দিবার মতো?’ ঘরের মেয়েবউরা বাটীর আব্রুর মধ্যে থাকবে এটাই ঘড্ডি ঘরের ঘরানা। ঘোড্ডি মেয়েবউরা কুচ্ছো করতো – ‘জানো, বাঙালদের বউটা রোজ দুকানে বসে? কী ঘিন্নার কতা! বাঙাল বলেই পারে, ঘোড্ডি বউ হলে মুকে নুড়ো জ্বেলে দিতো।’ ‘বাঙালগুনো সব একঘর একঘর করে ভিটে কিনে বসে পড়ছে, এরপর পুরো বংশ লিয়ে আসবে, ঘোড্ডি লোকদের আর থাকার জায়গা থাকবে না।’ উড়ে ঘট্টি আর রাঢ়ী ঘড্ডি একটাই কথা। রাঢ়ী লোকাল ঘট্টীদের কাছে রাঢ়ে আসা বঙ্গের বঙ্গাল বাইরের লোক বহিরাগত। তাই বাঙালরা লোকাল না, ঘট্টী না। ঘট্টী বাড়ির লোকেরা বাঙাল বাড়ির মেয়ে ঘরে তুলতো না। ঘটিবাঙাল কথাটাতে ঘটি মানে ঘট্টী, রাঢ়ের ঘরের লোক, লোকাল লোক।
ঘটী ঘট্টী দুটো কথাই বাংলা ভাষার জন্মের আগে জন্মেছে। ন্যাচারাল অর্গানিক জন্ম। ঘটি বাঙাল দুটো কথাই দুটো দেশ-আত্মক কথা, কোনওটাই কাউকে হ্যাটা করার প্রয়োজনে পয়দা করা হয়নি। দেশভাগের পর দুপারের দোগলা লোকজন কথাদুটোকে নিয়ে ছোটোলোকোমি করেছে বটে, তবে কথাদুটোকে আবার এদের সম্মানের মানেতে ফিরিয়ে দেয়া যায়। বাংলা ভাষাকে বুঝতে গেলে কোল মুণ্ডারী ওড়িআ রাঢ়ী সব সাগরেই ডুব দিতে হবে।
(ত্রুটি মার্জনীয় শুদ্ধি প্রার্থনীয়) ইউসুফ খান কলকাতা ২০২১ আগস্ট ২০
জানা অজানা অনেক মজার বিষয়: https://draminbd.com/?s=অজানা+অনেক+মজার+বিষয়
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
error: Content is protected !!